‘আমার সন্তান যেন সরকারি চাকরিজীবী হয়…’

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৪:১৫, জুলাই ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১৬, জুলাই ০২, ২০২০

আমীন আল রশীদ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে’—ভবিষ্যতে এই প্রবাদ হবে ‘আমার সন্তান যেন সরকারি চাকুরে হয়’।
শৈশব-কৈশোরে আমরা অনেক কিছু হতে চাইতাম। বাড়িতে অতিথি এলে তারাও জিজ্ঞেস করতেন, বড় হয়ে তুমি কী হতে চাও? স্বভাবতই আমরা বলতাম, ডাক্তার হবো। আরেকটু বড় হয়ে কখনও বলতাম পাইলট কিংবা বাবা মায়ের শেখানো শব্দ ‘ইঞ্জিনিয়ার’। কারণ ওই বয়সে এত খটমট শব্দ জানার কথা নয়। কিন্তু আমাদের সবাই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা পাইলট হতে পারি না। যারা এই লেখাটি পড়ছেন, মনে করে দেখতে পারেন, আমরা কেউই ছোটবেলায় বলিনি যে সরকারি চাকরি করবো বা শিক্ষক হবো কিংবা সাংবাদিক।
আমার সাড়ে পাঁচ বছরের মেয়ে একেক সময় একেকটা হওয়ার কথা বলে। একবার বলে সে ডাক্তার হবে, একবার বলে পাইলট, একবার বলে নায়িকা, আবার যখন তার দাদার সঙ্গে কথা বলে, তখন তার মনে হয় দাদার মতো শিক্ষক হবে। অনেক সময় বাবার মতো সাংবাদিক হওয়ার কথাও বলে। অর্থাৎ সে কী হবে বা হতে চায়, সেটি নির্ভর করে ওই সময়ের পরিস্থিতির ওপরে।

বড় হয়ে সন্তান কী হবে, সে বিষয়ে বাবা মায়েরও কিছু স্বপ্ন বা ইচ্ছা থাকে। সবার ক্ষেত্রে সেটা পূর্ণ হয় না। যেমন আমার বাবা চাইতেন আমি তার মতো শিক্ষক হবো। কিন্তু মা অনেক দূরদর্শী, তিনি চাইতেন তার সন্তান সরকারি চাকরিজীবী হোক—যাতে জীবন নিরাপদ হয়। কিন্তু আমি এ দুটির একটিও হইনি বা হওয়ার চেষ্টাও করিনি। এখন আমাকে যদি আপনি প্রশ্ন করেন, আপনার সন্তান বড় হয়ে কী হলে আপনি খুশি হবেন? একবাক্যে উত্তর, সরকারি চাকুরে।

গত ১৯ জুন জাতীয় দৈনিকের একটি সংবাদ শিরোনাম, ‘সরকারি চাকুরে ছাড়া কেউ ভালো নেই।’ খবরে বলা হয়, করোনার কারণে ভয়াবহ আর্থিক সংকটে পড়েছেন বেসরকারি চাকরিজীবীরা। চাকরিচ্যুতি, বেতন বন্ধ বা অনিয়মিত হয়ে যাওয়ায় অনেকে রাজধানী ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন। অনেক বাড়িওয়ালাও ভাড়া কমিয়ে দিয়েছেন। যাদের বাড়ি খালি হয়েছে তারা ভাড়াটিয়া পাচ্ছেন না। তবে বেসরকারি চাকরিজীবীরা শঙ্কায় দিন কাটালেও সরকারি চাকুরেদের জন্য গ্রেডভেদে প্রণোদনা আছে ৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা। শুধু তা-ই নয়, সরকারি চাকুরেদের জন্য সুখবর আছে প্রস্তাবিত বাজেটেও। আগামী অর্থবছরের (২০২০-২১) বাজেটে তাদের জন্য বাড়তি বরাদ্দ থাকছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনভাতা বাবদ বরাদ্দ আছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে সেটা দাঁড়াচ্ছে ৬৫ হাজার কোটি টাকা।

প্রণোদনার বাইরে বেশিরভাগ সরকারি চাকরিজীবীকে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর থেকে কাজ করতে হচ্ছে না। গত ৩১ মে থেকে সীমিত পরিসরে অফিস খুললেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অফিসগুলোতে অত্যন্ত কমসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে উপস্থিত থাকতে হচ্ছে। এমনকি গাড়ি ব্যবহার না করেও উপসচিব ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা মাসে মাসে এ বাবদ ৫০ হাজার টাকা করে খরচ পাচ্ছেন।

২৫ জুন আরেকটি জাতীয় দৈনিকের একটি সংবাদ শিরোনাম: ‘১০ বছরে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনভাতা ৩ গুণ ছাড়িয়েছে।’ সংবাদে বলা হয়, ২০১১-১২ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের সংক্ষিপ্তসার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১০ বছর আগে সরকারি চাকুরেদের বেতনভাতা দিতে সরকারের মোট খরচ হয়েছিল ২১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। তখন বেতন ১১ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা ও ভাতা ১০ হাজার ৯২ কোটি টাকা ছিল। সেই হিসাবে ১০ বছরে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রথম গ্রেড থেকে ২০তম—সব গ্রেড পর্যন্ত বেতনভাতা বেড়েছে ২২১ শতাংশ।  ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটের ১২ দশমিক ৫ শতাংশই হচ্ছে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনভাতা, যা ১০ বছর আগে ছিল ১৪ শতাংশ।

এই রিপোর্টে আরও বলা হয়, উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত বিনা সুদে গাড়ি কেনার যে সুযোগ দিয়ে রেখেছে সরকার, সেই গাড়ির তেল খরচ বাবদই প্রতি মাসে একেকজন পাচ্ছেন মোট বেতনভাতার সমান অর্থ। এছাড়া রয়েছে টেলিফোন, ভ্রমণ, গৃহকর্মী, ডোমেস্টিক এইড, আপ্যায়ন, শ্রান্তি ও বিনোদন ইত্যাদি ভাতা। আর নিচের গ্রেডের কর্মচারীরা পান যাতায়াত, টিফিন ও সন্তানের শিক্ষা ভাতা।

সরকারি চাকরিতে আরও ব্যতিক্রম ধরনের ভাতা রয়েছে, সাধারণ মানুষের অনেকেই হয়তো জানেন না। যেমন ধোলাই ভাতা, কার্যভার ভাতা, পাহাড়ি ও দুর্গম ভাতা, বিশেষ ভাতা, অবসর ভাতা, কিট ভাতা, রেশন ভাতা, ঝুঁকি ভাতা, ক্ষতিপূরণ ভাতা, প্রেষণ ভাতা, ইন্টার্নি ভাতা, প্রশিক্ষণ ভাতা, মহার্ঘ ভাতা, অধিকাল ভাতা, বিশেষ গার্ড ভাতা ইত্যাদি। যদিও সবাই এই ভাতা পান না।

চাকরি করলে সরকারি

করোনার প্রকোপ বাড়ার পরে ফেসবুকে একটি শ্লোগান বেশ জনপ্রিয় হয়েছে, তা হলো—‘চাকরি করলে সরকারি, ব্যবসা করলে ফার্মেসি ও তরকারি।’ আশা করি এটির ব্যাখ্যা করার কোনও প্রয়োজন নেই। সবাই এর অর্থ বুঝে গেছেন।

এই প্রবাদটি তৈরি হওয়ার মূল কারণ, করোনার ধাক্কায় যখন সব ধরনের বেসরকারি খাতের ভিত দুর্বল হয়ে গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, অসংখ্য কর্মী ছাঁটাই হয়েছেন; চাকরি হারিয়ে যখন অনেক বেসরকারি কর্মজীবী এরইমধ্যে ঢাকা ছেড়েছেন; অনেকের বেতন বন্ধ বা অনিয়মিত হয়ে গেছে; দেশের বহু স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানও যখন ঈদের বোনাস দেয়নি বা দিতে পারেনি—সেরকম ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও ন্যূনতম কোনও অসুবিধায় পড়তে হয়নি সরকারি চাকরিজীবীদের। বরং করোনার মধ্যে তারা বৈশাখী ভাতাও পেয়েছেন। অফিসে না গিয়েও বা কোনোমতে হাজিরা দিয়েই পূর্ণ বেতন পাচ্ছেন। উপরন্তু করোনায় আক্রান্ত হলে বা এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হলে তার জন্যও রয়েছে মোটা অঙ্কের প্রণোদনা। কিন্তু বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য কিছুই নেই। বরং চারিদিকে শুধু নেই আর নেই। এরকম মহামারির ভেতরেও চারিদিকে শুধু চাকরি হারানোর সংবাদ।

কেন সরকারি চাকরি আকর্ষণীয়?

বলাই হয়, ‘সরকারি চাকরি পাওয়ার চেয়ে যাওয়া বেশি কঠিন।’ অর্থাৎ সরকারি চাকুরেদের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা এত বেশি যে, গুরুতর অপরাধ না করলে এবং সেই অপরাধ আদালতে প্রমাণিত না হলেও চূড়ান্তভাবে কারও চাকরি যায় না। বরং এমন উদাহরণও ভুরি ভুরি যে, কোনও একটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে চাকরিচ্যুত হবার বহু বছর পরে আবার সেই চাকরি ফিরে পেয়েছেন। যে বছরগুলোয় কর্মহীন ছিলেন, সেই সময়েও বেতনভাতাও কড়ায় গণ্ডায় বুঝে পেয়েছেন।

সরকারি চাকরিজীবীদের সবচেয়ে বড় আইনি সুরক্ষার নাম ‘সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ’। অর্থাৎ প্রতিটি আইনে এই বাক্যটি উল্লেখ থাকে, প্রজাতন্ত্রের কোনও কর্মচারী এই আইনের বাইরে গিয়ে যদি সরল বিশ্বাসে কোনও অপরাধ করেন, তাহলে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না। এখানে মূল সমস্যাটা হলো, যখন কোনও সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ ওঠে, সাধারণত তদন্ত তার সতীর্থ সরকারি কর্মচারীরাই করেন। ফলে তাদের মধ্যে সব সময়ই একটা ‘ফেলো ফিলিং’ কাজ করে। যে কারণে তাদের সহকর্মীদের ওই কাজকে ‘সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ’ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করেন। কিছু ঘটনা অবশ্য খুব বেশি জানাজানি হয়ে গেলে, গণমাধ্যমে অব্যাহতভাবে রিপোর্ট হতে থাকলে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় হলে সেখানে এই বাঁচিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। কিন্তু তারপরও বেসরকারি চাকরিজীবীদের চাকরি যেরকম কচু পাতায় পানি, তার বিপরীতে সরকারি চাকরি আসলে কচু পাতায় জোঁকের মতো। সহজে ছাড়ানো যায় না। লবণ দিতে হয়।

সরকারি চাকুরেদের এই সুরক্ষা ও নিরাপত্তা একদিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে এই ধারণাটি মানুষের মনে বদ্ধমূল করা হয়েছে যে, একবার সরকারি চাকরি কোনোমতে হাতের মুঠোয় এলে সেটি আর কোনোভাবেই ছাড়ানো যাবে না। উপরন্তু আছে ঘুষ। সরকারের এমন কোনও প্রতিষ্ঠানের কথা আমরা বলতে পারবো না যেখানে কোনও না কোনও পর্যায়ে একশ’ ভাগ ঘুষমুক্ত পরিবেশে নাগরিকদের সেবা দেওয়া হয়। বরং সেবা শব্দটাই এখন সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে হাওয়া। যে সাধারণ মানুষের করের পয়সায় সরকারি চাকুরেদের বেতন হয়, সেই জনগণকেই যেকোনও সেবার জন্য গেলে প্রতি পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়। হয়তো অফিসের শীর্ষ কর্তা সৎ মানুষ। কিন্তু তার অধস্তনরা যখন অসৎ এবং ঘুষ ছাড়া কাজ করেন না, তখন ওই শীর্ষ কর্তা সৎ থাকলেও খুব একটা লাভ হয় না। কারণ তার টেবিল পর্যন্ত ফাইল আসবেই না।  খুব ব্যতিক্রম ছাড়া মানুষও সরকারি চাকুদের ঘাঁটাতে যায় না। তাদেরও যেহেতু তাড়া থাকে, অসুবিধা থাকে, ফলে ঘুষ দিয়ে হলেও কাজটা দ্রুত করিয়ে নেয়। অর্থাৎ অবস্থাটা এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে, সরকারি অফিসে কোনও কর্মকর্তা ঘুষ না খেলে সেটিই বরং এখন সংবাদ। ব্যক্তিপর্যায়ের এসব ঘুষের বাইরে আছে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প থেকে লুটপাট, বিশেষ করে কেনাকাটায়। সেই লুটপাটের সঙ্গে জড়িত থাকেন সংশ্লিষ্ট অফিসের কর্মকর্তা, ঠিকাদার এবং জনপ্রতিনিধিরাও। অর্থাৎ এখানে একটি দুর্নীতির বড় সিন্ডিকেট বা নেক্সাস খুব শক্তিশালী—যারা সাধারণত ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকে। অর্থাৎ একদিকে সরকারি চাকুরেদের বেতন ও আর্থিক সুবিধা বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে তাদের দুর্নীতি ও চুরি। অথচ একসময় ধারণা করা হতো, সরকারি চাকুরেদের বেতন কম বলে তারা ঘুষ খান। কিন্তু দেখা গেলো, বেতন কয়েক গুণ বাড়লেও কোথাও ঘুষ কমেনি। দুর্নীতি কমেনি। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে। বিশেষ করে সরকারি কেনাকাটার নামে সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনা সারা দেশেই আলোড়ন তুলেছে। যদিও করোনার কারণে গণমাধ্যমে সেসব ঘটনার ফলোআপ নেই।

ভবিষ্যৎ কী?

করোনা এসে দেখিয়ে দিয়েছে সরকারি চাকুরে ছাড়া কেউই সুরক্ষিত বা নিরাপদ নন। এমনকি মাঝারি মানের ব্যবসায়ীরাও নন। বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের লোভনীয় চাকরিও যে কতটা ঠুনকো, তাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে করোনাভাইরাস। ফলে ভবিষ্যতে সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের আগ্রহ বহু গুণ বেড়ে যাবে এবং সঙ্গত কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতার সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতিও বাড়বে। উচ্চপর্যায় থেকে তদবিরের পাশাপাশি মোটা অঙ্কের ঘুষ বাণিজ্য বাড়বে। জায়গা জমি বিক্রি করে বা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ঘুষের টাকা জোগানোর প্রবণতা বাড়বে। অভিভাবকরা যে করেই হোক তাদের সন্তানদের জন্য প্রথম না হোক, অন্তত দ্বিতীয় তৃতীয় শ্রেণির একটি সরকারি চাকরির জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করবেন। বৈধ-অবৈধ সব পথ খুঁজবেন।

যে তরুণেরা এতদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বেরোনোর পরেই লোভনীয় বেতন আর বৈশ্বিক মানের কর্মপরিবেশের কারণে বিভিন্ন করপোরেট দুনিয়ায় নিজেদের ক্যারিয়ার শুরু করার স্বপ্ন দেখতেন, তারাও এখন রং ওঠা ম্রিয়মাণ সরকারি অফিসের মাঝারি অফিসার পদে চাকরির জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়বেন। কারণ করোনা এসে তাদের বুঝিয়ে দিয়ে গেছে, সরকারি চাকরি ছাড়া এই দেশে কারও জীবিকাই একশ’ ভাগ নিরাপদ নয়।

উপায় কী?

সরকারি চাকরির প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরকালীন। এটাকে অস্বীকার করা যাবে না। অন্যান্য চাকরির চেয়ে সরকারি চাকরির নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা বেশি থাকবে, এটিও হয়তো ঠিক। কিন্তু এই সুযোগ সুবিধাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া উচিত হবে না যাতে দেশের মানুষের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, সরকারি চাকরি ছাড়া কেউই নিরাপদ নয়।

সরকারি চাকরিকে জবাবদিহিতার এতটা ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না যাতে মানুষের মনে এই ধারণা তৈরি হয় যে, অন্যায় করলেও সরকারি চাকুরেদের চাকরি যাবে না বা বড়জোর তাদের ওএসডি কিংবা বদলি করা হবে। তাতে করে সরকারি চাকরির প্রতি একদিকে মানুষের আকর্ষণ যেমন বাড়বে এবং যে করেই হোক অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের সরকারি চাকুরেই বানাতে চাইবেন; অন্যদিকে যারা সরকারি চাকরি না পাবেন তাদের মনে সরকারি চাকুরেদের প্রতি একধরনের ঈর্ষা তৈরি হবে, যা একটা সময়ে গিয়ে বড় ধরনের সামাজিক সংকটের জন্ম দেবে।

করোনাপূর্ব পৃথিবীতে বেসরকারি চাকরি যেরকম আকর্ষণীয় ছিল; যেভাবে এই খাত বিকশিত হচ্ছিল, সেটি অব্যাহত রাখতে রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে, যাতে কোনও বেসরকারি চাকরিজীবীর মনে এই আফসোস তৈরি না হয় যে সরকারি চাকরির চেষ্টা না করে ভুল করেছি। সবার জব সিকিউরিটি বা চাকরির নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

গণমাধ্যমসহ সব ধরনের বেসরকারি চাকরিতে প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটিসহ অন্যান্য সব আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে এবং এজন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরে সরকারকে চাপ প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে প্রণোদনা দিতে হবে। বেসরকারি খাত বিকশিত হওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায়গুলো দূর করার জন্য নীতিমালায় গলদ থাকলে তা সংশোধন করতে হবে। বেসরকারি খাতের কর্মীদের সঙ্গে অন্যায় বা অন্যায্য আচরণ করা হলে, অপেশাদারসুলভ আচরণ করা হলে তার সমাধানে শক্ত আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। না হলে মানুষ ধীরে ধীরে বেসরকারি চাকরির প্রতি আগ্রহ হারাবে এবং পক্ষান্তরে যেকোনোভাবে, যেকোনো মূল্যে সরকারি চাকরি পেতে মরিয়া হয়ে উঠবে। সমাজে দুর্নীতি ও অন্যায় বাড়বে। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ উৎকণ্ঠা বৃদ্ধি পাবে, যা একটা সময়ে গিয়ে বড় ধরনের সামাজিক সংকটে পরিণত হবে।

লেখক: সাংবাদিক।

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ