অসুস্থ অবয়ব নগর

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৬:০৫, জুন ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৭, জুন ২৭, ২০২০

তুষার আবদুল্লাহঅবয়ব নগর ছেড়ে যাওয়ার খবর আসছে একের পর এক। পরিচিত অনেক বাসিন্দাই ফোন করেন বা অবয়ব নগরের অন্দর ঘরে জানাচ্ছেন—এবার বিদায় বলছি। অসুখ সারলে ফিরবো আবার। অনেক বাসিন্দা অবয়বপত্রে প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে বিদায় নিচ্ছেন। কেউ বলছেন সাময়িক বিরতিতে যাওয়ার কথা। অবয়ব নগরের প্রতি বিরক্তি ক্ষোভের কথাও জানিয়ে যাচ্ছেন অনেকে। বলছেন—সইতে পারছি না আর। অসহ্য। বেশ কয়েকজন নাগরিকের সঙ্গে কথা হলো। তারা জানালেন—একেবারে শুরুর দিন থেকে। মানে চীনের উহানে যখন কোভিড-১৯ শনাক্ত হলো, তখন থেকে অবয়ব নগরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হতে থাকে। অর্থাৎ চিন্তা ও মননের দূষণ দেখছেন তারা তখন থেকেই। উহানের বাজারের নানা রকম ছবি, ভিডিওতে অবয়বপত্র সয়লাব হয়ে যায়। বাদুড়, সাপ, কুকুর হত্যার ছবি, ভিডিও তুলে ধরতে থাকে। এগুলোর কোনও কোনোটি মিথ্যে ছবি বা ভিডিও বলেও পরে জানা গেছে। উহানের সংক্রমণ, কোভিড-১৯ এর আবির্ভাব নিয়ে নানা রকম মনগড়া তথ্য পরিবেশিত হতে থাকে। যেগুলোর সহভাগের পরিমাণও হাজার হাজার। কোভিড-১৯ যখন ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে সংক্রমণ ঘটায়, তখনও সেখানকার প্রবাসী বাংলাদেশি এবং দেশ থেকে অবয়ব নগরের নাগরিকেরা হাস্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য ছড়াতে থাকে।

তবে অবয়ব নগরের নির্বিবাদী ও সাধারণ নাগরিকরা হাঁপিয়ে উঠতে থাকেন তখনই, যখন বাংলাদেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণ নিয়ে নানা রকম পূর্বাভাস ও ধারণা যুক্ত বক্তব্য আসতে পারে। কতিপয় চিকিৎসক যেমন বলেছেন—তাপমাত্রার কারণে বাংলাদেশে করোনা আসবে না। তেমনি অবয়ব নগরের বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণির বাসিন্দারাও এ বিষয়ে বিজ্ঞের মতো মতামত রেখেছেন। করোনার প্রতিষেধক হিসেবে নানা রকম বনজ, কবিরাজি, হোমিও এবং অ্যালোপেথিক ওষুধের পরামর্শ দিতে শুরু করলেন। কী খাবেন, কী খাবেন না এবং শারীরিক ব্যায়াম নিয়েও ব্যবস্থাপত্র পেশ করে গেছেন, যাচ্ছেন এখনও। আঁতকে দেওয়ার মতো বিষয় হলো—ডা.অবয়বগণ নিজেদের মতো করে করোনার লক্ষণ নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। বিচিত্র সব উপসর্গের বর্ণনা দেওয়াতে, সাধারণ নাগরিকেরা ভড়কে যান। ভাবতে থাকেন এই বুঝি করোনা আক্রান্ত হয়ে গেলেন। বা বেশ আগে থেকেই তিনি করোনার রোগী। চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়েও অবয়ব নগরে নানা রকম তথ্য ও ছবি ভেসে বেড়িয়েছে, বেড়াচ্ছে। ঘটনা সত্য হোক না হোক, বাবাকে ছেলেমেয়েরা ফেলে চলে গেছে করোনা সন্দেহে। স্বামীর মরদেহ রোদে পুড়েছে, বৃষ্টিতে ভিজেছে স্ত্রী-সন্তানরা কাছে আসেনি। করোনা আতঙ্কে উঁচু দালান থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যার খবর অবয়ব নগরেই প্রথম কানে কানে বয়ে গেছে। করোনা রোগীর অক্সিজেন, আইসিইউ সংকট নিয়ে জোরদার কথা হচ্ছে অবয়ব নগরে। সংকট থাকলে কথা হতে পারে। কিন্তু অপ্রয়োজনে অক্সিজেন মাপার যন্ত্র এবং অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনতে সাধারণ মানুষকে তাড়িত করার কাজটি করছে অবয়ব নগরের একটি গোষ্ঠী। কোন যন্ত্র কিনবে, কোন ওষুধ খাবে, এ নিয়ে মুহূর্তে মুহূর্তে তারা ব্যবস্থাপত্র বদলে দিচ্ছেন। করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সুড়ঙ্গের অহেতুক ব্যবহারটিও এই নগরের অবদান। সেই সঙ্গে নানা রকম তরল রাসায়নিক ব্যবহার তো আছেই। কোন মাস্কটি যথাযথ নগরবাসী এখনও এর সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। মাস্কের ধরন ও ব্যবহার নীতি নিয়েও রকমারি নির্দেশনা আসছে।  লকডাউন, সাধারণ ছুটি নিয়েও অবয়ব নগরের বাসিন্দারা নিজ নিজ মত, অনুশাসন তৈরি করেছেন। কোথাও কোথাও নিজেরাই লকডাউন ডেকে দিয়েছেন।

ঘরে বাইরে কেমন যাপন হবে? বাজারে, অফিসে, গণপরিবহনে চলাচল, ঘরের খাবার দাবার, পোশাকের ব্যবহার, পরিচ্ছন্নতা নিয়েও মানুষকে সংশয় ও উদ্বেগের মধ্যে ফেলা দেওয়া হচ্ছে। করোনা রোগীকে অচ্ছুৎ ভাবার ধারণাটিরও জন্ম এই অবয়ব নগর থেকে। কারণ করোনা রোগী ও রোগটিকে স্বাভাবিকের চেয়ে মহাআতঙ্কের চূড়ায় তুলে দেওয়ার কাজটি করেছেন অবয়ব নগরের বাসিন্দারাই। ফলে মহল্লা, গ্রামে, অ্যাপার্টমেন্টে করোনা রোগীদের বিভিন্ন দুর্ভোগ ও বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতে হয়েছে।

কতিপয় নাগরিকদের এই আচরণ, ছড়ানো উদ্বেগের উত্তাপের কারণে অবয়ব নগরে যে অসংখ্য মানুষ বিপন্ন সময়ে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে গেছেন, যাচ্ছেন, তাদের প্রয়াসও নানা বিভ্রান্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অবয়ব নগর ছেড়ে যাওয়া বাসিন্দাদের অভিযোগ-এমনিতেই পুরো পৃথিবী অবসাদে আছে। এরমধ্যে অবয়ব নগর আরও অবসাদের অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। এই নগরে বাস করলে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়বে, যা কোভিড-১৯ এর চেয়েও ভয়াবহ। অতএব বিদায় অবয়ব নগর।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ