পাচার ৭৩ হাজার কোটি, এসেছে তারও বেশি!

Send
ড. শাখাওয়াৎ নয়ন
প্রকাশিত : ১২:৪২, মে ১২, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৪৩, মে ১২, ২০১৭

শাখাওয়াৎ নয়ন৩ মে ২০১৭ বাংলাদেশের বেশ কিছু বাণিজ্যিক সংবাদ মাধ্যমের ‘এক বছরে ৭৩ হাজার কোটি টাকা পাচার’ শিরোনামটি বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। একজন দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে ৭৩ হাজার কোটি টাকা পাচারের খবর সহ্য করি কিভাবে? যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ভিত্তিক সংস্থা “গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)” এর “ইলিসিট ফিন্যান্সিয়াল ফ্লোস টু অ্যান্ড ফ্রম ডেভেলপিং কান্ট্রিজ: ২০০৫-২০১৪” রিপোর্টের বরাত দিয়ে সংবাদটি প্রকাশ করা হয়েছে। তাই মূল রিপোর্টটিও পড়লাম। উক্ত রিপোর্টে বাংলাদেশসহ ১৪৯টি উন্নয়নশীল দেশের তথ্য আছে। আসুন জিএফআই এবং বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোর  প্রতিবেদন নিয়ে একটু আলোচনা করি।     
১.   
উক্ত দিনে বাংলাদেশের একটি দৈনিক পত্রিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে ‘আট বছর ধরেই জিএফআই অর্থ পাচারের গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও এবারের রিপোর্টটি আগেরগুলোর তুলনায় ভিন্নভাবে তৈরি করা হয়েছে। এবার তারা মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কত শতাংশ পর্যন্ত অর্থ পাচার হয়েছে, সেই তথ্য প্রকাশ করেছে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন—দুটি হিসাবই রয়েছে। যেমন ২০০৪ সালে বাংলাদেশ থেকে সর্বনিম্ন ৯ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ বাইরে চলে গেছে। পাশাপাশি অবৈধভাবে কী পরিমাণ অর্থ দেশের ভেতরে এসেছে, সেই তথ্যও প্রতিবেদনে দেওয়া রয়েছে।’     
লক্ষ্য করুন, মূল প্রতিবেদনে অবৈধভাবে অর্থ আগমন (ইনফ্লো) এবং বহির্গমনের (আউট ফ্লো) উভয় তথ্যই দেওয়া আছে। কিন্তু বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো শুধুমাত্র ইলিসিট আউট ফ্লো’র অর্থ্যাৎ অর্থ পাচারের তথ্য দিয়ে সংবাদ শিরোনাম করেছে। আবারও লক্ষ্য করুন,  ‘২০০৪ সালে বাংলাদেশ থেকে সর্বনিম্ন ৯ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ বাইরে চলে গেছে।’ এখানে একটু অবাক হলাম। জিএফআই এর ২০১৪ সালের রিপোর্টেও একই তথ্যের উল্লেখ আছে। টাইপিং বিচ্যুতি কিনা, অনুসন্ধানের দাবি রাখে। যাই হোক, একই সাথে উক্ত সময়ে বাংলাদেশের মোট আমদানি-রফতানির কত শতাংশ পর্যন্ত টাকা কিংবা ডলার অন্য দেশ থেকে বাংলাদেশে ইনফ্লো হয়েছে কিংবা এসেছে? সেই খবরটি কিন্তু বাংলাদেশের কোনও সংবাদ মাধ্যমই দেয়নি। ২০১৪ সালে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করেছে মোট আমদানি-রফতানি অর্থের ৬ থেকে ১৮ শতাংশ। তার মানে কী দাঁড়ালো? বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে পাচারকৃত অর্থের চেয়ে অবৈধভাবে আগত (ইনফ্লো) অর্থের পরিমাণ অনেক বেশি। এই হিসাবটা বের করা খুব কঠিন কিছু নয়। খুব সহজেই অনুমান করা যায়, ২০১৪ সালে অবৈধভাবে বাংলাদেশে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি প্রবেশ করেছে।            
জিএফআইও কম যায় না। তাদের রিপোর্টে বিভিন্ন দেশে অবৈধভাবে আগত অর্থের পরিমাণ শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট দেশের মোট আমদানি-রফতানির পরিমাণের পার্সেন্টেজ প্রকাশ করেছে। তারা কিন্তু আগত অর্থের পরিমাণ মিলিয়ন ডলারের হিসেবে প্রকাশ করেনি। কিন্তু পাচারের পরিমাণ ঠিকই মিলিয়ন ডলারের হিসেবে প্রকাশ করেছে। কিন্তু কেন? একটি রিপোর্টের একই টেবিলে দুটো তথ্য একইভাবে উপস্থাপন করাটা গবেষণার নর্ম। তারা কিন্তু তা পালন করেনি। ইচ্ছা করলেই করতে পারতো। যদিও অবৈধভাবে অর্থ প্রবেশ একটি দেশের অর্থনীতির জন্য মোটেও ভালো কিছু নয়। তারপরেও জনগণের আবেগের দিক থেকে,  রাজনৈতিক বিবেচনায় বিষয়টি অবশ্যই ভিন্নতা দাবি করে। আমার দেশ থেকে টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে, আর আমার দেশে টাকা আসছে। সম্পূর্ণ ভিন্ন অনুভূতি তৈরি করে, তাই না? পরানের গহিন ভেতরে একটা ‘হায়’ ‘হায়’ ভাব জাগিয়ে তোলে। ‘ গেল গেল... দেশ গেল... দেশ গেল’ টাইপের মাতম তৈরি করে, তাই না? নিশ্চয়ই এখানে চিন্তার অবকাশ আছে।    
আমরা যদি পাশের দেশ ভারতের দিকে তাকাই, তাহলে কী দেখি? জিএফআই এর রিপোর্টের বরাত দিয়ে ভারতেও খবর ছাপা হয়েছে। ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক ‘দি হিন্দু’ সংবাদ শিরোনাম করেছে “৭৭০ বিলিয়ন ইউএস ডলার ব্লাক মানি এন্টার্ড ইন্ডিয়া ইন ২০০৫-২০১৪”। পত্রিকাটি আরো বলেছে, শুধুমাত্র ২০১৪ সালেই ভারতে ১০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (কালো টাকা) প্রবেশ করেছে, আর পক্ষান্তরে ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ভারত থেকে পাচার হয়েছে। একই বছরে ভারত থেকে তাদের মোট আমদানি রফতানির সর্বনিম্ন ১ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ বাইরে চলে গেছে, আর ভারতে এসেছে ৫ থেকে ১৩ শতাংশ।   
ভারতের পত্রিকাটি তাদের দেশে অবৈধভাবে টাকা আসার খবরটিকে বেশি গুরত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে, আর আমাদের দেশের পত্রিকাগুলো আমাদের দেশ থেকে টাকা চলে যাওয়ার খবরটিকে প্রাধান্য দিয়েছে। যদিও দুটি দেশেই অবৈধভাবে টাকা আসার পরিমাণ, পাচার হয়ে যাওয়া টাকার তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া আমরা যখন কোনও পরিসংখ্যান প্রকাশ করি তখন কিন্তু বড় সংখ্যা কিংবা বড় প্রপোর্শনটা প্রথমে উপস্থাপন করি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উল্টোভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু কেন?         
 ২.
উক্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘২০১৪ সালে যে পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে পাচার হয়ে গেছে, তা চলতি অর্থবছরের মূল্য সংযোজন কর (মূসক) খাতে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার সমান। চলতি বাজেটে মূসক থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য হচ্ছে ৭২ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। আর নতুন মূসক আইন নিয়ে সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের চলছে বড় ধরনের টানাপোড়েন। সুতরাং কেবল অর্থ পাচার ঠেকাতে পারলেই মূসক খাতের আয় নিয়ে আদৌ কোনও দুশ্চিন্তা করতে হতো না এনবিআরকে।’   
খেয়াল করুন, এখানে কিভাবে ধান বান্তে শিবের গীত গাওয়া হয়েছে? একটি দেশের অর্থ পাচারের সাথে মূল্য সংযোজন কর কতখানি প্রাসঙ্গিক? কয়েকটি আরব্য দেশ ব্যতীত পৃথিবীর ধনী দরিদ্র এমন কোনও দেশ আছে, যেখানে মূল্য সংযোজন কর নেই? অবশ্যই অর্থ পাচার এবং অবৈধভাবে অর্থ আসা (মানি লন্ডারিং) বন্ধ করতে হবে। কিন্তু মানি লন্ডারিং বন্ধ হোক বা না হোক, মূসক তো আদায় করতেই হবে। মূসক তো রাজস্ব বৃদ্ধি করে। এ ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ দেওয়া যাক- আমরা যদি আমাদের দেশে সব ধরনের ‘চুরি-চামারি’ বন্ধ করতে পারি, তাহলে কি আমাদের আর কোনও দিন কামাই-রোজগার করতে হবে না? অবশ্যই কামাই-রোজগার করতে হবে এবং একই সাথে ‘চুরি-চামারি’-দুর্নীতিও বন্ধ করতে হবে। এটা কোনোভাবেই বাইনারি চয়েজ না। পৃথিবীর ধনী দেশগুলোতে করের বোঝা অনেক বেশি এবং কর, অভিকর আদায়ের হার শতভাগ। অনেক ধনী দেশই উদ্বৃত্ত বাজেট করে। তাই বলে তারা কি মূসক আদায় বন্ধ করে দিয়েছে?     
হাজী শরিয়তউল্লাহ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় বলেছিলেন, ‘আল্লাহর জমিনে ব্রিটিশদেরকে খাজনা দিব কেন?’ তার কথা তৎকালীন জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রেক্ষাপটে দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। তবে এক সময় ব্রিটিশরা চলে গেছে কিন্তু আল্লাহর জমিনে কি কারও খাজনা দেওয়া বন্ধ হয়েছে? বাংলাদেশের মতো দেশে এই জাতীয় ‘খাজনা না দেওয়া’ টাইপের কথা রাজনীতিতে ভালো খায়, ব্যবসায়ীদের উস্কে দেওয়ার জন্য বেশ শক্তিশালী। তাই না? আমরা অনেকেই জানি, বাংলাদেশসহ ১৪৯টি উন্নয়নশীল দেশেই যারা অর্থ পাচার করে, তারাই আবার বিভিন্ন উপায়ে নিজ দেশে টাকা ফেরত আনে। খুব সহজ ভাবেই বোঝা যায়, বাংলাদেশ থেকে যদি অর্থ শুধুমাত্র পাচারই হতো তাহলে অনেক আগেই দেশের রিজার্ভ খালি হয়ে যেত। আউট ফ্লো’র চেয়ে ইনফ্লো বেশি আছে বলেই দেশের রিজার্ভের ওপর কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে না। তবে এক্ষেত্রে কালো টাকা সাদা করার দুই নাম্বারি খেলা চলে, এটা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। এসব খেলা অর্থনীতির জন্য হুমকি স্বরুপ।  
৩.  
কিছুদিন পুর্বে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, মাননীয় মন্ত্রী জনাব ওবায়দুল কাদের এমপি বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে টাকা-পয়সা নিয়ে পালাতে হবে।’ মওকা আর কারে বলে? জনাব ওবায়দুল কাদেরের উক্তিটি রাজনৈতিক শীত নীদ্রায় থাকা বিএনপি’র বড় বড় নেতাদের নিদ্রাভঙ্গে টনিকের মতো কাজ করেছে। সুযোগ কে হাতছাড়া করে? তাই যুক্তরাষ্ট্রের জিএফআই এবং বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো একযোগে  আওয়ামী লীগ সরকারের বডি লাইন বরাবর ন্যাস্টি বাউন্স বল করেছে। কিন্তু আওয়ামীলীগ সরকারও কম যায় না। এক দিনের মধ্যেই এসএসসি পরীক্ষার আগাম ফল প্রকাশ করে, দারুণ এক হুক শট খেলেছে; বল পাঠিয়ে দিয়েছে মাঠের বাইরে। বাণিজ্যিক গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে কারবালার মাতমের পরিবর্তে হঠাৎ করেই ঈদের খুশির মতো হাসির ঝলকানিতে সরব হয়ে উঠেছে।        
লেখক: কথাসাহিত্যিক, একাডেমিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
[email protected]   

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ