রাজাকারের এমন তালিকা কি খুব জরুরি ছিল?

Send
মাসুদ কামাল
প্রকাশিত : ১৭:১২, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:২৪, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৯

মাসুদ কামালএমন কী বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল তাড়াহুড়া করে, যাচাই-বাছাই না করেই যেনতেনভাবে রাজাকারের একটি তালিকা প্রকাশ করতে হলো? তারপর আবার সেই তালিকা স্থগিত ঘোষণা করে একটি লেজেগোবরে পরিস্থিতি তৈরি করা?
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হককে আমি বেশ সৎ ও ঠান্ডামাথার মানুষ বলে মনে করতাম। বিভিন্ন প্রসঙ্গে তার বক্তব্য শুনে তাকে আমার কাছে ‘সেন্সেবল রাজনীতিক’ বলেও মনে হয়েছে। এরকম একজন দায়িত্ববান ব্যক্তি এমন ভুল করলেন কীভাবে? তাকে তো কখনোই প্রচারকাঙাল বলে মনে হয়নি। তাহলে?
প্রায় সপ্তাহ দুয়েক আগে থেকেই মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলে আসছিলেন, এবার বিজয় দিবসে রাজাকারদের একটি তালিকা প্রকাশ করবে তার মন্ত্রণালয়। তার সেই ঘোষণায় বেশ একটা আত্মতৃপ্তির ভাব ছিল। যেন বিশাল একটি কাজ করতে পেরেছেন। কাজটি যথাযথভাবে করতে পারলে হয়তো ইতিহাসের স্বার্থে বেশ বড় কাজই হতো। কিন্তু আমার মনে কিছু সন্দেহ ছিল। ভাবছিলাম—স্বাধীনতার ৪৯ বছর পর এই তালিকা তৈরি কি আসলেই সহজ হবে? যেখানে এত বছরে আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাটিই সম্পূর্ণ করতে পারিনি, যাচাই-বাছাই নিয়ে বিতর্ক চলছে, প্রতিবার সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা ও সংখ্যা দুই-ই পাল্টে যায়, সেখানে এত বছর পর শুরু করে রাজাকারের তালিকা তৈরি করতে পারাটা কতটুকু সম্ভব হবে? আবার তালিকাটা যখন ‘রাজাকার’-এর, তখন একটা সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য অনেক গ্রুপ ছিল। রাজাকার, আলবদর, আলশামস, শান্তি কমিটি, দালাল—এরা সবাই অনেকটা চিহ্নিতই ছিল। এরমধ্যে একমাত্র রাজাকাররাই ছিল বেতনভোগী। তারা নিয়মিত মাসিক একশ’ টাকা করে পেতো। এই অর্থ দেওয়া হতো পাকিস্তান সরকারের রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। যেহেতু তাদের বেতন দেওয়া হতো, সেহেতু জেলা প্রশাসনের পুরনো নথি ঘাঁটলে তাদের তালিকা পাওয়ার একটা সুযোগ থাকার কথা। সে কারণেই ভেবেছিলাম—আন্তরিকতা নিয়ে খুঁজলে হয়তো একটি তালিকা করা সম্ভব হবে। আবার যেসব জেলায় পুরনো নথিপত্র নষ্ট হয়ে গেছে, সেখানে হয়তো ঝামেলা হবে। নথিপত্র আংশিক নষ্ট হলে, আংশিক তালিকা পাওয়া যাবে। 

এর পাশাপাশি অন্য কিছু প্রশ্ন আমার মনে জেগেছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে পাকিস্তানের বেতনভোগী পক্ষাবলম্বনকারী কি কেবল রাজাকাররাই ছিল? যারা সরকারি চাকরি করেছে, সচিবালয়ে থেকে শুরু করে জেলা বা মহকুমা পর্যায়ে চাকরি করে পাকিস্তানের প্রশাসনকে চালু রেখেছে, তারা কি রাজাকারের চেয়ে খুব ভালো কিছু করেছে? ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত যারা প্রশাসনকে পাকিস্তানের পক্ষে রাখার জন্য সচেষ্ট ছিল, তারা কোন জাদু বলে মাত্র একদিন পরেই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনকে চালু রাখার দায়িত্ব পেতে পারে? কিংবা সেই পুলিশ বাহিনীর কিছু সদস্য, যারা যুদ্ধের এই নয় মাস থানায় থানায় অস্ত্র হাতে চাকরি করেছেন- তারা? একশ’ টাকা বেতনের রাজাকাররা কি তাদের চেয়েও কম ভয়ঙ্কর ছিল? অনেকে সরকারি চাকরিজীবীদের পক্ষ নিয়ে বলেন, তাদের মধ্যে একটা বড় অংশ বাধ্য হয়ে চাকরি করেছে। দেশে থেকে চাকরি-বাকরি করলেও তারা কিন্তু মনেপ্রাণে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই ছিলেন। দেশে থেকে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। এই কথাগুলোর সত্যতা অস্বীকার করা যাবে না। এর পাশাপাশি একথাও স্বীকার করতে হবে, অনেক রাজাকারও কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ করেছে। এ তথ্যটা দিন কয়েক আগে আমাকে একজন মুক্তিযোদ্ধাই দিলেন। ভদ্রলোক মোটেই এলেবেলে লোক নন, মুক্তিযুদ্ধে একটি সেক্টরের ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন। তিনি জানান, ওই সময় অনেকে রাজাকারে ভর্তি হয়ে তারপর সেই অস্ত্র নিয়ে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। এমন সংখ্যাও একেবারে কম নয়। 

এসব কারণে আমার বিবেচনায় রাজাকারদের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর ছিল আলবদর, আলশামস। রাজাকাররা যেহেতু চাকরি করতো, তাই তাদের এক ধরনের জবাবদিহি ছিল। কিন্তু আলবদর, আলশামসদের কারও কাছে জবাবদিহির ব্যবস্থা ছিল না। তারা এসব বাহিনীতে সমবেত হয়েছিল নিজেদের বিকৃত মানসিকতার প্রেরণায়। তারা যা ইচ্ছা তা-ই করতো। বিজয়ের একেবারে দ্বারপ্রান্তে এসে যে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছিল, সেটা কিন্তু এই আলবদররাই করেছিল। তালিকা করলে তাদেরটাই আগে করা দরকার। 

কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় জটিল পথে যায়নি, তালিকা প্রকাশের জন্য সহজ অপশনটিই আগে বেছে নিয়েছে। তারা ভেবেছে, যেহেতু রাজাকারদের একটা তালিকা পাকিস্তানি প্রশাসন আগেই করে রেখেছে, তাই সেটি প্রকাশ করে দিলেই হয়। ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো—তালিকা তৈরির জন্য তারা জেলা প্রশাসনগুলোর সঙ্গে নিজেরা পর্যন্ত যোগাযোগ করেনি। শরণাপন্ন হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুলিশ প্রশাসনের মাধ্যমে সারাদেশ থেকে একটা তালিকা সংগ্রহ করে সেটা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। আ ক ম মোজাম্মেল হক ও তার মন্ত্রণালয় তালিকাটির দিকে একবারও না তাকিয়ে সেটাকেই রাজাকারের তালিকা হিসেবে প্রকাশ করে দিয়েছে। আর তাতেই বেঁধেছে যত গণ্ডগোল।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেটা পাঠিয়েছিল, সেটা আসলে কীসের তালিকা ছিল?  ওয়েবসাইটে যে ৬৫৯ পৃষ্ঠার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, সেটাতে চোখ বুলানোর সুযোগ আমার হয়েছে। এটা আসলে স্বাধীনতার পর পর বিভিন্ন লোকের বিরুদ্ধে রাজাকার, আলবদর, আলশামস, শান্তি কমিটির সদস্য, দালাল, ইত্যাদি হিসাবে যে মামলাগুলো হয়েছে, তারই তালিকা। তখন অনেকে প্রতিহিংসাবশত কিংবা ষড়যন্ত্রমূলকভাবে অনেক মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে কি কিছু মামলা করেনি? করেছিল। মামলা করা মানেই তো আর অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। অনেক মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন, অনেকের ক্ষেত্রে তদন্ত করে পুলিশ কিছুই পায়নি।  পুলিশের করা এই তালিকায় ব্যক্তির নামের পাশে মন্তব্যের ঘরে সে সব কথাও লেখা রয়েছে। লেখা রয়েছে—ফাউন্ড নট গিল্টি, ডিসচার্জড, ফাইনাল রিপোর্ট ইত্যাদি। তাহলে এসব ব্যক্তি রাজাকার হলেন কী করে? অথচ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় যে ১০ হাজার ৭৮৯ জনের হিসাব দিচ্ছে, তাদের মধ্যে কিন্তু এই নির্দোষ প্রমাণ হওয়া ব্যক্তিরাও রয়েছেন।

আসলে পুরো বিষয়টিই মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অযোগ্যতার ফসল। তারা বিষয়টির গুরুত্বই বুঝতে পারেনি। তারা এতদিন কাজ করেছে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে। সেটা ছিল লাভজনক তালিকা, সেখানে নিজেদের নাম থাকাটাকে মানুষ সম্মানের বলে মনে করে। আবার কারও নাম বাদ পড়লেও, তাতে তার কিছু অসম্মান হয়ে যায় না। তিনি মনে করেন, দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন, তালিকায় নাম ওঠানো বা সম্মানী পাওয়ার জন্য তো যুদ্ধ করেননি। কিন্তু রাজাকারের তালিকা তো একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। এটা অপমানজনক তালিকা। একজন স্বাধীনতাবিরোধীর নাম যদি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় ঢুকে যায়, তাহলে ওই নামের মালিক নিশ্চয়ই আপত্তি করবে না। কিন্তু উল্টো যদি হয়? যা হয়েছে এবার, কতটা মানসিক পীড়নের মধ্যে পড়তে হয় সেই মুক্তিযোদ্ধকে, সেটা আমরা সাধারণ মানুষ হয়তো কখনোই বুঝতে পারবো না। সে বিবেচনায় এই রাজাকারের তালিকা প্রণয়নের কাজটি আসলেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। এমন কাজে কেবল দক্ষতাই নয়, সেই সঙ্গে পর্যাপ্ত দেশপ্রেম আর আন্তরিকতাও দরকার। তার কতটা ছিল মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের আনাড়ি আমলাদের, তার প্রমাণ এখন পাওয়া যাচ্ছে।

ঠিক এখানেই আবারও সামনে এসে যাচ্ছে সেই অনিবার্য প্রশ্নটি—এই সময়ে এমন একটি জটিল তালিকা তৈরি কি খুবই প্রয়োজন ছিল? পৃথিবীর অনেক দেশই যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেনি। আমরা করেছি, রীতিমতো গণযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় পেয়েছি। আমাদের রয়েছে গর্ব করার মতো ইতিহাস। সেই ইতিহাসে যার যেখানে অবস্থান ছিল, কারা নায়ক আর কারা খলনায়ক—সবই প্রকাশিত হওয়া দরকার। কিন্তু ইতিহাস রচনা কি অতই সহজ? পাকবাহিনীর করে যাওয়া তালিকার ওপর ভিত্তি করে, আমলারা যদি দায়িত্ব নেয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার, তাহলে তো লেজেগোবরে হবেই।

লেখক: সাংবাদিক

      

 

/এসএএস/এমএনএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ