কড়ির ভেজালে রাজ্য হারাবে মোদি

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৪:৫৮, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০৬, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৬

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি ভারতের জনগণকে কথা দিয়েছিলেন বিদেশের ব্যাংকে থাকা সব কালো টাকা তিনি উদ্ধার করে এনে ভারতীয় জনগণকে বিলিয়ে দেবেন। অনেকে আবার হিসাব কষে দেখিয়েছিলেন যে কালো টাকা ভাগ করে দিলে প্রতিটি মানুষ মাথা পিছু কয়েক লাখ টাকা করে পায়। নরেন্দ্র মোদি টাকাও উদ্ধার করে আনতে পারেননি, ভারতীয় জনগণও ভাগের টাকা পাননি।
এতে মানুষ হতাশও হননি নরেন্দ্র মোদির ওপর, রাগও করেননি। মোদি বিপদে পড়লেন অভ্যন্তরীণ কালো টাকা উদ্ধার করার উদ্যোগ নিয়ে। ভারতে অর্থনীতির কারবারে হাতপাকা লোক হচ্ছেন মনমোহন সিং, চিতাম্বরম, প্রণব মুখার্জি। প্রণব মুখার্জি এখন ভারতের রাষ্ট্রপতি আর মনমোহন সিং এবং চিতাম্বরম কংগ্রেসের লোক। নরেন্দ্র মোদির অর্থমন্ত্রী হচ্ছে জেটলি। জেটলি অর্থনীতিতে কাচা লোক।
সম্ভবতো নোট ডিমনিটাইজ করার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে আলাপ করেননি। প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে আলাপ করলে সৎ পরামর্শই পেতেন আর হয়তো এতো ঝামেলাই পোহাতে হতো না। এখনতো নরেন্দ্র মোদির আম ছালা সবই হারাবার উপক্রম।
অর্থনীতিতে কালো টাকা, নকল টাকা অচল ঘোষণা করে অর্থনীতির প্রাণ সঞ্চালনের, স্বচ্ছতা আনয়নের একটা বিধি ব্যবস্থা রয়েছে। তবে তা প্রয়োগে কৌসুলি হতে হয়। ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া যেসব নোট বাজারে ছেড়েছে তার ৮৬% নোট হচ্ছে পাঁচ শত এবং হাজার টাকার নোট। সুতরাং বাজারে প্রচলিত ৮৬% শতাংশ নোট যদি একদিনেই অচল ঘোষণা করা হয় তবে বাজার যে অচল হয়ে যাবে তাতো অর্থনীতির জ্ঞান ছাড়া লোকও বুঝে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও অর্থমন্ত্রী জেটলি বিষয়টা অনুধাবন করতে অপরাগ হলেন কেন বুঝে আসে না। পূর্বেই তো বিকল্প মুদ্রা ছাপিয়ে রিজার্ভ ব্যাংকের প্রতিটি শাখায় মজুদ করে রাখা উচিৎ ছিল। পশ্চিম বাংলার মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় রিজার্ভ ব্যাংকের পশ্চিম বাংলা শাখায় নিজে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হয়ে তদন্ত করে দেখেছেন নতুন পাঁচশত টাকা ও দুই হাজার টাকার মুদ্রা পর্যাপ্ত পরিমাণ নোট নেই।
নিষিদ্ধ ঘোষিত নোটের সংখ্যা হচ্ছে ২২ বিলিয়ন। অথচ ভারতীয় টাকশালে বার্ষিক ২৬ বিলিয়নের ওপরে নোট ছাপানোর ব্যবস্থা নেই। ভারতীয় টাকশালের কর্মচারি ইউনিয়ন বলেছে বাজার স্বাভাবিক করতে যে পরিমাণ নোটের প্রয়োজন তিন শিফট কাজ করলেও নাকি সে পরিমাণ নোট ৫/৬ মাসে ছাপানো সম্ভব নয়। কর্মচারি ইউনিয়নের বক্তব্য যদি সঠিক হয় তবে নরেন্দ্র মোদির উচিৎ অন্যদেশের টাকশাল থেকে জরুরি ভিত্তিতে নোট ছাপিয়ে আনা। অন্যতায় জনদুর্ভোগের সীমা অতিক্রম করে যাবে।
এমনিতেই এ পর্যন্ত ৬৪ জন লোক কারেন্সি নোটের দুর্ভোগে আত্মহননের পথ বেঁছে নিয়েছে। কালো টাকার দেশীয় মালিকেরা সাধারণত নোট আকারে টাকা সঞ্চয় করে রাখে না। তারা স্বর্ণালঙ্কারেই টাকা বিনিয়োগ করে রাখে। সুতরাং মনে হচ্ছে নরেন্দ্র মোদির এ উদ্যোগ জনদুর্ভোগই সার হবে। ভারতের বিলিনিয়ার বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে বেশি। বিলিনিয়ারদের কালো টাকা দেশে থাকে না। সে টাকা নরেন্দ্র মোদি কখনও আনতেও পারবেন না।
মনমোহন সিং, অমর্ত্য সেন, বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কৌশিক বসু সবাই এক সুরে বলেছেন নরেন্দ্র মোদির নোট বাতিলের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মনমোহন সিং রাজনীতির পায়দা তুলে কোনও কথা বলেন না তিনি বলেছেন নৈতিকভাবে। তিনি নরেন্দ্র মোদির এ পরিকল্পনার বিরোধিতা করতে পারেন না। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নিয়ে মোদি ভারতীয় অর্থনীতির ক্ষতি করেছেন। ভারতের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ২% কম হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মনমোহন সিং।

কৌশিক বসু নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় এক নিবন্ধে লিখেছেন নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত খুব খারাপভাবে রূপায়িত হয়েছে। প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, নোট বাতিলের ফলে দুর্নীতি সাময়িকভাবে ধাক্কা খাবে সত্য তবে বিপর্যয় নেমে আসবে অর্থনীতিতে। যাদের আঘাত করার কোনও লক্ষ্য ছিল না তারাই আঘাতপ্রাপ্ত হবে সবচেয়ে বেশি।
অমর্ত্য সেন বলেছেন, নোট বাতিলের অর্জন খুবই সামান্য হবে। তবে তার ধাক্কাটা অমানবিক। ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নিতিশের দল শুধু নরেন্দ্র মোদির নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেননি। না হয় সব দলই এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।
লোকসভার শীতকালীন অধিবেশন আরম্ভ হয়েছে। অধিবেশনে অচলাবস্থা চলছে। বিরোধীদল নরেন্দ্র মোদিকে বার বার আহ্বান করছেন লোকসভার অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্য কিন্তু নরেন্দ্র মোদি লোকসভার অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন না।
আমার জানামতে বিরোধীদের আহ্বানের পরও প্রধানমন্ত্রীর অধিবেশনে যোগ না দেওয়া একটা নজিরবিহীন ঘটনা। লোকসভার ইতিহাসে এমন নজির বিরল। তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠান থেকে নোটের ব্যাপারে তার দৃঢ় অবস্থানের কথা অবশ্য জানাচ্ছেন। নোটের কারণে যে একটা অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে সে বিষয়টা তার সরকারও উপলব্ধি করতে পেরেছেন। গ্রাম পর্যায়ে কৃষকেরা যে বীজ সার, কীটনাশক কিনতে পারছে না তা বুঝতে পেরেই সরকার সরকারি গুদাম থেকে এসব প্রয়োজনীয় জিনিস বাকিতে কৃষককে সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন।
সরকারি গুদামের অবস্থান তহসিল (খানা) হেড কোয়ার্টার পর্যায়ে হওয়ায় বীজ সার, কীটনাশক সংগ্রহ করাও কৃষকের জন্য কষ্টকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। নোট বাতিলের ব্যাপারটা গ্রাম্য জীবনের সহজ চলাফেরাও বিঘ্নিত করেছে। চায়ের হকার বলছে তার ব্যবসায়ও নাকি মন্দা নেমেছে আগের মতো তার বেচাকেনা হচ্ছে না।
পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় আর দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল সবচেয়ে বেশি সোচ্চার বামপন্থী দলগুলোও হরতালের ডাক দিয়েছে। কংগ্রেস রাজ্যে রাজ্যে বিক্ষোভ মিছিল করছে। সব মিলিয় সমগ্র ভারতের বিরোধীরা নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে একটা অবস্থান সৃষ্টি করতে পেরেছে।
গত ৩০ নভেম্বর দিল্লির জন্তর-মন্তরের কাছে যখন মমতা বন্দোপাধ্যায় অবস্থান ধর্মঘটে ছিলেন তখন নরেন্দ্র মোদি দূত মারফত মমতাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন কিন্তু মমতা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন। রাহুল গান্ধীও লোকসভা আর রাজ্যসভার দুইশত সদস্য নিয়ে লোকসভার নিকটে গান্ধী মূর্তির পাশে অবস্থা নিয়েছিলেন।

গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনীতিবিদের প্রতিটি পদক্ষেপ খুবই সতর্কতার সঙ্গে দিতে হয়। অসতর্ক পদক্ষেপে রাজনীতিবিদদের প্রাসাদোপম অট্টালিকাও নদী গর্ভে বিলিন করে দেয়। সম্ভবতো নরেন্দ্র মোদিও সে রকম একটা অবস্থার মুখোমুখী হয়েছেন। আগামী দুইমাস পর ভারতের বৃহত্তম রাজ্য উত্তর প্রদেশে বিধানসভার নির্বাচন। কারেন্সির বিষয়টা মনে হয় উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে বিজিপিকে বিধ্বস্ত করে দেবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X