ভয়কে জয় করাই জরুরি

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৯:৪৪, মে ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৪৯, মে ২০, ২০২০

রেজানুর রহমানঘরে থাকুন এবং ঘরেই থাকুন। কিন্তু ঘরে থাকার স্থায়িত্ব কতদিন? কেউ জানি না। সে কারণেই দেশজুড়ে মানুষের অস্থিরতাটা বেশি। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে তাতে দেশের সব মানুষের অনন্তকাল ঘরে বসে থাকা কি আদৌ সম্ভব? আমার এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই হয়তো বলতে চাইবেন, ঘরে বসে না থেকে কি মরতে চান? যান মরেন গিয়া... উন্নত অনেক দেশের উদাহরণ দিতে চাইবেন কেউ কেউ। হোচি মিনের ভিয়েতনাম অথবা জাস্টিন ট্রুডোর কানাডার উদাহরণও দিতে চাইবেন কেউ কেউ। তাদের উদ্দেশে আমার বিনীত জিজ্ঞাসা,  জাস্টিন ট্রুডো তার দেশের মানুষকে যেভাবে আগলে রেখেছেন অর্থাৎ দেশের মানুকে অর্থনৈতিকভাবে যে নিশ্চয়তা দিয়ে যেভাবে বলেছেন, ‘আপনারা ঘরে থাকুন, আপনাদের খাবার, আপনাদের বেতন, অন্যান্য সব সুযোগ-সুবিধা ঘরে পৌঁছে দেওয়া হবে’। একই নিশ্চয়তা অর্থাৎ একই ধরনের ভরসার কথা কি বাংলাদেশের মানুষের জন্য দেয়া সম্ভব? এর উত্তর হবে- না। বাংলাদেশ এমন কোনও অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর এখনও নিজেকে দাঁড় করাতে পারেনি যে অনন্তকাল দেশের মানুষকে ঘরে বসিয়ে রেখে খাওয়াতে পারবে। আমার ধারণা সবাই আমার এই কথার সঙ্গে একমত হবেন। তাহলে বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিন দেশের মানুষকে ঘরে বসিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এবার হয়তো কেউ কেউ বলতে চাইবেন, তার মানে কি আপনি সবকিছু খুলে দেওয়ার পক্ষে? একজন সচেতন মানুষ হয়ে আপনি একথা বলতে পারেন না। এসব ‘আউল ফাউল’ কথাবার্তা বন্ধ করুন। করোনা থেকে বাঁচার একটা মাত্র পথ হলো, ঘরে থাকা এবং ঘরেই থাকা...।

বিনীতভাবে এই কথাগুলোর সঙ্গেও সহমত পোষণ করছি। কিন্তু আমার ওই প্রশ্নের উত্তর তো পাচ্ছি না। ঘরে যে থাকবো, কতদিন? যারা অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল, যাদের ভোগ-বিলাসের জীবন তাদের পক্ষেও বোধকরি অনন্তকাল ঘরে বসে থাকা সম্ভব নয়। চিন্তা করে দেখুন, যারা ভরপেট খেয়ে, আরাম আয়েশে থেকে জীবনযাপন করছেন তাদেরই যখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, আর পারি না বাপু! এভাবে আর কতদিন ঘরে থাকা যায়? সেখানে যাদের ঘরে খাবার নেই, যারা দিন আনে দিন খায় তাদের কতদিন ঘরে বসিয়ে রাখা সম্ভব? সবকিছু সহ্য করা যায়। কিন্তু পেটের ক্ষুধা কী আদৌ সহ্য করা যায়? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই দেখলাম, একজন লিখেছেন, তার এলাকায় একদল কুকুর বাস করে। খুবই নিরীহ ও শান্তশিষ্ট কুকুরগুলো। করোনার আগে কখনোই তারা মানুষকে উৎপাত করেনি। কিন্তু বর্তমান সময়ে কুকুরগুলো অনেক হিংস্র হয়ে উঠেছে। মানুষ দেখলেই ঘেউ ঘেউ শুরু করে দেয়। কামড়াতে চায়। ভদ্রলোক ঘটনার বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন, ওরা আসলে না খেতে খেতে হিংস্র হয়ে উঠেছে। আগে এলাকার হোটেল, রেস্তোরাঁর উচ্ছিষ্ট খাবার খেতো। বাসা-বাড়ির লোকজনও তাদের জন্য উচ্ছিষ্ট খাবার ফেলে দিতো। এখন বাসা-বাড়ির উচ্ছিষ্ট খাবার কমে এসেছে। উপরন্তু তাদের খাবারের বড় উৎস হোটেল, রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকায় খাবার না পেয়ে অবলা প্রাণীগুলো দিনে দিনে অতিমাত্রায় হিংস্র হয়ে উঠছে...।

কুকুরের সঙ্গে মানুষের তুলনা করছি না। কিন্তু দুই পক্ষকেই খাবার খেয়ে বাঁচতে হয়। কাজেই খাবার না থাকলে, পেটে দানাপানি না পড়লে কতদিন সম্ভব ঘরে বসে থাকা? পরিসংখ্যান বলছে, দেশে কমপক্ষে দেড় কোটি মানুষ ‘দিন আনে দিন খায়’। এর বাইরে আরও একটি বৃহৎ অংশ আছে। যারা নিম্ন মধ্যবিত্ত। ছোট চাকরি করে অথবা ছোট কোনও ব্যবসা করে সংসার চালায়। করোনা তাদের কারও চাকরি কেড়ে নিয়েছে। অনেকের ব্যবসাও বন্ধ। ফলে এরাই পড়েছে চরম বিপাকে। উচ্চবিত্তের সুবিধা হলো তারা হাত খুলে মানুষকে সাহায্য করতে পারে। নিম্নবিত্তরা এই সাহায্য নিতে দ্বিধা করে না। কিন্তু মধ্যবিত্ত পড়েছে মহাসংকটে। না পারে অন্যের কাছে হাত পাততে, না পারে মুখ ফুটে কিছু বলতে। এদের পক্ষে কতদিন ঘরে বসে থাকা সম্ভব?

এর মানে আমার কথার এই উদ্দেশ্য নয় যে এখনই সবাইকে ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ করে দিতে হবে। কিন্তু ঘর থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে একটা অবস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরি। একথা সত্য, মরণঘাতী করোনার প্রকোপ আমাদের দেশে সহসাই কমবে না! বরং দিনে দিনে বাড়বে। তার মানে করোনা যতদিন থাকবে ততদিন করোনার ভয়ে আমরা ঘরবন্দি জীবনযাপন করবো? সেটা কতদিন? ততদিনে দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? ঘরে ডাকাত পড়েছে বলে ভয়ে লুকিয়ে থাকলাম। চোখের সামনে ডাকাত বাড়ির সবকিছু নিয়ে গেলো। ডাকাত চলে যাওয়ার পর বুক চাপড়াচ্ছি, এখন আমার কী হবে? ঘরে ডাকাত পড়েছে দেখে ভীত না হয়ে সম্মিলিতভাবে যদি প্রতিরোধের হুঙ্কারও দেওয়া যেত তাহলে ডাকাত দল নিশ্চয়ই ভয় পেতো। বাসার সবকিছু ডাকাতি করার সাহস পেতো না!

করোনা ডাকাত নয়। করোনা মরণব্যাধি ভাইরাস। মানসিক শক্তির দৃঢ়তায় অদৃশ্য এই ভাইরাসকে মোকাবিলা করা সম্ভব! পরিস্থিতি যেহেতু বলছে সহসা এই দেশ থেকে করোনা মহামারি দূর হবে না; কাজেই করোনার সঙ্গে লড়াই করেই আমাদের সামনের দিকে এগুতে হবে। এই লড়াইয়ের মূল শক্তি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা! জীবনকে বদলে ফেলা! সে ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্যাম্পেইনটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি। দেশের শহর পর্যায়ে করোনা সংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরিবেশ মোটামুটি সন্তোষজনক। কিন্তু গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। এক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিরা বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেরও এক্ষেত্রে একটা বিশেষ ভূমিকা আছে। জোর দিয়েই একটা কথা বলা যায়। দেশের মসজিদ, মন্দিরসহ অন্যান্য উপাসনালয়ের নেতৃত্ব পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ যদি সিদ্ধান্ত নেন যে, করোনা প্রতিরোধে দেশের জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে উৎসাহ জোগাবেন তাহলে একটা কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসতে বাধ্য। পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিরা তো রয়েছেনই।

মোট কথা, করোনাকে ভয় পেলে চলবে না। ভয়কে জয় করতে হবে। যেহেতু আমাদের সামনে কোনও নির্দিষ্ট দিনক্ষণ নাই যে এরই মধ্যে করোনা দূর হয়ে যাবে। কাজেই করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করেই আমাদের দৈনন্দিন জীবন স্বাভাবিক করে তুলতে হবে। তার মানে এই নয় যে আমরা করোনার মতো প্রাণঘাতী রোগকে গুরুত্বই দেবো না। করোনাকে গুরুত্ব দিয়েই আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে স্বাভাবিক করে তুলতে হবে। সেক্ষেত্রে সরকারের বিধিনিষেধ মেনে চলা জরুরি।

আমাদের দেশে দুই ঈদ আর পহেলা বৈশাখ ব্যাপক আনন্দ উৎসবের উপলক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। ঈদে নাড়ির টানে আমরা শহর ছেড়ে গ্রামে ছুটে যাই। এটাই আমাদের সংস্কৃতির উজ্জ্বল অংশ। কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতির কথাও তো ভাবতে হবে। পহেলা বৈশাখ পালন করিনি। একটা ঈদ গ্রামে গিয়ে আনন্দ করতে না পারলে খুব কি ক্ষতি হয়ে যাবে? দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। অথচ হাজার হাজার মানুষ কি করে শহর ছেড়ে গ্রামের উদ্দেশে রওনা দিলো? এই প্রশ্নের জবাব কী? আমাদের দেশে যেকোনও সংকটকে পুঁজি করে সাধারণ মানুষকে সহজেই বিভ্রান্ত করা যায়। আমার এক আত্মীয় ঈদে গ্রামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কথা প্রসঙ্গে তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, যাবেন কী করে? বাস, রেল, নদী, আকাশপথ সবই তো বন্ধ! তিনি মুচকি হেসে জবাব দিলেন, টাকা দিলে এই দেশে বাঘের দুধও পাওয়া যায়। অনলাইনে গাড়ি ভাড়া করেছি। ভাড়া বেশি নিয়েছে। কী আর করা?  তাতেই রাজি হয়েছি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও দেখে যারপরনাই অবাক হলাম। বন্ধ দোকানের দরজায় ধাক্কা দিচ্ছেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। কিছুক্ষণ পর বন্ধ দরজা খুলে গেলো! পুলিশ কর্মকর্তা ভিতরে ঢুকে অবাক হয়ে গেলেন! দরজা বন্ধ রেখে ভিতরে কাপড়ের দোকানে কেনাবেচা চলছে। ক্রেতার সংখ্যা ৯ জন। তিন জন পুরুষ বাকিরা মহিলা। সঙ্গে একটি বাচ্চাও আছে! দুটি ঘটনা প্রমাণ করে করোনাকে আমরা গুরুত্ব দিলেও কার্যক্ষেত্রে এতদসংক্রান্ত বিধিনিষেধ মানার ক্ষেত্রে মোটেই আন্তরিক নই।

কিন্তু করোনার সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে হলে কিছু বিধিনিষেধ তো মানতেই হবে। জীবন বদলাতে হবে। করোনা প্রতিরোধের প্রধান অস্ত্র হলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। তা না হলে ঘরে থাকতে হবে বহুকাল। ততদিনে প্রিয় দেশটা তো অনেক কাহিল হয়ে পড়বে! কাজেই করোনার সঙ্গে লড়াই করেই আমাদের বাঁচতে হবে। আর মাত্র কয়েকদিন পর পবিত্র ঈদ। চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী ঈদের জামাত শেষে কোলাকুলি করা যাবে না। হাত মিলানোও যাবে না। এ জন্য মন খারাপ করবেন না। ভয়ও পাবেন না। আসুন সম্মিলিতভাবে ভয়কে জয় করার পথ খুঁজি। মহান সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই আমাদের পথ দেখাবেন! প্রিয় পাঠক, পবিত্র ঈদ কাছে চলে এসেছে। পবিত্র ঈদের আগাম শুভেচ্ছা নিন। ঈদ মোবারক।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক- আনন্দ আলো

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ