ভারতের বিরুদ্ধে নেপালের ‘বিদ্রোহ’ এবং জিরো প্লাস জিরো থিওরি

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৪:২৪, জুন ২৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৩৬, জুন ২৫, ২০২০

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীনেপাল ভারত সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করেছে এবং সীমান্তের বিভিন্ন অংশে হেলিপ্যাড বানাচ্ছে। নেপাল তার নতুন মানচিত্রে ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের লিপুলেখ, কালাপানি ও লিম্পিয়াধুরার অঞ্চলগুলোকে নেপালি ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করছে। ভারত হিমালয়ের কৈলাস মানস সরোবর যাওয়ার জন্য চীনের তিব্বত সীমান্তের লিপুলেখের সঙ্গে সংযুক্তকারী ৮০ কিলোমিটার একটি বাইপাস রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নিলে নেপালের সঙ্গে সাম্প্রতিককালে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়। ওইসব এলাকাকে নিজেদের দাবি করার পক্ষে নেপাল ঐতিহাসিক দলিলপত্র দেখাচ্ছে আর ভারত তা মানার পরিবর্তে সেটি যে কয়েক যুগ ধরে ভারতের দখলে আছে সেটা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে নেপালকে।
এই চলমান বিরোধের মধ্যে চলতি সপ্তাহে নেপাল ভারতকে সীমান্তে একটি বাঁধ নির্মাণ বন্ধ রাখতে বাধ্য করেছে। ভারতের বিহার রাজ্যের সঙ্গে নেপালের ৭২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। বিহারের চম্পারন জেলার লাল বাকাইয়া নদীর ওপর ভারতের প্রাণিসম্পদ বিভাগের একটি বাঁধ আছে। এবার এই বাঁধটা সংস্কার করতে গেলে নেপালের সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলো চালায়। এতে এক ভারতীয় বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়। এই এলাকায় প্রতি বছর বন্যা হয়, তাই বাঁধটা সংস্কার করা প্রায় রুটিন ওয়ার্কের মতো। বিহার সরকার আলোচনা করে বিরোধ মেটানোর প্রস্তাব করলে নেপাল তাতে সম্মত হয়নি।

ভারতের সঙ্গে বন্যার পানি নিয়ে দু’দেশের সমস্যা দীর্ঘদিনের। বর্ষাকালে, জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত, দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক খারাপ হয় পানি নিয়ে। বন্যা হলে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্কে আরও উত্তপ্ত হয়। সীমান্তের দুই পাশের বাসিন্দারা নিজেদের দুঃখ-কষ্টের জন্য পরস্পরকে দায়ী করে। এর কারণ হচ্ছে ভারত এবং নেপালের মধ্যে প্রায় ১৮০০ কিলোমিটার অভিন্ন সীমান্ত রয়েছে। নেপাল থেকে ভারতের উত্তরাঞ্চলে প্রায় ৬০০০ নদী ও জলধারা প্রবাহিত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে ভারতের গঙ্গা নদীতে প্রায় ৭০ শতাংশ পানি আসে নেপাল থেকে প্রবাহিত এসব নদী এবং জলধারা থেকে। যখন এসব নদীতে পানি বেড়ে যায়, তখন নেপাল এবং ভারতে বন্যা দেখা দেয়।

গত কয়েক বছর ধরে নেপালের সীমান্তে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এর কারণ হচ্ছে, নেপাল থেকে ভারতের দিকে যে বন্যার পানি প্রবাহিত হয় সেটিকে আটকে দেওয়ার জন্য ভারতের সীমান্তে নদীর ভেতরে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা সরেজমিন দেখতে পেয়েছে, শুধু বন্যার পানি আটকে দেওয়ার জন্য ভারতীয় অংশে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। নেপাল বলছে এ ধরনের অবকাঠামোর কারণে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ধরনের ১০টি বাঁধ রয়েছে, যেগুলো নেপালের ভেতরে হাজার-হাজার হেক্টর জমি প্লাবিত করছে। ভারতীয় কর্মকর্তারা বলছেন, সীমান্তে যেসব স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে সেগুলো রাস্তা। আর নেপালের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব স্থাপনা প্রকৃতপক্ষে বাঁধ, যার মাধ্যমে ভারতের গ্রামগুলোকে বন্যার হাত থেকে রক্ষা করা হচ্ছে। এই বাঁধ নিয়ে নেপালের দিক থেকে আপত্তি তোলার পর ২০১৬ সালে সীমান্তে উভয় দেশের মানুষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল।

ভারত শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকিয়ে আর বন্যার সময় পানি ছেড়ে বাংলাদেশকে যেভাবে বিপদে ফেলে, নেপাল-ভারতের এই সীমান্তের অসন্তোষটা তেমনই। ব্যতিক্রম হচ্ছে বন্যা ঠেকানোর জন্য বাংলাদেশ তার নদীতে বাঁধ তৈরি করেনি, আর নেপাল শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকিয়ে দেয় না।

যাক, নেপালের নতুন মানচিত্রে দাবি করা অঞ্চল নিয়ে ভারত বলছে নেপালের এই দাবির কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। তাই ভারত নেপালের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। নেপাল বরং এই দাবির পরও বিহারের আরও কিছু অংশ তাদের বলে নতুন দাবি উত্থাপন করেছে। সবাইকে ভাবনায় ফেলেছে, নেপাল এই সাহস পায় কোথায়? ভারতে অনেকের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, ‘এত বড় পদক্ষেপ কেন এখন নেপাল নিচ্ছে? হিমালয়ের নতুন সড়কটি তো রাতারাতি তৈরি হয়নি, নেপাল তো অনেকদিন ধরেই দেখছে যে ভারত সড়কটি তৈরি করছে।’ তাদের বিশ্বাস, ভারত-নেপালের কালাপানি বিরোধ চীনের উসকানিতেই।

নেপাল ভারতের উত্তরাংশে অবস্থিত ক্ষুদ্র একটি দেশ। ৮০০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য, ২০০ কিলোমিটার প্রস্থ, চতুর্ভুজের মতো একটি দেশ। তিন দিকে ভারত আর একদিকে চীনের তিব্বত। ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্য অনুসারে নেপাল তিন ভাগে বিভক্ত। পার্বত্য ভূমি, পাহাড়ি ভূমি এবং নিম্ন সমতল ভূমি। লোকসংখ্যা প্রায় তিন কোটির কাছাকাছি। লোকসংখ্যার ৮০ শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী, ৯ শতাংশ বৌদ্ধ আর ৫ শতাংশ মুসলিম। হিন্দু অধ্যুষিত হলেও নেপালিরা চরম ভারতবিদ্বেষী, কারণ নেপালে ভারতীয়দের ব্যবসা-বাণিজ্যের আধিপত্য বেশি। নেপাল কারেন্সির সঙ্গে মিলেমিশে সমানতালে ভারতীয় কারেন্সিও প্রচলিত আছে সেখানে।

নেপালিরা এই অবস্থা পছন্দ না করলেও তার থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার কোনও উপায় নেই। নেপাল স্থলভূমি দ্বারা আবদ্ধ দেশ। ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত নেপালের বাইরে যাওয়ার জন্য ভারতের দিকে একটি পার্বত্য রাস্তা ছিল, যা ১৯৫৬ সালে প্রশস্ত করা হয়। এখন নেপালের সঙ্গে চীনের একটা পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। নেপাল বহিঃবাণিজ্যের জন্য এই দুই প্রবেশ পথের ওপর নির্ভরশীল। চীনের দিকের রাস্তাটা তৈরি হওয়ার পর ভারত নির্ভরতা কমেছে। চীনের প্রবেশপথ দিয়ে চীন রেলপথ নির্মাণ করে দিয়েছে। এখন স্থল অবরোধ দিয়ে নেপালকে কাবু করার সুযোগ কম ভারতের।

ভারতের দাদাগিরিতে অতিষ্ঠ নেপালের সঙ্গে এখন চীনের ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। লাদাখে এখন চীন-ভারত যুদ্ধের মুখোমুখি। সম্ভবত চীনের পরামর্শে নেপাল ভারত সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করেছে আর বাঁধ নির্মাণে বাধা দিয়েছে। চীন নাকি প্রচুর অস্ত্র সরবরাহ করছে নেপালকে। চীনের মিডিয়াগুলো বলছে, ভারত যুদ্ধ করতে চাইলে নেপাল, পাকিস্তান, চীন—ত্রিমুখী আক্রমণে সম্মুখীন হবে।

ভারত সীমান্তে নেপাল সৈন্য সমাবেশ করেছে আর হেলিপ্যাড বানাচ্ছে, এই সংবাদ শোনার পর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ‘জিরো প্লাস জিরো থিওরি’র কথা মনে পড়েছে। ১৯৫৭ সালের মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর আহ্বানে ৯ এবং ১০ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার কাগমারিতে দুই দিনব্যাপী ‘সাংস্কৃতিক সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মওলানা তখন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক। নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আর সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল হক ওসমানী। তখন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ এবং রিপাবলিকান দলের কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতায় আর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী। পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের সরকার। আতাউর রহমান খান মুখ্যমন্ত্রী। বলতে গেলে আওয়ামী লীগ এবং মওলানা ভাসানী কাগমারি সম্মেলনের উদ্যোক্তা এবং সরকার প্রচ্ছন্নভাবে পৃষ্ঠপোষক।

এই বিরাট সাংস্কৃতিক সম্মেলনে ভারতের বহু লেখক সাহিত্যিক গুণীজন অংশগ্রহণ করেছিলেন। টাঙ্গাইল থেকে কাগমারি পর্যন্ত অসংখ্য তোরণ নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রথম তোরণ জিন্নাহর নামে হলেও অনেক তোরণে বহু ভারতীয় নেতার নামও ছিল। সম্মেলনের অর্থ সরবরাহ করেছিলেন সদরি ইস্পাহানি, ঢাকেশ্বরী কটন মিলের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সূর্যকান্ত বোস, রণদা প্রসাদ সাহা প্রমুখ। প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জাও নাকি মওলানাকে ২৫ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় সরকার কেন্দ্রের শিক্ষামন্ত্রী জহিরউদ্দিনকে দিয়ে দুই লাখ টাকা পাঠিয়েছিল। মওলানা নাকি ওই টাকা গ্রহণ করতে চাননি। সেই সময়ে এই সম্মেলন ছিল ঐতিহাসিক আর একটা কথা বলা প্রয়োজন সেদিন যদি কেন্দ্রে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী না থাকতেন তবে এই সম্মেলন আয়োজন করা কখনও সম্ভব হতো না।

এই সম্মেলনে আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভাও হয়েছিল। বর্ধিত সভায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যোগদান করেছিলেন। আওয়ামী লীগের গণপরিষদ সদস্য ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এই বর্ধিত সভায় প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের জন্য এবং সেন্টো (সেন্ট্রাল ট্রিটি অরগানাইজেশন) বা বাগদাদ প্যাক্ট, সিয়াটো (সাউথ ইস্ট এশিয়া ট্রিটি অরগানাইজেশন) থেকে বের হয়ে আসার জন্য। মওলানা ও তার অনুসারীদের প্রস্তাব ছিল মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে চলার। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সব শেষে সব কথার উত্তর দিতে গিয়ে বলেছিলেন, জিরো প্লাস জিরো ইজ ইকুয়াল টু জিরো। জিরোর আগে ১ না বসা পর্যন্ত জিরোর কোনও মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। সেন্টো, সিয়াটো থেকে বের হওয়া যাবে না, কারণ এই সব সংগঠনের সব সদস্য রাষ্ট্র জিরো। আমেরিকা আছে বলে সবার মূল্য আছে।

এখনও সোহরাওয়ার্দীর জিরো প্লাস জিরো থিওরি রাজনীতিতে আলোচিত বিষয় এবং বাস্তবতার নিরিখে তাই সত্য। নেপাল কখনও ভারত সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করতে সাহস করতো না, নদীর বাঁধ মেরামতের কাজে কখনও বাধা দিতে সাহস করতো না- যদি ‘নেপাল’ নামক এই জিরো পূর্বে ‘চীন’ নামক এক-এর অবস্থান না থাকতো। চন্দ্রের নিজস্ব আলো নেই, সূর্যের আলোতে চন্দ্র আলোকিত।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ