কত টাকায় পাহাড় কেনা যায়?

Send
সারওয়ার-উল-ইসলাম
প্রকাশিত : ১৫:৩২, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৯, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৯

সারওয়ার-উল-ইসলামকত টাকা হলে টাকাওয়ালা হওয়া যায়?
কত টাকায় সুখ কেনা যায়?
কত টাকা হয়ে গেলে আর টাকার প্রয়োজন পড়ে না?
টাকা কামাতে কামাতে কখন কাহিল হয়ে সিদ্ধান্ত নেয় আর টাকা লাগবে না?
ঘুষ খেতে খেতে কত বড় টাকার পাহাড় হলে আর ঘুষ খাবে না সিদ্ধান্ত নেয়?

সম্প্রতি কিছু ঘটনা প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে কিছুতেই যুৎসই প্রশ্নটা সাজাতে পারছি না। টাকা টাকা করে মানুষ কীভাবে অমানুষে পরিণত হয়। কিন্তু টাকা জমানোর শেষ কোথায়? সেই শেষ হওয়ার পর টাকা জমানোর পরিমাণটাই বা কত?

আমার মতো ছাপোষা মানুষের পক্ষে এ ধরনের ভাবনাটাও অনেকের কাছে আদিখ্যেতা মনে হতে পারে। মনে হতে পারে আদার ব্যাপারি জাহাজের খবরের পেছনে ছোটার দরকারটা কী?

সম্প্রতি বস্তায় করে টাকা কামানোর বিষয়ে নানা ধরনের খবর বাতাসে চাউর আছে। সেই থেকে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে বিষয়টা।

একজন পোশাকশ্রমিক সকাল ৭টার সময় আগের দিনের রান্না করা ভাত খেয়ে চাকরিতে ছোটে। ছোট টিফিন বক্সে একটু ভাত, আলুভর্তা, বাসি ডাল, কাঁচামরিচ নিয়ে যায়, দুপুরে খাবে বলে। সারাদিন কাজ করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরে। বাড়ি ফিরে আবার রান্নাবান্না, খাওয়া-দাওয়া শেষে ঘুম। সকালে উঠতে হবে। যেতে হবে কারখানায়। এভাবে প্রতিটা ভোর আসে তার জীবনে নতুন করে বাঁচার জন্য। আবার কেউ কেউ সন্ধ্যার পর দিনের রুটিন কাজ শেষে বাড়তি দু’তিন ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজ করে বাড়তি কিছু পয়সা আয়ের জন্য।

একজন অফিসের কর্মচারীও সকালে ছোটে তার কর্মস্থলে। সেও টিফিন বক্সে খাবার নিয়ে যায় দুপুরে জন্য। বাইরে খেতে একশ’ থেকে দেড়শ’ টাকা চলে যাবে। তাই বাড়ির সামান্য ভাত, ভাজি বা ভর্তাই পরম শান্তি তার কাছে। মাস শেষে বেতনের দিন তার চোখেমুখে স্বপ্নেরা বাসা বাঁধে। বছর শেষে এক হাজার দুই হাজার টাকা ইনক্রিমেন্ট যোগ হবে বেতনের সঙ্গে। ছেলে বা মেয়েটাকে একটা মাস্টারের কাছে পড়াতে হবে। ওপরের ক্লাসে উঠেছে তারা, একজন মাস্টার লাগেই। যদিও মেয়ে বা ছেলেটা মুখ ফুটে কিছু বলে না। তবে বাবা হিসেবে এটা বুঝতে পারে। বেতন পেয়ে রাতে শান্তিতে ঘুম দেয়। পর দিন সকালে আবার অফিসপথে পা বাড়ায়।

আবার হাউজিং বা ভূমি অফিসসহ সরকারি অফিস ও মন্ত্রণালয়ে চাকরি করা একজন কর্মকর্তা সকালে বের হন নিজের গাড়িতে। আজ কত টাকা কামানো যাবে, ড্রাইভারের পেছনের সিটে বসে সেই চিন্তা করতে করতে অফিসের গেটে চলে আসেন। তারপর নানা ধরনের ফাইল আসে টেবিলে। স্তূপ হয়ে যায়। অফিস পিয়ন বা সিবিএ নেতা এসে চুপি চুপি মৃদুস্বরে বলবেন, প্রতি ফাইলে স্বাক্ষর বাবদ স্যার ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা নগদ পেয়ে যাবেন। পার্টির কাছ থেকে অগ্রিম নিয়ে নেব। আর যারা টাকা না দেবে, তাদের ফাইল আলাদা রেখে দেবো। এইটা নাই ওইটা নাই– বলে মাসের পর মাস ঘুরাবো। একদিন ঠিকই বিরক্ত হয়ে টাকা ছাড়তে বাধ্য হবে।

দিনশেষে ড্রয়ারে লাখখানেক টাকা জমা হয়ে যাবে। প্যাকেট করে হ্যান্ডব্যাগ ভরে বাসার দিকে রওনা হবেন কর্মকর্তা। গাড়িতে ভাববেন আগামী মাসে নতুন ফ্ল্যাটে উঠতে হবে। বর্তমানের ফ্ল্যাটটা একটু সেকেলে হয়ে গেছে, ভাড়া দিয়ে দেবো। তাছাড়া গাড়ির মডেলটাও বদলাতে হবে। কামাই রোজগার আরো বাড়াতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন কর্মকর্তার সকালটা হয় অনেকটা ওরকমভাবেই। ব্রেকফাস্টে থাকে নানা আয়োজন। খেতে খেতে ভাবেন, মেয়র সাহেব ঢাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। এটা সম্ভব না। এলাকার রাজনৈতিক নেতাদের চাপ আছে। তাদের রাজনীতি করতে হয়। টাকা লাগে দল চালাতে। কোত্থেকে আসে সেই টাকা? সুতরাং ফুটপাতে মানুষের সমস্যা যতই হোক, দোকান বসবেই। দোকান না থাকলে চাঁদা তোলা যাবে না। আর চাঁদা না উঠলে তাদেরও কপালে টাকা জুটবে না। দরকার কি গরিব মানুষকে ফুটপাত থেকে তুলে দিয়ে? কত টাকা দরকার। ছেলেটা নর্থ সাউথে পড়ছে, প্রতি সেমিস্টারে আশি-নব্বই হাজার টাকা লাগে। মেয়েটা ব্র্যাকে পড়ছে। ওর তো আরও বেশি টাকা লাগে। এলাকার সোর্সদের টাকা কামানোর নানা ফন্দিফিকির বের করার কথা বলতে হবে। মামলা মোকদ্দমায় জড়াতে হবে নিরীহ মানুষকে। তাহলেই খামে করে টাকা চলে আসবে। সাংবাদিকদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে হবে। বিপদ-আপদে অনেক কাজে লাগে।

একজন ক্যাডার ঘুম থেকে ওঠে বেলা ১১টা কিংবা ১২টায়। কারণ রাত জেগে তাকে অনেক কাজ করতে হয়। কত ঝগড়া-ফ্যাসাদ মেটাতে হয়। ওয়েল ফার্নিশড আলিশান বাড়িতে থাকে। গোসল সেরে নাশতা সেরে ধোঁয়া ওঠা কফির পেয়ালায় ঠোঁট দিয়ে ভাবতে থাকে নতুন কোনও চাঁদাবাজি বা টেন্ডার বাগানোর ধান্দা বের করতে হবে। প্রতিদিন চার-পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা তুলে থানা-পুলিশ-লিডারের পেছনে চলে যায় তিন-চার লাখ টাকা। নিজের থাকে ১ থেকে দেড় লাখ টাকা। বাহিনী চালাতে হয়। বিপদ আপদে কত জায়গায় টাকা ঢালতে হয়। দু’একটা বড় দান মারতে হবে। দুই-তিন কোটি টাকা এক থাবাতে কামাতেই হবে। অল্প টাকায় আর চলে না। প্রয়োজনে খুন টুন করে ফেলতে হবে। অপহরণও খারাপ না। বড় লোকের আদুরে দুলালকে অপহরণ করলেই কোটি টাকা চলে আসবে।

২.

পাঠক, এ পর্যন্তই থাক। এ রকম অনেক চরিত্র আছে আমাদের চারপাশে। আমরা শুধু দেখে যাই। ভয়ে চুপ থাকি। কারণ সোচ্চার হলে একটা গুলি বুকের সামনে দিয়ে ঢুকে পেছন দিক দিয়ে বের হয়ে যাবে। বিধবা হবে স্ত্রী, সন্তানরা পিতৃহারা।

এই হচ্ছি আমরা। আর আমাদের চাহিদা।

চাহিদার কোনও সীমা-পরিসীমা নেই। প্রতিমুহূর্তে চাহিদার ধরন বদলাচ্ছে। আছে দশ লাখ, চাই আরো দশ লাখ; আছে বিশ লাখ, চাই আরো বিশ লাখ; আছে চল্লিশ লাখ, চাই আরো পঞ্চাশ লাখ; আছে পঞ্চাশ লাখ, চাই আরো এক কোটি টাকা; আছে এক কোটি, চাই আরো পাঁচ কোটি টাকা…

আমাদের চাহিদার লক্ষ্যে পৌঁছতে কত মানুষের হাসি আনন্দকে চিরতরে শেষ করে দিচ্ছি। কত মানুষের স্বপ্নকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছি। কত মানুষের বুকে ছুরি ঠেকিয়ে দিচ্ছি। সমাজ আর রাষ্ট্রকে পিছিয়ে দিচ্ছি। দেশের অর্থনীতির চাকাকে অচল করে দিচ্ছি।

চাহিদা আর প্রাপ্তির সমন্বয় যখন খুব সহজ হয়ে যায়, তখন মানুষ ধরাকে সরা জ্ঞান করতে দ্বিধাবোধ করে না। তখন দেশ নিয়ে তার কোনও ভাবনা থাকে না। সমাজকে সে তার হাতের খেলার পুতুল মনে করে। প্রশাসন থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধিকে দোকানের ক্রয়সামগ্রী মনে করে। ইচ্ছে করলেই বস্তা ভর্তি টাকা পাঠিয়ে কেনা যায় প্রশাসনের বড় কর্তাকে। জনপ্রতিনিধির বাসায় টাকা পাঠিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ম্যানেজ করার অনুরোধ করা যায়। টাকা পাঠিয়ে দিয়ে এলাকার একশ’ তরুণকে পকেটে রাখা যায়। যারা নির্দেশ পাওয়া মাত্র এলাকার গার্মেন্টসের মালিককে হুমকি দিয়ে আসতে পারে চাঁদার জন্য।

সব প্রাপ্তির পেছনে যখন নিয়মনীতির বদলে টাকাটাই মুখ্য হয়ে যায়, তখন কি আর মানুষ মানুষ থাকে?

একজন যুবলীগ নেতার সাম্রাজ্য কখন ব্যাপ্তি লাভ করে? যখন সে যা চায় সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে যায়। পুলিশ প্রোটেকশন? টাকা ঢেলে পেয়ে যায়। প্রশাসনের সাপোর্ট? রাজনীতির মাঠের ডিসিশন মেকার? টাকা ঢেলে পেয়ে যায়। এলাকার জনপ্রতিনিধি? ওপর থেকে ফোন করিয়ে ঠান্ডা করে রাখা সম্ভব।

মিডিয়াকেও ঠান্ডা রাখা সম্ভব। যারা মিডিয়ায় এসেছে সততাকে জলাঞ্জলি দিয়ে টু-পাইস কামানোর জন্য, তাদের কেনা কোনও ব্যাপারই না। ঈদ, পূজা-পার্বণসহ বিশেষ বিশেষ দিনে খাম পাঠিয়ে দিলেই হয়। কাগজে বা টেলিভিশন স্ক্রিনে কোনও অপকর্মের খবর যাবে না। উল্টো সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সেই ক্যাডারের অংশগ্রহণের খবর কাগজে প্রকাশিত হবে। টেলিভিশনে ২০ সেকেন্ডের ফুটেজ প্রচারিত হবে।

সুতরাং টাকা দরকার। কীভাবে টাকাটা এলো? সেটা জরুরি না। টাকা লাগবে সাম্রাজ্য বানাতে।

লোকমুখে একটাই প্রশ্ন—সবকিছুতে কেন প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন? প্রশাসন কী করে? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কী করে? গোয়েন্দা সংস্থা কেন আগে হানা দিলো না ক্যাসিনোতে?

বিদ্যুতের চেয়ে বেশি গতিতে কাজ হয়ে যায় যেই মানুষটার কথায়, তার পক্ষে কি সারাদেশের কে কোথায় চুরি করছে, ক্যাডার পালছে, ক্যাসিনো বানিয়ে জুয়ার আসর বসাচ্ছে, এগুলো দেখা সম্ভব?

কত টাকা হলে আর টাকার প্রয়োজন পড়ে না? এ প্রশ্ন অবান্তর। যে গার্মেন্টকর্মী, যে ছোট কর্মচারী, যে স্কুল শিক্ষক সূর্য ওঠার পরপর ঘর থেকে বের হয়ে যায় জীবিকার জন্য, মাস শেষে নির্দিষ্ট অংকের বেতনের জন্য, তার মতো বোকা নেই আপাতদৃষ্টিতে।

যে ঘুষখোর কর্মকর্তা সকালবেলা বেরিয়ে ফাইলে একটা স্বাক্ষর করেন ১০-১৫ হাজার টাকা প্রাপ্তির জন্য, যেটা তার কাজ, আর এজন্য সরকার তাকে মাস শেষে বেতন দিচ্ছে, সে সমাজকে কতটা এগিয়ে নিচ্ছে না পিছিয়ে দিচ্ছে, সেটা ভাবা নিছক বোকামি।

এতক্ষণ যা বললাম সব মিথ্যে হোক। আমরা এসব অন্ধকারের পরিসমাপ্তি দেখতে চাই। বিশ্বাস করি আলো আসবেই, যে আলোর কথা বলেছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর বর্তমানে যে আলোর পথ দেখাচ্ছেন তারই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

লেখক: ছড়াকার ও সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ