গুপ্তচরের ভবিষ্যৎ

Send
জুবায়ের বাবু
প্রকাশিত : ১২:১৭, ফেব্রুয়ারি ০১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৩২, ফেব্রুয়ারি ০১, ২০১৮

জুবায়ের বাবু'গুপ্তচর' শব্দটি শুনলেই কেমন পুলকিত লাগে। ছোটবেলা থেকেই এই শব্দটির প্রেমে পড়ে যাই সেবা প্রকাশনীর কল্যাণে। কাজী আনোয়ার হোসেন-এর ‘মাসুদ রানা’ কিংবা ‘কুয়াশা’ থেকে সত্যজিৎ রায়ের ‘ফেলুদা’ এমন এক নেশায় ফেলেছিলো যে পরবর্তীতে দেশি গল্পে আর মন ভরছিলো না। শুরু হলো বিদেশি গল্প খোঁজা। তার মাঝে রোডিয়ার্ড কিপলিংয়ের ১৮ শতকের শেষ ভাগে ব্রিটিশ রাশিয়ার দ্বন্দ্ব নিয়ে গল্প ‘কিম’ এখনও মনে দাগ কেটে আছে। তাছাড়া ‘দ্য সিক্রেট এজেন্ট, এ টেস্ট ফর ডেথ, ডিকোডেড, ফ্রম রাশিয়া উইথ লাভ, ফেভার এন্ড স্পেয়ার’ গল্পগুলোর কথা মনে পড়লে এখনও শিহরিত, আন্দোলিত হয়ে পড়ি। বইয়ের সঙ্গে সঙ্গে নেশা ধরে যায় সিনেমায়। তখন বাংলাদেশে ‘ভিসিআর’ এর যুগ। পাড়ায় পাড়ায় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়েছে ভিডিও লাইব্রেরি। তাদের হাতে ধরিয়ে দিতাম বিভিন্ন ছবির লিস্ট, তার পর ‘নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট,  জেমসবন্ড এর সিরিজ, ম্যান ফ্রম ইউ এন সি এল ই,  মিশন ইম্পসিবল, ব্রিজ অব স্পাইস, দ্য বোর্ন আইডেন্টিটি সহ ধীরে ধীরে বিভিন্ন চলচিত্রে গুপ্তচরের চরিত্র দেখে মাঝে মাঝে মনে হতো বড় হয়ে আমিও একজন গুপ্তচর হবো। কিন্তু গুপ্তচর হতে অনেক বুদ্ধিলাগে, তাই ওই জায়গা থেকে সরে আসি অনেক আগে। কিন্তু সিনেমার নেশায় এখনও বুঁদ হয়ে আছি। কয়েকদিন আগে নেটফ্লিক্সে দেখলাম একটা অসাধারণ ছবি ‘আই অন দ্য স্কাই’ ছবিটি, যেখানে আফ্রিকার কেনিয়াতে ইসলামিক জঙ্গিগোষ্ঠীর একটি আত্মঘাতী অপারেশান কিভাবে আকাশ থেকে ড্রোন দিয়ে গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে ধ্বংস করে দেওয়া হয় তার ওপর টান টান উত্তেজনার ছবি। গুপ্তচরের বিষয়টি পৃথিবী জুড়ে আলোড়ন তুলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এবং তার পরবর্তীতে ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত আমেরিকা রাশিয়ার কোল্ড ওয়ারের সময়। এই কোল্ড ওয়ার নিয়ে তৈরি প্রতিটি ছবিতেই একটি শক্তিশালী চরিত্র হলো গুপ্তচর। এই গুপ্তচর নিয়ে আলোচনার একটাই উদ্দেশ্য আর তা হলো বাংলাদেশ সরকারের সদ্য ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮’ অনুমোদন। আমি কোনও আইন বিশেষজ্ঞ নই, তাই আমার ভাবনাও সাধারণ আমজনতার মতো। সম্প্রতি মন্ত্রী সভায় অনুমোদিত এই আইনটি অতীতের ৫৭ ধারার স্থলাভিষিক্ত হলো। নতুন আইনের ১৭ থেকে ৩৮ ধারায় বিভিন্ন অপরাধ ও শাস্তির বিষয় উল্লেখ রয়েছে তবে ৩২ ধারা যে ভবিষ্যতে এক আতঙ্কের নাম হয়ে থাকবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ৩২ ধারায় কোনও সরকারি, আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ঢুকে কেউ কোনও কিছু রেকর্ড করলে, তা গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ হবে। এর জন্য ১৪ বছরের জেল এবং ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশের দুর্নীতির সিংহভাগই হয়ে থাকে এই তিন ধরনের প্রতিষ্ঠানে। আর এই আইনের আওতায় ওইসব দুর্নীতি আরও সুরক্ষিত হলো। বর্তমানে আমার প্রায় সবাই ন্যূনতম একটি ডিজিটাল ডিভাইস নিয়ে ঘুরাফেরা করি আর তা হলো মোবাইল। একটি মোবাইলে ফোন করা ছাড়াও আপনি ছবি তুলতে পারেন, ভিডিও করতে পারেন কিংবা অডিও রেকর্ড করতে পারেন তার মানে আপনি যে কোনও একটি কাজ করলেই হয়ে যেতে পারেন গুপ্তচর। ধরুন, আপনি  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে সেলফি তুলছেন কিংবা ভিডিও রেকর্ড করছেন, তাহলে তা গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে আপনার জেল জরিমানা হয়ে যেতে পারে কারণ আপনি যেখানে ছবিটি তুলেছেন অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়টি কিন্তু স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এখন থেকে আপনি সরকারি কর্মচারীর ঘুষ গ্রহণ কিংবা যে কোনও অনৈতিক কাজের ছবি তোলা বা ভিডিও রেকর্ড করতে পারবেন না। কারণ এগুলো সরকারি প্রতিষ্ঠান। পুলিশের নির্যাতনের ছবি/ ভিডিও তুলতে পারবেন না। এসব কাজ করলেই আপনি হয়ে যাবেন গুপ্তচর। সবচেয়ে বেশি যাদের গুপ্তচর হওয়ার সম্ভাবনা তারা হলো সাংবাদিক। যদিও অনেক ছবিতে সাংবাদিকতার আড়ালে গুপ্তচরবৃত্তির ঘটনা দেখেছি। সিনেমা তো সিনেমাই, সেই সুযোগ বাস্তবে এখন সাংবাদিকদের হাতে। যে কোনও অনুসন্ধানী রিপোর্ট হয়ে যেতে পারে গুপ্তচরের চিঠি। ইচ্ছা করলেই সরকারি কিংবা আধা সরকারি কোনও নথিপত্রের কপি ‘সোর্স অফ ইনফরমেশন’ হিসাবে ব্যবহার করতে পারবেন না।

সুতরাং, গুপ্তচর হওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ আপনার সামনে। এভাবে চলতে থাকলে খুব শিগগিরই আমরা গুপ্তচর জাতিতে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করবো।

লেখক: নির্মাতা

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ