ধর্ম ও আইনের বাহানায় শিক্ষকের অপকর্ম আড়াল করার সুযোগ নেই

ড. খালিদুর রহমান
০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১৪:০০ আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১৪:০০

গাজীপুরের টঙ্গীতে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মাদ্রাসাশিক্ষককে মারধর এবং সেই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি আমাদের সমাজের সামনে গভীর কিছু প্রশ্ন তুলে ধরেছে। শিশুর নিরাপত্তা, শিক্ষকের নৈতিকতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার এবং আইনের শাসন নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। অপরাধের অভিযোগ উঠলে যেমন নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে, তেমনই ধর্মীয় পরিচয় ও আইনের দোহাই দিয়ে অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাও প্রতিহত করতে হবে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনই ধর্মের আবরণে অন্যায়কে আড়াল করাও কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না।

প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া সাত বছর বয়সী এক ছাত্রীর প্রতি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে শিক্ষক মোসলেম আহম্মদের বিরুদ্ধে। শিশুটির বাবার করা মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ শিক্ষককে মারধর, প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর এবং অর্থ ও মোবাইলফোন লুটের অভিযোগে পৃথক অভিযোগ দিয়েছে। শিশুটির বাবা লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফলে ঘটনার প্রতিটি দিক নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। যৌন নিপীড়নের অভিযোগের তদন্ত যেমন গুরুত্বের সঙ্গে করতে হবে, তেমনই মারধর ও লুটপাটের অভিযোগ থাকলে সেগুলোরও আইনানুগ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে।

শিশুর প্রতি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। অল্পবয়সী শিশুরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন হওয়ার আগেই অনেক সময় পরিচিত মানুষের কাছ থেকে নির্যাতনের শিকার হয়। শিক্ষককে শিশুদের কাছে নিরাপত্তা, আস্থা ও স্নেহের প্রতীক হওয়ার কথা। সেই অবস্থানের অপব্যবহার করে কেউ অপরাধে জড়ালে তা শুধু ব্যক্তিগত নৈতিকতার বিচ্যুতি নয়, শিক্ষার্থীদের প্রতি অর্পিত দায়িত্বেরও গুরুতর লঙ্ঘন। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যেমন ন্যায়সংগত নয়, তেমনই অভিযুক্তের পেশা, ধর্মীয় পরিচয় ও প্রতিষ্ঠানের মর্যাদার দোহাই দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত বাধাগ্রস্ত করাও অনুচিত। আইনের শাসনের অর্থ হলো— অভিযোগের গুরুত্ব অনুসারে তদন্ত হবে, প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার হবে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

এখানে ধর্মীয় অনুভূতির দোহাই দিয়ে শিশুটির বাবাকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কোনও শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তার সমর্থনে দাঁড়িয়ে অভিযোগকারী পরিবারকে ভয় দেখানো, সামাজিকভাবে হেয় করা ও ন্যায়বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে সম্মান করার অর্থ সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির কর্মকাণ্ড কেন প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা নয়। প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে অনিয়মের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। অভিযোগ সত্য হলে অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। ধর্মীয় পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অভিযোগকারীর কণ্ঠ স্তব্ধ করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা অন্যায়ের প্রতিবাদ, নির্যাতিতের পাশে দাঁড়ানো এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেয়। পবিত্র কোরআনের সুরা আন নিসার ১৩৫ নম্বর আয়াতে ন্যায়বিচারের ওপর দৃঢ় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এমনকি সেই ন্যায় নিজের এবং আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধেও গেলেও। সুরা আল মায়িদার ৮ নম্বর আয়াতেও কোনও সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত না করে, সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। এসব নির্দেশনার আলোকে প্রশ্ন ওঠে, ধর্মীয় অনুভূতির প্রশ্নে যারা সোচ্চার, শিশুদের প্রতি যৌন নিপীড়নের অভিযোগের ক্ষেত্রেও তাদের একইভাবে ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানো উচিত নয় কি? ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর অর্থ অন্যায়ের অভিযোগ অস্বীকার করা নয়— বরং সত্য অনুসন্ধান ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করা।

অন্যদিকে, অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধর করার ঘটনাও সমর্থন করা যায় না। জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা সাময়িকভাবে ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারে, কিন্তু সত্য উদ্ঘাটন কিংবা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না। অভিযোগের পুরো বিবরণ না জেনে কাউকে শাস্তি দেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে গুজব, ব্যক্তিগত বিরোধ ও ভুল তথ্যের কারণে নিরপরাধ মানুষও সহিংসতার শিকার হতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনও ঘটনার আংশিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই যাচাই ছাড়াই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান।

অথচ ভিডিওতে দেখা দৃশ্য দিয়ে সব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। অপরাধের বিচার আদালতের দায়িত্ব; নাগরিকের দায়িত্ব অভিযোগ জানানো, তদন্তে সহযোগিতা করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে বিষয়টি তুলে ধরা।

শিশুর প্রতি সহিংসতার ব্যাপকতা নিয়েও উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ইউনিসেফের ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর প্রকাশিত বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে জীবিত ৩৭ কোটিরও বেশি মেয়ে ও নারী ১৮ বছর বয়সের আগে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। অনলাইন ও মৌখিক যৌন নিপীড়নের মতো সংস্পর্শবিহীন ঘটনাও হিসাবে ধরলে সংখ্যাটি প্রায় ৬৫ কোটিতে পৌঁছায়। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের ২০১৯ সালের বহুমাত্রিক সূচক জরিপে দেখা যায়, এক থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৮.৮ শতাংশ জরিপের আগের এক মাসে শারীরিক শাস্তি ও মানসিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছিল।

দ্বিতীয় পরিসংখ্যানটি সরাসরি যৌন নিপীড়নের হার নির্দেশ করে না; তবে শিশুদের প্রতি সহিংস আচরণের ব্যাপকতা বোঝায়। এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট— শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু পরিবারের নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব। টঙ্গীর ঘটনায় সংবাদ অনুযায়ী, ঘটনার পর শিশুটি মাদ্রাসায় যেতে চাইছিল না। প্রথমে পরিবারের সদস্যদের কাছে কিছু না বললেও পরে মা-বাবার জিজ্ঞাসাবাদে সে ঘটনার কথা জানায়। এমন পরিস্থিতিতে শিশুর বক্তব্য শোনার ক্ষেত্রে ধৈর্য, সংবেদনশীলতা ও সতর্কতা প্রয়োজন। তাকে বারবার প্রশ্ন করে মানসিক চাপে ফেলা, ভয় দেখানো এবং নিজের বক্তব্য বদলাতে প্রভাবিত করা উচিত নয়। শিশুটির পরিচয়, ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি প্রকাশের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন। তার নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন অনুসারে প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতার সহায়তা দেওয়াও জরুরি। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পথে শিশুটিকে নতুন করে মানসিক যন্ত্রণার মুখে ঠেলে দেওয়া চলবে না।

মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষেরও সুস্পষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। কোনও শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার অজুহাতে বিষয়টি চাপা দেওয়া কিংবা অভিযোগকারী পরিবারকে নিরুৎসাহিত করা উচিত নয়। অভিযোগ গ্রহণ, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। একইসঙ্গে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে পুরো প্রতিষ্ঠান কিংবা সেখানকার সব শিক্ষককে দায়ী করাও ন্যায়সংগত নয়। শিক্ষকদের ন্যায্য ছুটি, বিশ্রাম ও সুস্থ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে কর্মক্ষেত্রের চাপ ও ব্যক্তিগত সমস্যাকে কোনোভাবেই যৌন নিপীড়ন ও অনৈতিক আচরণের অজুহাত হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। শিক্ষকের প্রথম দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করা।

শিশু সুরক্ষার প্রশ্নে শুধু মাদ্রাসাকেন্দ্রিক আলোচনা করলেও চলবে না। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর আচরণবিধি, নিরাপদ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে অভিযোগকারীর সুরক্ষা, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নীতি অনুসরণ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে, সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় অযৌক্তিক বিলম্ব কমাতে হবে। গণমাধ্যমের দায়িত্ব যাচাই করা তথ্য প্রকাশ করা।

নাগরিকদেরও গুজব ছড়ানো, হুমকি দেওয়া এবং প্রতিশোধমূলক সহিংসতায় উসকানি দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। টঙ্গীর ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ধর্মীয় মর্যাদা এবং আইনের দোহাই দিয়ে কোনও অভিযোগকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে প্রতিশোধকে ন্যায়বিচার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করারও সুযোগ নেই।

অভিযোগ সত্য হলে অপরাধীর পরিচয় ও প্রভাব নির্বিশেষে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে; অভিযোগ প্রমাণিত না হলে অভিযুক্তের অধিকারও রক্ষা করতে হবে। শিশুর নিরাপত্তা, অভিযোগকারী পরিবারের মর্যাদা এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ধর্মের নামে অপরাধ আড়াল করা যেমন অন্যায়, তেমনই আইনের বাইরে গিয়ে শাস্তি দেওয়াও অন্যায়। জনতার থাপ্পড় নয়, প্রমাণভিত্তিক বিচারই হোক অন্যায়ের প্রতিকার। ধর্মীয় মূল্যবোধ, মানবিক দায়িত্ব ও আইনের শাসনের সমন্বয়েই নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার রায়ে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা বাংলাদেশের
রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার রায়ে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা বাংলাদেশের
শ্রমিকদের কাজে ফেরার পরও কেন সতর্ক পুলিশ
শ্রমিকদের কাজে ফেরার পরও কেন সতর্ক পুলিশ
ধর্ম ও আইনের বাহানায় শিক্ষকের অপকর্ম আড়াল করার সুযোগ নেই
ধর্ম ও আইনের বাহানায় শিক্ষকের অপকর্ম আড়াল করার সুযোগ নেই
জানেন কি, কোন শহর ‘প্রাচ্যের লন্ডন’ নামে পরিচিত?
জানেন কি, কোন শহর ‘প্রাচ্যের লন্ডন’ নামে পরিচিত?
সর্বশেষ সর্বাধিক