অপ্রতিম চলে গেছে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে কোনও শিশুর এমন চলে যাওয়া গভীর বেদনার। তার মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা হচ্ছে। শিশুর নিরাপত্তা, অভিভাবকের দায়িত্ব, মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে নানা মত উঠে এসেছে। এসব আলোচনায় আবেগ থাকা স্বাভাবিক। তবে শোকের পাশাপাশি প্রয়োজন আত্মজিজ্ঞাসা। অপ্রতিমের মর্মান্তিক মৃত্যু পরিবার ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব সম্পর্কে আমাদের কী শেখায়, সেই প্রশ্নও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, অপ্রতিম মায়ের মুঠোফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল। পরে সে নিখোঁজ হয় এবং পরদিন কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সংবাদে তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন থাকার কথাও জানানো হয়েছে। পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে এবং মুঠোফোন উদ্ধারের কথাও সংবাদে এসেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, কী উদ্দেশ্যে ঘটনা ঘটেছে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
অপ্রতিমের মা-বাবাকে দায়ী করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। কোনো পরিবারের ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ঘরের ভেতরের বাস্তবতা সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা ছাড়া অভিভাবকদের নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ন্যায়সংগত নয়। সন্তান হারানোর শোকে থাকা পরিবারের প্রতি প্রথম দায়িত্ব সহমর্মিতা। আলোচনার লক্ষ্য পরিবারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নয়; পরিবর্তিত সময়ের বাস্তবতায় সন্তানের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং অভিভাবকত্বের ধরন নিয়ে নতুন করে ভাবা।
সন্তানের নিরাপত্তা কেবল পরিবারের দায়িত্ব নয়। পরিবারকে সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে হবে, রাষ্ট্রকেও শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবার সন্তানকে ভালোবাসা, শিক্ষা, মূল্যবোধ, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেবে। রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ জনপরিসর, কার্যকর আইন, দ্রুত সহায়তা, শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা, নিরাপদ বিদ্যালয়, সুষ্ঠু নগরব্যবস্থা এবং নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ। দুই পক্ষের দায়িত্ব পরস্পরের বিকল্প নয়।
আমাদের সন্তানরা যে পৃথিবীতে বড় হচ্ছে, তা আমাদের শৈশবের পৃথিবীর মতো নয়। আগে শিশুর জগত মূলত বাড়ি, বিদ্যালয়, মাঠ, আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। সন্তান কোথায় খেলছে, কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, কখন বাড়ি ফিরবে, এসব বিষয়ে বাবা-মায়ের নজর রাখা তুলনামূলক সহজ ছিল। এখন ঘরে বসেও শিশু এমন এক জগতে প্রবেশ করতে পারে, যার পরিধি পরিবারের পরিচিত পরিবেশের অনেক বাইরে।
মুঠোফোন শিশুর পড়াশোনা, বিনোদন ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তার পরিচিতির পরিধি আরও বাড়িয়েছে। সে ছবি প্রকাশ করতে পারে, ভিডিও তৈরি করতে পারে, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে এবং বয়সের অনুপযোগী নানা বিষয় দেখতে পারে। ফলে সন্তান ঘরে আছে বলেই নিরাপদ আছে, এমন ধারণা এখন যথেষ্ট নয়।
এই বাস্তবতায় অভিভাবকের দায়িত্বও বেড়েছে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, কী ধরনের অনলাইন যোগাযোগ করছে, এসব বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ঝুঁকি, বিপদের লক্ষণ, জরুরি সময়ে সাহায্য চাওয়ার পদ্ধতি, ছবি ও ভিডিও প্রকাশের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সন্তানকে বয়স-উপযোগী ভাষায় শেখাতে হবে।
তবে অভিভাবকত্ব মানে সারাক্ষণ নজরদারি নয়। সন্তানের স্বাধীনতা প্রয়োজন; ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও দরকার। একই সঙ্গে স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধের সম্পর্ক থাকতে হবে। বয়স ও পরিপক্বতা অনুযায়ী স্বাধীনতার পরিধি বাড়বে, তার সঙ্গে বাড়বে দায়িত্ব। বাবা-মায়ের কাজ হলো সেই ভারসাম্য তৈরি করা।
আমাদের বাবা-মায়েরা অনেক সময় কঠোর ছিলেন। আমরা কার সঙ্গে মিশছি, কোথায় যাচ্ছি, কখন বাড়ি ফিরছি, এসব বিষয়ে তারা নিয়মিত খোঁজ নিতেন। তখন সেই শাসন স্বাধীনতার পথে বাধা মনে হতো। এখন পেছনে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, সেই কঠোরতার বড় অংশের পেছনে ছিল নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। তবে অতীতের কাঠামো হুবহু ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। বর্তমান প্রজন্মের জন্য প্রয়োজন এমন অভিভাবকত্ব, যেখানে শাসনের সঙ্গে যুক্তি, নজরদারির সঙ্গে আস্থা এবং স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ থাকবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার যত সচেতনই হোক, শিশুর নিরাপত্তা সবসময় পরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সন্তান বিদ্যালয়ে যায়, সড়কে চলাচল করে, গণপরিবহন ব্যবহার করে, পার্কে যায়, খেলাধুলা করে, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয়, ইন্টারনেট ব্যবহার করে। এসব ক্ষেত্রেই তার নিরাপত্তার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
একজন অভিভাবক সন্তানকে রাস্তা পার হওয়ার নিয়ম শেখাতে পারেন। কিন্তু ফুটপাত দখল হয়ে থাকলে, পথচারী পারাপারের নিরাপদ ব্যবস্থা না থাকলে, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে শুধু শিশুকে সাবধান করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। বাবা-মা সন্তানকে অনলাইন যোগাযোগের ঝুঁকি বোঝাতে পারেন। কিন্তু শিশুদের লক্ষ্য করে পরিচালিত ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড ঠেকাতে কার্যকর প্রযুক্তিগত ও আইনগত ব্যবস্থা প্রয়োজন। পরিবার সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারে; বিদ্যালয়ের আশপাশের পরিবেশ নিরাপদ রাখার দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও শিশু নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিবার ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব পাশাপাশি বিবেচনা করা হচ্ছে। অনলাইন নিরাপত্তা, বয়সভিত্তিক সুরক্ষা, অভিভাবকদের জন্য নির্দেশনা, শিশু সুরক্ষা আইন, বিদ্যালয়ভিত্তিক নিরাপত্তা শিক্ষা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিয়ে নানা উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। দেশভেদে পদ্ধতি ভিন্ন হলেও মূল প্রশ্ন অভিন্ন: শিশুকে নিরাপদে বেড়ে ওঠার পরিবেশ কীভাবে নিশ্চিত করা যায়?
বাংলাদেশেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা প্রয়োজন। কোনো মর্মান্তিক ঘটনার পর সাময়িক আলোড়ন তৈরি হলে দায়িত্ব শেষ হয় না। শিশু নিখোঁজ হলে দ্রুত অনুসন্ধান, বিপদে পড়লে দ্রুত সহায়তা, অপরাধের অভিযোগে কার্যকর তদন্ত, জনপরিসরে নিরাপত্তা, বিদ্যালয় ও যাতায়াতব্যবস্থায় সুরক্ষা এবং অনলাইন ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতার জন্য স্থায়ী ও সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা বলতে গিয়ে পরিবারের দায়িত্বকে ছোট করার সুযোগ নেই। যে রাষ্ট্রব্যবস্থায় সন্তানের নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারকে তুলনামূলকভাবে বেশি উদ্বিগ্ন থাকতে হয়, সেখানে অভিভাবকদের আরও সচেতনতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা থাকলে পারিবারিক সতর্কতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে পরিবারের সতর্কতা কখনো রাষ্ট্রের দায়িত্বের বিকল্প হতে পারে না।
পরিবারকে পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে হবে, রাষ্ট্রকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করতে হবে। পরিবার সন্তানের চরিত্র গঠনের প্রথম বিদ্যালয়; রাষ্ট্র শিশুর জন্য বৃহত্তর নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার প্রধান প্রতিষ্ঠান। কোনো পক্ষের দায়িত্ব অন্য পক্ষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
সন্তানের সঙ্গে পরিবারের সম্পর্কও নতুন করে ভাবতে হবে। সন্তান কী দেখছে, কী শুনছে, কী নিয়ে আগ্রহী, কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে, অনলাইনে কাদের অনুসরণ করছে, এসব জানতে হলে তার সঙ্গে কথা বলতে হবে। এমন পারিবারিক পরিবেশ দরকার, যেখানে সন্তান ভুল করলে কথা বলতে পারে, বিপদে পড়লে সাহায্য চাইতে পারে এবং অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা হলে বাবা-মায়ের কাছে ফিরে আসতে পারে।
অপ্রতিমের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হোক। দায়ী আইনের আওতায় আসুক। পাশাপাশি এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের বৃহত্তর দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দিক।
সন্তানকে শুধু ভালো ফলাফল, ভালো শিক্ষা ও ভালো পেশার জন্য প্রস্তুত করাই যথেষ্ট নয়। তাকে নিরাপদে চলতে শেখাতে হবে, বিপদ চিনতে শেখাতে হবে, নিজের সীমা বুঝতে শেখাতে হবে এবং প্রয়োজনে সাহায্য চাইতে শেখাতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে শিশুর নিরাপত্তা শুধু বাবা-মায়ের সতর্কতার ওপর নির্ভরশীল থাকবে না।
অপ্রতিমের পরিবারের প্রতি আমাদের গভীর সহমর্মিতা। তার চলে যাওয়া যেন শুধু শোকের সংবাদ হয়ে না থাকে। এই শোক পরিবারগুলোকে আরও দায়িত্বশীল করুক, রাষ্ট্রকে আরও জবাবদিহিমূলক করুক, সমাজকে আরও সচেতন করুক।
সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে, শুধু আহারে নয়, নিরাপত্তায়, ভালোবাসায়, সুশিক্ষায়, সুস্থতায় এবং সুন্দর ভবিষ্যতের আলোয়। সেই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দায়িত্ব পরিবারেরও, রাষ্ট্রেরও।
লেখক: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়




