সাকসেস বনাম গ্রেটনেস

Send
রাশেক রহমান
প্রকাশিত : ১৩:০৩, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩৯, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৯

রাশেক রহমানবাংলাদেশে যখন পেট্রোল বোমার তাণ্ডব চলছিল তখন স্বাভাবিকভাবেই অনেক ব্যবসায়ী বন্ধু শঙ্কিত হয়ে বলতো— এই পেট্রোল বোমার নাশকতার শেষ কোথায়? সমঝোতা করলেই তো হয়ে যায়। তখন উত্তরে আমি বলতাম, অশুভ’র সঙ্গে সমঝোতার কোনও সুযোগ নেই, অন্যায়ের সঙ্গেও সমঝোতার কোনও সুযোগ নেই। কারণ, এই বিষয়ে এখানে অনেক প্রশ্ন চলে আসে স্বাভাবিকভাবেই।
তবে একটা বিশেষ প্রশ্ন জাগে মনে আলাদাভাবে। যারা অন্যায় ও অশুভ শক্তির সঙ্গে আপস করার কথা বলেন, একজন ব্যবসায়ী হিসেবে ওনারা আসলে কী হতে চান?
একজন সফল ব্যবসায়ী হতে চান? নাকি মহৎ ব্যবসায়ী হতে চান? ইংরেজিতে বলতে গেলে শব্দ দুটো আসে তিনি কি ‘সাকসেসফুল বিজনেসম্যান’ হতে চান নাকি ‘গ্রেট বিজনেসম্যান’হতে চান?
কেউ যদি সফল ব্যবসায়ী হতে চান তবে সেখানে জাতিসত্তার স্ফূরণ খুব একটা বড় বিষয় না। পণ্য উৎপাদন করবে, বিক্রি করবে, কর ফাঁকি দেবে, ভেজাল মিশ্রণ করবে, ফাঁকিবাজি করেও অনেকে সফল ব্যবসায়ী হয়ে যেতে পারেন। দামী গাড়ি, দামী বাড়ি সবই পেয়ে যেতে পারেন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে।

কিন্তু যে ব্যবসায় সৃজনী আছে, যে ব্যবসায় বাজার তৈরি ও বাজার নিয়ন্ত্রণের ব্যাপার রয়েছে, যে ব্যবসায় একটা দেশে আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিকে পরিবর্তন করার সম্পর্ক আছে, সেই ব্যবসা করতে গেলে একজন মহৎ ব্যবসায়ী হতে হয়।

পৃথিবীতে এমন অনেক ব্যবসায়ী আছেন। ফোর্ডের মালিক মিস্টার ফোর্ড, মাইক্রোসফটের মালিক বিল গেটস, অ্যাপলের মালিক স্টিভ জবসসহ আরও অনেকেই আছেন, যারা বর্তমানে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের কারণে, নিজেদের সৃজনী শক্তি দিয়ে মহৎ ব্যবসায়ী হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।

কিন্তু এটা তখনই সম্ভব যখন সেই মহৎ ব্যবসায়ীর দেশটিও হয়ে থাকে মহান। শুধুমাত্র একটি সফল দেশ নয় বরং একটি মহান দেশের কারণেও একজন সফল ব্যবসায়ী গড়ে উঠতে পারেন বিশ্বব্যাপী একজন ব্যবসায়িক আইকন হিসেবে।

লেখার এতটুকু পড়ে অনেকের মনে প্রশ্ন হতে পারে— এমন কথাগুলো কেন বলছি। বিজয় দিবসকে সামনে রেখে এই কথাগুলো বলছি এই কারণে যে, বাংলাদেশ এক সময় তলাবিহীন ঝুড়ির একটি দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। হেনরি কিসিঞ্জাররা এভাবেই বাংলাদেশকে মূল্যায়ন করতো। অথচ আজকের বাস্তবতা দেখুন।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান একটি মহান রাষ্ট্র গঠনের কথা চিন্তা করে বাঙালি জাতিকে এই অনিন্দ্য সুন্দর, অনন্য দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। ৩০ লাখ শহীদ, লাখো লাখো মা বোনের সম্ভ্রম ও অগণিত মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বের ফলে আমরা যে স্বাধীন দেশ পেয়েছি তা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই পেয়েছি। উনি যে মহান রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন সেটিকে হত্যা করা হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। ওনাকে হত্যা করার মাধ্যমে সেই রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নকেও হত্যা করা হয়েছিল।

বাংলাদেশের সেই স্বর্ণসন্তানেরা যারা এই দেশকে সৃজনশীলভাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন একটি মানবিক, জ্ঞাননির্ভর সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য, যার মধ্য দিয়ে আমাদের সত্যিকারের স্ফূরণ ঘটবে— তাদেরও গুরুত্ব ম্লান হয়ে গিয়েছিল অনেক ক্ষেত্রেই। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেই সময়ে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্টে’র মাধ্যমে হাজার হাজার সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাই শুধু নয়, দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরও ফাঁসি দিয়েছিলেন। তাদের চাকরিচ্যুত করেছিলেন এবং বিভিন্ন মেয়াদে জেল জরিমানা করার মতো অত্যাচারও করেছিলেন। আর এসবের মধ্য দিয়ে যে মহৎ বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন সবাই সেটি হারিয়ে ফেলেছিলাম। একইসঙ্গে হারিয়ে ফেলেছিলাম বাংলাদেশের মহৎ প্রকৃতিও।

২০১৯ সালের এই ১৬ ডিসেম্বরে দাঁড়িয়ে থেকে দ্যর্থহীন কণ্ঠে বলতে পারি— আমাদের অনেক কিছুই করার আছে, অর্জনেরও আমাদের অনেক কিছু বাকি আছে। কিন্তু যেটুকু অর্জন বা যে স্থানে আমরা আজ  দাঁড়িয়ে আছি বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে, সেই জায়গা থেকে আবার বিশ্বাস খুঁজে পাই।

 

যে মহান বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির জনক, সেই বাংলাদেশ এখন উঠছে বঙ্গবন্ধুর কন্যার নেতৃত্বে। এর কারণেই ব্যক্তিসত্তা বিবেচনায় মহৎ বাঙালি, মহৎ ব্যবসায়ী, মহৎ শিক্ষক, মহৎ সংগীতজ্ঞ, চিকিৎসক, মহৎ প্রকৌশলী তৈরি হবে এই বাংলাদেশেই। আমরা সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছি। অর্থাৎ এক কথায় আমরা বলতে পারি— দেশ যখন মহানতার দিকে এগিয়ে যায়, সেখানে সব পেশাতেও গড়ে ওঠে মহৎ মনের মানুষ।

আজ  দরকার সংহতি, আজ  দরকার আমাদের সুসংহত হওয়া। আর  হ্যাঁ,অবশ্যই ভুল ত্রুটি যা আছে সেটির জন্য যদি ভাবা হয় কাউকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিলেই সেটি সংশোধিত বা সমাধান হবে, তবে তা নিশ্চিতভাবে আরেক ভুল হবে। বরং আমরা সবাই মিলে চোখে আঙুল দিয়ে সেই ভুলত্রুটিগুলো যদি মোকাবিলা করি, তবে নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধু কন্যা ও আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবো।

আমরা সবাই নিরাপদ সড়ক চাই। কিন্তু সেটার জন্য যদি কেউ ভাবে সরকার পতন হলেও সড়ক নিরাপদ হয়ে যাবে, তবে সেটি ভুল। মাথা ব্যথার জন্য যেমন মাথা কেটে ফেলা বা মাথা পালটে ফেলা সমাধান— ঠিক তেমনি কোনও দাবি পূরণেও সরকারের পদত্যাগও সমাধান না।

আর তাই বিজয় দিবসে বিজয়ীর কণ্ঠস্বরের মতোই আমাদের জোর থাকতে হবে সমাজের সব অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, আপনার কোনও সঙ্গী নেই এই লড়াইয়ে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার বাবা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই বাংলাদেশে ঐক্য ও মুক্তির প্রতীক ছিলেন। ২০১৯ সালের আজকের এই বিজয় দিবসের ক্ষণে দাঁড়িয়ে থেকে বঙ্গবন্ধু কন্যা এই দেশের সার্বভৌমত্ব, সংহতি ও ঐক্যের প্রতীক হয়ে আছেন। সুতরাং, আমাদের বিশ্বাস হারালে চলবে না। বরং কণ্ঠস্বর উঁচু করে বিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। যার যার ব্যক্তিগত স্থান থেকে অবশ্যই প্রতিবাদ জানাতে হবে যেকোনও অনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে।

এভাবেই আমরা পারি সামনের দিনগুলোতে এগিয়ে যেতে। যেন গড়ে ওঠে এক মহান বাংলাদেশ। আর তখনই সম্ভব বাংলাদেশেও মহৎ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহৎ শ্রেণিপেশার মানুষ হয়ে ওঠা।

দেশ যখন মহান হয়ে ওঠে তখন তা বিশ্বের কাছে পায় সম্মান, আর সেই মহান দেশের নাগরিকদেরও সম্মান তখন বেড়ে যায়। আমেরিকা, জাপান, চীনসহ উন্নত বিশ্বের আরও কিছু দেশ আছে, যাদের সবাই বৃহৎ রাষ্ট্র হিসেবেই শুধু না বরং তাদের পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণেও চেনে। স্টিভ জবস বা বিল গেটস যদি যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ না করে এমন কোনও স্থানে জন্মগ্রহণ করতো, যেটি রাষ্ট্র হিসেবে ব্যর্থ তবে তাদের ব্যবসা ক্ষেত্র নিয়ে মহান হতে পারতেন কিনা, তা নিয়ে ভাবনার অবকাশ থেকে যায়।

কারণ, দেশ যখন বড় হয়ে যায় তখন বৃদ্ধি পায় ভোগের ক্ষেত্র, চাহিদার ক্ষেত্র এবং একই সঙ্গে অনুভবের ক্ষেত্রও। সেই ক্ষেত্রগুলো কিন্তু এখন বাংলাদেশে তৈরি হচ্ছে বর্তমানে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। এই ক্ষেত্রগুলো তৈরি না হলে যে যতই জানুক বা বুঝুক সে কখনও মহান বা মহৎ হতে পারবে না।

একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নয় বরং নির্মোহভাবে, সংগোপনে ও প্রকাশ্যে বর্তমানে যদি ১০০ জন লোককে প্রশ্ন করা হয় তবে ৮০ জন লোক নির্দ্বিধায় বলবে যে, তারা বিশ্বাস করে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ছাড়া আর কেউ বদলাতে পারবে না।

সেই জায়গায় বিজয় দিবসে আহ্বান বঙ্গবন্ধু কন্যাকে সেই ক্ষেত্রগুলো তৈরি করার সুযোগ দিন। আরও  সম্প্রসারিত হোক, বৃদ্ধি পাক এর ব্যাপ্তি, এই আশা নিয়ে তাকে আমরা কাজ করতে দেই। একইসঙ্গে তার নেতৃত্বে তার সঙ্গে আমরাও কাজ করে যাই।

বঙ্গবন্ধু কন্যা কখনোই বলেন না অন্যায়ের সামনে থেকে তোমরা চুপ করে থাকো, তিনি বলেন না প্রতিবাদের পরিবর্তে তোমরা মৌনতা ধারণ করো। তিনি বলেন, বুঝে, চোখ কান খুলে ও অনুভবের জায়গা শাণিত করে প্রতিবাদ করো। যে প্রতিবাদ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্বদানের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান করেছিলেন। ওনার ধারাবাহিক প্রতিবাদ ও আন্দোলনের মধ্য দিয়েই পরাজিত, পরাহত,লাঞ্ছিত ও পরাস্ত এই জাতি পেয়েছিল মুক্তি স্বাধীনতা।

মনে রাখতে হবে দেশ যদি বড় না হয়ে থাকে, তবে সেই দেশে অনন্য ও মহৎ শ্রেণিপেশার মানুষ গড়ে ওঠাও অনেকটা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

আর তাই আসুন সকলে মিলে বঙ্গবন্ধু কন্যার শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করে তুলি, যাতে বাংলাদেশ এগিয়ে যায়, গড়ে ওঠে এক মহান বাংলাদেশ। যার পতাকা বিশ্ব মানচিত্রে উড়বে সম্মানের সঙ্গে প্রথম সারির একটি রাষ্ট্র হিসেবে।

এই মহান বিজয় দিবসে এটিই হোক আমাদের একমাত্র দৃপ্ত শপথ।

As a nation success doesn't suffice, we want to be great.

লেখক: রাজনীতিবিদ

 

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ