সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের অলস টাকা

Send
সালেক উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৬:৩৩, জুন ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪৯, জুন ৩০, ২০২০

সালেক উদ্দিনসুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক প্রতিবছরের মতো এ বছরও ব্যাংক ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৯ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ২৫ জুন ২০২০ তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি পড়লাম। এই প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের জমানো অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে। তথ্য মতে ২০১৯ সালে দেশটির বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশি পরিচয়ে হিসাব খোলা ব্যক্তিদের জমা করা অর্থের স্থিতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে এর পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৫৫৩ কোটি, ২০১৭ সালে ছিল ৪ হাজার ৬৯ কোটি, ২০১৬ সালে ছিল ৫ হাজার ৫৬৬ কোটি, ২০১৫ সালে ছিল ৪ হাজার ৪৪৭ কোটি এবং ২০১৪ সালে ছিল ৪ হাজার ৫৮ কোটি টাকা।
বাংলাদেশি পরিচয় কথাটি উল্লেখ করলাম এ কারণেই যে, যারা সুইস ব্যাংকের মতো বিদেশি ব্যাংকে টাকা জমা রাখেন এমন বাংলাদেশির অনেকেরই ডুয়েল সিটিজেনশিপ রয়েছে। ডুয়েল সিটিজেনশিপধারী  বাংলাদেশিরা তাদের অন্য দেশের সিটিজেনশিপ উল্লেখ করে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে থাকলে সেই টাকা বর্ণিত হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হয়নি, অর্থাৎ সেই হিসাবে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের অলস টাকা পড়ে থাকার পরিমাণ আরও অনেক অনেক বেশি।
ব্যাংক ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৮ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে এবং সেই প্রতিবেদনটি পড়ে সে বছর ‘অর্থ পাচার বনাম বিনিয়োগ’ শিরোনামে যে লেখাটি লিখেছিলাম তা বাংলা ট্রিবিউনে ১৩ জুলাই ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত হয়েছিল। সেই লেখাতে আশঙ্কা করেছিলাম এই টাকার সিংহভাগই অবৈধ উপায়ে অর্জিত কালো টাকা, যা হুন্ডিসহ বিভিন্ন তেলেসমাতি কৌশলে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে জমা হয়েছে। তার একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলাম, সুইস ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের বিশেষ করে বিদেশি গ্রাহকদের গোপনীয়তা কঠোরভাবে রক্ষা করে, যা নিয়ন্ত্রণ করে সুইস ফেডারেল ব্যাংকিং কমিশন। আইন অনুযায়ী একজন ব্যাংকার কখনও কোনও গ্রাহকের হিসাবের কোনও তথ্য নির্ধারিত দুয়েকটি পরিস্থিতি ছাড়া প্রকাশ করতে পারে না। ব্যত্যয় হলে, ব্যাংকারের জেল হতে পারে, হতে পারে ৫০ হাজার সুইস ফ্রাঙ্ক অর্থদণ্ড। এই গোপনীয়তার অধিকার আইন ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং ফেডারেল সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত।

ধরে নিতে পারি, বেশ কিছু দেশের সরকারের পক্ষ থেকে অর্থ পাচার রোধে যথেষ্ট পদক্ষেপ না থাকার কারণে সেসব দেশের নাগরিকরা তাদের কালো টাকা সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোর মতো পৃথিবীর বিভিন্ন ব্যাংকে যেখানে সুযোগ পায় সেখানেই পাচার করে থাকে।
ইতিহাস বলে একসময় পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের কালো টাকাধারীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল সুইস ব্যাংক। কারণ একসময় সুইস ব্যাংক গোপনীয়তা রক্ষার ব্যাপারে ছিল অতি কঠোর। তবে সুইজারল্যান্ড জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনে সই করা দেশ এবং সেই দেশ বিশ্বে অসাধু রাজনীতিক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের পাচারকৃত অর্থের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করলে ১৯৯৭ সাল থেকেই দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হয়। এই চাপের কারণে তখন থেকে সুইস ব্যাংকগুলো সংক্ষিপ্ত আকারে আমানতকারীর অর্থের তথ্য প্রকাশ করতে শুরু করে। এরপর বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধান ও স্বদেশে ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্সের চাপে সুইস ব্যাংকগুলো এখন বার্ষিক প্রতিবেদনে দেশ ওয়ারি বিদেশিদের জমাকৃত অর্থের পরিমাণ উল্লেখ করে থাকে। যার কারণেই এখন আমরা এসব তথ্য পেয়ে থাকি।

সাধারণত অবৈধ উপায়ে অর্জিত টাকার গোপনীয়তা রক্ষার লক্ষ্যে কালোবাজারিরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে জমা করা হয়ে থাকে। তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিকরাও দেশটিতে তাদের বৈধ অর্থ জমা রাখেন। কিন্তু সেই অর্থের পরিমাণ অতি নগণ্য। সুইজারল্যান্ডে গোপনীয়তা কিছুটা কমায় অনেকে এখন অবৈধ টাকা জমা রাখার জন্য ঝুঁকছেন লুক্সেমবার্গ, কেম্যান আইল্যান্ড, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, পানামা কিংবা বারমুডার মতো দেশে। 

একথা সত্য, যারা অবৈধ অর্থের মালিক হয় এবং অর্থ পাচার করে তারা সবসময়ই সরকারের অতি ঘনিষ্ঠতা অর্জনে সক্ষম হয়ে থাকে, সেটা যখন যে দলের সরকারই হোক। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারই হোক আর ইতিপূর্বে যত সরকার এসেছে সেই সরকারের ক্ষেত্রেই হোক এ বিষয়টি অস্বীকার করার উপায় নেই। সম্ভবত এ কারণেই সুইস ব্যাংকসহ লুক্সেমবার্গ, কেম্যান আইল্যান্ড, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড,পানামা কিংবা বারমুডার মতো দেশে নানা কৌশলে অর্থ পাচার হচ্ছে।

প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ পৃথিবীর অনেক দেশই সুইজারল্যান্ড সরকারের সঙ্গে যুগোপযোগী চুক্তি করে সেসব দেশ থেকে অর্থ পাচারের পরিমাণ বহুলাংশে কমিয়েছে। গেলো বছরের ‘অর্থ পাচার বনাম বিনিয়োগ’ শিরোনামের লেখায় উল্লেখ করেছিলাম, বাংলাদেশ সরকারেরও ভারতের মতো সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে একই রকমের অথবা তার চেয়েও যুগোপযোগী চুক্তি করে এদেশ থেকে অর্থ পাচার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর পদক্ষেপ নেওয়া অত্যাবশ্যক। যাতে অর্থ পাচারকারীরা পাচারকৃত টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার সাহস পায় নিরাপত্তা পায় এবং স্বদেশে বিনিয়োগকারী হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ হয় সেই পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি।

কেউ কেউ হয়তো বলবেন, সুইজারল্যান্ডসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাচারকৃত অর্থ চিহ্নিতকরণ ও তা ফেরত আনার জন্য সরকারের কঠিন ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা। আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক বলে এরকম একটি জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খুব তাড়াতাড়ি যে একটি সুফল আসবে তা নয়। এখানে প্রথমত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক পাচারকৃত অর্থ চিহ্নিত করার বিষয় রয়েছে, রয়েছে মামলা এবং মামলার রায়ের বিষয়। এরপর সেই দেশের আদালতের কাছে বিষয়টি প্রমাণ সাপেক্ষে গ্রহণযোগ্য হতে হবে, তারপরেই পরবর্তী পদক্ষেপ গৃহীত হবে।
এমন পদক্ষেপকে নিরুৎসাহিতও করা যায় না। কারণ এটি ভবিষ্যতে অর্থ পাচার রোধে সহায়ক হবে বলে বিশ্বাস করা যেতে পারে। তবে এই মুহূর্তে যখন বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব করোনার কারণে অর্থনীতির বিপর্যস্তের শিকার, দেশি ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম, সেখানে এই মুহূর্তে প্রয়োজন কালো টাকা সাদা করার পথ বের করে দেওয়া এবং তা বিনিয়োগ নিশ্চিত করে দেশের বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে টেনে তোলা। সম্ভবত সেই লক্ষ্যেই ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে বিনা প্রশ্নে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

সবশেষে ব্যাংক ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৯ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে বর্ণিত বাংলাদেশিদের ৫ হাজার ৪২৭ কোটি অলস টাকাসহ লুক্সেমবার্গ, কেম্যান আইল্যান্ড, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, পানামা কিংবা বারমুডার মতো দেশে পাচারকৃত বাংলাদেশিদের যে বিরাট অংকের অর্থ পড়ে আছে তা দেশেবিনিয়োগের জন্য আমানতকারীই বলি আর পাচারকারীই বলি, তাদের উদ্বুদ্ধ করা এখনই প্রয়োজন। অন্তত দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করার ক্ষেত্রে এটা একটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারকে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। এবারের অর্থ বাজেটের মতো বিনা প্রশ্নে কালো টাকা সাদা করার যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে তা তাদের বিশ্বাসে ঢুকাতে হবে এবং পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনার ক্ষেত্রে পদে পদে যে জটিলতা রয়েছে তা দূর করতে হবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ