ভারতকে চাপে রেখে স্বার্থ হাসিলই চীনের উদ্দেশ্য

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৪:০৩, জুন ১৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৫৭, জুন ১৬, ২০২০

দেড় মাস ধরে কাশ্মিরের লাদাখ সীমান্তের গালওয়ান ভ্যালি ও প্যাংগং লেক এলাকায় চীন-ভারতের সেনা মোতায়েনকে ঘিরে দু’দেশের সম্পর্কে তীব্র উত্তেজনা চলছে। করোনার মধ্যে শুরু হওয়া এই বিরোধ খুব তাড়াতাড়ি মিটবে বলা যাচ্ছে না। চীন-ভারত সীমান্ত বিরোধ শতাব্দী প্রাচীন। ব্রিটিশের সময় ম্যাকমোহন যে সীমানা ঠিক করেছিলেন তা চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পূর্বেকার কুমিংটান পার্টির সরকারও কখনও মানেনি। ১৯৪৯ সালে পিকিংয়ে কমিউনিস্ট পার্টির সরকার প্রতিষ্ঠা হলে তারাও পূর্বের জাতীয়তাবাদী সরকারের নীতি মেনে চলছে। বরং ১৯৬২ সালে সীমান্ত নিয়ে চীন-ভারতের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল। ভারত সেই যুদ্ধে পরাজিত হয়।আনিস আলমগীর

সেই যুদ্ধে চীন সীমান্ত অতিক্রম করে আসামের ডিব্রুগড়ে এসে উপস্থিত হয়েছিল। আবার তারা দখলকৃত ভারতীয় জায়গা ছেড়ে দিয়ে সীমান্তের ওপারে গিয়ে অবস্থান নিয়েছিল। চীন এমন হেয়ালিপনা কেন করেছিল তা নিয়ে নানান মত রয়েছে। অথচ ১৯৬২ সালের যুদ্ধের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত উভয়ের মধ্যে সুসম্পর্ক বিরাজমান ছিল। চীন অনেক প্রাচীন জাতি। রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর চীনের সম্রাট ছিলেন বিশ্বের বৃহত্তম সাম্রাজ্যের অধিপতি। বিশ্ব সভ্যতা উন্নয়নে চীনের অবদান অনেক। কাগজ আবিষ্কার করেছিল চীনারাই। কাগজের টাকাও প্রচলন করেছিল চীন সম্রাট।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ছিলেন সুশিক্ষিত লোক। চীনের প্রাচীনত্বের প্রতি, সভ্যতার প্রতি নেহরু সব সময় একটা দুর্বলতা পোষণ করতেন। যে কারণে তিনি চীনের সঙ্গে বিরোধ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছেন। চীনে কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে ভারত তাকে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছিল। চীন যখন তিব্বত দখল করে নিচ্ছিল ভারত তাতে কোনও বিরোধ করার চেষ্টা করেনি; বরং তিব্বতের দালাইলামাকে ভারতে আশ্রয় দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত রেখেছিল।

১৯৬০ সালে ভারতের দেশরক্ষামন্ত্রী কৃষ্ণ মেনন সীমান্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত সামরিক অফিসারদের এক বৈঠক ডেকেছিলেন। হিসাব করেছিলেন, এযাবৎ মধ্য সীমান্তে প্রায় পাঁচশ’ বর্গমাইল ভারতীয় এলাকা এবং উত্তর-পূর্ব সীমান্তে প্রায় সাত হাজার বর্গমাইল এলাকা চীন দখল করে রেখেছে। হিসাব নিকাশ করার পর যখন ভারতের হুঁশ ফিরে আসে তখন ওই হারানো এলাকা উদ্ধারের সিদ্ধান্ত হয়। সেই সময় নেহরু শ্রীলঙ্কা সফরে গিয়েছিলেন। বিমানবন্দরে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ অর্ডারড দ্য আর্মি টার্ন আউট দ্য চাইনিজ’। নেহরুর এই কথার পর চীন পূর্ব সীমান্তে পরিপূর্ণভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিল। ১৯৬২ সালের শিল্প-বাণিজ্যে সামরিক শক্তিতে চীনের চেয়ে ভারত উত্তম অবস্থানে ছিল। তারপরও ভারত চীনের হাতে পরাজিত হলো কেন?

চীন-ভারত যুদ্ধে ভারতের দায়িত্বপ্রাপ্ত সামরিক অফিসার ছিলেন জেনারেল ব্রিজ মোহন কাউল। তিনি যুদ্ধের পরে ‘আনটোলড হিস্ট্রি’ নামে একটি বই লিখেছেন। তাতে তিনি উলঙ্গভাবে সবকিছু বলার চেষ্টা করেননি সত্য, তবে ইশারা-ইঙ্গিতে যা বলেছেন তা থেকে বোঝা যায় যে লাল ক্যাম্বিসের জুতা পরে নাকি ভারতীয় সৈন্যদের যুদ্ধ করতে হয়েছিল। আর সীমান্তে নাকি ভালো রোড-ঘাট ছিল না, যে কারণে ভারতীয় সৈন্যরা অগ্রসর হতে পারেনি।

অবশ্য এই যুদ্ধ নিয়ে এখন পর্যন্ত বহু বই লেখা হয়েছে এবং সব বইয়ে দুটি প্রশ্ন আলোচিত হয়েছে যে, কেন যুদ্ধটি হলো আর কেন ভারতের কোনও প্রতিরোধ ছাড়া চীনারা ডিব্রুগড় পর্যন্ত আসতে পেরেছিল। অনেকে বলেছেন, ভারতের সেনাপ্রধানসহ যারা রণকৌশল নির্ধারণ করেন তারা নাকি চেয়েছিলেন চীনারা সমতলে আসুক তারপর যুদ্ধ হবে। এমন একটা ভারতীয় পরিকল্পনার কারণে চীনারা খুব দ্রুত বাধাহীনভাবে ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পেরেছিল, কিন্তু তারা সমতলে বেশিক্ষণ ছিল না। পুনরায় তাদের সীমান্তে ফিরে গিয়েছিল। চীন তখন আমেরিকার বাণিজ্য অবরোধের মধ্যে ছিল। মৌলিক বহু প্রয়োজনীয় দ্রব্যের জন্য চীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর নির্ভরশীল ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে চীনকে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল। সুতরাং অনেকে বলেছেন চীনের তখন তার সীমান্তে ফিরে যাওয়া ছাড়া কোনও উপায় ছিল না। যুদ্ধে চীনের যে ৩০০ বিমান অংশগ্রহণ করেছিল ওই বিমানগুলো সোভিয়েতের সরবরাহ করা তেলের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

যুদ্ধটা চীন ইচ্ছাকৃতভাবে বাধিয়েছিল। কারণ, ১৯৫৬ সালে বান্দুংয়ে জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে নেহরুর মাতব্বরি চীনের চৌ এন-লাইয়ের পছন্দ হয়নি। সর্বোপরি কোরিয়া উপত্যকার সমস্যা সমাধানের পর নেহরুর ভাবমূর্তি বিশ্বনেতাদের পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল। নেহরুর মর্যাদাহানি করতে এবং ভারতকে শিক্ষা দিতে এই যুদ্ধটা দিয়েছিল বলে বিশ্লেষকরা একমত হয়েছেন।

যাহোক, ভারত আর চীনের যুদ্ধ হয়েছিল প্রায় ছয় দশক পূর্বে। এখন কেউই পূর্ব অবস্থায় নেই। চীন এখন পরাশক্তির কাতারে। ভারত কিন্তু সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। তবে ১৯৬২ সালের যুদ্ধের প্রতিশোধ গ্রহণের স্পৃহা ত্যাগ করতেও পারেনি। এখন কট্টর হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী সরকার ক্ষমতায়। তারা প্রচুর কাজ করছে সীমান্তে এবং খুবই নিষ্ঠার সঙ্গে ভারতের সুরক্ষাকে মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চেষ্টা করছে। অনেকে মনে করেন, লাদাখ সীমান্তের গালোয়ান উপত্যকায় গত কয়েক বছর ধরে ভারত যেভাবে রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামো তৈরি করছে তাতে চীন সত্যিই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে, এবং ভারতের এই কর্মকাণ্ড তারা আর মেনে নিতে রাজি নয়। তারা মনে করছে সীমান্তের ওই পাহাড়ি এলাকায় ভবিষ্যতে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে ভারত ব্যাপক হারে অবকাঠামো নির্মাণ করে চলেছে। এছাড়া, মোদির ক্ষমতা-গ্রহণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সামরিক এবং রাজনৈতিক নৈকট্যে বেইজিংয়ের উদ্বেগ দিন দিন আরও বাড়ছে।

অবশ্য ভারত কোনও বিবাদে জড়ায়নি। চীন সুদীর্ঘ সময় ধরে ছোট ছোট সেনাদল ভারত সীমানায় ঢুকিয়ে সম্ভবত ভারতের প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করছে। হয়তো ভারতের আরও কিছু জায়গা চীনের প্রয়োজন হচ্ছে। সেটি নেওয়ার ফন্দিফিকির চলছে। আকসাই চীন থেকে তিব্বত পর্যন্ত চীন যে ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তা তৈরি করেছে তা সম্পূর্ণ ভারতের জায়গার ওপর। ভারত পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মিরকে ভারতের ভূখণ্ড বলে দাবি করে আর চীন তার ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ রাস্তা নিচ্ছে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মিরের ওপর দিয়ে। এই রাস্তা বেলুচিস্তানে নির্মাণাধীন গোয়াদর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত যাবে। এই রাস্তার সুরক্ষার জন্য ভারতকে চীনের কঠোর চাপে রাখার কৌশল অবলম্বন করে চলতে হচ্ছে।

তবে মনে হয় না যে চীন ভারতের মধ্যে কোনও যুদ্ধ হবে। চীন ভারতের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়। এই বাণিজ্যে চীন বেশি লাভবান সত্য, কিন্তু বাণিজ্য বন্ধ হলে চীনের চেয়ে ভারতেরই ক্ষতি বেশি। কারণ, তার পণ্য বাজার এবং কলকারখানা চীনের ওপর অনেক নির্ভর। চীন ব্যবসায়ে আসক্ত, তারা ভারতের মতো এত বড় একটি বাজার সহসা নষ্ট করতে চাইবে না। আবার পাকিস্তানকে যতই যুদ্ধের উস্কানি দিক, চীনের সঙ্গে যুদ্ধ বাধলে মুখরক্ষার উপায় থাকবে না বলে হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদি যুদ্ধের কোনও ঝুঁকি নেবে না। সামরিক শক্তিতে চীন এখন ভারতের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে। এখন যুদ্ধের ঝুঁকি নিলে এবং পরিপূর্ণ একটি যুদ্ধ হলে চীনের বিজয়কে ঠেকানো ভারতের পক্ষে সম্ভব হবে না—একথাটা ভারত সরকার ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারে।

অবশ্য ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিবো সূচাগ্র মেদিনী... নরেন্দ্র মোদি সরকার এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে চলে বলেই সীমান্তের পথঘাট আধুনিকায়নের কাজ এখন ভারত সম্পন্ন করতে উদ্যোগী হয়েছে। ২০১৭ সালে ভুটানের সীমান্তে দোকলাম নামক একটি এলাকায় চীনের রাস্তা তৈরি নিয়ে চীন ও ভারতের সৈন্যরা ৭২দিন ধরে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল। যুদ্ধ বেধে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। হয়নি। সেই সময় ভারত পিছু হটেনি। দৃঢ়ভাবে চীনকে মোকাবিলার প্রত্যয় ঘোষণা করেছিল।

চীনের সঙ্গে ভারতের ৪০৫৬ কিলোমিটার সীমান্ত পাহারা দেওয়া সহজ কথা নয়। আকসাই চীন অঞ্চলের ১৫ হাজার বর্গমাইল এলাকাকে ভারত তাদের এলাকা বলে দাবি করে। অন্যদিকে ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্য অরুণাচলকে চীন তাদের এলাকা বলে মনে করে। সুতরাং ভারতের উচিত সীমান্ত বিরোধ মিটিয়ে ফেলা।

চৌ এন-লাই ১৯৬০ সালে সর্বশেষ ভারত সফরের সময় একটি প্রস্তাব দিয়ে বলেছেন, যে এলাকা ভারতের অধীনে রয়েছে তা ভারতে থাকুক আর যে এলাকা বিতর্কিত এবং কারও অধিকার নেই তাও ভারতের হোক এবং যে এলাকায় চীনের অধিকার রয়েছে তা চীনের থাকুক (তথ্যসূত্র, ‘স্থানান্তর থেকে’, লেখক শংকর ঘোষ।) চৌ এন-লাইয়ের সেই প্রস্তাবটি পুনরুজ্জীবিত করে ভারত সমাধানের পথ বের করার চেষ্টা করা উচিত।

বিশ্ব ব্যবস্থায় চীনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার পরও সংকটে পড়া দেশগুলোকে ঋণ-সাহায্য দিয়ে বেইজিং অনেকটা তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে। এবার করোনাভাইরাস সেই পথ আরও সুগম করবে চীনের জন্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ক্ষয়িষ্ণু। মার্কিনিরা ভারতের যতই বন্ধু হোক কেউ কারও জন্য যুদ্ধ করে না। তার প্রমাণ হচ্ছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমেরিকা আর চীন পাকিস্তানের পক্ষে ছিল সত্য, কিন্তু পাকিস্তানের পরাজয় ঠেকানোর জন্য হুমকি প্রদান করা ছাড়া কিছুই করেনি।

 

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

 

 

/এমএমজে/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ