ড. কামাল আসলে একজন ‘বিভ্রান্ত সৈনিক’

Send
লীনা পারভীন
প্রকাশিত : ১৮:২২, অক্টোবর ২৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০১, অক্টোবর ২৭, ২০১৮

লীনা পারভীনদেশে এই মুহূর্তের সবচেয়ে আলোচিত শব্দ হচ্ছে ‘ঐক্য’। আর সে আলোচনার মাঝেই চলছে নানা প্লটের নাটক, মঞ্চনাটক, সার্কাস ইত্যাদি। ছোটবেলায় শিখেছিলাম ঐক্যেই নাকি সব মুশকিল থেকে পার পাওয়া যায়। একজন যা করতে পারে না সেই কাজে দশজন সমমনা এক হলেই সহজেই অর্জন করা সম্ভব হয়।
কিন্তু বর্তমানে যে ঐক্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে সেটি কি সেই ঐক্যকেই বোঝাচ্ছে? নির্বাচনের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি আছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন আসবে, হবেও। গতবারের নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি যে ভুল করেছে সে ভুল তারা এবার আর করতে চাইবে না, এটাই হচ্ছে হিসাব। অথচ তাদের চেয়ারপারসন দুর্নীতির মামলায় জেলে আছেন। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফেরারি আসামি। স্বাভাবিকভাবেই রাজনীতির মাঠে বিএনপির এখন অস্তিত্ব সংকট চলছে। জামায়াতকে ভালোবেসে তারা এখন ঘর ও ‘কুলহারা কলঙ্কিনীর’ সিল নিয়ে এদিক-ওদিক ছন্নছাড়া হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কার কাছে যাবে, কী করবে কিছুই যেন মাথায় খেলছে না।
প্রতিবার নির্বাচনের আগে আগে মাঠে কিছু পারফর্মার হাজির হয়। সেই একই কাজ আবারও শুরু হয়ে গেছে। অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে ড. কামাল হোসেনকে সামনে নিয়ে মাঠে এসেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। দেশে ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্মানিত একজন ছিলেন ড. কামাল। উনি আমাদের বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম। অথচ শেষ বয়সে এসে নিজেই নিজেকে বিতর্কিত করার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। গণফোরাম করেছিলেন, সফল হতে পারেননি। কিন্তু মেনে নেবেন না যে তিনি রাজনীতির মাঠে ব্যর্থ। মনে করছেন তিনি এখনও আমাদের দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একজন। আসলেই কি?

তিনি সাম্প্রতিককালের চলতে থাকা ‘ঐক্য’ প্রক্রিয়ায় নিজেকে নিয়ে গেছেন আরও একধাপ নিচে। এই ঐক্য আসলে কিসের ঐক্য বা কাদের ঐক্য? একদম সোজা হিসাব। এই ঐক্য আওয়ামী লীগ বিরোধী ঐক্য। কাদের নিয়ে ঐক্য? কিছু দলছুট ব্যর্থ মানুষ আছেন সেখানে আর আছে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদের সহায়ক দল বিএনপি আর প্রচ্ছন্নভাবে আছে তাদের 'প্রেমিক' জামায়াতে ইসলামী। সব আলোচনা বাদ দিলেও যে বিষয়টিকে উপেক্ষা করতে পারছি না সেটি হচ্ছে, ড. কামাল ঐক্য প্রক্রিয়া গঠনের সংবাদ সম্মেলনে একপাশে জামায়াত বিএনপির প্রতিনিধি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আর আরেক পাশে স্বৈরাচারের বন্ধু ও সহায়ক আ. স. ম. রবকে নিয়ে বলতে থাকলেন তিনি বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। তিনি বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে শিখেছেন কেমন করে জনগণের জন্য রাজনীতি করতে হয়, কেমন করে সময়ের প্রয়োজনে ব্যক্তিস্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে দেশের জন্য এগিয়ে যেতে হয়। একই রকম বক্তব্য তিনি সিলেটের জনসভায়ও দিয়েছেন বলে জানা যায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, ডা. কামাল জামায়াত প্রশ্নে বদরুদ্দোজা চৌধুরীদের বিসর্জন দিয়ে বিএনপির সাথে ঐক্য করলেন আবার বলছেন তিনি বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। যে দলটির ওপর বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে, যে দলের নেতাদের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর কন্যাকে হত্যা চেষ্টার অপরাধে শাস্তির রায় দিয়েছেন আদালত, তাদের সাথে বসে তিনি কেমন করে বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হওয়ার যোগ্যতা রাখলেন বুঝতে পারলাম না। সবচেয়ে হাস্যকর বিষয় হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হয়ে তারই গড়া দলের বিরুদ্ধে ঐক্য গড়ার কাজে শপথ নিয়েছেন কামাল সাহেব।

তার বয়স হয়েছে যথেষ্ট। বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতাকে তিনি কতটা অনুধাবন করতে পেরেছেন জানি না। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কথা তেমন শুনেছি বলে মনে পড়ে না। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জীবিত দুই কন্যাকে আশ্রয় দেয়া নিয়ে কামাল সাহেবের ভূমিকা যথেষ্ট সন্দেহজনক ছিল। সেটা আর নতুন করে আলোচনার কিছু নেই। নিজেকে বঙ্গবন্ধুর সৈনিক বলেন অথচ আমরা জানি তার জামাতা কীভাবে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে সোচ্চার ছিল। কীভাবে তার জামাতা বিচার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে লেখালেখি করেছে। অথচ কখনই ড. কামাল এর বিরোধিতা করেছেন বলে জানা নেই। তিনি বলেছেন জাতির পিতার কাছ থেকে আদর্শে অনড় থাকতে শিখেছেন। সেটা কোন আদর্শ? বঙ্গবন্ধু কী দেশকে বিপদে ফেলতে পারে এমন কোনও আদর্শের পক্ষে ছিলেন? উনি আসলে কী বলতে চাইলেন? অন্যায়ের সাথে আপস করা কামাল সাহেবের চরিত্রে অনেকবারই প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এই দ্বিচারিতার মানে কী? তিনি কী শেষ বয়সে এসে বুঝতে পারছেন যে তিনি অপরাধ করছেন? তিনি কী জামায়াত ও বিএনপির সাথে আপস করে বুঝতে পারছেন বঙ্গবন্ধুর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন? আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করে ক্ষমতায় আসতে চায় যে দল সে দলের সাথে ঐক্য করে কী বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখা যায়?

আমার মনে হয় তার মতো বিপজ্জনক লোকের মুখে জাতির পিতার নাম উচ্চারণ মানায় না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ সবাই ধারণ করতে পারে না। এ ধরনের লোকেরা দেশের জন্য কেবল ক্ষতিকরই না, ভবিষ্যৎ ইতিহাসের জন্যও হুমকিস্বরূপ। দেশের রাজনীতিকে এমন করে নিজেদের খায়েশ মেটানোর প্লাটফর্ম হিসেবে ব্যবহারের টার্গেট যাদের থাকে তাদের থামাতে হয় শক্তভাবে। যুব ও তরুণরাই হচ্ছে বাংলাদেশের মূলশক্তি। তাদের বিভ্রান্ত করতে পারে এমন শক্তি বা রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলার মতো কোনও ধারাকেই আশ্রয় প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়।

ড. কামাল হোসেন একদিকে বিএনপি জামায়াতকে আশ্রয় করে ক্ষমতায় যেতে চাইছেন, আবার অন্যদিকে বলছেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শই তার আদর্শ। এমন বিভ্রান্তিতে ভোগা ব্যক্তিকে রাজনীতিতে দেখতে চাই না আমরা। তার বয়সও তাকে এই মুহূর্তের বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায় পারমিট করে না। 

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ