স্বাস্থ্য নিয়ে জালিয়াতি

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৪:৩৪, জুলাই ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৫, জুলাই ০৯, ২০২০

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীসোশ্যাল মিডিয়ায় দেখলাম একটি ছবিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং ডিজি হেলথের সঙ্গে চেয়ারে বসে এক হাসপাতালের মালিক তার হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার জন্য সরকারের সঙ্গে চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করছে। তার পেছনে দাঁড়ানো সরকারের কয়েকজন বড় বড় সচিব। ছবিটি ভাইরাল হয়েছে কারণ যে লোকের সঙ্গে চুক্তি করা হচ্ছে, র‌্যাবের সাম্প্রতিক অভিযানে দেখা গেলো সেই লোকের হাসপাতালের লাইসেন্স নেই ২০১৪ সাল থেকে। করোনা চিকিৎসার নামে তারা ভুয়া রিপোর্ট দিচ্ছে, বিনা পয়সায় টেস্ট করার কথা থাকলেও লোকজন থেকে করোনার টেস্টের নামে কামিয়ে নিয়েছে কয়েক কোটি টাকা। এর আগে জেকেজি নামের আরেকটি ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানও একই কাজ করেছে।
দেখা যাচ্ছে, এদেশে স্বাস্থ্য সচেতনতা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঘরে আগুন লাগলে পানির সন্ধানে বের হওয়ার মতো। আগে থেকে কোনও কিছুই করবে না, রোগবালাই শুরু হলে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়। এমন দৌড়ের ফল হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত। সমাজের নিকৃষ্ট কাজে, আগে থেকে প্রতারণায় যুক্ত লোকদের দেওয়া হয়েছে মানুষের জীবনমরণ সমস্যাযুক্ত কাজ দেখার দায়িত্ব। জিকেজি, রিজেন্ট জাতীয় ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে যাচাই করা যাদের দায়িত্ব ছিল, তারা নিজেরাই রয়েছেন দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। ওই সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে প্রতারণার জন্য আইনের মুখোমুখি করা হচ্ছে, কিন্তু সরকারের মধ্যে যাদের এগুলো দেখার দায়িত্ব ছিল তারা বহাল তবিয়তে আছেন।

যে খুঁটিকে কেন্দ্র করে কোনও কিছু আবর্তিত হয় তা যদি শক্ত খুঁটি না হয় তাহলে তো বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। দিনের পর দিন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় খুঁটি ছাড়া চলছে। দুর্নীতির সীমা পরিসীমা নেই এই মন্ত্রণালয়কে ঘিরে। মানুষ চিকিৎসার জন্য যাচ্ছে বিদেশে। বিদেশে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছে না, যাচ্ছে বেসরকারি খাতে পরিচালিত উন্নত হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে। অথচ বেসরকারি খাতে আমাদেরও রয়েছে অনেক হাসপাতাল। আমরা না পারছি সরকারি হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা দিতে, না পারছি বেসরকারি হাসপাতালে দিতে। সর্বত্র দুর্নীতি, রোগীর সঙ্গে প্রতারণা। দেখার কেউ নেই।

সম্ভবত সে বিষয়টা উপলব্ধি করে সংসদে সম্প্রতি কিছু বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছিলেন এবং কেউ কেউ আবার মতিয়া চৌধুরীকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী করার প্রস্তাব করেছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মর্জি হয় কিনা জানি না, উনি পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি না করলে পরিবর্তন তো সম্ভব নয়। কিছু শক্ত মানুষকে মন্ত্রী নিয়োগের কথা আমরা বলে আসছি বহুদিন ধরে, কিন্তু আমাদের সেই পরামর্শে তিনি ভ্রূক্ষেপ করেননি। বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের ধন্যবাদ জানাই যে তারা সাহস করে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন। শুধু তাই নয়, বিকল্প স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান নেত্রীর নাম প্রস্তাব করেছেন। এবার দেখা যাক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন কিনা।

করোনাভাইরাস ক্রমবর্ধমান। গতি প্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে সমগ্র দেশটাকে গ্রাস করবে। আল্লাহ না করুক নিউইয়র্কের মতো অবস্থা হলে দেশের সর্বনাশ হবে। ব্রাজিল চোখে পথ দেখছে না। দেশটার প্রেসিডেন্টের একগুঁয়েমির কারণে দেশটার সর্বনাশ হলো। শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট নিজেও আক্রান্ত হয়েছেন করোনায়।

কার্যকর কোনও প্রতিষেধক যদি আবিষ্কার না হয় তাহলে খুবই দক্ষ পরিচালনার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা করে দেশের মানুষকে রক্ষা করার পথ ও পন্থা স্থির করে চলতে হবে। সেজন্য সৎ এবং দক্ষ মন্ত্রীর দরকার। শুধু মন্ত্রী নয়, সমগ্র স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দক্ষ লোক দিয়ে ভরপুর করে রাখতে হবে। দক্ষভাবে প্রতিরোধের পথ দেখিয়েছে চীন। এখন চীনে পুনরায় সংক্রমণ আরম্ভ হয়েছে। অবশ্য তারা উহানের পদ্ধতি অনুসরণ করছে বেইজিংয়েও।

যাহোক, প্রতিষেধক আবিষ্কার না হলে সমগ্র বিশ্বটাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে করোনাভাইরাস। প্লেগ পাঁচ বছর স্থায়ী হয়েছিল। স্প্যানিশ ফ্লু দুই বছর স্থায়ী হয়েছিল। প্লেগে শুধু ইউরোপে পাঁচ কোটি লোক মরেছিল। স্প্যানিশ ফ্লুতে দুই কোটি লোক মারা গিয়েছিল। চীনে নাকি আবার প্লেগ দেখা দিয়েছে। করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কার না হলে করোনাও হয়তোবা অনুরূপ দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং বহু লোক মারা যাবে। করোনা অর্থনীতিকে পিষিয়ে মারছে। করোনা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বকে অর্থনৈতিক মন্দা গ্রাস করবে, অনাহারের আশঙ্কাও আছে।

করোনাভাইরাসের মধ্যেও পত্রিকায় দেখি ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ইত্যাদি রোগও আত্মপ্রকাশ করছে। গ্রীষ্মপ্রধান দেশে অনুকূল পরিবেশ ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া ম্যালেরিয়া প্রভৃতি রোগের প্রাদুর্ভাব হওয়াটা নতুন কোনও ঘটনা নয়। একটি মশার আয়ু কাল ২১ দিন। এই ২১ দিনের মধ্যে স্ত্রী মশা পাঁচবার গর্ভবতী হয় এবং গর্ভধারণের জন্য তার মানুষের রক্তের প্রয়োজন হয়। সাধারণত জুন-জুলাই থেকে অক্টোবর-নভেম্বর মাস পর্যন্ত মশার বংশ বৃদ্ধির পক্ষে সহায়ক। আবর্জনা সাফ করা, মশারি ব্যবহার করা, জামা কাপড় পরে থাকা, ইত্যাদি সচেতনতা থেকে এই রোগগুলো থেকে মুক্ত থাকা যায়।

কিন্তু ঢাকার দুই অংশের মেয়ররা জনস্বাস্থ্য নিয়ে ভাবেন বলে মনে হয় না। শহরের দুই অংশে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিরাজ করছে। ময়লা রাস্তা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার বিক্রি, ভেজাল খাবার যত্রতত্র। মশা মারার নামে কোটি কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণের আগের মেয়র  তো গদিই হারিয়েছেন মশা মারার ব্যর্থতায়। কিছুই তো তারা পারেন না, মশাটিও যদি না মারতে পারেন—এই শহরের মানুষ তাদের ওপর আর কী কাজে ভরসা করবে।

একসময় ম্যালেরিয়া আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়েছিল। আমাদের দেশে ১৯৬০ সালে ম্যালেরিয়া নিধন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল। ডিটিটি ও মশা মারার তেল দিয়ে মশা মেরে ১৯৬১ সাল থেকে ম্যালেরিয়া নির্মূল করার কাজ আরম্ভ করেছিল এবং নির্মূলও হয়েছিল। প্রকোপ কমে যাওয়ার পর বসে থাকলে আবারও তা ফিরে আসে।

১৯৯২ সালে আমস্টারডামে স্বাস্থ্যমন্ত্রীদের এক সম্মেলনে ‘দ্রুত ও সঠিক ম্যালেরিয়া চিকিৎসা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার’ বলে ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশসহ ১০২টি দেশ এই অঙ্গীকারপত্রে স্বাক্ষর করেছিল। ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া ও ম্যালেরিয়া কম দুর্বল রোগ নয়। এই রোগগুলোর ব্যাপারে ঢাকার দুই মেয়র যত্নবান হলে হয়তো রোগ নির্মূল অথবা নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন হবে না।

এই প্রসঙ্গে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। ১৯৫০ সালের দিকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন হাবিবুল্লাহ বাহার। সেইসময় ঢাকা শহরে মশার উপদ্রব হয়েছিল। তিনি মশক নিধনের এক কর্মসূচি নিয়েছিলেন। প্লেন থেকে ওষুধ ছিটানো হয়েছিল। বাহার সাহেবের এই নিধন অভিযানের পর দীর্ঘ ১০ বছর ঢাকায় মশার উপদ্রব ছিল না। তখন ঢাকা শহর ছিল মূলত পুরান ঢাকা আর শাহবাগ পর্যন্ত। আমরা ঢাকা আসলে পুরান ঢাকার ‘ঢাকা হোটেল’-এ থাকতাম, আর তখন হোটেলে কোনও মশারির প্রয়োজন হতো না। বর্তমান দুই মেয়রের কাছে অনুরোধ করবো মরহুম হাবিবুল্লাহ বাহারের অনুরূপ একটি মশক নিধনের ব্যবস্থা যেন গ্রহণ করেন। এত রোগ-শোক নিয়ে একটা শহরে বসবাস করা সম্ভব নয়।

এখন এডিস মশার বিস্তার ঠেকানো জরুরি। এডিস মশা প্রচুর ভাবে জন্ম নিলে ডেঙ্গু চিকুনগুনিয়া মহামারি আকারে দেখা দিতে পারে। বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে যে বরাদ্দ রাখা হয় তা নাকি সম্পূর্ণ খরচ করা সম্ভব হয় না। অথচ এই অর্থ বলতে গেলে অপ্রতুল। আমাদের দেশে স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ হয়, অথচ ভিয়েতনামে বরাদ্দ হচ্ছে ১৭ শতাংশ। সম্ভবত সে কারণেই ভিয়েতনামে করোনা ক্ষতি করতে পারেনি। পদক্ষেপ নিয়ে অগ্রসর হলে আশা করি মশাবাহিত ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া বা ম্যালেরিয়া থেকে আমরা মুক্ত হতে পারবো। উভয় মেয়র যৌথ উদ্যোগে মশা নিধনের উদ্যোগ নেবেন আশা করি। ব্যাপক পরিচ্ছন্নতা অভিযান আর মশার ওষুধ ছিটালে হয়তো করোনা নিষ্ক্রিয় করতেও সহায়ক হবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ