চাপাতিঘেঁষা আহাজারির জীবন

Send
জোবাইদা নাসরীন
প্রকাশিত : ১৬:৩২, জুলাই ০১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪৫, জুলাই ০১, ২০১৯

জোবাইদা নাসরীনঘটনাটি এখন সবার মুখে মুখে। হ্যাঁ বলছি, বরগুনার সেই খুনের কথাটিই। সবার সামনে যখন রামদা দিয়ে একজনকে রাস্তায় কুপিয়ে মারা হলো, তখন রাস্তাটি কিন্তু ফাঁকা ছিল না। একটি কলেজের সামনেই ঘটনাটি ঘটে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনের রাস্তা কখনও ফাঁকা থাকে না। অথচ ঘটনাটি যখন ঘটেছিল, তখন কোনও সংবাদ মাধ্যমে ঘটনাটি সম্পর্কে জানা যায়নি। জানা গিয়েছিল তখনই, যখন কোনও একজন সেই বীভৎস খুনের রেকর্ড করা দৃশ্যটি ফেসবুকে আপলোড করেন এবং সেটি ছড়িয়ে পড়তে থাকে ফেসবুকের পাতায়। তখনই সংবাদ মাধ্যম থেকে সবার নড়াচড়া শুরু হয়। টুকটাক প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। চলতে থাকে নানা ধরনের তর্ক-বিতর্ক। প্রসঙ্গ এসেছে অনেক। হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধ আলোচনা ছাপিয়ে কোনও কোনও জায়গায় গুরুত্ব পেয়েছে মেয়েটির চরিত্রের কাটাকাটি।
কেউ কেন এগিয়ে এলো না? স্বামীকে বাঁচানোর নানা চেষ্টায় থাকা নারী চিৎকার করে সাহায্য চেয়েছিলেন। কিন্তু কেউ আসেনি। বরং অনেকেই দূর থেকে কিংবা কিছুটা কাছে থাকা দূরত্ব থেকে এই খুনের দৃশ্যটি মোবাইলফোনে ধারণ করছিল। শুধু এই ঘটনাতেই নয়, প্রতিদিন ঘটে যাওয়া এই ধরনের নানা ঘটনায় আজ আর কেউ কাউকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসে না, এমনকি পুলিশও না। ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে আমরা কী দেখবো? যদি কাউকে গুলি করা হয়, তখন মনে হতে পারে যে, অনেক সময় হওয়ার কারণে অপরাধীকে ধরা যায়নি, কিন্তু যখন চাপাতি দিয়ে  আঘাত করে হত্যা করা হয়, তখন সেখানে অন্তত ১০-১৫ মিনিট সময় লাগে। তার মানে লোকজন দশ থেকে পনের মিনিট ধরে সময় নিয়ে রিফাতকে রক্তাক্ত করা পর্যবেক্ষণ করেছে, তার স্ত্রীর আকুল আর্তনাদ শুনেছে, কিন্তু এগিয়ে আসনি? এখন অনেকের মনেই একটা প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, আসলে একে অন্যের সহযোগিতা করার প্রবণতা কমে যাচ্ছে কেন? কেন আমরা সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে পারছি না? কেন আমাদের ভূমিকা হয়ে উঠছে শুধুই দর্শকের কিংবা সামাজিক বিলাপের?

বাংলাদেশে এই ধরনের ঘটনা যে এই প্রথম ঘটেছে, তা কিন্তু নয়। এর আগে ব্লগার অভিজিৎ রায়কে যখন হত্যা করা হয়েছিল, তখন তার স্ত্রী বন্যাও সাহায্যের জন্য আর্জি জানিয়েছিলেন, কিন্তু ওই সময়ও কেউ এগিয়ে আসেনি। সেটিও ঘটেছিল ঢাকার প্রাণকেন্দ্র-খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির পাশেই। ওই সময় বইমেলা চলছিল, আশেপাশে হাজার মানুষের আনাগোনা ছিল, কিন্তু কেউই আসেনি অভিজিৎকে রক্ষায়। সেখানেও হত্যাকারীরা সময় নিয়েছে, কুপিয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন অভিজিতের স্ত্রীও। এর আগে একই কায়দায় আক্রান্ত হয়েছিলেন অধ্যাপক এবং লেখক হুমায়ুন আজাদ। এই সব ঘটনার বাইরে একমাত্র প্রতিবাদ এসেছিল। এবার সেটিও হয়েছে। তাও তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যরা করেছেন। ব্লগার বাবু হত্যার আসামিদের সাহস করে ধরতে পেরেছিলেন কয়েকজন তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য।

এই প্রতিবাদহীনতা কিংবা রুখে দাঁড়ানোর সংস্কৃতি কি একেবারেই ব্যক্তিগত? কেনই বা এই সংস্কৃতি আমরা চালু করতে পারছি না? কিন্তু এই বাংলাদেশেই পাড়ার বা পাশের বাড়ির লোকের কিছু হলে মানুষ নিজের মনে করতো। যেটা মোটা দাগে বলতে গেলে শহরের বাইরে, গ্রামে- গঞ্জে এখনও আছে। কিন্তু বিশেষ করে শহরাঞ্চলে এখন যতক্ষণ নিজের ওপর না আসছে, ততক্ষণ সবাই আলাদা, সবাই নিজেই এর সঙ্গে যুক্ত হতে চাইচ্ছন না। এটি কি শুধু চাপাতির কোপের ভয়? নাকি আরও নানা ধরনের ভয়? এই ভয়ের উৎস হয়তো অন্য জায়গায়, আরও গভীরে। মানুষ হয়তো মনে করছে এর প্রতিবাদে এগিয়ে আসলে তারও ভবিষ্যৎ খারাপ। তিনিও রাতারাতি গুম হয়ে যেতে পারেন, রামদার কোপ তার মাথায়ও পড়তে পারে যে কোনও দিন, যে কোনও সময়ে। আমরা এখন সবাই মৃত্যুকে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছি।

এই ভয়ের মধ্যে আছে, সবাই জানে যারা এই হত্যাকারী, তারা এই প্রথম এই ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছেন না। তার মানে তারা এতটাই ভয়াবহ সন্ত্রাসী যে দিন-দুপুরে সবার সামনেই একজনকে কুপিয়ে হত্যা করার সাহস করছে। এ থেকে খালি চোখেই বোঝা যায়, তারা একা নয়। তারা নানাভাবে বিভিন্ন ক্ষমতাসীন লোকদের কাছের মানুষ, ক্ষমতাসীন মানুষেরা তাদের ব্যবহার করছে, নিজস্ব প্রয়োজনে, নিজেদের ক্ষমতা জিইয়ে রাখতে, আরও শক্তিশালী করতে। তাই এই অপরাধীরাও জেনে গেছে, তারা যে কোনও জায়গায় যে কোনও কিছু করতে পারে।

পুলিশের খাতায় এই অপরাধীদের বিষয়ে নানা ধরনের মামলা ছিল। কিন্তু তারা তাহলে বাইরে কেন? এলাকার লোকজন বলছে, তারা আগে থেকেই ভয়ঙ্কর অপরাধী হিসেবে পরিচিতি। তবু তারা কারাগারে নেই। পুলিশ তাদের সম্পর্কে আগে থেকেই জানে। এলাকার এমপি, মন্ত্রী কিংবা রাজনৈতিক নেতা, তারাও জানেন। তাদের জানাশোনা আছে বলেই এই অপরাধীরা আরও বেপরোয়া।

খুব অবাক বিষয় হলো, এখন সবার তথ্যের উৎস হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, এক কথায় বলত গেলে ফেসবুক। অনেক সময়ই দেখা যায়, ফেসবুকে না দিলে কেউ জানতেও পারে না কী হচ্ছে আমাদেরই আশপাশে। আগে সাংবাদিকরা তাৎক্ষণিকভাবে সংবাদ পরিবেশন করতেন, এখন তাদের অনেকেই ফেসবুকের ওপর নির্ভরশীল। তাই ঘটনা ঘটলেও তা পত্রিকায় পাতায় আসে না। কয়েকদিন পর আসে যখন সেটি নিয়ে ফেসবুকে আহাজারি তৈরি হয়।

এই ঘটনাগুলোর জন্য আমরাই দায়ী। আমরা সবাই কম বেশি অবদান রাখছি। এলাকার পুলিশ, এমপি, নেতা, সবাই রাখছি। নুসরাতের ক্ষেত্রেও এমন দেখা গেছে। সবাই জানতো কিন্তু কেউই ঘটনার আগ পর্যন্ত কেউই কোনও ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি।

বরগুনার ঘটনার কারণ হিসেবে পুলিশ সেটিকে ‘ব্যক্তিগত’ হিসেবে উল্লখ করেছেন। সঠিক তদন্তের আগেই এই ধরনের বক্তব্য কাঙ্ক্ষিত নয়। খুনের মনগড়া কারণ না প্রচার করে সবার দায়িত্ব পালন কতটুকু হলো সেটি নিয়েই মূল্যায়নটা হওয়া জরুরি। আমরা বুঝে গেছি আমরা সবাই নিজেদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছি না দেখেই অপরাধ চলছেই।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল: [email protected]

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ