অপরাধী কে?

Send
রাশেদা রওনক খান
প্রকাশিত : ১৪:২০, মার্চ ৩০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪৪, মার্চ ৩০, ২০১৯

রাশেদা রওনক খানআমেরিকার ওয়াশিংটনে আমরা যে বাসায় থাকতাম, সেটির নাম ছিল ‘দ্য আইরিন’। ফ্রেন্ডশিপ হাইটস জায়গাটা ওয়াশিংটনে শ্বেতাঙ্গদের এলাকা হিসেবে সুপরিচিত ছিল। সেখানে আফ্রিকান-আমেরিকানদের কোনও বাসা কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। পিএইচডির প্রথম বর্ষে নেইবারহুড বর্ণবাদ নিয়ে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে গিয়ে অধ্যাপককে বলেছিলাম, আমার এলাকায় সাদা আমেরিকান ছাড়া সাক্ষাৎকার নেওয়ার মতো কাউকে খুঁজে পাইনি। শুনে তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আমেরিকার কিছু এলাকা সাদা-কালোয় বিভক্ত।’
প্রতি মাসে আইরিনে একটা ফায়ার অ্যালার্ম বাজানো হতো। তখন অ্যাপার্টমেন্টের সবাই দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যেতো। অনেক সময় এমনও হয়েছে, কেউ শাওয়ার নিচ্ছিলেন বলে তোয়ালে গায়ে জড়িয়ে নেমে গেছেন। এটা এমনই এক ট্রায়াল যে, মনে হতো সত্যি সত্যিই আগুন লেগেছে! ট্রায়াল বুঝেও যারা নামতেন তাদের মুখও যেমন সিরিয়াস থাকতো, আবার যার মনে হতো আগুন লেগেছে তার মুখও একইরকম সিরিয়াস। ভবনের চারদিকেই সিঁড়ি ছিল। যে যেদিক দিয়ে ইচ্ছে নামতো। 

ওই সময় আমাকে দেখতে মা দু’মাসের জন্য এসেছিলেন। আমার গর্ভে তখন তিন মাসের জারিয়া। ফায়ার অ্যালার্ম বাজলেও বয়সের কারণে মায়ের নামতে ইচ্ছে হতো না। তারপরও অনেকটা বাধ্য হয়েই নামতে হতো তাকে। পুরো অ্যাপার্টমেন্টের সবাই নামার পর ফের উঠে যেতে বলা হতো। একবার মা ঠিক করলেন নামবেন না। আমি শরীর খারাপ থাকার পরও কষ্ট করে নামতাম, কারণ বিকট শব্দে ফ্ল্যাটে বসে থাকা যেতো না। কিন্তু দশ মিনিট পরে দেখি তিনিও নেমে এলেন। জিজ্ঞেস করলাম– কী ব্যাপার, তুমি নামলে যে? মা বললেন, ‘৯০ বছরের এক বয়স্কা কষ্ট করে নামছেন দেখলাম, আমার তো ৭০ বছর। তাই ভাবলাম নামি।’ আইরিনের শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বাসিন্দাকে এভাবে নিয়ম বা আইনকে শ্রদ্ধা করতে দেখেছি।

এবার ইংল্যান্ডে এসে বার্মিংহামে বাংলাদেশি ডুপ্লেক্স সিঙ্গেল হাউসে আছি। এজন্য মনে মনে একটা স্বস্তি কাজ করছে। কারণ এখানে প্রতি মাসে ফায়ার অ্যালার্ম বাজবে না, তাড়াহুড়া করে দৌড়ে বেরও হতে হবে না। দুই দিন আগে মেয়েকে আনতে স্কুলে গেলাম। সেখানে দেখি বাচ্চারা একে অন্যের হাত ধরে ক্লাস টিচারের পেছন পেছন দৌড়ে গেটের পাশে এসে লাইনে দাঁড়াচ্ছে। বুঝতে পারলাম, স্কুলে আগুন লাগলে কীভাবে বাচ্চারা বের হবে সেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় প্রতি মাসে। আমাদের দেশে এসব শিক্ষা দেওয়ার সময় আছে? যে দেশের পরীক্ষা পাস করার একমাত্র উপায় মুখস্ত বিদ্যা, সেই দেশে আইন ভেঙে, অনিয়ম-দুর্নীতি করে ও বিল্ডিং কোড না মেনে ভবন নির্মাণ তো হবেই, যেখানে ভবন মালিক একজন প্রকৌশলী হওয়া সত্ত্বেও অগ্নিনির্বাপণের কোনও পদ্ধতি থাকবে না। 

আমেরিকা-ইংল্যান্ড কিংবা অভিজাত এলাকা বনানীর ভবনই হোক বা বস্তিতেই লাগুক; আগুন আগুনই। তফাৎ এটাই যে– উন্নত দেশে নিয়ম মানা হয়, সেখানে আইনকে শ্রদ্ধা করে সবাই, তাদের জন্য দুর্নীতির কঠোর সাজা রয়েছে, মানুষের জীবনের মূল্য আছে। আর আমাদের যেন এসবের কোনোটাই নেই। এ ধরনের দুর্ঘটনাগুলোর জন্য আসলে কে বা কারা দায়ী?

২৮ মার্চ বনানীর এফ আর টাওয়ারের আগুনে ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে আর সড়ক দুর্ঘটনায় একই দিন ৩০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এই 'মৃত্যু' বা 'প্রাণ হারানো'র কথা যারা বলছেন বা প্রচার করছেন, তাদের সঙ্গে একমত হতে পারছি না। বরং আমার অভিমত, এগুলোকে হত্যাকাণ্ড বলার সাহস করুন। নিউজিল্যান্ডের দুষ্কৃতিকারীকে এবার পশ্চিমা মিডিয়াগুলো কেবল ‘গানম্যান’ বলে ছেড়ে দেয়নি, চাপের মুখে তারা সেই দুষ্কৃতিকারীকে টেরোরিস্ট তথা সন্ত্রাসী বলেছে। এখানে শব্দচয়নটা খুব জরুরি একটি বিষয়।

১৮ তলা ভবনের অনুমোদন নিয়ে ২৩ তলা করার পেছনে দায়ী কে, আমরা বলতে পারি? ভবন মালিক কীভাবে তা করলেন? এই ভবন মালিক কিংবা যারা বাড়তি চারতলা করার জন্য তাকে সমর্থন দিয়েছেন, তারা কারা? রাজউকের অনুমোদন না পেলেও কীভাবে এটা হলো? বাড়তি চারতলায় গ্যাস লাইন কীভাবে এলো? যারা তাকে এই অবৈধ স্থাপনা তৈরিতে সহায়তা করেছেন তারা কি অন্য কোনও গ্রহ থেকে এসেছেন? না, বিরাট অংকের উৎকোচ গ্রহণের মধ্য দিয়ে আমাদের বাবা-মামা-চাচা-আত্মীয়স্বজনই অবৈধভাবে বাড়তি চারতলা গড়ে তুলতে সহায়তা করেছিলেন। অতএব অনিয়ম-দুর্নীতি আমাদেরই কাজ। আমার আপনার চারপাশের মানুষ কিংবা আমি-আপনিই তো এসব করছি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় একটাই– দেশের আইনকে শক্তিশালী করা, দুর্নীতি বন্ধ করা। রাষ্ট্রে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত না হলে এই আমরাই অনিয়ম ও দুর্নীতি করতে থাকবো।

ঢাকার একটি ভবনে আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিস যথাযথভাবে সব উপকরণ পায় না, পর্যাপ্ত পানি পায় না। কারণ ওয়াটার হাইড্রেন্ট নেই, পর্যাপ্ত ওয়াটার সোর্স নেই। অথচ আমরা বলি– আমাদের ঢাকা শহর নদী দিয়ে ঘেরা। ওয়াটার হাইড্রেন্টের ব্যবস্থা করার কাজটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা অধিদফতর খুব শিগগিরই ভুলে যাবেন। যদিও এখন তা বারবার আলোচনায় আসছে। 

প্রশ্ন হচ্ছে, আমরাই কি এসব আইন মানবো? এই আমরাই কি পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল কারখানা সরাতে দিচ্ছি? আমরাই তো এই ভবনকে আবারও সেজে উঠতে দেখবো। দুর্ঘটনা ঘটলে আবার আমরাই বারবার প্রশ্ন করবো– কেন আপনার ভবনে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা নেই? শহরের প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্টে নিয়মিতভাবে ফায়ার অ্যালার্ম বাজিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে কীভাবে আগুন লাগলে বিকল্প পথ বা সিঁড়ি দিয়ে রাস্তায় নেমে আসতে হবে, এগুলো ভাবনায় আনাটাও অপরাধ মনে হতে পারে! 
আমাদের মধ্যেই তো কেউ ১৮ তলার জায়গায় নিয়ম ভঙ্গ করে ২৩ তলা বানাচ্ছি। এই আমরাই রাজউক কিংবা সরকারের অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি। আমাদের মধ্যেই কেউ কেউ ঘুষের বিনিময়ে দেশকে ধ্বংস করে দিচ্ছি। অপরাধীকে টাকার বিনিময়ে আরও অপরাধ করার পথ দেখাচ্ছি তো আমরাই।

এই আমাদের মধ্যেই কি কেউ পুলিশের চাকরি করছে না? যেখানে নিজের স্বার্থ জড়িত আমরাই সেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার করছি না? আমরা যেখানে সেখানে গাড়ি পার্ক করছি না? অবৈধ স্থাপনা বানাচ্ছি না? মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হচ্ছি না? ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে চলছি না? বিআরটিএতে চাকরি করছি না? শহরের যেকোনও জায়গায় দাঁড়িয়ে বাসে উঠতে চাইছি তো আমরাই। বাস থামিয়ে ড্রাইভারের কাছ থেকে লাইসেন্স দেখার নামে টাকা পকেটে ঢুকিয়ে নিচ্ছি তো আমরাই। ‘ডোনেশন’ দিয়ে বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তির সব অনিয়ম করছি না? বাচ্চাদের সামনে মিথ্যা বলে বলে তাদের মিথ্যা শেখাচ্ছি না? আমাদের মধ্যেই তো কেউ কেউ প্রশ্নপত্র ফাঁস করছে। বাবা-মা হয়েও সন্তানের হাতে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন তুলে দিচ্ছেন অনেকে। আইসিইউতে লাশ রেখে ব্যবসা করছি না? এই আমরাই তো রডের বদলে বাঁশ দিচ্ছি না? এই আমরাই তো সব মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি করছি না? হয় আমি, না হয় আপনি, নয়তো আমাদের আত্মীয়-স্বজনেরা। আমরা আমরাই তো!

এই আমরাই ফেসবুকে আছি, স্ট্যাটাস দিচ্ছি দিব্যি। এই আমরাই ফেসবুকে বলি– বিমানবন্দরে কেন ঠিকমত সার্চ হয় না। আবার এই আমরাই প্রধান বিচারপতিকে কেন সার্চ করা হবে তা নিয়ে বিমানবন্দর তোলপাড় করে ফেলছি না? সরকার কিংবা জনগণ যে যেই পর্যায়েরই হোক, আমরা আমরাই তো। এই আমরা কি ভিনগ্রহের কেউ?

লেখক: শিক্ষক, নৃ-বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

/এসএএস/জেএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ