আমার দেখার গল্প হলো শুরু

Send
নবনীতা চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৯:০০, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৫১, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৯

নবনীতা চৌধুরীঅনেক দিন পর ঢাকার বাইরে গেলাম। সে ঠিক ১৭ বছর পর। মানুষের সঙ্গে মিশতে, মিলতে, তাদের সুখ-দুঃখ সাফল্য আর প্রতিকূলতার খবর বের করে আনতে যেমন যেতাম একুশে টেলিভিশন থেকে, তেমন করে যাওয়া হয়নি এই এত বছর। ওই সময় মাসে ১৫ থেকে ২০ দিনই ঘুরে বেড়াতাম দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। ২০০০ থেকে ২০০২-এর মাঝামাঝি পর্যন্ত যে সময়ের কথা বলছি, সে সময়ে বিদ্যুৎ নেই অনেক উপজেলায়, মোবাইল নেটওয়ার্ক তো পৌঁছেইনি, তবু অ্যান্টেনা বসিয়ে নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করে ফোনের দোকান থেকে দেশে-বিদেশে ফোন করার সহজ ব্যবস্থা—মিনিটে ৬ টাকা ৯০ পয়সা কলরেট ছিল তখন। কিন্তু মিনিটে ৬ টাকা ৯০ পয়সার ফোনকল তো সোজা কথা নয়, শহরে আমরাই তাই তখন মিসড কল দিয়ে কুশল জানাচ্ছি। আর এখন মোবাইল ফোনের গ্রাহক প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি, ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন প্রায় দশ কোটি মানুষ, বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে ৯৪ শতাংশ মানুষের কাছে। এসব সংখ্যা পড়ি, কিন্তু বিশ্বাস হতে চায় না। কেমন হয় তেমন গ্রামের মানুষ, যারা খেয়ে পরে বাচ্চা স্কুলে পাঠিয়ে আবার মোবাইল ফোন কেনেন, টাকা খরচ করে আরেকজনের সুখ দুঃখের খবর নেন, আবার নেট চালিয়ে গান শোনেন?

টেলিভিশন স্টুডিওতে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা ধরে বলার কাজ ছেড়ে তাই দেশ দেখতে বের হলাম আবার—বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক-এ যোগ দিয়ে। বারবার শুধু প্রায় ২০ বছর আগের বাংলাদেশের কথাই মনে পড়ে। ওই সময়ে অনেক জেলা শহরের মানুষ যেমন টিভি ক্যামেরা দেখেননি, তেমনি দেখেননি নারী সাংবাদিকও, (নারী পুলিশ, নারী আর্মি, নারী জেলা প্রশাসক, ইউএনও-ই বা কোথায় দেখেছেন তখন!) কাজেই, ঢাকা থেকে বড় শহরে রওনা হওয়া বাসে, ট্রেনে, লঞ্চে যেমন সবাই ধরেই নিতেন আমি ব্র্যাকের আপা, তেমনি বড় শহর থেকে যখন মুড়ির টিন বাসে, ভ্যানে, নৌকায় কিংবা মাইলের পর মাইল হেটে পৌঁছতাম কোনও চরে, কিংবা গহিন গ্রামে, তখনও পথে এবং প্রথম উপস্থিতিতে আমাকে ব্র্যাকের আপাই ধরে নেওয়া হতো। এবার বাংলাদেশ দেখতে বের হলাম সব সত্যতা আর অধিকারে ব্র্যাকের আপা হয়েই।

গেলাম রংপুরে। দেড় দশকের বেশি সময় আগের সেই বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক স্কুল সর্বত্র পৌঁছাতে পারেনি, সরকারি-বেসরকারি সকল উদ্যোগ তখন সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করায়। শ্রমজীবী শিশু, বয়স্ক শিক্ষায় আলাদা নজর দিতে হচ্ছে, মেয়েশিশুরা সবাই স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগই পাচ্ছে না। ওই সময় ব্র্যাক সারাদেশে হাজার হাজার বেড়ার ঘরের স্কুল পরিচালনা শুরু করে। এখন বাংলাদেশে যাতায়াত অগম্যতা আর দূরত্বের কারণে সরকারি প্রাথমিক স্কুলের সুবিধা পায় না এমন গ্রাম পাওয়া মুশকিল। ব্র্যাক বরাবর যে সেবা পৌঁছে দিতে পারে, সে কাজ থেকে সরে এসে তার বাড়তি সেবাটুকু দেওয়ার নীতি মেনে কাজ করায় বদলে যেতে শুরু করেছে ব্র্যাক স্কুলের আকার-প্রকৃতিও। দেখি ব্র্যাকের জমিতে এমন স্কুল, যে স্কুলের ছেলেমেয়েরা ইউনিফর্ম পরে আসে, প্রতিদিন সকালে জাতীয় সংগীত গেয়ে, ছেলেমেয়ে কাউকে আলাদা করে না দেখার প্রতিজ্ঞা দিয়ে দিন শুরু করে। দাতা সংস্থার বদান্যতানির্ভর উন্নয়ন কাজ থেকে বেরিয়ে নিজের ব্যবসার মুনাফার অর্থ আর সমাজের নিজস্ব সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে যেহেতু ব্র্যাক হাঁটছে, কাজেই এখন সমাজের সক্ষমতার বিচারে এসব স্কুলের বেতন ২০০ টাকা। ছেলেমেয়েদের হাসিমুখ দেখতে বা শিক্ষকদের সঙ্গে ভয়ের সম্পর্কের বাইরে বন্ধুত্বের সম্পর্কের আবহ টের পেতে কোনও প্রশ্ন করতে হয় না আমাদের। দেখি, ঢাকার যেকোনও কিন্ডার গার্টেন স্কুলের মতোই ১৫ -২০ জন মা মাঠে দাঁড়িয়ে আছেন নার্সারি থেকে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত শিশুদের এই স্কুলে। তাদের সঙ্গে কথা বলতে যাই, জিজ্ঞেস করি, নিজেদের পাড়াতেই তো স্কুল, তবু সঙ্গে এসেছেন যে? কোনও মা বলেন, ঠিক কাছে নয়, ৫ টাকা অটো ভাড়া দিয়ে স্কুলে আসেন, কেউ বা গাড়ি চলার রাস্তা পার হয়ে এই স্কুলে বাচ্চাটা একা একা আসবে সে উদ্বেগ কাটাতে না পেরে আসেন, কিন্তু, পাড়ার স্কুলের চেয়ে এই স্কুলটায় তত্ত্বাবধান ভালো, তাই এই আনা-নেওয়া। আর ক’জন বলেন, শিশুশ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে সন্তান, ক্লাসে এখনও প্রায়ই মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য কান্না জুড়ে দেয়। কাজেই তিনি স্কুলে থেকে যান। এই স্কুলের সব বাচ্চা টিফিন আনে। ১২টার দিকে তারা একবার পেট ভরে ভাত বা রুটি খেয়ে না নিলে পড়ায় একদম মন দিতে পারে না । তেমনই জানালেন এই মায়েরাই।

আমি বুঝি, সন্তানের শিক্ষার মান নিয়ে চিন্তায়, তার ভরা পেট আর মুখের হাসি নিশ্চিত করতে এবং শিশুসুলভ আহ্লাদে সাড়া দেওয়ার সচ্ছলতায় সক্ষম মধ্যবিত্ত সংখ্যায় বাড়ছে, ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের ভাবনার অতীত তৃণমূলে। গল্পে গল্পে জানি এই মায়েদের সবাই অন্তত ফাইভ পাস, সর্বোচ্চ শিক্ষিত জন পড়েছেন ক্লাস নাইন পর্যন্ত। আমি হঠাৎ শিহরিত হয়ে ভাবি, ২০ বছর আগেও যে জাতিকে শুধু সাক্ষর করাতে সংগ্রাম চলেছে, সে জাতির দ্বিতীয় প্রজন্ম এখন শিক্ষিত হতে শুরু করেছে। ২০ বছর আগের মায়েদের চেহারার সঙ্গে তাই আমি এই মায়েদের মেলাতে পারি না। আর, স্বাস্থ্যে –আত্মবিশ্বাসে এই মায়েদের চেয়েও উজ্জ্বল তাদের শিশুরা।

আরেক গ্রামে যাই। দেখি ২০০ টাকা দিয়ে সপ্তাহে ৬ দিন তিন ঘণ্টার প্রাক প্রাথমিক স্কুলে ছেলেমেয়েদের দিয়েছেন বাবা-মা। ছেলেমেয়েরা শিক্ষকের সঙ্গে নেচে-গেয়ে-আনন্দে লুটিয়ে পড়ছে, আবার তিনি যখন ওদের হাতের সামনের কাঠিগুলো দিয়ে কোনও সংখ্যা গুনতে বলছেন, বা স্লেটে লিখতে বলছেন কোনও অক্ষর, সবাই সবচেয়ে আগে তা করে জানান দিতে ব্যস্ত! কী যে আনন্দ সেসব আনন্দ নিকেতনে! আবার এই ৪-৫ বছরের শিশুরাই হাতের ময়লা ডাস্টবিনে ফেলছে, নিজের জিনিস গুছিয়ে রাখছে, এক ঘরের ক্লাসরুমের এক কোণায় তৈরি লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখছে, আর তারাও শিখছে ছেলে-মেয়ে বা প্রতিবন্ধী বলে কাউকে আলাদা করে দেখা যাবে না। গ্রামের ওই বেড়ার ঘরের আনন্দ নিকেতনের বাইরে দেখি আবার বালু মাটি পানি ঘাঁটাঘাঁটির ব্যবস্থা, গাছের সঙ্গে দড়ি আর টায়ার বেঁধে দোলনা আর দেশি প্লাস্টিক কোম্পানির তৈরি (এসবই বা কোথায় তৈরি হতো এই দেশে ২০ বছর আগে) স্লিপার দিয়ে প্রস্তুত শিশুদের হুটোপাটির জায়গা।

ভাবি, যে শিশুরা এমন শিক্ষা আর আত্মবিশ্বাসের স্বাদ পায় তাদের ৪-৫ বছরেই, তাদের মেধা আর মনন বিকাশের অসীম সম্ভাবনা বোধহয় আমরা সেকেলে মানুষ বুঝেও উঠতে পারছি না। ক’দিন আগে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ শিক্ষা বিকাশে অত্যন্ত সম্মানজনক আন্তর্জাতিক পুরস্কার ‘ইদান’ পাওয়ার পর জানলাম, ব্র্যাক আবিষ্কৃত এই প্লে ল্যাব মডেল এখন উগান্ডা, তানজানিয়া বা বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবিরসহ নানা জায়গায় অনুসৃত হচ্ছে। আর এই মডেলকে আরও মানবিক ও প্রত্যুতপন্নমতি মানুষ তৈরিতে একে বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত কার্যকর বলে ভাবা হচ্ছে।

কিন্তু ভাবছিলাম, আমাদের সরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলোয় অর্থাৎ মূলধারার স্কুলগুলোয় তো বাচ্চারা এই সুযোগ পাচ্ছে না, যে বাবা-মায়ের ২০০ টাকা দেওয়ার ক্ষমতা নেই, তার কী হবে? আরও গ্রামে ঢুকলাম, সম্বলহীন নারীদের ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের ঋণগ্রহীতা মায়েদের জিজ্ঞেস করি, ছেলেমেয়ে স্কুলে যায়? সবাই বেশ অবাক কণ্ঠেই উত্তর দেন—হ্যাঁ! যেন এমন প্রশ্নের কীই বা অর্থ থাকতে পারে! আমিও বুঝি কথা ঠিক। এখন তো দেশের ৯৬ শতাংশ ছেলে আর ৯৮ শতাংশ মেয়েই স্কুলে যাচ্ছে। এই গ্রাম থেকে ঢিল দূরত্বেই আছে বড়সড় সরকারি প্রাথমিক স্কুল, সেখানে যায় তাদের শিশুরা। আমি জানতে চাই, কার বাচ্চা কোন ক্লাসে পড়ে, দুই মা আমাকে বিস্মিত করে জানান, ৫ বছর বয়সী তাদের ছেলেমেয়ে যায় শিশুশ্রেণিতে। তৃপ্তির হাসি হেসে, এক এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে স্বামীর দোকানে মজুত তোলেন। আরেকজন এনজিও থেকে সেলাই শিখে বাড়ি বসে টেইলরের কাজ করে একরকম দিন এনে দিন খাওয়া মা জানান, সরকারি স্কুলে অনেক খেলনা এনেছেন ওই ক্লাসের জন্য, বাচ্চাদের শিশুশ্রেণিতে বেশি খেলায় আর অল্প পড়ায় গ্রামের ওই প্রাথমিক স্কুলে!

আমি বিস্ময় লুকাতে না পেরে গাড়িতে উঠেই গুগলে চাপ দিয়ে দেখি, সারাদেশের ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক স্কুলের মধ্যে সাড়ে ৩৭ হাজারের বেশি স্কুলে আলাদা শিক্ষক নিয়োগ করে প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছে আর আরও ২৬ হাজারের বেশি স্কুলে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। শুধু আনন্দময় প্রাক প্রাথমিক স্কুল তৈরিতেই কাজ চলছে না, সব প্রাথমিক স্কুলে সংগীত ও শরীরচর্চার আলাদা শিক্ষক নিয়োগেও কাজ চলছে। আমার হঠাৎ কেমন যেন নির্ভার লাগে, মনে হয়, আমাদের দ্বিতীয় শিক্ষিত প্রজন্ম এখন বিদ্যালয়ে, তারা আমাদের চেয়েও ভালো মানে আর আনন্দে পড়ছে, আমি ঘরের মা এবং দেশ মা- দুই মায়েরই সাধ আর সাধ্য বহুগুণ বাড়ার প্রমাণ পাই।

এখন থেকে যা দেখছি, যেখানে দেখছি, চোখে দেখি আর পড়ে দেখি, দেশে দেখি আর বিদেশে, নিয়মিত লিখবো বলে ভাবছি। নিয়মিত আপনাদের সামনে বলার সুযোগ মিস করছি, শুধু তা-ই নয়, দুই দশক বাদে গ্রাম দেখে এও বোধ করেছি যে, মেঘে মেঘে দেখা জানা-শোনার বেলাও কম হলো না। তবে জানেন, এই যে মেয়েরা এত ঋণ পেলো, কাজে যুক্ত হলো, সন্তানের ভালো খাবার আর শিক্ষা নিশ্চিত করতে সচেতন হলো, কিন্তু যেখানে যেই গ্রামেই নারীর সঙ্গে কথা বলেছি, ঘরে তার মায়ের খাওয়া বন্ধ হয়েছে, কিংবা মেয়েটাকে ১৮ বছরের আগে বিয়ে দেবেন না কিংবা ছেলেকে ২১ বিয়ে দেবেন, এমনটা নিশ্চিত করে কিন্তু বলতে পারেননি কেউ। কেউ হেসে, কেউ করুণ মুখে বলেছেন, পুরুষের কেন এত মেজাজ খারাপ থাকে আর কেনই বা সংসারের খরচের ভার বা ভাগ নারী নেওয়ার পরেও তার সিদ্ধান্তের মূল্য হলো না তা নিয়ে নাকি আমাদের কাজ করা দরকার। কেউ কেউ বলেছেন আরও দামি কথা। বলেছেন, নারী নির্যাতন বা বাল্যবিবাহ বন্ধসহ সব প্রয়োজনীয় কথা আপনারা সেই নারীদেরই তো এসে বলেন, এবার পুরুষদের জানান। আমি ভাবি, ভাবনায় আর অভিজ্ঞতায় আমার সঙ্গে তাহলে ২০ বছর আগের নারী বা আজকের নারীরও অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত যোগ্যতার বিস্তর ফারাকের পরও কোনও কোনও বিষয়ে ঐক্য ঠিক একই জায়গায় রয়ে গেছে।

এ নিয়ে কথা বলবো আরেক দিন। ব্র্যাকে এই আমার কাজের জায়গাও বটে। মাঠে কাজ শেষে ফিরে দেখা হলো স্যার ফজলে হাসান আবেদের সঙ্গে। আমার দেখাশোনার উচ্ছ্বাস নিয়ে বলতে বলতে বললাম, কই মেয়েরা এত সংখ্যায় স্কুলে এলো, এত ঋণ পেলো, তাদের মার খাওয়া বন্ধ হলো না কেন? কেন নিরাপদ সম্মানজনক জীবনের কপাল হলো না? পুরুষ তাকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করেই রাখলো কেন? ৪৭ বছর ধরে তৃণমূলকে বদলে যেতে দেখা, বদলানোর উপায় বাতলে দেওয়া ৮৩ বছরের তরুণ, ব্র্যাকের লক্ষাধিক কর্মীর ‘আবেদ ভাই’’ বললেন, ব্র্যাকের প্লে ল্যাব মডেলের মতো খেলতে খেলতে আনন্দের মধ্য দিয়ে মানবিক ও মানসম্মত শিক্ষা পেয়ে যে নতুন প্রজন্ম তৈরি হবে, ২০ বছর পর তারাই নাকি বদলে দেবে দেশ। কী জানি, আবেদ ভাই হয়তো দেখবেন না, কিন্তু আমরা তো দেখবো সেই বাংলাদেশ! তবে, ভাববেন না যে ভুলতে বসেছি, ইউনিসেফের হিসাব বলছে, প্রাথমিকে ভর্তির হার ৯৮ শতাংশ হলেও স্কুলে যাওয়ার উপযুক্ত প্রায় ৬২ লাখ শিশু এখনও এই দেশেই শিক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। আর তাদের মধ্যে ৪৬ লাখ শিশুই প্রাথমিক স্কুলে যাওয়ার বয়সী।

পাঠকদের মধ্যে অনেকে নিশ্চয়ই আমাকে গাল দিচ্ছেন এই ভেবে যে, ভিসিদের কাণ্ড কিংবা ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি রেখে এসব কী আশাবাদের গল্প শোনাতে এসেছি। শুনুন, আজকাল আমরা প্রায়ই রব তুলি যে, সমাজ-সংসার সব বোধহয় এই এখনই রসাতলে যাচ্ছে। সাড়ে তিন দশক আগে আমি প্রাক প্রাথমিকে পড়তাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর এক নামকরা স্কুলে। সেই স্কুলে আমাদের প্রায়ই বাইরের গোলাগুলি থেকে নিরাপদ থাকতে বেঞ্চের নিচে মাথা লুকিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে হতো। আর আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, তখন দেখেছি, ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন আর প্রশাসনের উৎসাহে কীভাবে মেয়েদের হলে মাঝরাতে পুরুষ পুলিশ ঢুকে যাচ্ছেতাই গালাগাল করছে, বাথরুমে ঢুকে পর্যন্ত মেয়েদের মারছে! কোথায় ছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, কোথায় ভিসি! দেখাশোনার এই মাঝ বয়সে এসে তাই বুঝি—এই দেশে কোনও ঘটনাই প্রথম বা অশ্রুতপূর্ব নয়, কোনও কিছুই ভবিষ্যতেও সবচেয়ে বিস্ময়কর থাকবে না। তবে, এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান দিয়েই দেশ-বিদেশে পড়া আর চাকরি করার অভিজ্ঞতা থেকে জানি, পৃথিবীর আর কোনও বিশ্ববিদ্যালয় সব রাজনৈতিক সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়াকেই তার প্রধান যোগ্যতা হিসেবে প্রচার করে না। আমাদের ভূখণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টিই হয়েছিল অনেক প্রতিরোধের মধ্যেও, একটি বিশেষ জাতিগোষ্ঠীর উচ্চশিক্ষা এবং নিজস্ব আত্মপরিচয় সৃষ্টির মহান দায়িত্ব নিয়ে। সেই উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। রাজনীতির মহান দায়িত্ব পালন শেষে, লুটপাটতন্ত্রও ঢুকেছে এসব প্রতিষ্ঠানে রাজনীতির চেহারা বদলের সঙ্গে সঙ্গে। এতেই সব ভেঙে পড়লে চলবে? আমার মনে হয় সাক্ষরতায় সাফল্য আসার পর যেমন আমরা প্রাথমিক শিক্ষার মানের দিকে নজর দিচ্ছি, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও এখন রাজনৈতিক গর্বগাথা বলা ছেড়ে তার শিক্ষা-গবেষণার মানের প্রতিযোগিতায় নামতে হবে।

সে কাজ সহজ? একদম নয়। যেমন আমি মনে করি, বাড়িতে কত টাকা বেতনের চাকরি করে কত টাকার জীবন যাপিত হচ্ছে, সে হিসাব না করে শুধু ক্যাসিনো ধরে হারামের দুনিয়া ধ্বংস করা যাবে না। যেমন আমি বিশ্বাস করি, যে দেশে নারী শুধু নারী বলেই অনিরাপদ থাকবেন, সে দেশে গরিব শুধু গরিব বলেই মার খাবেন। সেসব ভাবনার গল্পও করবো ধীরে ধীরে। আসলে সামনে ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার’ এখনও বাকি। তবে, ‘লঙ্ঘিতে হবে, রাত্রি নিশীথে, যাত্রীরা হুঁশিয়ার’।

এখন থেকে লিখবো নিয়মিত—আমার দেখার গল্প।

লেখক: পরিচালক, ব্র্যাক

/এসএএস/এমএনএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ