করোনাকালীন বাজেট: কী করার কথা, কী করেছি

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৬:৫৪, জুন ১৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৮, জুন ১৯, ২০২০

রুমিন ফারহানাকরোনা পৃথিবীকে পাল্টে দিয়েছে সবদিক থেকে। পৃথিবীর প্রতিটি দেশ, উন্নত কিংবা অনুন্নত তাদের বাজেট প্রণয়নে, আর্থিক নীতি-পরিকল্পনায় করোনার অভিঘাতকে বিবেচনায় নিয়ে পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু এই নিয়মের এক ‘উজ্জ্বল’ ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পড়লে বাজেটটির কাঠামো এবং আর্থিক নীতি-বরাদ্দ দেখে কোনোভাবেই বোঝা সম্ভব না এটা করোনাকালীন বাজেট। সে কারণেই বোধকরি অর্থমন্ত্রী অনেক গতানুগতিক বরাদ্দের আগে অপ্রাসঙ্গিকভাবে ‘করোনাভাইরাস’ শব্দটি জুড়ে দিয়ে এই বাজেটকে করোনাকালীন বাজেট হিসেবে চিহ্নিত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন।
করোনাকে বিবেচনায় নিলে এই বাজেটের খোলনলচে পাল্টে যাওয়ার কথা ছিল। আগে বলে নেওয়া যাক কী হওয়ার কথা ছিল। করোনা যখন মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলেছে, তখন বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়ার কথা ছিল এই সময়ে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা। করোনার এই সময়ে করোনা আক্রান্ত এবং করোনায় আক্রান্ত না হয়েও মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। তাই দ্রুততম সময়ে মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য সব পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল। কথা ছিল করোনার অভিঘাতে কোটি কোটি মানুষ তাদের উপার্জন হারিয়ে অনাহারে/অর্ধাহারে আছে, তাদের খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অনেক বেশি বরাদ্দ করা। আর সর্বোপরি করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী ধেয়ে আসা খাদ্য সংকটের মুখে কৃষিতে অনেক বেশি পদক্ষেপ নেওয়া। কী হয়েছে বাজেটে সেই আলোচনা পরে করেছি বিস্তারিত।

একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, করোনার কারণে যেহেতু বিশ্বব্যাপী একটা মন্দা এসেছে এবং সেটা বেশ দীর্ঘ হবে বলে অর্থনীতিবিদরা বলেছেন এবং সেই মন্দার অনিবার্য প্রভাব যেহেতু আমাদের দেশেও পড়বে, তাহলে উল্লেখিত খাতগুলোতে বরাদ্দের মতো টাকা কি সরকারের হাতে থাকবে? ২০০৭-০৮-এর বৈশ্বিক মন্দার সময় পৃথিবীর বহু দেশ তাদের বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প স্থগিত রেখেছিল অথবা ধীরগতি করেছিল। করোনার এই ক্রান্তিকালে একটা কল্যাণমুখী সরকার থাকলে তারা অবকাঠামোর যে প্রকল্পগুলো ছিল সেগুলো অনেকটা ধীরগতিতে নিয়ে বরাদ্দ অনেক কমিয়ে দিতো উল্লেখযোগ্যভাবে। সেই টাকা করোনা মোকাবিলায় সবচেয়ে জরুরি ক্ষেত্রগুলোতে ব্যয় করতো।

করোনার এই সংকটের মধ্যে রাষ্ট্র খাতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বলে যে আদতে কিছু নেই সেটা প্রকাশিত হলো। তাই এই বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে একটা স্বল্প, মধ্যম এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা অত্যাবশ্যক ছিল। তাতে চিকিৎসা সেবাদানকারী জনবল (চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান এবং অন্যান্য কর্মী) দ্রুততম সময়ে নিয়োগ দিয়ে কীভাবে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সংখ্যা অর্জন করা যায়, এবং দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর সংখ্যা এবং আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে কীভাবে সেটাকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া যায় সেটা নিয়ে দিকনির্দেশনা থাকার কথা ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, এই বাজেটে উল্লেখ থাকা দরকার ছিল স্বল্পতম কত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় একটি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ধাপে ধাপে চালু করবে। করোনার এই সংকট আমাদের স্পষ্টভাবে বার্তা দিয়েছে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কোনোভাবেই বেসরকারি খাতনির্ভর হয়ে থাকতে পারে না।

একটা খুব বড় সংকট স্বাস্থ্য খাতে যে কেমন পরিবর্তন আনতে পারে তার একটা চমৎকার উদাহরণ হচ্ছে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)। জনগণের অর্থে পরিচালিত একটা সর্বজনীন রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা হিসেবে এটি খুবই আলোচিত প্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকেই এই ধরনের একটি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা চালু করা নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও এই সিদ্ধান্ত বছরে পর বছর নেওয়া যায়নি। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীভৎসতা এবং সেই সময় মানুষের স্বাস্থ্যের ভয়ংকর রকম সংকট ব্রিটেনকে এরকম একটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তৈরি করার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ প্রণোদনা দিতে পেরেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

আমরা যখন বাজেটে বরাদ্দ নিয়ে আলোচনা করি তখন আমরা জানি এর মাত্র ক্ষুদ্র একটা ভগ্নাংশই আসলে জনগণের কাজে লাগে যাচ্ছেতাই লুটপাটের কারণে। এই আলোচনায় আমি লুটপাট বাদ দিয়ে বাজেটের দর্শনগত দিক নিয়েই কথা বলছি।

এই বছরের বাজেটেও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১ শতাংশেরও কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৯,২৪৭ কোটি টাকা, যা আগামী অর্থবছরের জিডিপি’র (৩১,৭১, ৮০০ কোটি) ০.৯ শতাংশ; বছরের পরের দিকে সংশোধিত বাজেটে কাটছাঁটের পর দেখা যাবে এটা ০.৭ শতাংশ বা তার কিছু বেশি হবে। প্রস্তাবিত বরাদ্দ বর্তমান অর্থবছরের চেয়ে ৩৫১৫ কোটি টাকা বেশি। চলতি অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে ৩৩৬৬ কোটি টাকা বেশি ছিল।

আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ থাকছে ১৩ হাজার ৩৩ কোটি টাকা। সেই হিসাবে চলতি অর্থবছরের এডিপির চেয়ে বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র ৭৯৭ কোটি টাকা। চলতি এডিপিতে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ আছে ১২ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা। এছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১০ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৮ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। অর্থাৎ ২০১৯-২০, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে আগের বছরের তুলনায় এডিপিতে বরাদ্দ বেশি ছিল যথাক্রমে ১৪২৭ এবং ২১১৯ কোটি টাকা। করোনা এত কিছু ঘটিয়ে দেওয়ার পরও বরাদ্দ আগের দুই অর্থবছরের চেয়ে যথাক্রমে অর্ধেক এবং এক-তৃতীয়াংশ হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে এই মুহূর্তে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন অবস্থানে আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান, নেপাল, আফগানিস্তান, ভারত, ভুটান, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপে স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয় যথাক্রমে মাথাপিছু ১২৯, ১৩৭, ১৬৭, ২৬৭, ২৮১, ৩৬৯, ১৯৯৬ ডলার। বাংলাদেশে এর পরিমাণ মাত্র ৮৮ ডলার, যা পাকিস্তানের দুই-তৃতীয়াংশ এবং আফগানিস্তানের অর্ধেক। এ কারণেই এই দেশের জনগণকে এখনও তাদের চিকিৎসার ৬৭ থেকে ৭২% নিজের পকেট থেকে খরচ করতে হয়। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা মতে, এই ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতিবছর ৬৪-৬৬ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়।

স্বাস্থ্য খাতের প্রতিটি সূচকে আমাদের অবস্থান এ অঞ্চলে একেবারে তলানীতে। একটা পরিসংখ্যানই এটা বোঝাতে যথেষ্ট হবে। প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য বাংলাদেশে ডাক্তার আছে ৫.২৭ জন, যা দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম সর্বনিম্ন। প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য ডাক্তারের সংখ্যা নেপালে ৬.৫১, ভারতে ৭.৭৮, শ্রীলংকায় ৯.৫৮, পাকিস্তানে ৯.৭৫ ও মালদ্বীপে ২২.৩০ জন।

৯ জুন অর্থনীতি সমিতির তাদের বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনায় বলে, অতি ধনী শ্রেণির ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষের আর্থিক অবস্থায় কোনও পরিবর্তন হয়নি, বরং কোনও কোনও ধনী আরও ধনী হয়েছে। তবে আগের ৩ কোটি ৪০ লাখ উচ্চ মধ্যবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত হয়েছে ১ কোটি ১৯ লাখ, ৩ কোটি ৪০ লাখ মধ্যম পর্যায়ের মধ্যবিত্ত থেকে ১ কোটি ২ লাখ হয়েছে নিম্ন মধ্যবিত্ত, ৫ কোটি ১০ লাখ নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে ১ কোটি ১৯ লাখ দরিদ্র এবং ৩ কোটি ৪০ লাখ দরিদ্র থেকে ২ কোটি ৫৫ লাখ অতি দরিদ্র হয়েছে। ৬৬ দিনে সব মিলিয়ে ৫ কোটি ৯৫ লাখ নতুন করে দরিদ্র ও অতি দরিদ্র হয়েছে বলে দাবি করে সমিতি। এদের জন্য সরকার কী করেছে কিংবা কি পরিকল্পনা আছে বাজেটে?

করোনায় আর্থিক সংকটে পড়া মানুষদের জন্য সরকার কী ত্রাণ দিয়েছে সেটা নিয়মিত প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানায়। ৮ জুন পর্যন্ত তিন মাসে দেওয়া ত্রাণের সরকারি হিসাব বলছে, সারা দেশে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে দুই লাখ ১ হাজার ৪১৭ মেট্রিক টন এবং বিতরণ করা হয়েছে এক লাখ ৬৭ হাজার ৭৯৫ মেট্রিক টন। এতে উপকারভোগী পরিবার সংখ্যা এক কোটি ৪৭ লাখ ২৯ হাজার ৫৩২টি এবং উপকারভোগী লোকসংখ্যা ছয় কোটি ৫২ লাখ ৯৩ হাজার ৭২০ জন। অর্থাৎ মাথাপিছু চাল বরাদ্দ হয়েছে ২.৫৬ কেজি। সাধারণ ত্রাণ বাবদ নগদ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৯১ কোটি ১৩ লাখ ৭২ হাজার ২৬৪ টাকা এবং বিতরণ করা হয়েছে ৭৮ কোটি ১ লাখ ৫২ হাজার ৬৬১ টাকা। এতে উপকারভোগী পরিবার সংখ্যা ৯৪ লাখ ৪৪ হাজার ৬৮৯টি এবং উপকারভোগী লোকসংখ্যা ৪ কোটি ২১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৪০ জন। অর্থাৎ মাথাপিছু বরাদ্দ হয়েছে ১৮ টাকা ৫০ পয়সা। এই হচ্ছে সাড়ে ৬ কোটি মানুষকে সাহায্য করার নমুনা।

সাধারণ ছুটির নামে অঘোষিত লকডাউন শুরু হয়েছিল ২৬ মার্চ। তার দেড় মাসেরও বেশি সময় পর সরকারের হঠাৎ মনে হলো লকডাউনের জন্য তো কোটি কোটি মানুষ কাজ হারিয়েছে, তাই তাদের জন্য কিছু অন্তত করা হচ্ছে এমন একটা ধারণা দেওয়া দরকার। তারই ধারাবাহিকতায় গড়ে ৫ সদস্যের একটি পরিবারে এককালীন ২৫০০ টাকা দেওয়া হলো। তারপর এখন পর্যন্ত ১৪ লক্ষ পরিবারকে (ভালোভাবে খুঁজলে এখানেও অনেক ভুয়া নাম পাওয়া যাবে) সেই টাকা দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ বাকি আছে এখনও ৩৬ লক্ষ পরিবার। লকডাউন ঘোষণা করার পর তিন মাস চলে গেলো, কিন্তু এখনও এই মানুষগুলো টাকা পায়নি।

এবারের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ৯৫,৫৭৪ কোটি টাকা। এখানেও আছে শুভঙ্করের ফাঁকি। এই বরাদ্দের মধ্যে ২৭ হাজার কোটি টাকার বেশি সরকারি অবসরভোগীদের পেনশন-গ্র্যাচুয়িটি, অর্থাৎ এই উপকারভোগীরা মোটেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নন। করোনার কারণে দেশের দারিদ্র্যসীমার নিচে মানুষের সংখ্যা যখন দ্বিগুণের বেশি হয়ে গেছে তখন আগের বছরের চেয়ে মাত্র ১৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বৃদ্ধি কোনোভাবেই সংকট মোকাবিলা করতে পারবে না। পূর্ববর্তী কর্মসূচিগুলোর ভাতার পরিমাণ না বাড়িয়ে আওতা কিছুটা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু উপার্জন তলানিতে পড়ে যাওয়া মানুষকে সত্যিকার অর্থে সাহায্য করতে চাইলে পরিমাণও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বাড়ানো জরুরি ছিল।

সামাজিক সুরক্ষা খাতে খরচের দিক থেকে বাংলাদেশ এশিয়ার নিচের দিককার পাঁচটি দেশের একটি। বাংলাদেশের পেছনে আছে শুধু মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, ভুটান ও লাওস। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ২১তম। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদন অনুযায়ী মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ পরিমাণ অর্থ সামাজিক সুরক্ষায় খরচ করে দরিদ্র বাংলাদেশ। তালিকার শীর্ষে থাকা অতি ধনী দেশ জাপান খরচ করে জিডিপির ২১ শতাংশের বেশি।

অঘোষিত লকডাউনে কৃষি খাত খুবই চাপের মধ্যে পড়েছিল। ৪ জুন ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা যায়, পোল্ট্রির দাম কমেছে প্রায় ৪৪ শতাংশ, দুধের দাম কমেছে ২২ শতাংশ। সবজির ৩৮-৯০ শতাংশ দাম কমেছে। অন্যদিকে বীজ, সার এবং পোল্ট্রির খাদ্যের দাম বেড়েছে। ৬৬ শতাংশ কৃষক জানিয়েছেন তাদের কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, বাজার বন্ধ থাকায় আড়তদার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি তারা। ৫২ শতাংশ কৃষক জানিয়েছেন পণ্য বিক্রির জন্য মার্কেটে পৌঁছাতে পারেননি। ফলে তারা যতটুকু দাম পেয়েছেন, সেই দামে পণ্য ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। ওই গবেষণা এটাও আমাদের জানায়, এ সময়ে ৯৫ শতাংশ কৃষকই সরকারি অথবা বেসরকারিভাবে কোনও ধরনের সহায়তা পাননি।

২০২০-২১ সালের জাতীয় বাজেটে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য নিরাপত্তা মিলিয়ে ২২ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা গত অর্থবছরের তুলনায় এক হাজার পাঁচ কোটি টাকা বেশি এবং মোট বাজেটের শতকরা ৩ দশমিক ৯৬ ভাগ। শুধু কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য এবারের বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৫ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা, যা গত বছরের তুলনায় দুই হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা বেশি। ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে দেশের কৃষি খাতের জন্য ভর্তুকি বাবদ ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে মাত্র ৫০০ কোটি টাকা বেশি। এই ন্যূনতম বরাদ্দ বৃদ্ধি করোনা পরিস্থিতিতে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জকে কোনোভাবেই মোকাবিলা করতে পারবে না।

কৃষিতে একটি বরাদ্দ আলাদাভাবে আলোচনার দাবি রাখে। আসন্ন বাজেটে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ৩ হাজার ১৯৮ কোটি টাকার প্রকল্প, যার মধ্যে বীজ বোনা থেকে ফসল কাটার (কম্বাইন্ড হারভেস্টার) যন্ত্র আছে। করোনার এই সময়ে কোটি কোটি মানুষ যখন তাদের কাজ হারিয়ে উপার্জনহীন হয়ে পড়েছে তখন এমন পদক্ষেপ একেবারেই জনবিরোধী; এটা এসব মেশিন আমদানিকারক কিছু বড় কোম্পানিকে বিরাট সুবিধা দেবে মাত্র। করোনার মতো সংকটের স্বরূপ বুঝলে কিংবা সেটা ন্যূনতম আমলে নিলে এমন ভয়ংকর পদক্ষেপ সরকার নিতো না।

এবারের বাজেটে সবচেয়ে বেশি নজর দেওয়ার কথা ছিল স্বাস্থ্য, কৃষি আর সামাজিক সুরক্ষা খাতে। তীব্র ঝুঁকির মুখে পড়া স্বাস্থ্য আর অর্থনীতির জন্য দরকার ছিল একটি দুই বা তিন বছর মেয়াদি পরিকল্পনা। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে এই কঠিন সময় মোকাবিলা করার মতো পরিকল্পিত, গণমুখী বাজেট এই করোনাকালেও পেলাম না আমরা।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।  জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X