করোনা প্রতিরোধে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কেন জরুরি?

Send
মো. আবুসালেহ সেকেন্দার
প্রকাশিত : ২০:০৫, মার্চ ২৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:১৫, মার্চ ২৩, ২০২০

মো. আবুসালেহ সেকেন্দারকরোনা ভাইরাসের মতো আরেক ভাইরাসজনিত রোগ মহামারিরূপে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর তাণ্ডবলীলা চালিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর দিনগুলোয়।  স্প্যানিশ ফ্লু খ্যাত ওই মহামারিতে বিশ্বের প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন। তরুণ-বৃদ্ধ-শিশু, ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, আস্তিক-নাস্তিক তথা ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ ওই স্প্যানিশ ফ্লুতে মারা যান। গবেষকদের দাবি, ওই স্প্যানিশ ফ্লুতে বিশ্বব্যাপী মারা যায় প্রায় ১৯ থেকে ৫০ মিলিয়ন মানুষ। অনেকের মতে, মৃত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১০০ মিলিয়ন।  তৎকালীন সময়ে স্প্যানিশ ফ্লুতে মৃত্যুর মিছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত মানুষের চেয়েও বেশি ছিল। জানুয়ারি ১৯১৮ থেকে ডিসেম্বর ১৯২০ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী চলা ওই স্প্যানিশ ফ্লুর তাণ্ডবে ভারতের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উত্তর ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া ওই ফ্লু তার যৌবনকাল পেয়েছিল ভারতে আসার পর। ফলে পুরো ভারতে প্রায় ১২ থেকে ১৭ মিলিয়ন মানুষ মারা যায় বলে গবেষকরা দাবি করেছেন। আর ভারতের মধ্যে বাংলা অঞ্চলে আক্রান্ত ও মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল। বাংলার পরিস্থিতি এত খারাপ ছিল যে, মৃত মানুষের লাশে ভরে উঠেছিল গঙ্গা। লাশের সৎকার করার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল।

করোনা ভাইরাসের মতো স্প্যানিশ ফ্লুও বন্যপ্রাণী বা পাখি থেকে মানুষে ছড়িয়েছিল। করোনা ভাইরাসের মতো ওই ফ্লুর আক্রমণের মূল জায়গা ছিল মানুষের ফুসফুস। ফলে শ্বাসকষ্টজনিত রোগেই অধিকাংশ মানুষের মৃত্যু হয়। প্রথমদিকে ভারতীয়রা স্প্যানিশ ফ্লুকে গুরুত্ব দেয়নি। কারণ, তারা মনে করেছিল ইউরোপের ঠান্ডা আবহাওয়ায় জন্ম নেওয়া ওই ফ্লু ভারতের আবহাওয়ায় খুব বেশি দিন কার্যকর থাকতে পারবে না। ফলে ভারতীয়রা স্প্যানিশ ফ্লুর ক্ষতিকর প্রভাবকে এক ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ভারতীয় অর্থনীতি থেকে অধিক মুনাফা লাভের আশায় ব্রিটিশ সরকার সাধারণ মানুষের জীবনের চেয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে সামাজিক বিছিন্নতা বা Social Distancing-এর প্রচার বা নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগে ব্রিটিশ সরকারের আগ্রহ ছিল কম। তৃতীয়ত, ধর্মীয় নেতাদের গোঁড়ামি ও কুসংস্কার নির্ভর ফতোয়া বিশেষ করে মুসলিম ওলামাদের প্রচার ‘ইসলামে ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই’ এবং হিন্দু গুরুদের স্প্যানিশ ফ্লু’র চিকিৎসায় কুসংস্কার নির্ভর টোটকা প্রদানের কারণে সাধারণ মানুষ স্প্যানিশ ফ্লু থেকে নিজেকে রক্ষার বিজ্ঞাননির্ভর চিকিৎসার চেষ্টা খুব বেশি করেনি। ফলে শেষ পর্যন্ত ওই ফ্লুর আক্রমণে বাংলাসহ ভারতের অনেক অঞ্চল শ্মশানে পরিণত হয়।

বর্তমান করোনা ভাইরাসের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলেও দেখা যাবে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, সরকার ও ধর্মনেতাদের মধ্যে স্প্যানিশ ফ্লুর মহামারির শুরুর দিনগুলোরই যেন পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হচ্ছে ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়া।

সরকার অর্থনীতির ক্ষতি বিবেচনা করে পুরো দেশ লকডাউন করতে আগ্রহী নয় বলে মনে হয়। কিছু ওলামাদের দেখলাম, ‘ইসলামে ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই’- তত্ত্ব নিয়ে ব্যস্ত আছেন। আর সাধারণ মানুষ মনে করছেন করোনা ভাইরাস তো সামান্য জ্বর সর্দি কাশি- এ আর এমনকি। কিন্তু চীনের উহানের পর ইতালির দিকে তাকালে বোঝা যায় করোনা ভাইরাস কত ভয়ঙ্কর। ইতালিতে একদিনে ৮০০ মানুষের মৃত্যুই বলে দেয় সবচেয়ে উন্নত জীবন ও চিকিৎসা ব্যবস্থার সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও সেখানে মৃত্যুর মিছিল থামানো যাচ্ছে না। যদিও করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রথম পর্যায়ে রোগের মাত্রা বিবেচনায় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করলে এই মৃত্যুর মিছিল থামানো যেত।  চীনের প্রতিবেশী হওয়া সত্ত্বেও ম্যাকাও, সিঙ্গাপুর ও তাইওয়ান তার বড় উদাহরণ হতে পারে। চীনে যখন করোনা ভাইরাস আক্রমণ করেছে তখন ওই রাষ্ট্রগুলো তাদের পূর্ববর্তী সার্স ভাইরাস মোকাবিলার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রথম থেকেই করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। করোনা ভাইরাসের টিকা ও ওষুধ না থাকায় তারা প্রধানত দুটি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। 

এক. যারাই এ সময় ওই দেশে প্রবেশ করেছেন তাদের সবাইকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে কোয়ারেন্টিনে রাখার ব্যবস্থা করেছে।  দুই. আক্রান্ত ব্যক্তিদের সামাজিক বিছিন্নতার নীতি মেনে আইসোলেশনে বা অন্যদের থেকে আলাদা রেখেছে। ফলে করোনা ভাইরাসের জীবাণু কেউ বহন করলেও একজন থেকে অন্যজনে সংক্রমিত হতে পারেনি।

ডিসেম্বরে করোনা ভাইরাসের আক্রমণ চীনে হওয়ার পর বাংলাদেশেরও ম্যাকাও, সিঙ্গাপুর ও তাইওয়ানের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ ছিল। যারাই বিদেশ থেকে আসবে তাদের ১৪ দিন বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে রাখার বিধান চালু করা যেত।

অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রবেশের শর্তই হতো, করোনা ভাইরাসের লক্ষণ প্রকাশিত হোক আর না হোক, স্থল, আকাশ, জল যে পথেই দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা হোক না কেন ১৪ দিন বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। কারণ করোনাভাইরাস যদি কেউ বহন করে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তার লক্ষণ প্রকাশ পায় না। ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে ওই লক্ষণ প্রকাশ পায়। ফলে কোনও লক্ষণ প্রকাশ ছাড়াই যে কেউ ওই ভাইরাস বহন করে অন্যকে সংক্রমিত করতে পারে। কিন্তু সরকারের উদাসীনতায় ওই ধরনের কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। শুরুতে লোক দেখানো কিছু লোকের কোয়ারেন্টিন করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে পরবর্তী সময়ে অবস্থার ভয়াবহতা টের পেয়ে এখন কঠোর পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে।

গত জানুয়ারি থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রায় ৭ লাখ লোক বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে তার মধ্যে মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন নামকাওয়াস্তে কোয়ারেন্টিনে থেকেছে। বাকিদের হদিস এখনও করা সম্ভব হয়নি।

মনে রাখা দরকার, একজন করোনা ভাইরাস বহনকারীও যদি অন্য মানুষের সংস্পর্শে আসে তাহলে যত পদক্ষেপই নেওয়া হোক না কেন করোনার সংক্রমণ রোধ করা যাবে না। যার বড় উদাহরণ দক্ষিণ কোরিয়া। সেখানে একজন ব্যক্তি থেকে হাজার হাজার ব্যক্তি সংক্রমিত হয়েছে। ওই ব্যক্তি যে করোনা ভাইরাস বহন করছে তা প্রথমে জানা যায়নি। ফলে তিনি অবাধে চলাচল করেছেন। চার্চে গিয়েছেন প্রার্থনার জন্য। রেস্টুরেন্টে গিয়েছেন বন্ধুদের সঙ্গে ডিনার খেতে। যার ফলশ্রুতিতে ওই চার্চে প্রার্থনায় অংশ নেওয়া কয়েক হাজার মানুষ এবং রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া মানুষরা তার মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছে। যার পরবর্তী ফলাফল ছিল দক্ষিণ কোরিয়ায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। ইতালিতেও একই ঘটনা ঘটেছে। সেখানেও করোনা বহনকারী একজন ব্যক্তির প্রতি উদাসীনতার ফল এখন তারা ভোগ করছেন। তাই বাংলাদেশ সরকারের এখন প্রথম কাজ হবে করোনাভাইরাস বহনকারী প্রতিটি ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা। আর এই চিহ্নিত করার কাজ খুব সহজ নয়। কারণ, করোনা এক অজ্ঞাত শত্রু  যে নিজেকে প্রকাশ করতে ৭ থেকে ১৪ দিন সময় নেয়।

তাই অনেকেই মনে করছিলেন সরকারের উচিত আগামী দুই সপ্তাহের জন্য পুরো দেশ লকডাউন করে সব মানুষকে সামাজিক বিছিন্নতার নীতি কঠোরভাবে পালন করতে বাধ্য করা। আজকে সরকারের পক্ষ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে, যদিও এটাকে লকডাউন বলা যায় না।  সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ওপরই বেশি জোর দিয়েছেন। যার ফলে গাড়ি চলাচল সীমিত করতে বলা হয়েছে। এটা মনে রাখতে হবে, কোনও মানুষ ঘর থেকে বের হতে না পারলে নতুন কেউ সংক্রমিত হবে না।

এরমধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ায় কারা করোনা ভাইরাস বহন করছে তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। তখন ওই সংক্রমিত ব্যক্তিদের আইসোলেশনে রেখে এবং তার সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইনে রেখে করোনো ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানো যাবে। এই মুহূর্তে এর কোনও বিকল্প নেই।

দুই সপ্তাহ দেশ লকডাউন থাকলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু কারা ভাইরাস বহন করছেন তা চিহ্নিত করতে না পারলে সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা দিন দিন জ্যামিতিক হারে বেড়ে মহামারির রূপ নিলে দেশের অর্থনীতি দুই সপ্তাহ লকডাউনের চেয়েও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর মানুষের জীবন রক্ষার চেয়ে অর্থনীতি রক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়।

পদ্মা সেতু, ফ্লাইওভার বা মেট্রোরেল যে সাধারণ মানুষের জন্য করা হচ্ছে, তারাই যদি করোনার মহামারিতে মারা পড়ে তাহলে ওই উন্নয়ন দিয়ে কী হবে! মানুষের জীবনের চেয়ে দেশের অর্থনীতি-উন্নয়ন বড় হতে পারে না।

আর পুরো দেশ দুই সপ্তাহ লকডাউন করলে অর্থনীতির যে ক্ষতি হবে তা বিদেশে পাচার করা হাজার হাজার কোটি টাকা অথবা বিগত সময়ে রাজনৈতিক দলের হরতাল অবরোধের সময়ের অর্থনীতির ক্ষতির তুলনায় নস্যি। তাই যত দ্রুত সম্ভব সামাজিক বিছিন্নতার নীতি কঠোরভাবে পালন করার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করছি।

লকডাউন প্রকৃতপক্ষে কার্যকর করার জন্য অবশ্যই দিন আনে দিন খাওয়া শ্রমজীবী মানুষদের খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। আজ দেখলাম এ বিষয়েও সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তাই সামনের সময় শ্রমজীবী মানুষের জন্য রেশন সরবরাহ করার বিষয়টি আমলে নেওয়ার দাবি করছি।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ