তাহলে আর ‘ফেসবুকজীবী’দের দোষ দিয়ে লাভ কী?

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৫:৩০, জানুয়ারি ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩১, জানুয়ারি ২০, ২০২০

প্রভাষ আমিনবাংলাদেশে আলোচিত-সমালোচিত ইস্যু হলো ক্রসফায়ার। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, তারা কোনও একজন আসামি নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে যান। সেখানে ওঁৎ পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা গুলি চালায় এবং তাতে শুধু পুলিশের হাতে আসামিই মারা যায়। গত ১৫ বছর ধরে এই গল্পই চলে আসছে। সবাই জানে গল্পটি মিথ্যা। আসলে পুলিশ গুলি করে সন্দেহভাজন লোকটিকে মেরে ফেলে। ভারতে ক্রসফায়ারকে বলা হয় এনকাউন্টার।
আর মানবাধিকারকর্মীরা ক্রসফায়ারকে বলেন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। আসলে ক্রসফায়ার মানে ঠান্ডা মাথায় খুন। কিন্তু খুন বলুন আর ক্রসফায়ার, গল্পটা সত্যি হোক আর মিথ্যা; ক্রসফায়ার কিন্তু বাংলাদেশে দারুণ জনপ্রিয়। এই মুহূর্তে গণভোট হলে ক্রসফায়ার বিপুল ভোটে পাস করবে। তবে গণভোটটা হতে হবে সত্যি সত্যি গোপন ব্যালটে। কারণ অনেকে মুখে ক্রসফায়ারের বিরোধিতা করলেও, মনে মনে বিশ্বাস করেন, ক্রসফায়ার ছাড়া সমাধান নেই। এমন বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যাই এখন দেশে বেশি। গত ১৫ বছর ধরে এই ধারায় একই গল্পে ক্রসফায়ার চলে আসছে। ক্রসফায়ার নিয়ে আমাদের দেশে বিরল রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে উঠেছে।

সাধারণত বিএনপি কিছু করলে আওয়ামী লীগ সেটা বাতিল করে দেয়। কিন্তু বিএনপি যে ক্রসফায়ার সিস্টেম চালু করেছিল, আওয়ামী লীগ তা দারুণ গতিতে এগিয়ে নিচ্ছে। সমস্যা হলো, ক্ষসতাসীনরা ক্রসফায়ারের পক্ষে হলেও বিরোধীরা সবসময় এর বিপক্ষে থাকে। যেমন ক্রসফায়ারের জন্মদাতা বিএনপি এখন জান দিয়ে ক্রসফায়ারের বিরোধিতা করে।

কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর ফেসবুকে ধর্ষকের ক্রসফায়ার গণদাবিতে পরিণত হয়। আসলে ক্রসফায়ার নিয়ে আমাদের মধ্যে অদ্ভুত একটা বৈপরীত্য কাজ করে। কখনও আমরা ক্রসফায়ারেই সমাধান মানি, আবার কখনও আমরা মানবাধিকারকর্মী বনে যাই। ক্রসফায়ারে নিহত হাজার হাজার অভিযুক্ত সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজের মৃত্যু আমাদের ভাবায় না, কাঁদায় না; এমনকি আমরা প্রকাশ্যে ক্রসফায়ারের দাবি জানাই। আবার টেকনাফের কমিশনার একরামুলের কন্যার প্রশ্ন, ‘আব্বু তুমি কান্না করতেছো যে…?’ আমাদের হৃদয়ে কান্নার জোয়ার আনে। ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে আমরা সোচ্চার হই। কিন্তু আমরা বোঝার চেষ্টাই করি না, প্রত্যেকটা ক্রসফায়ারের পেছনে এমন করুণ গল্প আছে।

ফেসবুকে ধর্ষকের ক্রসফায়ারের গণদাবি ওঠার পর গত সপ্তাহে এই কলামে লিখেছিলাম, ‘ক্রসফায়ার নয়, ধর্ষকের ফাঁসি চাই।’ সে কলামে মানবাধিকার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল; ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ সকল ধর্ষণ ঘটনার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবি। সে লেখায় ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি করার দাবি জানিয়েছিলাম। স্বাভাবিকভাবেই দাবিটি ছিল সংসদের প্রতি। কারণ আইন প্রণয়ন, সংশোধনের এখতিয়ার সংসদের। কিন্তু কলামটি প্রকাশের পরদিনই সংসদে ক্রসফায়ারের পক্ষে বিরল ঐকমত্য গড়ে ওঠে। জাতীয় পার্টির দুই এমপি সংসদে ধর্ষকের ক্রসফায়ারের দাবি তোলেন। সরকারি দলের নেতারাও তাতে সায় দেন। ক্রসফায়ারের পক্ষে সবচেয়ে সোচ্চার জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশিদ বলেন, ‘এই মুহূর্তে সমাজকে ধর্ষণমুক্ত করতে হলে এনকাউন্টার মাস্ট। একমাত্র ওষুধ পুলিশ ধরার পর ধর্ষককে গুলি করে মেরে ফেলা।’ তিনি বলেন, ‘আমি মানবাধিকারকর্মীদের বলবো, আপনারা যদি ধর্ষণের শিকার হতেন; আপনার স্ত্রী, আপনার মা, আপনার বোন, আপনার কেউ যদি ধর্ষণের শিকার হতেন, কী হতো?’ তিনি আরও বলেন, ‘এখান থেকে এই বার্তাটা দিতে চাই। একমাত্র শাস্তি এনকাউন্টারে মেরে ফেলা। ১০-১২টা মারা হোক, ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে।’ এ সময় পাশ থেকে একজন কঠোর আইন প্রণয়নের দাবি তুললে কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘আইন লাগে না। পুলিশের আইন আছে তো। পরশুদিনও মাদকের আসামি ক্রসফায়ারে মারা হয়েছে, কোন আইনে মারা হলো? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হলো, সারাজীবনের জন্য সে কারও কাছে মুখ দেখাতে পারবে? এখন যদি বিচারের আওতায় আনেন, কোনও সাক্ষী নাই। এই মেয়েকে কাঠগড়ায় আনা হবে। সাক্ষ্য দিতে হবে, কীভাবে ধর্ষণ হলো।’

কাজী ফিরোজ রশীদের কথা যে একেবারে অযৌক্তিক, তা কিন্তু নয়। ক্রসফায়ারের পক্ষে হাজারটা যুক্তি আছে। ধর্ষক বা সন্ত্রাসীদের ধরা হলে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা যায় না। কেউ ভয়ে তাদের বিপক্ষে সাক্ষী দিতে চায় না। আদালতে ধর্ষণ প্রমাণ করা কঠিন হয়। কারণ ধর্ষণের কোনও সাক্ষী থাকে না। তাছাড়া আইনের ফাঁক গলে সন্ত্রাসীরা জামিন পেয়ে যায় বা কিছুদিন কারাভোগ করে এসে আবার দ্বিগুণ উদ্যমে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করে।

তবে যত যুক্তিই দেওয়া হোক, ক্রসফায়ার কখনও সমাধান নয়। সব মানুষেরই মানবাধিকার আছে, তিনি সন্ত্রাসী হোন আর ভালো মানুষ। সবারই আইনের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার আছে। যে দেশে বঙ্গবন্ধুর খুনি, যুদ্ধাপরাধীরা আইনের সর্বোচ্চ সুবিধা পান, সে দেশে ক্রসফায়ার চলতে পারে না। ক্রসফায়ারে খুন হয়ে কোনও পাতি সন্ত্রাসী নিশ্চয়ই গোলাম আযম বা সাঈদীর চেয়ে খারাপ নয়।

গোলাম আযমেরও স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে, সাঈদী এখনও কারাগারে। নিজামী, কাদের মোল্লা বা বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে। আমরা সব অন্যায়ের ন্যায়বিচার চাই। বিচারবহির্ভূত কোনও কর্মকাণ্ডকে সমর্থন দেওয়ার কোনও সুযোগই নেই।

ক্রসফায়ার হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সূচক। এমনিতে ক্রসফায়ার বাড়লে তাৎক্ষণিক একটা প্রভাব পড়ে। সন্ত্রাসীরা একটু গা ঢাকা দিয়ে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্রসফায়ার যত বেশি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তত খারাপ। আইনের শাসন না থাকলেই, ক্রসফায়ারের প্রাদুর্ভাব বাড়ে। ক্রসফায়ারের প্রতি মানুষের সমর্থন মানে হলো, সরকারের প্রতি, আইনের শাসনের প্রতি মানুষের চরম অনাস্থা।

হাজার যুক্তিতেও আপনি ক্রসফায়ার জায়েজ করতে পারবেন না। কারণ মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান কিছু নেই। বিজ্ঞান অনেক কিছু আবিষ্কার করেছে। কিন্তু মানুষের জীবন দিতে পারে না। তাই যা আপনি দিতে পারবেন না, তা নিতেও পারবেন না। আর এ কারণেই ফাঁসির আসামি আইনে আপিল, রিভিউ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা—সব ধাপে সুযোগ পায়। যাতে কোনোভাবেই কোনও নির্দোষ লোকের জীবন না যায়। বাংলাদেশে আইনের ধারণাই হলো, ১০ জন দোষী ছাড়া পাক, কিন্তু কোনও নিরপরাধ যেন সাজা না পায়।

সংসদে ক্রসফায়ারের পক্ষে ওকালতির সঙ্গে অবশ্য সুর মেলাননি সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘যারা এনকাউন্টারের পক্ষে বক্তব্য রেখেছেন, আমার মনে হয়, এটা তাদের ব্যক্তিগত মতামত। এটা সরকার বা দলের কোনও বক্তব্য নয়। আমরা এনকাউন্টার বা ক্রসফায়ারকে সাপোর্ট করতে পারি না। এটা সংবিধানের আওতার বাইরে। কারণ এটা সংবিধানসম্মত নয়।’ ওবায়দুল কাদের একদম আমার মনের কথা বলেছেন। কিন্তু সরকার যদি ক্রসফায়ার সমর্থন না করে, তাহলে আইনশৃঙ্খখলা বাহিনী ক্রসফায়ার করে কার নির্দেশে, কোন সাহসে? তাদের কি কারও জবাবদিহি করতে হয় না?

ফেসবুকে তো মানুষ হতাশা থেকে, অনাস্থা থেকে ক্রসফায়ারের দাবি তোলে। সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব হলো, কঠোর আইন প্রণয়ন করা, যাতে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসে। তাদের দায়িত্ব মানুষকে হতাশা থেকে বের করে আনা। কিন্তু যাদের আইন প্রণয়ন করার দায়িত্ব, আইনের শাসন কায়েম যাদের লক্ষ্য, সংবিধান রক্ষা যাদের শপথ; সেই সংসদ সদস্যরাই যদি পবিত্র সংসদে দাঁড়িয়ে ক্রসফায়ারের পক্ষে ওকালতি করেন, তাহলে আর ‘ফেসবুকজীবী’দের দোষ দিয়ে লাভ কী? সংসদে ক্রসফায়ারের পক্ষে দাবি ওঠার পর নিজেদের সভ্য দেশের নাগরিক বলে পরিচয় দিতেই লজ্জা লাগবে। এতদিন দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো যে দাবি করতো, সংসদ সদস্যরা সেই দাবির পক্ষেই অবস্থান নিলেন। তারা যদি ক্রসফায়ারেই সমাধান মনে করেন, তাহলে আইন করে বিচার ব্যবস্থা, আদালত বিলুপ্ত ঘোষণা করুন। একই দেশে বিচার ব্যবস্থা এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড একসঙ্গে চলতে পারে না।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ