খুব সহজে আমরাই দানব হয়ে উঠছি

Send
মোহাম্মদ আসাদ উজ জামান
প্রকাশিত : ১৯:৩৭, জানুয়ারি ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩৮, জানুয়ারি ২৬, ২০২০

মোহাম্মদ আসাদ উজ জামানযানজটে রাস্তার এক পাশের গাড়ি থেমে আছে। ওদিক থেকে গাড়ি আসার লেন খালি। অনেকেই নিয়ম মেনে এপাশেই গাড়ি থামিয়ে অপেক্ষা করছেন, কখন জ্যাম ছুটবে। ঠিক ওই সময় একটি গাড়ি পেছন থেকে সাঁই করে চলে গেলো ওপাশের ফাঁকা লেন ধরে। অথচ ওই লেন দিয়ে তার যাওয়ার কথা নয়। এপাশের লেনে যারা আটকা পড়ে আছেন, তাদের মনে বেশ বড় একটা চাপ লাগে, পেছনের গাড়ি কেন ওই লেন দিয়ে যাবে! একটু পর জ্যাম ছেড়ে গেলে যদি দেখা যায়, পেছন দিক থেকে ছুটে আসা ওই গাড়িটা উল্টে পড়ে গেছে, তাহলে কারও না কারও মনে কিছুক্ষণের জন্যে হলেও ভাবনা আসবে, যাক লোকটার একটা উচিত শিক্ষা হয়েছে–ঠিক এটাই একটি দানবের মনোভাব। হয়তো তারা তখনও জানেন না, ওই গাড়িতে কতজন ছিল, কয়টি বাচ্চা ছিল। অল্পের  জন্য কিছু মানুষের মনে এই দানবীয় ভাবের উদয় হয়েছে, ওই মানুষটির কারণে, যে নিয়ম ভেঙে অন্যের অধিকারে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। প্রকৃত ঘটনা জানার পর হয়তো সবার মনেই কষ্ট লাগবে, আহা সেও তো একজন মানুষ!
হ্যাঁ, আমরা সবাই মানুষ, আমাদের মনে মানবতা আছে। কিন্তু কিছু কিছু সময় আমরা আমাদের মানবিকতা ধরে রাখতে পারছি না। আমাদের মনে দানব জেগে উঠছে। দানব মানে আমাদের ঘাড় মটকে রক্ত মাংস খাবে এরকম দানব নয়। আমাদের সহজ-স্বাভাবিক মনের ভেতর বিষ ঢুকে পড়ে আমরা যেন ভিন্ন একটা কিছু হয়ে উঠছি। একেই আমি দানব বলতে চাই। এই বিষাক্ত মনোভাবের কারণে আমরা সহজ-স্বাভাবিক থাকতে পারছি না। একইসঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ততাও হারিয়ে ফেলছি। এর প্রধান কারণ নিয়ম না মানা। বিশেষ করে, যেখানে সবার অধিকার সমান হওয়ার কথা, সেসব ক্ষেত্রে নিয়মের একটু ব্যাঘাত ঘটলেই সবার মনে চাপ লাগে, আমাদের মন তখন খুব সহজেই বিষিয়ে ওঠে।

লিফটে ওঠার মতো বিষয়েও আমাদের মনে চাপ লাগতে পারে। যে আগে আসবে, সে আগে উঠবে, কেউ যদি পরে এসে আগে ওঠার চেষ্টা করে, তাহলেই আমাদের মনে চাপ লাগে। আপাতদৃষ্টিতে এগুলো ছোট একটা ঘটনা হলেও, আসলে অত ছোট নয়। পরে আসা লোকটি আমার সহজ-স্বাভাবিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করছে বা আমার অধিকার অন্যায়ভাবে কেড়ে নিতে চাচ্ছে। ঠিক একই ঘটনা ঘটে টিকিট কিনে লাইন ধরে বাসের ওঠার ক্ষেত্রেও। আপনি লাইন ধরে নিয়ম মেনে বাসে উঠলেন, একটু পর দেখা গেলো কন্ডাক্টর একজনকে রাস্তা থেকে তুলে নিচ্ছে, কিংবা গাড়ি যখন জ্যামে আটকে আছে, এই ফাঁকে কনডাক্টর একজনকে উঠতে দিলো, যেখানে তার লোক ওঠানোর কথা নয়। সবাই যখন জ্যামে পড়ে হাঁসফাঁস করছি, তখন দেখা গেলো একটি গাড়ি উল্টো পথে সাইসাই করে চলে গেলো। গাড়িটা দেখে বুঝলেন, বড় অফিসারের গাড়ি! তখন মনের মধ্যে অনেক চাপ সৃষ্টি হয়—বড় মানুষ হলেই কি সাধারণ আইনও মানবে না? এসব দেখে তো ছোটরাও বড় হয়ে এই ভুলে নিজেদের জড়িয়ে নেবে, অন্যদের অধিকার সহজভাবে কেড়ে নিতে চাইবে। তাহলে সমাজের অবস্থাটা কী হবে! সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যে সমাজ গড়ে উঠবে, সে সমাজেই আমাদের বাস করতে হবে, দানবের কাছে তো দানবের সমাজই আশা করা যায়! 

এত গেলো রাস্তার কথা। ডাক্তারের চেম্বারে অনেক দিন আগে নাম লিখিয়ে বসে আছেন। একজন এসেই সবাইকে পাশ কাটিয়ে ঢুকে গেলো চেম্বারের ভেতরে অথবা চেম্বারের কাউকে কিছু টাকা দিয়ে অন্যদের আগে ডাক্তার দেখিয়ে নিলো। এগুলো এখন চোখের সামনেই ঘটে। যার ফলে অনেকের মনেই চাপ লাগে। আসলে সব জায়গায়ই নিজের একটু বেশি সুবিধার আশায় আমরা অন্যদের দানব বানাতে সহায়তা করি। বিশেষ করে, যখন আমাদের ভেতর লোভটা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অফিসের প্রমোশন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সুবিধা আদায়ে আমরা আর সহজভাবে ভাবতে পারি না, ওগুলো যেন আমাদের পেতেই হবে। কোনও কারণে না পেলে আমরা আর আমরা থাকি না, শুরু হয়ে যায় কাদা ছোড়াছুড়ি। এ কোন সমাজে আমরা বাস করছি—যেখানে নিজে পেলে সব ঠিক, অন্য পেলেই দোষ!

আমাদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কিছু অধিকার থাকে। আমাদের এই অধিকার যখন কেউ কেড়ে নেয় বা কেড়ে নিতে চায়, তখনই আমাদের মনে চাপ পড়ে। মনের এই চাপে আমরা মানুষ থাকি না। হয় আমরা নিজেরাই দানব হয়ে উঠি, অথবা অন্যকে দানব হতে সহায়তা করি। এরকম দানব আছে শেয়ারবাজারে, যারা মানুষের টাকা মেরে দিচ্ছে। মানুষের সঞ্চয় খাওয়ার দানব আছে ব্যাংকে। দানব আছে হাট-বাজারে, নানান শঠতা আর ধোঁকাবাজিতে এ ওরটা, ও এরটা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টায় আছে। দ্রুত মুনাফা লাভের জন্য ভেজাল, অস্বাস্থ্যকর খাবার, ফলের সংখ্যায় কম দেওয়া—আপাত এমন ছোট ছোট চাপের কারণেই মনটা হয়ে উঠে ভীষণ বিষাক্ত। তাই সুযোগ পেলেই বেরিয়ে আসে আমাদের ভেতরের বিচার বুদ্ধিহীন পাশবিকতা। রোগীর কিছু হলে ডাক্তারের ওপর আক্রমণ, অ্যাক্সিডেন্ট হলে গাড়ি ভাঙচুর, চালককে মারপিট, বাসা বাড়ির ছোট ছোট কাজের বাচ্চার ওপর অমানুষিক অত্যাচার—একজন ছিনতাইকারী ধরা পড়লে আমাদের পাশবিকতা কত নির্মমভাবেই না ধরা পড়ে! অথচ নিজের বেলায় আমরা আশা করি, অন্যের সহানুভূতি! মনের ভেতর একটা দানব দিনে দিনে বড় হয়ে উঠছে, যার ফলে অন্যের পাশে স্বতঃস্ফূর্ত মানবিকতা নিয়ে দাঁড়াতে পারছি না। একইসঙ্গে দ্রুত গতিতে নির্মম পাশবিকতা ছড়িয়ে যাচ্ছে সবখানে। 

কোথায় দানব নেই! দানব আছে কাগজে কলমে, আমাদের জীবনের কত কিছু যে মিথ্যায় ভরা, কল্পনাও করা যায় না। কাগজে এক, বাস্তবে আরেক। অফিসে গেলে এক রকমের দানব, চাকরি নিতে গেলে আরেক রকমের দানব। এই দানবিয়তার সবচে’ বীভৎস রূপ হচ্ছে, সাধারণ মানুষ এগুলো মেনে নিতে শিখছে। একটি সমাজের জন্যে এটি একটি ভয়াবহ অবস্থা, আর নিজের দানবিকতার সবচে বড় প্রকাশ হলো—আমি কী করবো! 

বাড়ির পরিবেশও এর বাইরে নয়। এই দানবিকতার স্থূল একটি উদাহরণ হলো পৈতৃক সম্পত্তিতে বোনদের ঠকানো। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় ‘দেব’, ‘দিচ্ছি’ করে করে ভাইয়েরা বোনদের অংশটুকু ঠিকভাবে দিতে চায় না বা দেয় না। ভাই-বোনের সুন্দর সম্পর্কের মাঝেও চলে আসে দানবের দেয়াল।

সমাজে আজ যেন এখানে-ওখানে বড় বড় দানবেরা বসে আছে। ওরা আমাদের অধিকার নিয়ে হাসি-তামাশা করে। ওদের কারণে অনেকেই বিশেষ কিছু সুবিধা পায় বলে একটা দল চুপ থাকে, আরেক দল অপেক্ষায় আছে সুযোগ পেলে ওরাও এদের চেয়েও বড় বড় দানবীয় কাজ করবে। আর সমাজের বড় অংশটি নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে; এর ভেতরেই যতটুকু সম্ভব চেয়ে নিয়ে, কেড়ে নিয়ে, ওরা বাঁচার চেষ্টায় আছে। আর এই সুযোগেই দানবরা আরও বড় দানব হয়ে উঠছে। 

বলতে পারেন, সমাজের কোথায় দানব নেই? দানবের কাছে যদি আপনার অধিকার ছেড়ে দিন অথবা কোনও কিছু পাওয়ার লোভে যদি কাউকে দানব বানিয়ে ফেলেন, তাহলে একটা জিনিস মনে রাখবেন, এই দানবরা আমাদের সন্তানের অধিকার কেড়ে নেবে, ওদের মানুষ হিসেবে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে দেবে না। বাঁচার জন্য আমাদের সন্তানকে হয় ওদের চেয়েও বড় দানব হতে হবে, নয় পদে পদে দানদের হাতে নিগৃহীত হবে—দুটিই একটি সুস্থ সমাজের জন্য বড় হুমকি! সমাজের সুস্থতার জন্য সন্তানকে শুদ্ধ চিন্তার শিক্ষা দিতে হবে, যেন ওর মাঝে লুকিয়ে থাকা শুভ বুদ্ধির উদয় ঘটে। ওদের স্বাভাবিক অধিকার বুঝতে দিতে হবে, ওদের সামনে অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া চলবে না। তা না হলে আমাদের মেয়েরা কেন, ছেলেরাও রাস্তায় বের হতে পারবে না। অনেক দানব রাস্তায় এখনও আছে। পত্রিকা খুললেই ওদের দানবীয় কীর্তির খবর পাওয়া যায়। এর চেয়েও অনেক বেশি দানবীয় কীর্তি অজানাই থেকে যায়। আর ওদের বিচার চাইতে গিয়ে আমাদের মনের ভেতর দানবীয় রূপটিও কিছু না কিছু বের হয়ে আসে।

আজকের যারা দানব হয়ে উঠেছে, ওরাও নিজেরা নিজেরা দানব হয়ে ওঠেনি। পুরো সমাজ ওদের দানব হতে সহায়তা করছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে এর উদাহরণ টেনেই শেষ করছি। আমাদের সন্তানকে যেন ভালো রেজাল্ট করতেই হবে। তাই আমরা ছুটে গেলাম শিক্ষকের কাছে। শুরু হয়ে গেলো প্রাইভেট, কোচিং।  এখন স্কুল শেষে স্কুলেও কোচিং! কেউ যদি এর বাইরে যেতে চায়, ওরা পারবে না। স্কুলশিক্ষকের কাছে প্রাইভেট না পড়লে পরীক্ষার ছাত্র খারাপ করে। কোচিং না করলে স্কুল ছাড়বে না।  যাদের কাছে প্রাইভেট না পড়লে ছাত্ররা অকারণেই পরীক্ষায় খারাপ করে, ওরা কি দানব না? ওদের কি আমরাই দানব বানাইনি?

ভালো করার মানেই যেন ভালো রেজাল্ট, ভালো মানুষ মানেই যেন বড় চাকরিজীবী, কীভাবে কীভাবে যেন পুরো সমাজেই দানব ছড়িয়ে যাচ্ছে। এরপর আছে স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে নানান অনিয়মের কথা। যে স্কুলশিক্ষক তার ছাত্রকে নীতি-নৈতিকতা শেখাবেন, তাদেরই যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে সমাজে কীভাবে নীতি-নৈতিকতার প্রতিষ্ঠা পাবে! স্কুল কেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগেও অনেক কথা কানে আসে, এই নিয়ে অনেক খবরই পত্রিকায় ছাপা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ নানান কর্তাব্যক্তির কিছু কিছু অনিয়মের কথা শুনে মনে হয় তারা যেন দানব হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে গেছেন, কে কত বড় দানব হবেন। এই দানবদের দেখে নতুন আরও আরও অনেক দানব তৈরি হবে, ওদের থেকে আরও দানব, পুরো সমাজকে একদিন গিলে খাবে এই দানব সমাজ!

যে সমস্ত বিষয়ে বা ক্ষেত্র তুলে আমাদের অনিয়মের চিত্র দিয়ে দানবীয়তা তুলে ধরার চেষ্টা করছি, অনিয়ম শুধু এগুলোতেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি দেশের বা একটি সমাজের সব খানেই একই ধরনের অনিয়ম থাকার কথা, কোথাও একটু কম, কোথাও একটু বেশি, এই যা! এই অনিয়মের সুযোগেই দানবের জন্ম! এ দানব মানুষের ঘাড় ভাঙে না, এ দানব মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে খেয়ে ফেলে না, এ দানব এর চেয়েও ভয়াবহ, এ দানব আমাদের অধিকার খেয়ে ফেলে, আমাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ খেয়ে ফেলে। এ দানব আমাদের মাঝেই আছে, আমরাই দানব হয়ে উঠছি!

আমরা দানব হয়ে যাচ্ছি আমাদের লোভের জন্যে, আমরা দানব হয়ে উঠছি সহজ-সরল জীবন থেকে দূরে যাচ্ছি বলে, আমরা সত্য এড়িয়ে কোনোভাবে বাঁচার চেষ্টা করি বলে। সহজভাবে কিছু পাওয়ার জন্য আমরা ক্ষমতাবান এর-ওর কাছে ছুটে যাই। মাঝে মাঝে ঝামেলা থেকে উদ্ধার পেতেও তাদের কাছে ছুটে যাই। নিজের পাওনা পেতেও তাদের কাছে ছুটে যাই। এ রকম হতে হতেই ওরা দানব হয়ে ওঠে। তখন ওরা বসেই থাকে—আমরা যেন ওদের কাছে যাই। একসময় ওদের দেখাদেখি আমরাও দানব হয়ে উঠি।

যেহেতু আমরা খুব সহজেই দানব হয়ে উঠছি, এর থেকে মুক্তির উপায়ও খুব সহজ, নিয়ম মানতে হবে। সে সব জায়গায় সাধারণের যাতায়াত এবং সবার অধিকার সমান হওয়ার কথা, যেমন রাস্তা, বাজার, হাসপাতাল, শিক্ষাক্ষেত্রে সাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। মাঝে মাঝে বৃহত্তর কল্যাণের জন্যে, বিশেষ করে ভবিষ্যৎ সন্তানের কথা ভেবে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দিতেও শিখতে হবে। ‘প্রাপ্তিই ন্যায়, অপ্রাপ্তি অন্যায়’—এই বোধ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কিন্তু জটিলতার নানান আবর্তে আজকের এই সহজ কাজটাই সবচেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে! যার ফলে আমরা অনেক কিছুই আর সরলভাবে ভাবতে পারছি না। অথচ এই দানবের রূপ থেকে আমাদের মুক্তি দরকার, ভীষণ দরকার! একটি কথা মনে রাখতে হবে, সবাই মিলে ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে একটি সুন্দর পরিবেশ গড়ে না তোলা পর্যন্ত সবার ব্যক্তি স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হবে না।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ