সব কিছু যেন ভেঙে পড়ছে

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৪:৪১, জুলাই ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৩, জুলাই ২১, ২০২০

আনিস আলমগীরলোকের মুখে গল্পটি আপনারা অনেকে শুনেছেন। এক বিদেশি বাংলাদেশে এসে বলেছিলেন, আমি সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী ছিলাম না, কিন্তু বাংলাদেশে এসে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব স্বীকার করলাম। অর্থাৎ এতো অনিয়মের মধ্যে একটি দেশ কীভাবে টিকে আছে সেটা বুঝাতে গিয়েই তিনি এই কথা তুলেছিলেন। সত্যি, সৃষ্টিকর্তা একজন না থাকলে আর তাঁর অনুগ্রহ না পেলে এত বিশৃঙ্খলার মাঝে একটা দেশ টিকতে পারে না।


মহামারির মধ্যে চার-পাঁচ মাস অতিবাহিত করার পর আমাদের অবস্থান দৃঢ় হওয়া উচিত ছিল। করোনা প্রতিরোধে আমরা শক্তিশালী হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার কারণে তা উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। আরও কত দিন এই পরিস্থিতি চলে কেউ জানি না। কোনও কোনও মন্ত্রী তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বলছেন, মৃত্যুর দিক থেকে আমাদের সংখ্যা নাকি কম। পরিস্থিতি এখন শেষ পর্যন্ত যা দাঁড়িয়েছে, মানুষ করোনার টেস্ট করাই কমিয়ে দিয়েছে।
সম্প্রতি করা এক জরিপ বলছে, কোভিড আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগের বেশি করোনা টেস্ট করাতে অনাগ্রহী। ইউনিভার্সাল মেডিক্যাল কলেজ ও রিসার্চ সেন্টারের প্রধান অধ্যাপক ডা. রিদওয়ান-উর রহমান পরিচালিত এই জরিপে অংশ নেওয়া ১২০২ জন ব্যক্তির মধ্যে ৮৫ শতাংশই চিকিৎসক, যারা কোভিড রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তারা জানান, তাদের কাছে আসা রোগীদের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগের বেশি করোনা পরীক্ষা করাতে অনাগ্রহ দেখিয়েছে। পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় এবং সামাজিক অবমাননার ভয়ে তারা টেস্ট করাতে যাননি। টেস্ট করাতে গেলে তিন থেকে ছয় ঘণ্টা লাগছে। এই পুরোটা সময়ই সম্পূর্ণ ‘এক্সপোজড’ অবস্থায় থাকতে হবে, যা রিস্কি। এছাড়া পরীক্ষার ফল দেরি করে আসা ও ভুল রিপোর্ট আসার কারণে পরীক্ষা করার আগ্রহ হারিয়েছে রোগীরা।
করোনার আক্রমণে দেশের সার্বিক অবস্থা মোটেও ভালো নয়। দেশের এই অবস্থার মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আর স্বাস্থ্য অধিদফতরের দ্বন্দ্বে করোনা মহামারি মোকাবিলার কাজে দৃশ্যত স্থবিরতা এসেছে। প্রথমে জেকেজি, তারপর রিজেন্ট এরপর সাহাবউদ্দিন মেডিক্যাল কলেজ—একে এক ধরা পড়ছে ভুয়া পরীক্ষার প্রতিষ্ঠান। করোনা রোগীদের এরা ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়েছে। অথচ যারা তাদের এই কাজ করতে দিয়েছে তাদের কোনও বিচার নেই। তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে।
গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। আর ১৮ মার্চ করোনায় প্রথম রোগী মারা যায়। এযাবৎ আড়াই হাজারের বেশি করোনায় মারা গেছেন। আর দুই লাখের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদফতর করোনা নিয়ে হেলাফেলার দায়িত্ব এড়াতে পারবে না। সাহেদ করিম রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক। তাকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অনুমোদন দিয়েছে অথচ তার হাসপাতালের লাইসেন্স পর্যন্ত নবায়ন করা ছিল না। সে শত শত টেস্ট রিপোর্ট প্রদান করেছে অথচ রিপোর্টগুলো ছিল ভুয়া। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোনও মনিটরিং ছিল না। দুটি সরকারি ডাক্তার রিজেন্টে নিয়োগ করা হয়েছিল। তারা কাজে যোগদান করে যখন রিজেন্টের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করে তখন ডাক্তারকে রিজেন্ট থেকে বদলি করে দেওয়া হয়। সাহেদ করিম রিজেন্টের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করার ডাক্তারদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছিল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর তার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ না করে বরং উভয় ডাক্তারকে বদলি করে দিয়েছিল।
এখন সাহেদ করিম আর জেকেজির চেয়ারম্যান সাবরিনার কথাবার্তায় মনে হয় তারা পয়সা বানানোর জন্য সিন্ডিকেট করেছিল মাত্র। মন্ত্রণালয় এবং তার অধিদফতরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের একটা বোঝাপড়া হয়েছিল। অনুমোদন ছাড়া করোনা পরীক্ষা এবং ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে প্রতারণার অভিযোগে রাজধানীর গুলশানের সাহাবউদ্দিন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এমডি ফয়সাল আল ইসলামকে (৩৪) গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। হয়তো সহসা বের হয়ে আসবে তার সঙ্গে কী সমঝোতা হয়েছিল, স্বাস্থ্য অধিদফতরের দুর্নীতিবাজদের।
দেখা যাচ্ছে সারা দেশে বহু হাসপাতাল খোলা হয়েছে যারা ভুয়া সার্টিফিকেট প্রদান করছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোনও নিয়ম-শৃঙ্খলা ছিল না। দিনের পর দিন বাংলাদেশি রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। পয়সা লুট করার জন্য স্বাস্থ্য বিষয় নিয়ে এতো অনিয়ম সত্যিই মর্মান্তিক বিষয়। ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে যা কিছু অনিয়ম হয়েছে, এখন দেখা যাচ্ছে ভুয়া হাসপাতাল আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর- পরস্পরের মধ্যে যোগসাজশ রয়েছে। মানুষের স্বাস্থ্য বিষয় নিয়ে ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে মুঠো মুঠো টাকা রোজগার করা হচ্ছে—এটা অধিদফতর আর মন্ত্রণালয় জানতো।
সরকার কারও কথায় কর্ণপাত করছে না। আমরা বহুবার মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্মম চরিত্রের কর্মকর্তাদের পুনর্বিন্যাস করে একটা পরিবর্তনের সুপারিশ করেছি। কিন্তু সরকার কোনও উদ্যোগ নেয়নি।
অথচ পুলিশের ভাবমূর্তি নিয়ে মানুষের মধ্যে একটা খারাপ ধারণা ছিল। গত তিন-চার মাস পুলিশের আত্মত্যাগে পুলিশের সব অতীত কর্মকাণ্ডের কথা বিস্মৃত হয়েছে মানুষ। যেখানে সন্তানেরা বৃদ্ধ করোনা আক্রান্ত মা-বাবাকে জঙ্গলে ফেলে দিয়ে গেছে, সেখানে পুলিশ এক বৃদ্ধকে কুড়িয়ে নিয়ে সেবা-শুশ্রূষা প্রদান করেছে। আমরা দেখছি কুমিল্লা শহরে এক বৃদ্ধকে তার সন্তানেরা পথের পাশে ডাস্টবিনের কাছে ফেলে গেলে পুলিশ এই বৃদ্ধকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। হাসপাতালে মৃত্যুর পরে সন্তানেরা লাশের সৎকারের জন্য আসেনি। পুলিশ সৎকারের ব্যবস্থা করেছে।
করোনার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আমরা দেখলাম সন্তানেরা আক্রান্ত বাবা-মাকে জঙ্গলে পথের ধারে ফেলে এসেছে, কিন্তু কোনও পিতা-মাতা রোগাক্রান্ত সন্তানকে পথের ধারে ফেলে দিয়ে আসেনি। আমরা আবারও প্রমাণ পেলাম মমত্ববোধে মা-বাবা বড় না, মানুষের কাছে সন্তান-সন্ততিরা বড়। করোনা নতুন রোগ। তার কোনও প্রতিষেধক কোনও প্রতিরোধক কিছুই কারও জানা নেই। এই সুযোগে রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, বুদ্ধিজীবী সবাই করোনা বিশেষজ্ঞ হয়ে গেলেন। অথচ করোনা যখন ছড়ানো শুরু করেছিল তখন জাতিসংঘের মহাসচিব নেতৃবৃন্দকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যেহেতু রোগটি নতুন, সেটাকে সম্মিলিত প্রয়াসে মোকাবিলা করতে হবে। আসলে সেটাই ছিল সার্বিক সিদ্ধান্ত। বিচ্ছিন্ন প্রয়াসে কোনও উপকার হলো না। ইতালি, স্পেন ভয়াবহ অবস্থার মোকাবিলা করেছে। ইরান, যুক্তরাজ্যও কঠিন অবস্থা মোকাবিলা করেছে। আমেরিকা আর ব্রাজিলের অবস্থা আরও ভয়াবহ। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন।
সাহেদ করিম, ডাক্তার সাবরিনাসহ কিছু প্রতারকের হাতে পড়ে দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের অবস্থা নাজুক হয়েছে। বিদেশের মিডিয়ায় বাংলাদেশের ভুয়া করোনার সার্টিফিকেট নিয়ে হেডলাইন হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের কোনও খ্যাতি আর অবশিষ্ট নেই। বাংলাদেশ সাহেদ করিমদের শাস্তির ব্যাপারে প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত। না হয় যে ভাবমূর্তি বাংলাদেশ হারিয়েছে তা আর ফিরে পাওয়া মুশকিল হবে। বিনা বিচারে শাস্তি হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়, না হয় এসব ক্রিমিনালকে ক্রসফায়ারে দেওয়ার কথা বলতাম।
আরেকটি বিস্ময়কর খবর দেখলাম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশি কূটনীতিকদের জন্য প্রতারক সাহেদ করিমের রিজেন্ট হাসপাতালকে সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। যে হাসপাতালে আধুনিক সুবিধার অভাব সেই হাসপাতালে বিদেশি কূটনীতিকদের চিকিৎসার জন্য কী করে সিদ্ধান্ত হয় মাথায় আসে না! এটা তো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চরম দায়িত্বহীন সিদ্ধান্ত বলে আমরা মনে করি। কূটনীতিকদের চিকিৎসার ব্যাপারে হাসপাতাল ডেজিগনেটেড করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। রিজেন্টকে কী দেখে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সুনির্দিষ্ট করলো সে বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জবাবদিহিতা দরকার। এই বিষয়ে তদন্ত হওয়া উচিত। বেশ কিছু পরিস্থিতিতে প্রমাণিত হয়েছে যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উপযুক্ত মন্ত্রী পায়নি।
আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করে কয়েকজন বিচক্ষণ মন্ত্রী নিয়োগ করা হোক। করোনা শক্ত হাতে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। আবার করোনা পরবর্তী দেশের অবস্থা আরও নাজুক হবে। তখনও শক্ত লোকের প্রয়োজন হবে। সুতরাং যোগ্য মন্ত্রী না থাকলে তখন সমস্ত প্রশাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
[email protected]


 

 
/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ