এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে?

Send
মামুন রশীদ
প্রকাশিত : ১৭:০২, মে ০৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৩, মে ০৩, ২০২০

মামুন রশীদঅনেকেই বলেন, বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। তাদের মতে, ঢাকা তো দিল্লি নয় যে পথেঘাটে নারীদের লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে। ভারতের রাজধানীতে এত কিছু হওয়ার পরও বলা হচ্ছে ‘সাইনিং ইন্ডিয়া, ‘ডেজলিং ইন্ডিয়া। আমরা তো ট্রাম্পের মতো আজব আজব কথা বলছি না। আমরা তো পুতিনের মতো এত খুনোখুনি করছি নাকিংবা আমাদের সরকার তো মালয়েশিয়া সরকারের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত নয়, ফিলিপাইন বা থাইল্যান্ডের মতো এত নৈতিক স্খলন হয়নি কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের মতো স্বৈরশাসকও নয়। আমরা তো ভালোই আছি। হ্যাঁ, এক হিসাবে ভালোই আছি। আমার এ লেখার উদ্দেশ্য এটা বলা নয় যে বাংলাদেশ অতলে তলিয়ে যাচ্ছে। মূল বিষয় হচ্ছে, আমরা একটি আটপৌঢ়ে চক্রে আটকে যাচ্ছি কিনা? আমরা কি একটি পারস্পরিক পিঠ চুলকানোর মতো সাময়িক সাফল্যের চক্রে আটকে যাচ্ছি?
একটি দেশের চারটি স্তম্ভ কী? এগুলো হচ্ছে সংসদ, সরকার, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যম। এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি, আমাদের সরকারগুলো যেভাবেই হোক ক্ষমতায় থাকার জন্য যেসব কাজ করে, সেগুলো কিন্তু একটি চক্র থেকে বেরিয়ে গিয়ে আমরা একটি সম্মানিত জাতি হিসেবে আবির্ভূত হবো, সম্মানিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত  হবো, , সেটা হতে দিচ্ছে না। ফলে তরুণরা রাজনীতি বিমুখ হয়ে যাচ্ছে। তারা হয়তো বিরোধী দলকে পছন্দ করছে না, বিরোধী দলের অনেক কিছুর বা কোনও কোনও ব্যক্তির সমালোচনাও করছে। আবার একই সঙ্গে তারা সার্বিকভাবে বলছে, সরকারি দলও অনেক অন্যায় করছে, দুর্নীতি করছে। কিন্তু তারা নিদেনপক্ষে একজনকে বেছে নিচ্ছে। যে আনন্দঘন পরিবেশে, যে সম্মানজনক পরিবেশ-পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে আমাদের বরণ করে নেওয়ার কথা, সেটা কিন্তু আমরা পারছি না। অসত্য হবে না এটা বলা যে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছে না।
যানবাহন সমস্যা একটি বড় সমস্যা। আমরা অনেক দিন ধরে শুনে আসছি মালিকদের কারণে ঢাকার যানবাহন ব্যবস্থা উন্নত করা যাচ্ছে না। এ সমস্যা সমাধান না হওয়ার পেছনে ব্যক্তিস্বার্থ রয়েছে। আগের সরকারের আমলে আমরা শুনেছিলাম যানবাহন ব্যবস্থা একজন এমপি নিয়ন্ত্রণ করেন। এখন শুনছি আরেকজন এমপি নিয়ন্ত্রণ করছেন। আমরা এক হাত থেকে আরেক হাতে চলে যাচ্ছি। আমরা এখনও শুনতে পাই শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যাত্রীদের প্রচুর জিনিস চুরি হয়। যাত্রীরা সময়মতো মালপত্র পায় না। দীর্ঘ সময় লেগে যায় মালপত্র পেতে। বন্দর আধুনিকায়ন করার পরেও বহু জায়গায় যেতে হয়। আমাদের এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। এটা কিছুতেই আমরা ভাঙতে পারছি না। ক্ষণে ক্ষণে সুযোগ পেলে বারবার পিছিয়ে থাকা গোষ্ঠী, ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর সঙ্গে আমাদের আপস করতে হচ্ছে।
আমার প্রায়ই মনে হয়, আসলে দেশটা কে চালায়? প্রত্যেকে বলছে, এভাবে হওয়া উচিত নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে যত এমপি, মন্ত্রী ও সরকার সমর্থককে চিনি, তারা প্রত্যেকে বলেছেন, যানবাহন ব্যবস্থা যেভাবে চলছে সেভাবে চলতে পারে না। যানবাহনের চালকরা যেভাবে যাত্রীদের সঙ্গে ব্যবহার করছেন, মানুষকে জিম্মি করছেন, এভাবে চলতে পারে না। আমাদের যানবাহন ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করতে হবে। আমাদের বন্দরকে আধুনিকায়ন করতে হবে। কিন্তু এগুলো আমরা করতে পারছি না। আমরা ছোট ছোট স্বার্থের জন্য বড় বড় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিচ্ছি। বছরের পর বছর কেটে গেলেও এসব সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। মাস্তানি, চাঁদাবাজি বন্ধ করা যাচ্ছে না। এগুলো কিন্তু যুদ্ধাপরাধের বিচার বা গণতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত নয়। এগুলোর বিচার কবে হবে? গ্রিসের তরুণরা শপথ নিতেন- আমরা যে গ্রিসে জন্ম গ্রহণ করেছি, তার থেকে উন্নত গ্রিস নির্মাণের চেষ্টা করবো। আমাদের সংসদ সদস্য, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান, আইন-আদালতের কর্তাব্যক্তি, তাদের দায়বদ্ধতা কার কাছে? সরকারের পর সরকারের পরিবর্তন ঘটছে, কিন্তু আমরা তো পারছি না চিকিৎসকদের গ্রামে পাঠাতে। চিকিৎসকদের গ্রামে রাখতে পারছি না, বেতন বৃদ্ধি করেও রাখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশে ৭৭ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় নিজেদের পকেট থেকে দিতে হয়। একটি ডেথ সার্টিফিকেট বের করার জন্য অনেক সময় লেগে যায়। এসবের জন্য তো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অবশ্যই হতে হবে এবং হয়েছেও। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে, অতীব আনন্দের বিষয়। কিন্তু এখন আমরা কী দেখতে চাই? আমরা চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছি, এটা দেখতে চাই না। এগুলো কারা দেখবে? শুধু কি আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথাই বলবো, নাকি এগুলোর কথাও বলবো। শিক্ষকরা আজ শিক্ষার কাজ বাদ দিয়ে রাজনীতিতে বেশি মনোযোগী। এ জন্য তো কোনও জবাবদিহি করা হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে মাস্টার্স শেষে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার প্রবণতা কমছে। অনেকে স্থানীয়ভাবে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন। কিছু শিক্ষক আশেপাশের দেশ থেকে ডিগ্রি নিচ্ছেন। এগুলোর মান নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যেই অনেক সন্দেহ।
এ জবাবদিহিহীনতা, পরিবহন ব্যবস্থায় অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ হবে কবে? শহরের অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও গ্রামের অবস্থা খুব খারাপ। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তারা যে আচরণ করেন, তা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের আচরণ হতে পারে না। ব্যবসায়ী হবো, ঋণের টাকা ফেরত দেবো না, পত্রিকা দেবো, টিভি চ্যানেল দেবো- এমন একটি মনোভাব তৈরি হয়েছে। কৃষি পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত একটি উচ্চশিক্ষিত পরিবারের দুই সন্তান যারা বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যবসায় খুব ভালো করছেন, তাদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম সর্বোচ্চ সময় তারা কোথায় ব্যয় করেন। জানান, তারা ব্যবসার কাজে সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় করেন এবং তাদের বাবা সর্বোচ্চ সময় দেন টেলিভিশন চ্যানেলে। কেন? তারা জানালেন, আগে তাদের ব্যবসার কাজ করতে গিয়ে চাঁদাবাজির শিকার হতে হতো, যানবাহনের মালিকরা সমস্যা করতেন, পণ্য পরিবহন নিয়ে সমস্যা তৈরি করতেন, এ ধরনের অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হতো। কিন্তু টিভি চ্যানেল দেওয়ার পর এখন কেউ আর সমস্যা করছে না বা করলেও তা অনেক কম। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি গণমাধ্যমের এ ধরনের উত্থান চেয়েছিলাম? এই যে উন্নয়নের একটি মডেল বা খাঁচার মধ্যে আটকে যাচ্ছি আমরা, এটি ভাঙব কীভাবে? এখন প্রচুর জনসংযোগ বা পিআর হচ্ছে। টু মাচ পিআর। সবাই পিআর নিয়ে খুব ক্রেজি, সবাই টেলিভিশনে মুখ দেখাতে চায়। যে কাজ রাজনৈতিক দলগুলোর করার কথা, সেটা অনেক নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান করছেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধানকে কেন জনপ্রিয় নেতা হতে হবে? এমন উদাহরণ বিশ্বে সম্ভবত আর নেই।
আগে আমরা পরাধীনতার খাঁচায় ছিলাম, এখন অন্য খাঁচায় বন্দি হয়ে যাচ্ছি। সরকারের সঙ্গে থাকতে হবে, একটু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলতে হবে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে বড় অংকের ঋণ নিতে হবে, ব্যবসা করতে হবে, ঋণখেলাপি হতে হবে, রবীন্দ্রনাথকে না বুঝলেও একটু পৃষ্ঠপোষকতার ভাব করতে হবে, প্রয়োজনে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের পা ধরে সালাম করতে হবে- এমন মনোভাব দেখতে হচ্ছে। বেসরকারি ব্যাংককে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের টাকা দিয়ে রক্ষা করার চেষ্টা গোটা বিশ্বের কাছে উদাহরণ বটে। আমরা কি এই ইতিহাস গড়তে চেয়েছিলাম? আমরা যে এই নতুন খাঁচার ভেতর আটকে পড়ছি, সে খাঁচা ভাঙবো কি করে? করোনার অভিজ্ঞতা কি আমাদের এ থেকে বের করতে পারবে?

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ