একটি পাঠপ্রতিক্রিয়া

Send
লীনা পারভীন
প্রকাশিত : ১৭:৩৪, জানুয়ারি ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩৫, জানুয়ারি ০২, ২০২০

লীনা পারভীনঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন বছরে জানুয়ারির ৩০ তারিখে অনুষ্ঠিত হবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে এই নির্বাচন। তাই ভাবছিলাম, অনেক তো হলো নগর ও নগরপিতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা। এবার নতুন মুখ, নতুন নেতৃত্বের ছোঁয়া আছে প্রার্থীতালিকায়। তাই তাদের কাছে কিছু চাওয়াও দিয়ে রাখি, যদি বিবেচনায় আনেন তারা।

কিন্তু লেখাটির অ্যাংগেল পালটে গেলো বাংলা ট্রিবিউনের একটি লেখা পড়ে। লেখক একজন সাংবাদিক। নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন নানা ইস্যুতে। তিনি মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী চাইলেই কেবল নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে। আমি অনেকবার পড়েছি, আসলে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন বা কী কী কারণে তিনি মনে করছেন নির্বাচনের চাবিকাঠি প্রধানমন্ত্রীর হাতে, সেটি পরিষ্কার হয়নি। বাস্তবে লেখাটি তিনি শুরু করেছেন নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, পরাধীনতা ও এখতিয়ারের প্রসঙ্গ টেনে। তবে, লেখাটি কোথায় যেন হারিয়ে গেলো বাংলাদেশের সংবিধান, সরকার ব্যবস্থা ইত্যাদি ইস্যুতে। তিনি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন সংবিধান রাষ্ট্রপতির চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাকে বেশি দৃঢ় করেছে। যে কারণে রাষ্ট্রপতি পদটি একটি আলঙ্করিক পদ মাত্র। আসলে আমাদের সংবিধানের কাটাছেঁড়ার ইতিহাস সবাই জানে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর কতবার কতভাবে এই রাষ্ট্রকে অকার্যকর করার চেষ্টা হয়েছে, সে ইতিহাসও নতুন নয়। তাহলে প্রধানমন্ত্রীশাসিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় তিনি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতায়নের মাত্রা কেমন করে চাইছেন, বিষয়টি একদমই গোলমেলে লেগেছে। আর এই ব্যবস্থা কি আজকের যিনি প্রধানমন্ত্রী, তিনি করেছেন? তাহলে আজকের প্রধানমন্ত্রী কেমন করে শাসন ব্যবস্থার নিয়ম কানুন পালটে দিতে পারেন? তাহলে বরং লেখক চাইলে সংবিধানের আরেকটি পরিবর্তনের দাবি করতে পারতেন।

দ্বিতীয়ত লেখক বলেছেন, নির্বাচন-প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা এখন একটি ‘কেতাবি’ কথা; যার সূত্র হিসেবে তিনি একজন নির্বাচন কমিশনারের উক্তিকে স্মরণ করেছেন। একজন কমিশনার কী বললেন, সেটি দিয়েই কি গোটা একটি ব্যবস্থাকে আমরা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারি, যদি এর পেছনে কিছু শক্ত ও দৃঢ়  প্রমাণ না দেওয়া যায়? এদেশে তো কথা বলতে সবাই পারদর্শী। বুঝতাম যদি, ওই নির্বাচন কমিশনার, যাকে লেখক সাক্ষী মেনেছেন, তিনি নির্বাচনের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে এবং নিজের ক্ষমতার যথার্থ ব্যবহার করতে পারছেন না বলে পদত্যাগ করে একটি উদাহরণ তৈরি করতেন। বাস্তবে তিনি কিছু অভিযোগ করেছেন, যার পেছনে শক্ত কোনও প্রমাণ এখনও হাজির করতে পারেননি। নির্বাচন কমিশনারের ক্ষমতার কোথায় সরকার হস্তক্ষেপ করছে, সে অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে অবশ্যই প্রয়োজন যথাযথ প্রমাণসহ জাতির সামনে হাজির করা অন্যথায় নির্বাচন কমিশনার আর বিএনপি’র মতো লেখকের বাতাসে ছড়ানো কথাও ভিত্তিহীন নয় কেবল, সিটি নির্বাচনের আগে এমন কথায় ষড়যন্ত্রেরই সুরও পাওয়া যায়। নির্বাচন কমিশন একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানের কাঠামো বা প্রশাসনিক স্তরে প্রচুর কাজ করার সুযোগ রয়েছে—এ দাবিগুলো আমাদের সবার। এর নীতিমালাকে আধুনিকায়নে কমিশনের আরও অনেক কিছু পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি।  ইলেকট্রিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) পদ্ধতি যদি সুষ্ঠুভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের অন্যতম মাধ্যম হয়ে থাকে, তাহলে সেই ব্যবস্থা গ্রহণেও কমিশনের দুর্বলতা রয়ে গেছে। তবে ভোটার আনার কাজে কমিশনের ভূমিকা বা প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা কোথায় আছে, সেই বিষয়টি আমার ছোট্ট মগজে সত্যি ধরেনি। লেখক ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের রেফারেন্স দিয়েছেন। কিন্তু বিএনপি বা অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনে আসা বা তাদের ভোটারদের উৎসাহিত করার কাজে প্রধানমন্ত্রী কোন ভূমিকা রাখতে পারেন? এটা তো দলের কাজ। বিএনপি কেন ব্যর্থ হচ্ছে তাদের ভোটারদের আকৃষ্ট করতে? কেন তাদের কর্মীরা মাঠে নামছে না? যে দলের প্রধান নেতা জেলে থাকে, সেই নেতাকে মুক্ত করতেও কি প্রধানমন্ত্রীর আন্দোলন লাগবে? না প্রধানমন্ত্রী তাদের হয়ে আইনি লড়াই করে দেবেন? ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫ সালে বিএনপি-জামায়াত যে সন্ত্রাস চালিয়েছিল দেশব্যাপী, সেগুলোকে অস্বীকার করবেন কীভাবে? বাস্তবতা হচ্ছে সেই সন্ত্রাসী কার্যক্রমই বিএনপি’র রাজনৈতিক অস্তিত্বকে নির্মূল করতে যথেষ্ট। নেতা-কর্মীরা সব জেল আর মামলার ভয়ে পালানোর কারণ দলের নির্দেশেই তারা সবাই আগুনের সন্ত্রাস কায়েম করেছিলেন। আর সেই আগুনে রাষ্ট্রের সম্পদ নষ্ট করতেও তারা পিছপা হননি। আমি জানি না, লেখক এই কারণগুলোকে কেন বিএনপি’র মতো একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ক্ষমতা নষ্ট হওয়ার পেছনে দায়ী মনে করছেন না। এত দেউলয়াত্ব যে আজকে তাদের ভোটারদের মাঠে নামাতেও প্রধানমন্ত্রীকেই লাগবে? এই যে সবকিছুতেই প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনাও আমাদের দুর্বল মনকেই হাজির করে।

রাজনীতি যদি হয় জনগণের জন্য, তাহলে আপনি নিজের দিকে তাকাতে পারেন না। অথচ আমরা এ পর্যন্ত কোনও পাবলিক ইস্যুতে বিএনপিকে রাস্তায় নামতে দেখিনি। ভোটের সময় কেবল ভোট চাইলেই আপনি তা পাবেন কেন? মন জয় করতে কোন কাজটি করেছেন, সেই হিসাব ঠিক মিলিয়ে নিতে জানে জনতা। ধরেও যদি নেই যে, সরকার নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে দেয়নি বা দিচ্ছে না, তাহলে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন কোথায়? বিএনপি কয়টি কর্মসূচি দিয়েছিল জাতীয় নির্বাচন বয়কট ছাড়া? বয়কটেই কি সমাধান আসে, না লড়াইয়ে আসে? আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এখনও ইউরোপ আমেরিকার মতো হয়ে যায়নি। আমরা এখনও মাঠের লড়াইয়ে বিশ্বাস করি। তাই জনগণ তাদের সুখে-দুঃখে যাকে পাশে পায়, তাকেই আপন করে নেয়। বিএনপি’র কোন নেতা কী দেখাতে পেরেছেন, তারা এলাকায় গিয়ে কতটা কী করেছেন, এই অব্যবস্থার বিরুদ্ধে? নির্বাচন কমিশনের কার্যকারিতা কেবল সরকার বা লেখকের ভাষায় প্রধানমন্ত্রীর ওপর নির্ভর করে না। এখানে দরকার সব অংশী দলের সমান আন্তরিকতা ও সহায়তা। বিএনপি বা অন্য দলগুলোর ভূমিকা যদি আলোচনায় আনা না হয়, তাহলে লেখাটা একদম একপেশে হয়ে যায়, যা একজন সাংবাদিক কলামিস্টের কাছে কাম্য নয়। আমরা একজন সাংবাদিকের কাছে বা কলামিস্টের কাছে চাই সঠিক ও যৌক্তিক বিশ্লেষণ। দলীয় পরিচয়ে লেখলে অবশ্য ভিন্ন কথা। কিন্তু সাংবাদিক পরচয়ে যখন আপনি দেশের প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি দোষারোপ করেন, তখন আসলে বিতর্কে যাওয়ারও কিছু থাকে না। প্রধানমন্ত্রী কোনও একজন ব্যক্তি মাত্র নন, রাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান। তেমনি রাষ্ট্রপতিও একটি প্রতিষ্ঠান। তাই এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে আলোচনা করতে হলে দরকার যথেষ্ট তথ্য-উপাত্তভিত্তিক আলোচনা, যেন আলোচনাটা গঠনমূলক হয়। এতে রাষ্ট্রের কল্যাণ আসে। আমি ব্যক্তি শেখ হাসিনাকে অপছন্দ করতেই পারি কিন্তু তিনি যে পদে আছেন, সেটি একটি রাষ্ট্রীয় পদ, সেটিকে অপছন্দ করে ইচ্ছামতো কথা বলতে চাওয়াটাও এক ধরনের বালকসূলভ আলোচনা।

লেখক: কলামিস্ট

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ