জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেশের সংকীর্ণ রাজনৈতিক দলাদলি থেকে বের হয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের একটি অগ্রণী ভূমিকা তুলে ধরার সুযোগ এনে দেয়। এই সুযোগ প্রতি বছরই আসে, তবে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে এবারের সাধারণ অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বাড়তি গুরুত্ব এনে দিয়েছিল।
এখন প্রশ্ন হলো, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কি সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করলেন? নাকি চিরাচরিত নিয়মে নিজ দলের গুণগান, প্রতিপক্ষকে গাল-মন্দ এবং ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ে সাদামাটা আমলাতান্ত্রিক ভাষা দিয়ে ‘ধরি মাছ, না ছুঁই পানি’ ধরনের বক্তব্য দিয়েই সারলেন?
ভাষণের শুরুতেই বোঝা গেলো, প্রধানমন্ত্রী কোনও নতুন পথে হাঁটবেন না। দেশের বয়স ৫৫ বছর, কিন্তু তিনি ‘স্মৃতিকাতর’ হয়ে এই মঞ্চে শুধু তার পিতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভাষণের কথা স্মরণ করলেন। এই একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ১৯৭৪ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন। সেকথাও তিনি স্মরণ করতে পারতেন। করলে দেশের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে তার অবস্থান দুর্বল হতো না। কিন্তু মঞ্চ যত বড়ই হোক, দেশের রাজনৈতিক সংকীর্ণতার কারণে এ ধরনের কোনও মহানুভবতা দেখানোর সুযোগ নেই।
বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েও বাংলাদেশের নেতারা দেশে ফেলে আসা রাজনৈতিক বিভাজন থেকে বের হতে পারেন না। এরকম উদাহরণ অতীতে আছে। এবারও কোন ব্যতিক্রম হলো না। প্রধানমন্ত্রী অতীতকে দোষারোপ করলেন, ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘ফ্যাসিবাদী’ বলে আখ্যায়িত করলেন, আর নিজে দলের কর্মসূচিকে উন্নয়নের রূপরেখা হিসেবে তুলে ধরলেন।
দেশ পুনরায় গণতন্ত্রের পথে ফিরে এসেছে, এ কথা যে তিনি বলবেন সেটা প্রত্যাশিত ছিল; ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের গুণগান গাইনবেন, সেটাও আশ্চর্য করার মত কিছু নয়। কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে ‘ফ্যাসিবাদী’ আখ্যা দেওয়ার দেশি রীতি যখন বিশ্বমঞ্চে নিয়ে আসা হয়, তখন সেটা দেশের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশকে ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করার সামিল। নতুন রাজনীতির লক্ষণ হতো যদি তিনি শুধু ইতিবাচক অগ্রযাত্রার কথাই বলতেন, কাউকে দোষারোপ করে খণ্ডিত জাতি উপস্থাপন না করতেন।
ভাষণের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘জনগণের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা এমন একটি সমৃদ্ধ স্বনির্ভর কল্যাণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই যে রাষ্ট্রে দলমত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই নিশ্চিন্তে, নিরাপদে সমান অধিকার, সম্মান এবং মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে সক্ষম হবে।’
কথাগুলো শুনতে সবারই ভালো লাগবে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু যখন একটি দলের কর্মী-সমর্থকরা গ্রেফতার আতঙ্কে ভুয়া মামলা মাথায় নিয়ে পালিয়ে থাকে; বা মাসের পর মাস বিনা বিচারে কারাগারে বন্দী থাকে; বা সেই দলের ‘দোসর’ আখ্যা দিয়ে যখন যে কাউকে হামলা করা যায়, পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে মিথ্যা মামলায় কারাগারে পাঠানো যায়, তখন এই কথাগুলো অন্তঃসারশূন্য মনে হলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার ভাষণে বেশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর মন্তব্য করেছেন। যেমন, অভিবাসন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোহিঙ্গা সংকট, সংঘাতময় বিশ্ব পরিস্থিতি, জাতিসংঘের উন্নয়ন লক্ষ্য ইত্যাদি। সবক্ষেত্রেই দেখা গেছে সরকারের কর্মসূচি বা সাফল্য তুলে ধরা হয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এড়াতে নিরস্ত্রীকরণসহ শান্তি প্রচেষ্টার পক্ষে অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। জাতিসংঘের রাজনীতিতে এগুলো ধরা-বাঁধা বিষয়, যেগুলোর উপর উন্নয়নশীল দেশের বক্তব্য অন্যরা শোনেন এবং সাধারণত জাতিসংঘ ভবন থেকে বের হওয়ার আগেই ভুলে যান।
তবে, প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব প্রচার দল কীভাবে তার ভাষণ দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছে, সেটা কিছুটা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের ব্রিফ করার সময় জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যকে ‘ঐতিহাসিক এবং যুগান্তকারী’ বলে বর্ণনা করেন।
এক পরিবার, তিন ভাষণ
মাহদী আমিন বলেন যে, এই ভাষণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ‘নতুন এক ইতিহাসের সৃষ্টি করেছে’। নতুন এই ইতিহাসটা কী? আমিনের বক্তব্য পড়ে মনে হলো একই পরিবারের তিন সদস্য দেশের সরকার প্রধান হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার বিরল ঘটনাকেই তিনি ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে দেখছেন। শুধু পরিবার নয়, নেতা-বন্দনাই ছিল সরকারি মুখপাত্রের মূল লক্ষ্য।
‘এ ভাষণের মাধ্যমে একজন সরকারপ্রধান কীভাবে প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠেন, তারই বহিঃপ্রকাশ বিশ্ববাসী দেখেছে,’ আমিন বলেন।
নেতা-বন্দনার এরকম উৎকৃষ্ট উদাহরণ বিশ্বে সত্যই বিরল। কিন্তু তিনি সেখানেই থেমে যাননি। তিনি দেশবাসীকে মনে করিয়ে দিলেন যে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং তিনি বিশ্ব শান্তি এবং ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী মানুষের অধিকার রক্ষা নিয়েও বক্তব্য দেন এবং খোদ জাতিসংঘকে লক্ষ্য করেও উপদেশ দেন।
‘জাতিসংঘ কীভাবে সারাবিশ্বে শান্তি, সমৃদ্ধি ও ঐক্য ফিরিয়ে আনতে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে, সেই সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বিশ্বনেতাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন,’ মাহদী আমিন সংবাদ সম্মেলনে বলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণে এসব দিক আছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু এ কথাগুলো যে ‘ঐতিহাসিক’ বা ‘রাষ্ট্রনায়কসুলভ’; তা নিয়ে দ্বিমতের সুযোগ আছে। প্রথমত, বাংলাদেশের সরকার প্রধানরা জাতিসংঘে ভাষণ দিতে এসে ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে সবসময় কথা বলেন। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের নেতারাই তাদের ভাষণে শান্তি-সমৃদ্ধির কথা বলেন, জাতিসংঘকে আরও শক্তিশালী, কার্যকর ভূমিকায় দেখতে চান। এগুলো যেকোনও আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশের গৎবাঁধা বুলি।
দ্বিতীয়ত, জাতিসংঘ কীভাবে জোরাল ভূমিকা রাখতে পারে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘সেই সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বিশ্বনেতাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন’ বলে যে দাবি তার মুখপাত্র করেছেন, সেটা নিয়ে শুধু দ্বিমত নয়, রীতিমত ঝগড়া করা যেতে পারে।
স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের ভূমিকা বা তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা নিয়ে ভালো ভালো কথা বলেছেন ঠিকই, কিন্তু সেগুলোকে কি আদৌ একটি ‘রূপরেখা’ হিসেবে বর্ণনা করা যায়? আর কোন ‘বিশ্বনেতার’ সামনে সেটা উপস্থাপন করা হলো? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণের সময় সাধারণ সভা কক্ষর বেশির ভাগ আসন খালি ছিল।
প্রধানমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন যে গ্লোবালাইজেশনের যুগে বিশ্বের এক প্রান্তের সংঘাত অপর প্রান্তে অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটাতে পারে। তিনি বিবাদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ‘সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা এবং সম্মান ও মর্যাদা’ রক্ষার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক কিংবা বহুপাক্ষিক সম্পর্ক’ স্থাপনের কথা বলেন, যা নিয়েও কারো কোন দ্বিমত থাকার কথা নয়।
‘একে অপরের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমঝোতামূলক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে দেখতে চায়,’ প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেন। সবই ভালো কথা। কিন্তু এখানে জাতিসংঘের জন্য ‘রূপরেখা’ কোথায়? একটি রূপরেখায় তো নির্দিষ্ট প্রস্তাবনা থাকবে, কিছু পদক্ষেপ উল্লেখ করা থাকবে। শুধু ‘দেখতে চায়’ বলাকে আর যাই বলেন, রূপরেখা বলা যায় না। কথাগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশে এবং ভারতের সম্পর্কের আলোকে। কিন্তু বিশ্ব পর্যায়ে এই কথা নতুন নয়, এবং ভাষণ শেষে সেগুলো শুধু কথাই রয়ে যায়।
প্রধানমন্ত্রী চাইলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরতে পারতেন; কীভাবে উন্নয়ন তহবিল সংকট থেকে উত্তরণ পাওয়া যায়, সে ব্যাপারেও প্রস্তাব দিতে পারতেন; রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে শুধু আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কামনা না করে, বাস্তবতার নিরিখে নির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব দিতে পারতেন; নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের সমর্থন জোরদার করার লক্ষ্যে নিজস্ব কিছু একতরফা পদক্ষেপ ঘোষণা করতে পারতেন।
সব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী বা ভিক্টিম না থেকে, সমস্যা সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা রাখার লক্ষ্যে প্রস্তাব নিয়ে আসলেই এই ভাষণ ‘ঐতিহাসিক’ বা ‘যুগান্তকারী’ হতো। কিন্তু যে ভাষণ দেওয়া হলো, তা গতানুগতিক আমলাতান্ত্রিক ‘রিডিং পয়েন্ট’ ছাড়া বেশি কিছু হয়নি।
লেখক: একজন সাংবাদিক এবং পডকাস্টার।
ইমেইল: [email protected]