খাসোগজির অমল আঙুল এবং পৃথিবীর কাছে আমাদের প্রশ্ন

Send
মাসুদা ভাট্টি
প্রকাশিত : ১৫:১৪, অক্টোবর ২৫, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩০, অক্টোবর ২৫, ২০১৮

মাসুদা ভাট্টিসৌদি রাজপরিবারের একসময়ের ঘনিষ্ঠ কিন্তু নতুন ক্ষমতাবানদের কট্টর সমালোচক স্বেচ্ছানির্বাসিত সাংবাদিক জামাল খাসোগজিকে তুরস্কের সৌদি দূতাবাসের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং এখনও পর্যন্ত তার লাশটা খুঁজে পাওয়া যায়নি– অন্তত গতকাল তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের ভাষণেও এ বিষয়ে কোনও উল্লেখ ছিল না। কিন্তু ব্রিটিশ গণমাধ্যমের দাবি, খাসোগজির লাশের খণ্ডিত অংশ তুরস্কে সৌদি রাষ্ট্রদূতের বাসভবনের বাগানে পাওয়া গিয়েছে। তবে এরচেয়েও ভয়ঙ্কর ও ন্যক্কারজনক দাবি করেছে তেহরান টাইমস ও যুক্তরাজ্যের দ্য মিরর পত্রিকা। রাজপরিবারের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে এই সংবাদমাধ্যম দুটি দাবি করছে, নিহত জামাল খাসোগজির একটি আঙুল নাকি সৌদি যুবরাজ সালমানকে উপহার দেওয়া হয়েছিল এটা প্রমাণ করার জন্যই যে তুরস্কে সৌদি দূতাবাসে সত্যি সত্যিই সাংবাদিক জামাল খাসোগজিকে হত্যা করা হয়েছে। এরপরও কি আমাদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে আমরা আসলে আধুনিক নয়, মধ্যযুগের নাইটদের আমলেই বসবাস করছি, যেখানে যখন-তখন রাজ-রাজড়াগণ তাদের শত্রুদের মাথা চেয়ে নাইটদের পাঠিয়ে দিতেন, তারা ছলে-বলে-কৌশলে শত্রুকে বধ করে তার মাথাটি একটি রুপার রেকাবিতে লালসালু দিয়ে ঢেকে এনে রাজাকে ভেট দেন এবং রাজা বলেন, ‘কী চাই তোমার? জমি? নারী? নাকি সহস্র উট?’ রাজাকে তার শত্রুর শির উপহার দিয়ে হত্যাকারী কুর্নিশ করে প্রাপ্তি নিয়ে ফিরে যায় তার জীবনে– পার্থক্য সত্যিই কি কিছু আছে সে কাল আর এ কালে?

সৌদি আরব পৃথিবীর মানচিত্রে এই মুহূর্তে একটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা। অনেকেই বিতর্ক করবেন যে ইসরায়েলও তা-ই, যদিও ইসরায়েলে সৌদি আরবের মতো রাজতন্ত্র নেই, সেখানে কিন্তু সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিকভাবেই নির্বাচিত সরকার কাজ করে, জবাবদিহিও রয়েছে। আমরা বিতর্ক করতেই পারি যে সেই জবাবদিহিতে ফাঁক রয়েছে, প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু সৌদি আরব ও তার মিত্ররা গোটা বৈশ্বিক-রাজনীতিকে একটি সংকটময় জায়গায় এনে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। বিশেষ করে, সারা বিশ্ব যখন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে তখন সৌদি-মার্কিন মিত্রতায় সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে কোনও শক্ত দেয়াল নির্মাণ সম্ভব হয়নি। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ কিছু রাষ্ট্রে সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে ক্ষমতাসীন সরকারকে হঠানোর কাজটি করেছে এবং নতুন সন্ত্রাসবাদ উসকে দিয়েছে। তেল-বাণিজ্য ও ধর্মবিশ্বাসকে প্রাধান্য নিয়ে শত্রু-মিত্র নির্ধারণ করতে গিয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘকাল ধরে এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে আছে। যে কেউ যখন-তখন এখানে হয় ঘি ঢালে না হয় অস্ত্র বিক্রির নামে অন্যায় ও মানবতাবিরোধী চুক্তি করে। রাজায়-রাজায় কিন্তু বন্ধুত্ব চরম, শুধু জনগণকে উসকে দেওয়া হয় ধর্মরক্ষার নামে আরেক দেশে গিয়ে সন্ত্রাসী আক্রমণ চালানোয়। গত দুই দশক ধরে আমরা এই বাস্তবতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। মধ্যপ্রাচ্য থেকে উদ্বাস্তুর দল পাড়ি জমাচ্ছে ইউরোপের দিকে, কেবল বেঁচে থাকার তাগিদে। ইউরোপেও এই শরণার্থীদের কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নতুন বাস্তবতা, যেখানে নব্য নাৎসিবাদের উত্থান ঘটছে এবং কট্টরপন্থীদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের কাছাকাছি চলে যেতে দেখা যাচ্ছে। এমন অবস্থায় পৃথিবীর ভারসাম্য যখন একেবারে টলায়মান তখনই জামাল খাসোগজির মতো একজন সাংবাদিককে টুকরো টুকরো করে ফেলা হলো সৌদি দূতাবাসের অভ্যন্তরে এবং তার আঙুল পাঠানো হলো সৌদি যুবরাজের কাছে ‘ভেট’ হিসেবে।

এতদিন তুরস্ক কঠোরভাবে দাবি করেছে যে তাদের কাছে খাসোগজিকে হত্যার সকল প্রমাণ আছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান যখন তার ভাষণে এই প্রমাণের বিষয়টি এরকম এড়িয়েই গেলেন তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না এর পেছনে রয়েছে নির্মম আন্তর্জাতিক সুবিধাবাদী রাজনীতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, সৌদি আরব, ইরান, ইয়েমেন ও সিরিয়ার মধ্যে চলমান যুদ্ধংদেহি ও বহুমুখী হিসাব-নিকাশের জের ধরে চলা রাজনীতির সামনে খাসোগজির কাটা আঙুল যেন এক ভয়ঙ্কর ‘অস্ত্র’, যে অস্ত্র দিয়ে প্রতিটি পক্ষ চাইছে প্রতিপক্ষকে হয় ঘায়েল করতে, নয় নিজের পক্ষে যতটুকু পারা যায় আদায় করে নিতে। একজন মৃত মানুষের ছোট্ট কাটা আঙুল, যার কোনও মূল্য নেই, ফেলে দিলে হয় পচে যাবে এবং কিছুদিন পর বিলীন হয়ে যাবে। তবে সেই ছোট্ট আঙুলটিই আজ হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক কু-রাজনীতি ও দরকষাকষির মোক্ষম ‘দাও’। মানবতা, গণতন্ত্র, আধুনিকতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা– সবকিছুই আজ চ্যালেঞ্জের মুখে খাসোগজির ওই সামান্য আঙুলের কাছে। একটি আঙুলের এত ক্ষমতা থাকলে জীবিত খাসোগজির তবে কত ক্ষমতা ছিল?

স্বাধীন সাংবাদিকতা দেশে দেশে প্রশ্নবিদ্ধ, হুমকির সম্মুখীন এবং অত্যন্ত এক অকাল পার করছে। যে তুরস্ক আজ খাসোগজি হত্যাকাণ্ড নিয়ে অত্যন্ত উচ্চকণ্ঠ সেই তুরস্কেই শত শত সাংবাদিক হয় কারাবন্দি, না হয় পালিয়ে জীবন রক্ষা করে চলেছেন। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বিন্দুমাত্র সমালোচনা হলেই সে দেশে যে প্রতিদিন একজন করে খাসোগজি হত্যাকাণ্ড ঘটবে না তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। সবচেয়ে বড় কথা হলো, খাসোগজি হত্যাকাণ্ডকে যেভাবে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান তার নিজের দেশের পক্ষে ব্যবহার করছেন দরকষাকষিতে, তা এটাই প্রমাণ করে যে খাসোগজি সাংবাদিক না হলে হয়তো তার লাশ এতটা মূল্যবান হতো না, যতটা মূল্যবান হয়েছে সাংবাদিক খাসোগজির লাশ। তার মানে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের মূল্য আছে, সে যদি লাশও হয়ে যায়, তাতেও সংবাদ, সাংবাদিক বা গণমাধ্যমের মূল্য বিন্দুমাত্র কমে না। কিন্তু শুরুতেই যে প্রশ্ন তুলেছিলাম, লাশকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক দরকষাকষি, সেটাকে আমরা কোন কাতারে ফেলবো? কীভাবে দাবি করবো আমরা আধুনিক, গণতান্ত্রিক কিংবা মানবতাবাদী?

ধরা যাক, এরকম একটি ঘটনা ঘটলো ইরানের কোনও দূতাবাসে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা যুক্তরাজ্যে। কী হতো ফলাফল? আমরা দেখতে পেতাম নতুন একটি যুদ্ধ, আধুনিক যুদ্ধবিমান উড়ে আসতো স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র বহন করে। উপসাগর ভরে যেত যুদ্ধজাহাজে। দেশটি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত এতক্ষণে হয়তো। কিংবা হয়তো নাও হতে পারতো, আমরা একটি সম্ভাবনার কথা বলছি মাত্র। এমনও হতে পারতো যে সেখানেও সেই কল্পিত লাশকে কেন্দ্র করে তৈরি হতো নতুন রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক, স্ট্র্যাটিজিক দরকষাকষি। তার মানে হচ্ছে, মানুষ বা প্রতিষ্ঠান কিংবা ঘটে যাওয়া ঘটনা কোনোটিই কিছু নয়, রাজনীতিই সত্য এবং রাজনীতিকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক সম্পর্কের নির্ধারিত হওয়া মাত্রাই একমাত্র আমাদের সময়ের বাস্তবতা। এখানে গণতন্ত্র, গণমাধ্যম কিংবা আধুনিকতার কোনও মূল্য নেই, নেই কোনও হেরফের বা পার্থক্য।

প্রশ্ন হলো, যদি পার্থক্য নাই-ই থাকবে তাহলে আমরা কেন নিজেদের আধুনিক দাবি করছি? কোন যুক্তিতে? হ্যাঁ, প্রযুক্তিগতভাবে আমরা এগিয়েছি অনেক। আমরা মহাকাশ বিজয় করেছি, আবিষ্কার করেছি সভ্যতাবিধ্বংসী মারণাস্ত্র। তথ্য-প্রযুক্তিকে নিয়ে গেছি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মাত্রায়। কিন্তু সে মাত্রায় কি আমরা নিজেদের মানবীয় গুণাবলিকে নিয়ে যেতে পেরেছি? ঘোচাতে কি পেরেছি মানুষে মানুষে বৈষম্য? কিংবা আমরা কি সত্যিকার অর্থেই এসব ইতিবাচক ঘটনার ভেতর দিয়ে পৃথিবী টিকে থাকুক, সেটা কি চাই? গণতন্ত্র বলে যে গালভরা দাবি আমরা আধুনিক মানুষেরা করে থাকি তার কোথায় আমরা আজ জায়গা করে দেবো খাসোগজির বিচ্ছিন্ন আঙুলকে? কি-বোর্ডের ওপর যে আঙুল থেকে স্বাচ্ছন্দ্যে বেরিয়ে আসতো প্রতিবাদ (কিংবা ধরুন প্রতিবাদ নয়, আপসের কথাই– একসময় তো খাসোগজি রাজপরিবারের কাছে প্রিয়জনই ছিলেন, তাতেইবা কি এসে যায়, সেটা তো তার ব্যক্তিগত নির্ণয়), আজ সে আঙুল হয়েছে যুবরাজের কাছে ‘ভেট’– প্রমাণ যে খাসোগজিকে নিশ্চিতভাবেই হত্যা করা হয়েছে। যুবরাজ নিশ্চয়ই খুশি হয়েছেন, সৌদি রাজপরিবারের পথের কাঁটা দূর হয়েছে। কিন্তু গোটা পৃথিবীর সামনে যে খাসোগজির শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা অমল আঙুলটি একটি নিষ্ঠুর প্রশ্ন হয়ে থাকলো, তার উত্তর কে দেবে? সৌদি নিশ্চয়ই দেবে না, এরদোয়ানও দেবেন না। ট্রাম্প? তিনি কি দেবেন? তিনিও দেবেন বলেও মনে হয় না। তাহলে? তার মানে কেউই দেবে না। কিন্তু তার আগে প্রশ্নটি কি সেটা ঠিক করেছেন?

আসুন, সবার আগে আমরা একটি প্রশ্ন দাঁড় করাই নিহত খাসোগজির বিচ্ছিন্ন আঙুলটিকে চোখের সামনে রেখে।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি

[email protected]

 

(নোট: বাংলা ট্রিবিউনের বানানরীতি হলো ‘জামাল খাশোগি’। এই কলামটিতে উক্ত নামটির ক্ষেত্রে লেখকের বানানরীতি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।)

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ