এই লেখাটি ডায়াবেটিস-মুক্তদের জন্য

Send
ইকরাম কবীর
প্রকাশিত : ২০:১০, জুন ২৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:১৫, জুন ২৪, ২০১৮

ইকরাম কবীরআমার যখন ডায়াবেটিস ধরা পড়লো প্রায় নয় বছর আগে, আমি মুষড়ে পড়েছিলাম। যদিও আমার ডায়াবেটিস রোগের পারিবারিক ইতিহাস আছে, তবু আমি নিজে ৪৩ বছর বয়সে এ রোগে আক্রান্ত হবো ভাবিনি। ডাক্তারের কাছে গেলাম। তিনি ওষুধ দিলেন। পাশপাশি শরীরচর্চা করতে বললেন। আমি প্রায় প্রতিদিন হাঁটতে শুরু করলাম। সঙ্গে ওষুধও খাচ্ছিলাম। ভাত ও মিষ্টি খাওয়া প্রায় ছেড়েই দিলাম। এ সব কিছু করে আমার মনে হয়েছিল যে, আমি বেশ ভালোই আছি। এমন করেই প্রায় সাড়ে-পাঁচ বছর কেটে গেলো। ভেবেই নিলাম—আমি খুবই ভালো আছি।
একদিন শুক্রবার সকালে, এগারোটার সময়, সাপ্তাহিক বাজার সেরে গেলাম বাবার সঙ্গে দেখা করতে। বাবা তখন পঁয়ত্রিশ বছর কাটিয়ে দিয়েছেন ডায়াবেটিসকে সঙ্গী করে। তিনি যথারীতি জানতে চাইলেন আমার শরীরে শর্করার পরিমাণ কেমন থাকে। বললাম, আমি ভালো আছি, ডায়াবেটিস আয়ত্তের মধ্যেই আছে। তিনি একটি রক্তে শর্করা মাপার একটি নতুন যন্ত্র এনে বললেন, ‘এসো, তোমার চিনির পরিমাণ মেপে দেই। তোমাকে এই মেশিনটিও দিয়ে দেই।’

তিনি আমার রক্ত পরীক্ষা করে দেখলেন, শর্করার পরিমাণ তখন ১৬! আমাকে ধমকানো শুরু করলেন। বললেন, ‘এই তোমার নিজের যত্ন নেওয়া! রক্তে চিনির পরিমাণ এমন থাকলে কয়েক বছরের মধ্যেই তোমার অন্য সব অঙ্গগুলো অকেজো হয়ে পড়বে।' নিজেকে নিজের কাছে ছোট মনে হলো। এরপর প্রায় দশদিন আমি ডায়াবেটিস রোগ নিয়ে পড়াশোনা করলাম। পড়তে গিয়ে যা জানলাম, তা আমাকে অবাক করেছিল। আমি যা জানলাম, তা আমাদের দেশের কোনও ডাক্তার আমাকে কখনও বলেননি। আর আমি ভেবেই নিয়েছিলাম যে, আমি আমাদের ডাক্তারদের কথা শুনে বেশ ভালোই আছি।

জাপানি, চীনা ও আমেরিকান ডাক্তারদের অনেক লেকচার শুনলাম, তাদের লেখা পড়লাম। তাদের মতে, ডায়াবেটিস একটি খাদ্য-জনিত রোগ এবং একে খাদ্য দিয়েই সামলাতে হবে। বছরের পর বছর খাদ্য দিয়ে চিকিৎসা চালালে এ রোগ ভালোও হয়ে যাবে। তারা আরও বলছেন, ডায়াবেটিস হওয়ার জন্যে মানুষের প্যাংক্রিয়াসের ভূমিকা মাত্র ২০ শতাংশ এবং যকৃতের ভূমিকা ৮০ শতাংশ। যকৃৎ থেকে যদি সব চর্বি দূর করে দেওয়া যায়, তাহলে ডায়াবেটিসের আশঙ্কা আর থাকেই না। আর যারা ইতোমধ্যেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছেন, তারাও যদি যকৃৎ থেকে সম্পূর্ণভাবে চর্বি দূর করতে পারেন, তাহলে তারাও খুব ভালো থাকবেন।

একজন ডায়াবেটিক রোগীর খাবার কেমন হবে, তা নিয়ে আরও পড়াশোনা করলাম। পড়তে পড়তে আমি আমার শরীরের অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নিজের জন্যে খাদ্য নির্ণয় করলাম। এমন খাদ্য যা আমার রক্তে শর্করা বাড়াবে না এবং সারাদিন কাজ করারও শক্তি জোগাবে। আমি কার্বোহাইড্রেট খাওয়া প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনলাম। আমার মূল লক্ষ্য ছিল শাকসব্জি খেয়ে বেঁচে থাকা। একইসঙ্গে আমার জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনলাম। শুধু হাঁটা নয়, তার সঙ্গে কিছু খালি হাতের ব্যায়ামও যোগ করলাম। এক সপ্তাহের মধ্যেই আমার রক্তে চিনির পরিমাণ স্বাভাবিক হয়ে এলো।

শুরুতে খুবই কষ্ট হয়েছিল। ভাত-রুটি থেকে যে শর্করা আসে, তা খাবারের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া বেশ কঠিন কাজ। শুধু সবজি দিয়ে খাবার সবসময় হাতের কাছে থাকে না, খেতে ভালোও লাগে না। এর সঙ্গে আবার শরীরচর্চা! দৃঢ় মনবলের প্রয়োজন, রীতিমতো অধ্যাবসায়।

এই যীবনযাত্রা অনুসরণ করতে গিয়ে আমি সামাজিক ভাবে একা হয়ে গেলাম। চারপাশের মানুষের সঙ্গে আর খাপ খাওয়াতে পারি না। আমার চলাফেরা, খাবার অভ্যাস—সবকিছুই তাদের চেয়ে ভিন্ন। আমি তাদের মাঝে এক ভিনগ্রহের মানুষের মতো বসবাস করি। আমার জীবনযাত্রা আমাদের সমাজ বোঝে না। আরও বুঝতে পারলাম, এ সমাজে কারও ডায়াবেটিস সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। এই রোগ যে মানবশরীরের কী কী ক্ষতি করতে পারে, তা নিয়েও ধারণা নেই। এই সমাজ একজন ডায়াবেটিক রোগীর যীবনযাত্রা মেনে নেওয়ার জন্যে তৈরিও নয়। বিয়ের দাওয়াতে, অফিসের অনুষ্ঠানে, বন্ধুদের আড্ডায় আমার খুব অসুবিধে হয়।

বিয়ের দাওয়াতে শুধুই হাজিরা দেওয়া; আশেপাশে সবাই খাওয়া-দাওয়া করে আর আমি চুপচাপ বসে থাকি, কিংবা একটু খাবার নিয়ে নাড়াচাড়া করি। আমার খেতে ইচ্ছে হয় না, তা নয়, আমি অভিনয় করি। আমি জানি, এ সব খাওয়ার আমন্ত্রণ যারা আয়োজন করেন, তারা ডায়াবেটিক আক্রান্ত মানুষের কথা চিন্তা করে আয়োজন করেন না। কোনও ডায়াবেটিক আক্রান্ত মানুষও তাদের কখনও বলেননি যে, এসব খাবার তাদের খাওয়া একেবারেই উচিত নয়। আমাদের সামাজিক পারিপার্শ্বিকতায় ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষের জন্যে চিন্তা করে খাবার-দাবার বা পরিবেশ তৈরি হয় না। যারা নিজেরা আক্রান্ত তারাও খেয়ে-দেয়ে ইনসুলিন নিয়ে ভেবে নেন যে, তারা ভালো আছেন।

তবে যারা সত্যি-সত্যি নিজের যত্ন নিতে চান, তাদের জীবন হয়ে পড়ে অত্যন্ত কঠিন। সামান্য একটু মিষ্টি কিছু খেলেই যে মানুষটির শরীরে শর্করার পরিমাণ কুড়ির ওপর চলে যায়, সেই মানুষটির শরীরের অবস্থা বোধহয় তিনি ছাড়া আর কারও অনুধাবন করা সম্ভব নয়। একটু এদিক-ওদিক হলেই শরীর দুর্যোগ আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এমন মানুষের শরীরে বিপদ এলে আশে-পাশের বেশির ভাগ মানুষই বিশ্বাস করেন না। মনে করেন ভান করছে যে তারা ঢং করছে। নিজেদের কর্মক্ষম রাখতে অনেক কসরত করতে হয়, যা কাউকে বলে বোঝানো যায় না।

নানা রকমের ঠাট্টা-বিদ্রূপ সহ্য করতে হয়। প্রথম-প্রথম মন খারাপ করেছি। বিষয়টি খুলে বলেছি প্রায় শ’খানেক বার। কিন্তু এখন আর গায়ে লাগে না। আমি আমার মতো জীবনযাপন করতে পারছি তা ভেবেই আনন্দ পাই। কে কী মনে করলো তা নিয়ে আর মাথা ঘামাই না। এ জন্য আমার বাড়ির মানুষদের ধন্যবাদ দিতে হয়, কারণ আমার জন্যে তারা কষ্ট করেন।

ডায়াবেটিসে কথা বাদ দেই। যদি একজন ডায়াবেটিক-মুক্ত মানুষকে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খেতে ও প্রতিদিন শরীরচর্চার বিষয়ে কেউ উদ্বুদ্ধ করতে চায়, তা হবে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ। ডায়াবেটিস আক্রমণ না করলে কেউ এ সব চিন্তা করতে রাজি নন। সামান্য একটু জীবনযাত্রায় বদল সবার জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এ বিষয়টি ডায়াবেটিস না হলে কেউ বোঝেন না। আমি নিজেও তেমনই ছিলাম। অন্ধ ছিলাম, দেখতে পেতাম না। এখন আমি দেখতে পাই।

এখন আমি ডায়াবেটিস রোগকে আমার জন্য একটি বর মনে করি যে, কারণে আমি সাবধান হয়ে জীবনযাপন করতে পারছি।

অনেকে বলে থাকেন, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলেই শুধু শর্করা খাওয়া বন্ধ করতে হবে, না হলে নয়। ধারণাটি কি সত্যি? আপনি ঠিক জানেন? একটু পড়াশোনা করেই দেখুন না!

লেখক: গল্পকার ও কলামিস্ট।

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ