রক্তচোষা ব্যবসায়ী ও গুজব রটনাকারী দুই-ই সমান অপরাধী

Send
স্বদেশ রায়
প্রকাশিত : ১৬:৩৯, নভেম্বর ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪২, নভেম্বর ২০, ২০১৯

স্বদেশ রায়সরকারের মুখপাত্র হিসেবে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ ১৯ নভেম্বর এক আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখার সময় জানিয়ে দিয়েছেন, পেঁয়াজের দাম বাড়ার সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পেঁয়াজের দাম কেন এভাবে বাড়লো, এর জন্য সরকারের কোন কোন পর্যায়ে দায়িত্বহীনতা ছিল, সেগুলো এখনই চিহ্নিত করার সময়। পাশাপাশি যে ব্যবসায়ীরা এদেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাসের একটি অন্যতম মসলা পেঁয়াজের দাম নিয়ে কারসাজি করে সাধারণ মানুষের রক্ত চুষে নিলো, তাদেরও চিহ্নিত করা ও শাস্তি দেওয়া ছাড়া কোনও বিকল্প নেই।
কোনও ব্যবসায়ী যদি মনে করে থাকেন এটা ১৯৭৩ বা ১৯৭৪ সাল, তাহলে তিনি ভুল করছেন। সরকারের ভেতরে বসেও কোনও মহল যদি এমনটি মনে করে, তারাও ভুল করছে। কারণ, এ মুহূর্তের পৃথিবী যেমন বদলে গেছে, তেমনি সরকারি ব্যবস্থা এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। তাই ১৯৭৩ বা ’৭৪-এ একটি মহলের সঙ্গে কারসাজি করে সরকারের ভেতরের ও এক শ্রেণির ব্যবসায়ীরা যেভাবে পার পেয়ে গিয়েছিল, এখন আর সেটা সম্ভব নয়। বরং জনগণ এখন সত্যি সত্যি দেখতে চায়, এ কাজে জড়িতদের সরকার কত দ্রুত কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে পারে।

অন্যদিকে যে বিষয়টি এখন সামনে এসেছে তা হলো চালের দাম বাড়ানোর জন্য মিডিয়ার একটি অংশ যে উসকানিমূলক নিউজ করছে, সেগুলোর বিষয়ে সজাগ হওয়া। আবার এর পাশাপাশি সোশ্যাল ফোরামে যারা গুজব ছড়াচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করা। ১৯ তারিখ একটি ইংরেজি দৈনিক এমনভাবে তাদের লিড নিউজ করেছে—পেঁয়াজের পরে এখন চালের দাম বাড়া শুরু হয়েছে। এবং দেশে চালের সংকট আছে। সাধারণ মানুষ চালের দামের ফলে কষ্ট পাচ্ছে। দেশের মানুষ সবাই জানে, মাত্র কিছুদিন আগে মিডিয়া সরব ছিল, কৃষকরা তাদের ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। বাস্তবে এক মণ ধানের দাম কমপক্ষে ৭শ’ টাকা না পেলে কৃষক একপর্যায়ে গিয়ে ধান চাষ ছেড়ে দেবেন। কারণ, প্রায় ৭শ’ টাকাই পড়ে যায় এক মণ ধান উৎপাদনের খরচ। দেশের মানুষ সবাই জানে, এই ধান চালের বাজার বাড়ানোর জন্য সরকার গত কয়েক মাস ধরে চাল রফতানির বাজার খুঁজছে। তাছাড়া সামনেই আমন সংগ্রহ শুরু হতে যাবে। এ সময়ে গুদাম খালি করার জন্য সরকারকে গুদামের চাল ধান বাজারে ছাড়তে হবে। নতুন ধান ও চাল গুদামে ঢুকাতে হবে। গুদাম খালি করার জন্য যেই গুদাম থেকে চাল বাজারে আসবে, সে সময়ে আবার চালের দাম ও ধানের দাম পড়ে যাবে। এ অবস্থায় কৃষককে ধান ও চালের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাটি বেশ জটিল হয়ে পড়েছে। সে কারণে বাজারের অন্য পণ্যের সঙ্গে মিল রেখে চালের দাম যদি কিছু বাড়ে এবং সেটা যদি আমন ওঠা অবধি কন্টিনিউ করে, তাহলে আমন ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কৃষক দাম পাবে। পাশাপাশি আমন ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যাতে কৃষক দাম পায় সে বিষয়টি এখনই সরকারকে ভাবতে হবে। কারণ, এমনিতে সরকার কম দামে বাজারে প্রচুর চাল দিচ্ছে। সরকার ৫০ লাখ মানুষকে বছরের পাঁচ মাস ১০ টাকা কেজিদরে প্রতিমাসে ২৭ কেজি চাল দিয়ে আসছিল। এখন আবার সেটা পাঁচ মাস থেকে বাড়িয়ে সাত মাস করেছে। অর্থাৎ এই বিপুল পরিমাণ চাল মানুষ পাচ্ছে দশ টাকা কেজিদরে। এ অবস্থায় কৃষকের চালে বা ধানের উৎপাদন খরচের থেকে বেশি অর্থাৎ লাভজনক দাম দেওয়া বেশ কষ্টকর। আবার মূল খাদ্য চাল উৎপাদন যদি কৃষক ছেড়ে দেয়, তাহলে দেশ ও মানুষ বিপাকে পড়বে। তাই চালের দাম নিয়ে সরকার ও দেশের মানুষকে বেশ সচেতন পথে এগোতে হবে। এমন একটি সময়ে মিডিয়ার কোনও অংশ যদি শুধু সরকারবিরোধিতার জন্য চালের দাম নিয়ে এ ধরনের উসকানিমূলক রিপোর্ট করে, তা শুধু দেশের জন্য ক্ষতিকর নয়, কৃষকের জন্য এমনকি চাল উৎপাদনের জন্যও ক্ষতিকর। কেন তারা এই ক্ষতিকর পথ বেছে নিয়েছে, সেটা খতিয়ে দেখা দরকার।

অন্যদিকে আর যে বিষয়টি ১৯ তারিখ সারাদিন দেখা গেলো, তা হলো লবণের দাম বাড়ানোর জন্য সোশ্যাল ফোরামে এক শ্রেণির মানুষ লবণের দাম বেড়েছে বলে গুজব ছড়িয়ে গেলো। বিশেষ করে দেশের সব থেকে বিস্তৃত সোশ্যাল ফোরাম ফেসবুকে তারা সারাদিন ধরে এ গুজব ছড়ালো। বিএনপি করে এমন শিক্ষিত পেশাজীবী’র ফেসবুকের স্ট্যাটাসেও এই গুজব দেখলাম সারাদিন। শুধু তাই নয়, তারা একটি বিশেষ কৌশল নিয়ে এই গুজব ছড়ালো। একজন একটি স্ট্যাটাস দেয় লবণের দাম বেড়েছে, তারপরে অন্য বিএনপি-জামায়াত সমর্থকরা তার কমেন্টে একজনের পর একজন যা লিখে যাচ্ছে তার সবই মিথ্যে। কেউ লিখছে একশ’ টাকা লবণের দাম, কেউ একটু পরে লিখছে দেড়শ’ টাকা, আবার একটু পরে কেউ লিখছে দুইশ’ টাকা। এর থেকে বোঝা যায়, তারা সংঘবদ্ধভাবে এ গুজব ছড়ানোর কাজে নেমেছিল। সরকার তাৎক্ষণিক সজাগ হওয়ার কারণে খুব বেশি ক্ষতি তারা করতে পারেনি।

ক্ষতি তারা করতে পারেনি ঠিকই। তবে তারা যা করেছে তা শুধু ষড়যন্ত্র নয়, দেশের সাধারণ মানুষের পকেট কেটে ব্যবসায়ীর ঘরে টাকা তুলে দেওয়ার একটি চেষ্টাও তারা করেছে। তাই এখানে তারা একসঙ্গে বেশ কিছু অপরাধ করেছে। আর এ অপরাধ করেছে তথ্যপ্রযুক্তিকে ব্যবহার করে। ইতোমধ্যে এ দেশে তথ্যপ্রযুক্তিকে খারাপ কাজে ব্যবহার করার কারণে যে কয়টি কেস হয়েছে, তার অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারকে সমালোচিত হতে হয়েছে, না হয় নানান ধরনের বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছে। কিন্তু এবার যদি সরকার তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে লবণের দাম বাড়ানোর জন্য এই গুজব যারা ছড়িয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে সরকারকে সবাই সাধুবাদ দেবে। তাছাড়া ভবিষ্যতের বড় ধরনের নাশকতা ঠেকানোর জন্য অবিলম্বে এই শ্রেণির বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

আর যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, তাদের খুঁজে বের করা খুব কষ্টকর নয়। এজন্য সরকারকে শুধু গোয়েন্দা বিভাগের ওপর নির্ভর করার দরকার নেই। সরকার বা সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় শুধু কতকগুলো ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে বিজ্ঞাপন দিক যে, যারা ১৯ নভেম্বর গুজব ছড়িয়েছে, তাদের সেইসব গুজবের স্ট্যাটাস ও কমেন্টগুলোর স্ক্রিন শর্ট তুলে যেন সরকারের ওই অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। দেশপ্রেমিক বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী যেসব তরুণ তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে, সোশ্যাল ফোরাম নিয়ে কাজ করে, তারা সব খুঁজে খুঁজে সরকারের ওই অ্যাকাউন্টে পাঠাতে পারবে। আর ছোট-বড় ওইসব অপরাধীর বিরুদ্ধে যদি সরকার নির্মোহভাবে ব্যবস্থা নিতে পারে, তাহলে শুধু লবণের দাম বাড়ানোর চেষ্টাকারীদের শাস্তি দেওয়া হবে না—ভবিষ্যতে এ দেশে সোশ্যাল ফোরামে গুজব ছড়াতে ভয় পাবে ওই চক্র।

বাংলাদেশে এই গুজবের কারণে এ পর্যন্ত বহু প্রাণ গেছে। ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের ঘরবাড়ি ভেঙেছে অপর সম্প্রদায়। অনেক অঘটন ঘটেছে। তাই এবার মনে হয় সময় এসেছে ব্যাপকহারে একটা ব্যবস্থা নেওয়ার। 

লেখক: রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ