পুরুষের পর্দার ওয়াজ

Send
মো. আবুসালেহ সেকেন্দার
প্রকাশিত : ১৭:০৩, জুলাই ০৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৫, জুলাই ০৩, ২০১৯

মো. আবুসালেহ সেকেন্দারবিভিন্ন মাহফিলে বক্তব্য শুনলে দেখা যাবে, তার উল্লেখযোগ্য অংশে থাকে নারীর পর্দার ওয়াজ। পুরুষ বক্তা রসিয়ে রসিয়ে পুরুষ শ্রোতার সামনে নারীকে পর্দার তালিম দিচ্ছেন। উচ্চকণ্ঠে বলছেন, নারীদের বেপর্দায় চলাফেরার ফলে সমাজে নৈতিক অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। যদিও ইসলাম শুধু নারীর জন্য পর্দার বিধান করেনি। ইসলামে নারীর পাশাপাশি পুরুষের জন্যও পর্দার বিধান রয়েছে। মহানবী হজরত মোহাম্মদ (স.) ও  খলিফাদের সময়ে নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও পর্দা মেনে চলেছেন। ফলে মাহফিলের পুরুষ বক্তাদের দায়িত্ব ছিল তার পুরুষ বন্ধুরা যেন পর্দা করে সেই বিষয়ে ওয়াজ করা। বাস্তবে ঘটে তার উল্টো। ওয়াজে নারীদের পর্দার বিধান নিয়ে তুলোধুনো করা হলেও পুরুষদের পর্দার বিষয়ে কোনও আলোচনাই হয় না।
ইসলাম ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল-কোরআনে নারীর পাশাপাশি পুরুষকে পর্দার জন্য  কঠোরভাবে বলা হয়েছে। আল-কোরআনের সুরা আরাফের ২৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে–‘হে মানব সন্তান! আল্লাহ তোমাদের শরীর আবৃত করার জন্য পোশাক দিয়েছেন এবং ইহা তোমাদের শোভাবর্ধক।’
এই আয়াতের মর্ম অনুযায়ী শরীর ঢেকে রাখা প্রত্যেক নারী-পুরুষের জন্যই ফরজ। হজরত মোহাম্মদ (স.) কড়া নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, কোনও ব্যক্তি তিনি নারী অথবা পুরুষ যেই হোন না কেন, তিনি যেন কোনোভাবেই পর্দা লঙ্ঘন না করেন। তিনি বলেন, ‘যে আপন ভাইয়ের সতরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, সে অভিশপ্ত।’ (মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (রহ) ,আল্লামা আবু বকর আহমাদ আল-জাসসাস (রহঃ), আহকামুল কুরআন)

এমনকি কোনও পুরষ কোনও নারীর সামনে এবং কোনও নারী কোনও নারীর সামনে উলঙ্গ হতে পারবে না। সিহাহ সিত্তা হাদিস গ্রন্থের অন্যতম গ্রন্থ মুসলিম শরীফে বলা হয়েছে, ‘কোনও পুরুষ কোনও পুরুষকে এবং কোনও নারী কোনও নারীকে যেন উলঙ্গ অবস্থায় না দেখে।’

অর্থাৎ হজরত মোহাম্মদ (স.)-এর এই বাণীটির মাধ্যমে এই বিষয়টি স্পষ্ট যে শুধু পুরুষের সামনে নারী পর্দা করবে তা নয়। বরং নারীর সামনে পুরুষও পর্দা করবে। উপরন্তু, নারীর সামনে নারী এবং পুরুষের সামনে পুরুষ পর্দা করতে বাধ্য হবে।

এই সব নির্দেশনার পাশাপাশি পুরুষের জন্য স্পষ্টভাবে পর্দার কথা বলা হয়েছে। শারীরিক গঠন বিবেচনা করে ওই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পুরুষের জন্য শরীরের নাভী ও হাঁটুর মধ্যবর্তী অংশ ঢেকে রাখার জন্য মহানবি (স.) নির্দেশ দিয়েছেন। হজরত আলী (রা.) জানান, হজরত মোহাম্মদ (স.)  বলেছেন যে, তোমরা নিজের উরু কাউকে দেখাবে না এবং কোনও জীবিত বা মৃত ব্যক্তির উরুর প্রতি দৃষ্টি দিও না (তাফসিরে কবীর)। ওই নির্দেশগুলো সর্বজনীন নির্দেশ অর্থাৎ নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য।

পুরুষের জন্য ঘরে ঢোকার আগে অনুমতি নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই বিধান প্রবর্তন করার উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়ে থাকে যে, যেন ঘরের ভেতরের স্ত্রীলোকদের কাউকে যেন এমন অবস্থায় দেখা না যায়, যে অবস্থায় তাদের দেখা আগন্তুক পুরুষের উচিত নয়। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘যখন তোমাদের পুত্ররা সাবালক হবে, তখন অনুমতি নিয়ে ঘরে প্রবেশ করা তাদের উচিত, যেমন তাদের পূর্ববর্তীরা অনুমতিসহ ঘরে প্রবেশ করতো’। (সুরা নুর: ৫৯)।

আল্লাহ অন্য এক আয়াতে বলেছেন–‘হে ঈমানদারগণ! গৃহস্বামীর অনুমতি ছাড়া কারও গৃহে প্রবেশ করবে না এবং যখন প্রবেশ করবে তখন গৃহের অধিবাসীদের সালাম দাও’। (সুরা নুর: ২৭)

বস্তুত, ঘরের ভেতরে ও বাইরের মধ্যে একটা বাধা-নিষেধ স্থাপন করাই ওই আয়াত দুটির উদ্দেশ্য হলেও প্রকৃতপক্ষে ওই আয়াত দুটির মাধ্যমে পারিবারিক বলয়ে নারীকে পুরুষের দৃষ্টি থেকে নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর একটি কথা না বললেই নয়, এর মাধ্যমে পুরুষকে পর্দা করার কথা বলা হয়েছে। আর ওই নির্দেশ লঙ্ঘনকারীদের জন্য তো হজরত মোহাম্মদ (স.) কঠোর শাস্তির ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যদি কেহ অনুমতি ছাড়া অন্যের ঘরের ভেতরে তাকিয়ে দেখে, তাহলে তার চক্ষু উৎপাটিত করার অধিকার ঘরের অধিবাসীদের থাকবে’ (মুসলিম)। এছাড়া অপরিচিত লোকদের সুস্পষ্টভাবে আদেশ করা হয়েছে যে, যদি অন্যের গৃহ হতে কিছু চাওয়ার প্রয়োজন হয়; তবে গৃহে প্রবেশ না করে বাইরে পর্দার অন্তরাল থেকে চাইতে হবে। এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো যে, পুরুষরা যদি উল্লিখিত নিদের্শগুলো যথাযথভাবে পালন করে তাহলে অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক বিড়ম্বনা থেকে নারী রক্ষা পাবে।

পুরুষের জন্য বিধান হচ্ছে, তারা নিভৃতে কোনও নারীর সঙ্গে আলাপ করবে না এবং শরীর স্পর্শ করতে পারবে না (নিজ স্ত্রীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়), সে যতই নিকটতম বন্ধু বা আত্মীয়ই হোক না কেন। উকবা বিন-আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, মোহাম্মাদ (স.) বলেছেন, ‘সাবধান নিভৃতে নারীদের নিকটে যেও না’ (বুখারি, মুসলিম, তিরমিযি)।

অন্য এক হাদিসে হজরত মোহাম্মদ (স.) বলেছেন,  ‘স্বামীর অনুপস্থিতিতে কোনও নারীর নিকটে যেও না। কারণ শয়তান তোমাদের যে কোনও একজনের মধ্যে রক্তের ন্যায় প্রবাহিত হবে’। (তিরমিযি)

এছাড়া পর নারীকে স্পর্শ করলে পরকালে তার জন্য কঠিন শাস্তির বিধানের কথা উল্লেখ করে হজরত মোহাম্মদ (স.) বলেন, ‘যদি কেহ এমন কোনও নারীর হস্ত স্পর্শ করে, যার সঙ্গে তার কোনও বৈধ সম্পর্ক নেই, তা হলে পরকালে তার হাতের ওপর জ্বলন্ত আগুন রাখা হবে।’ ওই হাদিসের মাধ্যমে পুরুষকে অন্য নারীকে স্পর্শ না করার জন্য কঠোরভাবে সর্তক করে দেওয়া হয়েছে।

আল কুরআনে আরও বলা হয়েছে, ‘(হে নবি!) মুমিন পুরুষদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনমিত রাখে এবং পবিত্রতা রক্ষা করে চলে। এটাই তাদের জন্য পবিত্রতম পন্থা। নিশ্চয়ই তারা যাহা কিছুই করে, আল্লাহ তৎ সম্পর্কে পরিজ্ঞাত।’ (সুরা নুর: ৩০)

এই আয়াতের মাধ্যমে পুরুষদের দৃষ্টি সংযত রাখার আদেশ করেছেন। এটা নারীর ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। আর পুরুষ যদি তার দৃষ্টি সংযত রাখে তা হলে নারী ‘তেঁতুল’ না ‘মরিচ’ সেই বিষয়টি অনুভব করার সুযোগ একেবারেই নেই। অপরিচিত নারীর রূপে ও  সৌন্দার্য-শোভা দর্শন করে আনন্দ উপভোগ করা পুরুষের জন্য অনাচার সৃষ্টিকারী। আর অনাচার বিপর্যয়ের সূচনা স্বাভাবিক ও প্রকৃতিগতভাবে দৃষ্টি বিনিময়ের মাধ্যমে হয়। এই জন্য সর্বপ্রথম এই পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে পথে-ঘাটে চলতে ফিরতে যদি কোনও নারীর ওপর হঠাৎ করে কোনও পুরুষের দৃষ্টি পড়ে; তবে ইসলামের বিধান হচ্ছে, তিনি তাৎক্ষণিক দৃষ্টি সংযত করবেন এবং দ্বিতীয় বার দৃষ্টি নিক্ষেপ করবেন না।  হজরত মোহাম্মদ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনও অপরিচিত নারীর প্রতি যৌন লোলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, কেয়ামতের দিন তার চোখে উত্তপ্ত গলিত লৌহ ঢেলে দেওয়া হবে’ (ফাতহুল কাদির)। বস্তুত, এভাবে যদি এই পর্দার বিধানাবলি নারীর পাশাপাশি পুরুষও যথাযথভাবে পালন করে,  তবে সর্বত্র নারী নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবে। বলে রাখা ভালো যে, পর্দার বিধান কিছু ক্ষেত্রে শিথিল করা হয়েছে। যেমন—ডাক্তার রোগীকে দেখার স্বার্থে তার মুখ মণ্ডল শুধু নয়, প্রয়োজনে হলে সতরও দেখতে পারবে। এছাড়া বিয়ে করার সময়, বৃদ্ধ, রুগ্ন ব্যক্তি ও বালকের জন্য পর্দা সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলে অনেকে মত প্রকাশ করেন।

পরিশেষে, পুরুষের ওপর অর্পিত শরিয়তের পর্দার বিধানাবলি যদি পুরুষ যথাযথভাবে মেনে চলে, তা হলে নারীকে পর্দা প্রথার নামে ঘরে বন্দি করে রাখার প্রয়োজন হবে না। আর যদি এমনটি সম্ভব হয় তবে সমাজে অনাচার ব্যভিচার বিশেষ করে ধর্ষণ একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ ধর্মের বিধান অনুসারে পুরুষের পথ-ঘাট এবং কর্মক্ষেত্রে দৃষ্টি সংযত রেখে চলাফেরা করবে। নিভৃতে থাকা কোনও নারীর কাছে পুরুষরা যাবে না। অপরিচিত কোনও নারী থেকে দূরে থাকবে। তাই পুরুষ ওয়াজকারীদের কাছে অনুরোধ থাকবে, দয়া করে নারীদের পর্দার ওয়াজ করার চেয়ে স্বজাতি পুরুষের পর্দার বিধান কী কী আছে, সেই বিষয়ে বেশি করে ওয়াজ করেন। কারণ ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত পুরুষ। তাই পুরুষকে যদি তার ওপর আরোপিত ধর্মীয় বিধানাবলি সম্পর্কে জানানো যায়, তবে ধর্ষণ শূন্যের কোটায় নেমে আসবে। অন্যথায় সারাদিন নারীকে পর্দার ছবক দিয়েও ধর্ষণ বন্ধ করা যাবে না।

প্রকৃতপক্ষে, পুরুষ যদি শরিয়ত মেনে পর্দা পালন করে, তবে সর্বদা নারী থাকবে নিরাপদ। ফলে নারীদের জন্য আর ‘তেঁতুল তত্ত্বের’ প্রয়োজন হবে না।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ