শবে বরাতে করণীয়-বর্জনীয়

Send
মুফতি লুৎফুর রহমান
প্রকাশিত : ১২:১২, মে ০১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০১, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯



মুফতি লুৎফুর রহমানশাবান মাসের ১৫তম রজনী অর্থাৎ ১৪ শাবানের দিবাগত রাতকে শবে বরাত বলা হয়। বিভিন্ন হাদিসে এই রাতকে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ (শাবানের ১৫তম রাত) বলা হয়েছে।
বিভিন্ন সহিহ ও আমলযোগ্য হাদিসে এ রাতের ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে এর কিছু নমুনা পেশ করা হলো:
* হজরত মুআজ ইবনে জবাল (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, শা’বানে পনেরতম রাতে আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি মনোনিবেশ করেন। মুশরিক ও পরস্পর বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান-হাদিস নং ৩৮৩৩, আল মু’জামুল কাবির-১০৮-১০৯)
* হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একরাতে আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাশে না দেখে খুঁজতে বের হলাম। এরপর তাকে ‘জান্নাতুল বাকি’তে (মদিনার কবরস্থানে) পেলাম। আমাকে দেখে তিনি বললেন, হে আয়েশা! তুমি কি এই আশঙ্কা করছ যে, আল্লাহ ও তার রাসুল তোমার সঙ্গে খেয়ানত করেছেন? আমি বললাম, হে রাসুল! আমি ভেবেছিলাম, আপনি আমায় ছেড়ে অন্য কোনও বিবির ঘরে গমন করেছেন। এরপর হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, শাবানের পনেরোতম রাতে আল্লাহ প্রথম আকাশে অবতরণ করেন এবং ‘বনু কালব’ গোত্রের পালিত ছাগল-পালের পশমের চেয়েও বেশি বান্দাহকে ক্ষমা করে দেন। (তিরমিজি, হাদিস নং ৭৩৯, ইবনে মাজাহ ১৩৮৫, মুসনাদে আহমদ-২৩৮)

* হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, একদা রাতের বেলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং এত দীর্ঘ সময় ধরে তিনি সিজদাবনত অবস্থায় পড়ে থাকলেন যে, আমি শঙ্কাগ্রস্ত হয়ে পড়লাম, তবে কি তিনি মৃত্যুবরণ করলেন!

এমতাবস্থায় আমি উঠে গিয়ে তার বৃদ্ধাঙ্গুলি ধরে নাড়া দিলাম, তখন আঙুলটি নড়ে উঠলো (আমি নিশ্চিত হলাম, তিনি জীবিত আছেন) আমি নিজের জায়গায় ফিরে এলাম।

নামাজ শেষ করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে সম্বোধন করে বললেন, হে আয়েশা! তুমি কি ভেবেছ, আল্লাহর নবি তোমার সঙ্গে খেয়ানত করেছেন? উত্তরে আমি বললাম, অমন কিছুই ভাবিনি। বরং আপনার দীর্ঘসময়ব্যাপী সিজদা দেখে আমার ভয় হচ্ছিল, আপনাকে আল্লাহ উঠিয়ে নিলেন কিনা? এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আয়েশা তুমি কি জানো এ রাতটি কোন রাত? আমি বললাম আল্লাহ ও রাসুলই এ বিষয়ে ভালো জানেন।

তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটি শাবানের পনেরোতম রাত। এতে বান্দাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেন আল্লাহ। ক্ষমাপ্রার্থীদের ক্ষমা করে দেন। দয়াপ্রার্থীদের প্রতি দয়া করেন। অন্যদিকে পরশ্রীকাতর ব্যক্তিদের আপন অবস্থায় ছেড়ে দেন। (রায়হাকি-মু’আবুল ঈমান-হাদিস নম্বর ৩৬৩৫)

* হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেছেন, যখন শাবানের পনেরোতম রাত আসবে, তোমরা ওই রাতে নামাজ পড়ো এবং পরবর্তী দিনে রোজা রেখো। (রায়হাকি হাদীস নং ৩৮২৩)

পর্যালোচনা ও বর্জনীয়

করণীয়: উল্লিখিত হাদিসগুলো থেকে শবে বরাত ও পরবর্তী দিনে ৪টি আমল করার বিষয় প্রমাণিত। এ রাতে ক্ষমা প্রার্থনা করা, নফল নামাজ আদায় করা, কবর জিয়ারত করা ও পরের দিন রোজা রাখা। তবে মনে রাখতে হবে, এ সব আমলের প্রত্যেকটিই নফল, আবশ্যিক নয়। এটাও মনে রাখতে হবে, নফল নামাজ জামায়াতের সঙ্গে নয়, ঘরে বা মসজিদে নিরিবিলি পরিবেশে আদায় করতে হবে। নামাজ কী পরিমাণ হবে, তাও নির্দিষ্ট নেই, যেকোনও সুরা দিয়ে দুই রাকাত করে করে পড়লে ভালো।

কবর জিয়ারত করতে হবে, তবে দলবদ্ধ হয়ে নয়, কবরস্থানে বাতি জ্বালিয়ে বা আলোকসজ্জা করে নয়। কবর প্রাঙ্গণে মেলা বসিয়ে নয়। এ ছাড়া রাসুলের (সা.) একবার কবরস্থানে যাওয়ার কথা মা আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন।

অন্যান্য বছর, তার শবে বরাতে কবর জিয়ারত করা এবং না করা উভয়টি সম্ভাবনা রয়েছে। কবর জিয়ারত করা একটি সুন্নত/মুস্তাহাব আমল।

আতশবাজি, আলোকসজ্জা, শিরনি বিতরণ, মাইকে কোরআন খতম, গোরস্থানে মেলা বসানো ও হালুয়া-রুটি পাঠানোর সঙ্গে শবে বরাতের কোনও সম্পর্ক নেই। এই কাজগুলোর কোনও কোনেটি নাজায়েজ, কোনোটি অপচয় ও শয়তানি কর্ম। এ কারণে এগুলো অবশ্যই পরিহার করতে হবে।

বর্তমানে একদল লোক যারা নিজেদের আহলে হাদিসে বা সালাফি বলে পরিচয় দেয় তারা বলে থাকে, শবে বরাত কথাটি কোরআন-হাদিসে নেই। সুতরাং তা ভিত্তিহীন। ফার্সিতে ‘শব’ অর্থ রাত, বরাত (বারা-আত) অর্থ মুক্তি অর্থাৎ মুক্তির রাত। হাদিসে শা’বানের পনেরোতম রাতে গুনাহ থেকে মুক্তির বর্ণনা পাওয়া যায়, এ জন্য ফার্সিতে এ রাতকে শবে বরাত নামকরণ করা হয়েছে, এতে দোষের কী আছে? নামাজ-রোজা এই দু’টি শব্দও তো কোরআন-হাদিসে নেই, শব্দ দু’টি আরবি সালাত-সওম-এর ফার্সি প্রতিশব্দ, যা আমরা অহরহ ব্যবহার করে থাকি।

এ সব লোকের আরও একটি অভিযোগ হলো, শবে বরাতের আমল সম্পর্কে বর্ণিত সব হাদিসই নাকি মউজু বা জাল। আমাদের বক্তব্য হলো—শবে-বরাত সম্পর্কিত হাদিসগুলো সনদের দিক দিয়ে মধ্যম পর্যায়ের—আমলযোগ্য হাদিস। আর ‘হাসান’ পর্যায়ের হাদিস যে আমলযোগ্য, সে ব্যাপারে হাদিস বিশারদরা একমত। এ বিষয়ে আহলে হাদিসের গুরু আল্লামা ইবনে তাইমিয়া, নামিরুদ্দীন আনবানী, নওয়াব সিদ্দীক হাসান খান প্রমুখের বক্তব্য অন্যান্য মুহাদ্দিসদের মতোই। সুতরাং এ ব্যাপারে বিভ্রান্তি ছড়ানো তাদের পূর্বসূরিদের অবাধ্যতা ছাড়া কিছু নয়।

বাড়াবাড়ি

আরেক দল শবে বরাতের নামে আলোকসজ্জা, কবর সাজানো, কবরে মেলা বসানো, চাঁদাবাজি করে শিরকের ব্যবস্থা, শাবিনা খতম ইত্যাদির মাধ্যমে শবে বরাতকে একটি জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের রূপ দিতে চায়। তারা বাড়াবাড়িতে লিপ্ত। হাদিসে বর্ণিত নফল ইবাদাতগুলো ছাড়া অন্য সব রুসম-রেওয়াজ (রীতি) ও কুসংস্কার ছেড়ে দিয়ে সঠিক পথে পরিচালিত হওয়ার তওফিক আল্লাহ সবাইকে দান করুন। আ-মিন।

লেখক: সিনিয়র শিক্ষক, ফয়জুল উলুম, আজিমপুর

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ