মানুষের পুলিশ

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৪:২৪, মে ০৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২৫, মে ০৬, ২০২০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাপশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের নানা রাজ্যের যে ছবিগুলো এই করোনাকালে পাওয়া গেছে, সবকটিতেই দেখা যাচ্ছে সেখানকার পুলিশ খুব মারমুখী আচরণ করছে জনতাকে ঘরে আটকে রাখতে। লাঠিপেটা করা ছাড়াও নিবর্তনমূলক বিভিন্ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে সরকার ঘোষিত লকডাউন সফল করতে। সেদিক বিবেচনা করলে বাংলাদেশের পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সেনাসদস্যরা অনেক ধৈর্য ধরে মানুষকে বোঝাবার চেষ্টা করেছে। শুধু তাই নয়, তারা অসহায় মানুষকে ত্রাণ দিয়েছে, করোনা আক্রান্ত মানুষকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া বা মারা যাওয়া মানুষকে দাফন কাফনেও এগিয়ে এসেছে। সেনাসদস্যরা নিজেদের রেশন বিলিয়ে দিচ্ছেন, বিভিন্ন জায়গায় মেডিক্যাল ক্যাম্প করেছেন মানুষকে স্বাস্থ্য সহায়তা দিতে।
করোনাকালে আমরা অনেক কিছু হারিয়েছি। দেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বহু মানুষ রোজগার হারিয়েছে। কিন্তু এই সময়ে আমাদের প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাসদস্যদের এই মানবিক মুখ বড় অর্জন হিসেবেই বিবেচিত হবে।

সেনাবাহিনীকে বিশেষ প্রয়োজনে ডাকা হয়েছে, তারা আবার চলেও যাবে সেনানিবাসগুলোতে। কিন্তু পুলিশ থাকবে মানুষের মাঝে সাধারণ আইনশৃঙ্খলা ও জনজীবনে শান্তি বজায় রাখার জন্য। করোনায় পুলিশ সদস্য মারা গেছেন, আক্রান্ত অনেকে চিকিৎসাধীন আছেন। এবার পুলিশ মানুষের যে বাহবা কুড়িয়েছে, সেটা তাদের জন্য আগামী দিনের বড় পুঁজি বলেই মনে করছি। পুলিশকে প্রয়োজনে কঠোর হতেই হয়, বিশেষ করে যারা আইন মানতে চায় না, যারা দাগী অপরাধী, তাদের সঙ্গে। আবার রাজনৈতিক কারণে পুলিশ ব্যবহৃত হয়, সেটাও সবার জানা। কিন্তু সবসময় প্রত্যাশা থাকে, পুলিশ জনতার বন্ধু হিসেবে কাজ করবে, কারণ যেকোনও বিপদে প্রথম মানুষ পুলিশের কথাই ভাবে, তাদের কাছেই যাওয়ার চেষ্টা করে। সেখানে গিয়ে ভালো ব্যবহার আর সাহায্য না পেলে মানুষ হতাশ হয়। মানুষ সরকারের বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠান থেকেই বঞ্চিত হয়, কিন্তু পুলিশ যেহেতু অনেক দৃশ্যমান, তাই এই বাহিনীর নেতিবাচক কোনও কিছু নিয়ে আলোচনা অনেক বেশি হয়।

বর্তমান সরকারের সময়ে পুলিশ বাহিনীর আধুনিকায়নে, তাদের সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণে অনেক রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ হয়েছে। এবং এর একটা ইতবাচক ফলও আমরা দেখেছি। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস দমনে আমাদের পুলিশ বাহিনী প্রত্যাশিত সাফল্য দেখিয়েছে।

এ বছর জানুয়ারি মাসে পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘জনগণ যেন পুলিশ বাহিনী থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবাটা পেতে পারে, সেজন্য আমরা পুলিশকে আধুনিক ও জনবান্ধব করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনের মধ্য দিয়ে যেকোনও ধরনের দমন করা সহজ এবং সেই দৃষ্টিকোণ থেকে পুলিশ কাজ করবে, সেটাই আমার প্রত্যাশা।’

এই লেখা যখন লিখছি তখন সামাজিক মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে পুলিশ ফটো সাংবাদিক কাজলকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বেনাপোলের আদালতে। বিশ্ব প্রেস ফ্রিডম ডে-তে এমন এক ছবি সাংবাদিকসহ মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা প্রতিটি হৃদয়কে আহত করেছে। তবে একথাও বুঝতে পারি, ফটো সাংবাদিক কাজলের বিষয়টিতে পুলিশের চেয়েও ওপরে কোনও কর্তৃপক্ষ জড়িয়ে আছে।

আমরা সবাই জনবান্ধব পুলিশ দেখতে চাই। কিন্তু সেটা কী করে হবে, তা বলা খুব কঠিন। এখানে চলে আসবে পুলিশ-জনতার সংখ্যানুপাত প্রসঙ্গ, পুলিশের লজিস্টিকস বাড়ানো, সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানোর বিষয়গুলো। চাহিদা ও রাষ্ট্রীয় সামর্থ্য বিবেচনায় এগুলো একটা প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে করতে হয়। কিন্তু মনস্তত্ত্বের জায়গা থেকে একটা কথা বলতে পারি এবং সেটা খুব কঠিন নয় বলেই ধারণা করি। এর জন্য সুযোগ-সুবিধা বা লজিস্টিকসও বড় উপকরণ নয়। আমরা এমন একটা দিন চাই যেদিন থেকে আমরা সবাই জানব, থানা হবে সেবার কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে সাধারণ মানষ নির্ভয়ে যাবে, সেবা নিয়ে বের হবে হাসিমুখে।

করোনা উত্তর বাংলাদেশে এটি বড় কোনও চাওয়া নয় নিশ্চয়ই। এবং আমরা বিশ্বাস করি সেই প্রচেষ্টাও আছে এই বাহিনীর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে। পুলিশ হৃদয়হীন, এমন একটা ভাবনা এবার এই করোনা সংকটে অনেকখানি দূরীভূত হয়েছে বলে মনে করছি। এটা ধরে রাখাটা একটা চ্যালেঞ্জ। খুব বেশি কিছু নয়, বিপদগ্রস্ত নারী আর শিশুদের সুরক্ষায় পুলিশ বড় নজির রাখতে পারলেই বদলে যাবে পুরো চিত্রটা।

শুধু এই করোনা পরিস্থিতিতে নয়, নানা সময় পুলিশ বাহিনী তাদের ত্যাগের দৃষ্টান্ত রেখেছে। এই সরকারের আমলে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর স্বাধীনতাবিরোধী চক্র যে তাণ্ডব শুরু করেছিল, আমরা দেখেছি সেই সন্ত্রাস দমন করতে গিয়ে প্রায় ৩০ জন সদস্য জামায়াত কর্মীদের সহিংস হামলায় শহীদ হয়েছিলেন। এতসব কিছুর পরও বাহিনীকে আরও সক্ষম, আরও জনবান্ধব করার কথা উচ্চারিত হয় এবং সেজন্য সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।

পুলিশ বেশি সমালোচিত হয়, কারণ পুলিশের কাজ মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এই বাহিনীর একজনও যদি কোনও অন্যায় বা নিয়মবহির্ভূত কিছু করেন, তার প্রভাব অনেক বেশি হয়। কেউ যদি অন্যায়ভাবে আটক হয়,  কোনও কাজে পুলিশের সামান্যতম বিচ্যুতিও মানুষকে রাগান্বিত করে। একটা কথা মনে রাখা দরকার, মানুষের স্বাধীনতা খর্ব করার জন্য পুলিশকে অধিকার দেওয়া আছে ন্যায়সঙ্গত আইনি উপায়ে। কিন্তু সবসময় যে ন্যায়সঙ্গত উপায়ে সেটা হয়, তা বলা যাবে না এবং সে কারণেই সমালোচনা হয় ব্যাপকভাবে।

আশা অনেক। বিপুল চাহিদা বা প্রত্যাশার বিপরীতে কিছু ঘটলেই অনাস্থা তৈরি হয়। আর এজন্য কঠোরতম উপায়ে এই বিষয়গুলোর প্রতি নজর দেওয়া গেলে পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছি।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ