নারী অগ্রযাত্রা: ভাষা আন্দোলন থেকে সেনাবাহিনী

Send
মো. আবুসালেহ সেকেন্দার
প্রকাশিত : ১৯:৪৮, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৫০, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২০

মো. আবুসালেহ সেকেন্দারঔপনিবেশিক শাসনামলে ইংরেজ নারীদের সংস্পর্শে বাংলার উচ্চবিত্ত নারীরা নিজেদের স্বাধীনচেতা ভাবতে শুরু করেন। অনেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে সাহসী কর্মেও যুক্ত হন। তবে তাদের ওই অগ্রযাত্রা অনেকটা সমাজসেবার গণ্ডিতে আবদ্ধ থেকেছে। আর ওই সময় তাদের ওই অগ্রযাত্রা সমাজের নিম্নবিত্ত নারীদের স্পর্শ করেনি। ফলে পুরুষ শাসিত সমাজে নারীরা কেবল পুরুষের সেবাদাসী হয়েই বেঁচে থাকাকে নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছেন। তবে পাকিস্তান শাসনামলে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে নারী জাগরণ বেশ গতি পেয়েছে। এর আগে একসঙ্গে এত নারীর-পুরুষকে পাশাপাশি মিছিল-মিটিংয়ে প্রকাশ্যে অংশ নিতে দেখা যায়নি, যদিও ইংরেজ আমলে বিচ্ছিন্নভাবে অনেক নারীর ভূমিকা ছিল আন্দোলন, সংগ্রামে। তবে ভাষা আন্দোলনে ঢাকার নারীদের পাশাপাশি জেলা শহর বা উপ-শহরের নারীরাও নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৪৮ সালে যশোর ভাষা সংগ্রাম কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক হামিদা রহমান ও নারায়ণগঞ্জের আন্দোলনের অগ্নিকন্যা মর্গান বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মমতাজ বেগম তার বড় প্রমাণ। এভাবে সিলেট, কুমিল্লা, খুলনা, দিনাজপুর, রাজশাহী, বরিশাল প্রভৃতি অঞ্চলে নারীরা ভাষা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রথম শোভাযাত্রায় মেয়েরাই প্রথম সারিতে ছিলেন। জাতীয় অধ্যাপক সুফিয়া আহমদসহ অনেক নারী সেদিন রাজপথে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান তুলেছেন।

ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি পর্বে নারীর অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বে ও নয় মাসের প্রত্যক্ষ সংগ্রামে নারীরাও মা-মাতৃভূমি রক্ষায় অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছেন। স্বাধীনতার পর অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নারীর অগ্রযাত্রা থেমে গেলেও গত এক দশকে বাংলাদেশ নারী শিক্ষাসহ নানা ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। ১৮৭৬ সালে প্রথম বাঙালি নারী হিসেবে চন্দ্রমুখী বসুর এন্ট্রান্স বা প্রবেশিকা পাস করার মাধ্যমে যে নারীর শিক্ষাযাত্রা শুরু হয়েছিল, তা এখন ছেলেদের সঙ্গে সমান তালে চলছে। তারা এখন উচ্চশিক্ষাও গ্রহণ করছেন। এসএসসি ও এইচএসসির গত কয়েক বছরের ফলাফল বলে দেয় ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সাফল্যের হার বেশি। বিসিএস পরীক্ষায়ও প্রথম হওয়ার কৃতিত্ব রয়েছে তাদের। গবেষণার ক্ষেত্রেও নারীরা বেশ খ্যাতি অর্জন করেছেন। পাটের জিন উদ্ভাবন থেকে শুরু করে ইতিহাস গবেষণায় নারীরা বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছেন। পাটের জিন আবিষ্কারক বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের প্রধান সহযোগী ছিলেন ঢাবির অধ্যাপক হাসিনা খান। অন্যদিকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আয়শা বেগম তার মৌলিক গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন পুরস্কার এবং বিশ্ব ভারতীয় পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে চিত্রশিল্পী হিসেবে নারীরা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছেন। চিত্রশিল্পী নাজমা আক্তার তার কাজের জন্য দেশ-বিদেশে বহু পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। নারীরা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বও পালন করছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটে উপাচার্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্য হিসেবে নারীর দায়িত্ব পালন প্রমাণ করেছে, নারীরা শুধু শিক্ষকতায় নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চ্যালেঞ্জিং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনেও পারদর্শী। সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রেও নারীরা পিছিয়ে নেই। তাই ফেসবুক-টুইটারের যুগে লেখক সেলিনা হোসেনের পাঠক সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। নারী উদ্যোক্তারা সফল ব্যবসায়ে। পারসোনার মতো বিশ্বমানের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান নারীদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।

দুর্গমগিরি কান্তার মেরুতেও বাংলাদেশি মেয়েদের পায়ের ধুলা পড়েছে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্ট থেকে আফ্রিকার কিলিমাঞ্জারো পর্যন্ত তারা ছুটে চলেছেন। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে মুসা ইব্রাহিমের এভারেস্ট বিজয়ের আনন্দ মুছে যেতে না যেতেই প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে নিশাত মজুমদার বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন এভারেস্টে। নিশাত মজুমদার হিমালয়ের পাদদেশে ফিরতে না ফিরতেই দ্বিতীয় বাংলাদেশী নারী হিসেবে ওয়াসফিয়া নাজনীন পা রেখেছেন এভারেস্টে। আধুনিক নারী সাংবাদিকতার অগ্রদূত মুন্নী সাহার পদাঙ্ক অনুসরণ করে সংবাদমাধ্যমগুলোয় কাজ করছেন একঝাঁক উচ্চশিক্ষিত মেধাবী নারী। নারী সাফল্যের আর একটি অর্জন নাজনীন সুলতানার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম নারী ডেপুটি গভর্নর নিযুক্তি। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস যেমন বাংলাদেশকে দিয়েছেন বিশ্বপরিচিতি, তেমনি এশিয়ার নোবেল খ্যাত র‌্যামন ম্যাগসাসে পুরস্কার পেয়ে বাংলাদেশের নারীর কৃতিত্বকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করিয়েছেন বেলা’র নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ রিজওয়ানা হাসান। কানাডার নিউ ফাউন্ডল্যান্ডে এসটি জোনস শহরে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব উইমেন পুলিশের ৫০তম বার্ষিক সম্মেলনে ‘আইএডব্লিউপি-২০১২’ পুরস্কারে ভূষিত হন আরেক এক বাংলাদেশি কৃতী নারী আবিদা সুলতানা। শুধু পুলিশে নয়, সেনাবাহিনীর প্রথম সেনা অফিসার হওয়ার গৌরব অর্জন করে ক্যাপ্টেন জান্নাতুল ফেরদৌস নারীর অর্জনকে নিয়ে গেছেন নতুন উচ্চতায়।

রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ নতুন নয়। এ দেশের নারীরা প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর পদ অলংকৃত করেছেন বহুবার। এখন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রধান, স্পিকার, মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ নানা পদে দায়িত্ব পালন করে রাজনীতিতে কেবল তাদের সরব উপস্থিতি নয়; প্রভাব বজায় রেখেছেন তারা। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে যে নারীর নবযাত্রা শুরু হয়েছিল, সেনাবাহিনীর গর্বিত সদস্য হওয়ার মাধ্যমে তা  আজ পরিপূর্ণতা পেয়েছে।

বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, সেতারা বেগম, প্রীতিলতা প্রমুখ মহীয়সী নারীর নামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নারী কোম্পানিগুলোর নামকরণ করাই বলে দিচ্ছে ওই মহীয়সী নারীরা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই পথেই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। শফী হুজুরের নারীদের কেবল ক্লাস ফাইভ পাস করার তত্ত্ব যে বাংলাদেশের নারীরা গ্রহণ করেননি এটা তার বড় প্রমাণ। জঙ্গিবাদ-ধর্মান্ধ শক্তির উত্থানে সারা বিশ্ব যখন আতঙ্কিত, সেই সময়ে আমাদের মেয়েদের সেনাবাহিনীর মতো একটি পেশাদার বাহিনীতে কাজ করা এবং এই চ্যালেঞ্জিং পেশায় পুরুষের পাশাপাশি সমান তালে এগিয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে অন্যদেরও প্রগতিশীলতার পথ দেখাবে। আর এই অর্জন শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, তা নয়। জাতিসংঘ শান্তি মিশনে কাজ করা এ দেশের নারী পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি এই নারী সৈনিকরাও  বহির্বিশ্বের শান্তিরক্ষায় যুক্ত হয়ে এই গৌরব ছড়িয়ে দিচ্ছে দেশ থেকে দেশান্তরে, মুসলিম বিশ্বের পশ্চাৎপদ নারীদেরও নারী অধিকার আদায়ে নতুন পথ দেখাচ্ছে। মোল্লাতন্ত্রের শিকল ভেঙে ওইসব দেশের নারীরাও বাংলাদেশের নারীদের পথ অনুসরণ করে মুক্তির আস্বাদ পাবেন।

নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ পুলিশের নারী সদস্যরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি মিশনে কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও আধুনিক মনস্ক মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নতুন পরিচয় দেখছে আধুনিক বিশ্ব। সৃষ্টি হচ্ছে নতুন ইতিহাস। পাশাপাশি ওই শান্তি মিশন থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে তারা দেশের অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করছে। নারীরা এখন আর বোঝা না হয়ে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জিং কাজে যুক্ত হয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য হয়ে উঠছে রোল মডেল। অন্যদিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং পুলিশে নারী সদস্যরা যুক্ত হওয়ায় নারীদের সম্পর্কে প্রচলিত সামাজিক ধারণার পরিবর্তন হচ্ছে। মোল্লাতন্ত্রের ফতোয়া ‘নারীরা দুর্বল তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে পুরুষ। তাই পুরুষ সঙ্গী ছাড়া নারীর ঘরের বাইরে বের হওয়া যাবে না’ তত্ত্ব অন্তঃসারশূন্য প্রমাণিত হচ্ছে। কারণ, সেনাবাহিনী ও পুলিশে কর্মরত নারীরা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুরুষেরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। নারীর এই নতুন পথচলা নারী মুক্তির পাশাপাশি মোল্লাতন্ত্রের সামাজিক প্রভাব ক্ষুণ্ন করছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো মুসলিম বিশ্বের অন্য দেশগুলোর নারী মুক্তির আন্দোলনকেও প্রভাবিত করবে।

পরিশেষে, নারীর এই অদম্য পথচলা ততদিনই সম্ভব হবে, যতদিন ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বেঁচে থাকবে। আর অসাম্প্রদায়িক-ধর্মান্ধ-জঙ্গিবাদমুক্ত বাংলাদেশই কেবল সেই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ