পদত্যাগের শেষ না শুরু?

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৬:০৬, জুলাই ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫১, জুলাই ২২, ২০২০

প্রভাষ আমিনঅবশেষে পদত্যাগ করে তিনি প্রমাণ করলেন, শত সমালোচনা সত্ত্বেও এতদিন তিনি পদ আঁকড়ে ছিলেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদের পদত্যাগের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আনন্দের হিল্লোল তুললো। দম আটকে থাকা অসহনীয় পরিবেশে এই সংবাদে সবাই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। একজন মানুষের পদত্যাগ যখন অনেক মানুষকে আনন্দিত করে, তখন বুঝে নিতে হয় সমস্যাটা কোথায়।

ব্যক্তি আবুল কালাম আজাদ কেমন মানুষ আমি জানি না। কিন্তু গত চার মাসে পুঞ্জীভূত ব্যর্থতার দায় তাকে নিতে হবে। তিনি ব্যর্থ করোনা মোকাবিলায়, তিনি ব্যর্থ দুর্নীতি প্রতিরোধে। একজন ব্যক্তির ব্যর্থতা যখন কোটি মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়, তখন তার পদত্যাগের খবর মানুষকে আনন্দিত করতেই পারে।
বিশ্বের নানা প্রান্তে বিজ্ঞানীরা যখন করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কারে ব্যস্ত, গোটা বিশ্ব যখন অধীর আগ্রহে সেই ভ্যাকসিনের জন্য অপেক্ষা করছে, বিজ্ঞানীরা যখন কোভিড-১৯ এর নানা ওষুধ নিয়ে গবেষণা করছে; তখন আমরা, মানে বাংলাদেশের মানুষ ব্যস্ত দুর্নীতি বিষয়ক গবেষণায়। এন৯৫ মাস্ক কেলেঙ্কারি, জেকেজি-রিজেন্ট কেলেঙ্কারি, সাবরিনা-সাহেদের গ্রেফতার, রিমান্ডে সাবরিনা-আরিফের মুখোমুখি, সাহাবউদ্দিন হাসপাতাল সিলগালা, স্বাস্থ্য অধিদফতরে দু’দকের অভিযান—এসবই আমাদের নিত্যদিনের শিরোনাম। আমি দেখি আর অবাক হই, এই করোনার সময়, যখন মানুষের জীবন-মৃত্যু সুতায় ঝুলছে, তখনও মানুষের মতো দেখতে কিছু প্রাণী মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পারে; তা অবিশ্বাস্য বললেও কম বলা হবে।
মহাখালীতে স্বাস্থ্য অধিদফতরে মহাপরিচালকের কার্যালয়ের প্রবেশপথে বেশ বড় করে লেখা আছে, ‘আমি এবং আমার প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিমুক্ত’। নিচে পদত্যাগী মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদের স্বাক্ষর। এর চেয়ে হাস্যকর সাইনবোর্ড আমি জীবনে দেখিনি। জাতির সঙ্গে তামাশা যেন। আগেই বলেছি, ব্যক্তিগতভাবে আবুল কালাম আজাদ কেমন মানুষ তা আমি জানি না। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতর যে দুর্নীতির আখড়া, সেটা শুধু আমি নই, বাংলাদেশের সব মানুষ জানে এবং বিশ্বাস করে। গত সপ্তাহে এই কলামে ‘স্বাস্থ্য খাতের কালো বেড়ালের খোঁজে’ শিরোনামে লিখেছিলাম, স্বাস্থ্য অধিদফতরের দুর্নীতি রীতিমতো রূপকথার মতো। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর হাজার কোটি টাকার মালিক হওয়া দুই জায়গায় সম্ভব—রূপকথার বইয়ে আর বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদফতরে। তো সেই অফিসের সামনে যদি লেখা থাকে ‘আমি ও আমার প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিমুক্ত’, তখন সেটাকে তামাশাই মনে হয়। দু’দিন আগে দুর্নীতির খোঁজে দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাস্থ্য অধিদফতরে হানা দিয়েছিল। দুদক কর্মকর্তারা যখন সেই হাস্যকর সাইনবোর্ডটির পাস দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন গোটা দৃশ্যটি একটা প্রতীকী ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। বর্তমান করোনাভাইরাসের বয়স প্রায় সাত মাস, আর বাংলাদেশে এর বয়স সাড়ে চার মাস। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি সাড়ে চার দশকের। করোনা দুর্যোগেও সেই দুর্নীতির গতি মন্থর হয়নি। বাংলাদেশে করোনা আতঙ্ক যখন তুঙ্গে, তখনই সামনে আসে এন৯৫ মাস্ক কেলেঙ্কারি। জেএমআই গ্রুপের ভুয়া এন৯৫ মাস্ক কত ডাক্তারকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে, তার কিন্তু কোনও বিচার হবে না। জেকেজি আর রিজেন্টের করোনা সার্টিফিকেট কেলেঙ্কারি কত মানুষকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে গেছে, কত মানুষকে সংক্রমিত করেছে, তার হিসাব কে রাখে। বছরের পর বছর স্বাস্থ্য অধিদফতরে দুর্নীতি হতে হতে সেটাই যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। করোনায় সবার নজর স্বাস্থ্য অধিদফতরের দিকে বলে, একের পর এক কেলেঙ্কারি ফাঁস হচ্ছে। কিন্তু এমনিতে যা শুনি, তাতে স্বাস্থ্য খাতে সাবরিনা-সাহেদরা চুনোপুঁটি, রাঘববোয়ালরা এখনও আড়ালেই আছেন। রিজেন্ট-জেকেজি হিমশৈলের চূড়ামাত্র।
চীনের উহানে করোনাভাইরাস ধরা পড়ে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর, আর বাংলাদেশে শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। মাঝে ৬৬ দিন সময় পেয়েছিল বাংলাদেশ। এই ৬৬ দিনে অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ করোনা মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে পারতো। কিন্তু এই সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আর অধিদফতরের পক্ষ থেকে দিনের পর দিন বলা হয়েছে, আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। একদম কোনও প্রস্তুতি না নিয়ে মানে শূন্য প্রস্ততি নিয়ে পূর্ণ প্রস্তুতির গল্প শুনিয়ে তারা নীতিনির্ধারকদের বিভ্রান্ত করেছে, জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে। ৬৬টি অতি মূল্যবান সময় আমরা নষ্ট করেছি অতি অবহেলায়।
আমরা বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় কঠোর মনিটরিং করিনি, মানসম্মত কোয়ারেন্টিন সেন্টার বানাইনি, পর্যাপ্ত কিট সংগ্রহ করিনি, হাসপাতাল তৈরি করিনি, ডাক্তারদের তৈরি করিনি, পিপিই জোগাড় করিনি, লকডাউন পরিকল্পনা করিনি। তাই ৬৬ দিন পর করোনা দৈত্য যখন আমাদের চোখের সামনে বিমানবন্দর দিয়ে ঢুকে সারাদেশে ছড়িয়ে গেলো, তখন অসহায় আত্মসমর্পণ এবং প্রতিদিন দুপুর আড়াইটায় মৃত্যুর স্কোর আপডেট ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই।
বাংলাদেশে কেউ পদত্যাগ করলে তার প্রতি এক ধরনের সহানুভূতি তৈরি হয়। কিন্তু অন্তত স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের ক্ষেত্রে সেটা হবে বলে মনে হয় না। কারণ মনে হয় না, তিনি সকল ব্যর্থতার দায়ভার কাঁধে নিয়ে বিবেকের তাড়নায় পদত্যাগ করেছেন। আমার ধারণা তিনি পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন অথবা নিজে বাঁচার জন্য সরে দাঁড়িয়েছেন। গত ২১ মার্চ রিজেন্টের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সমঝোতা স্মারকে রিজেন্টের পক্ষে মো. সাহেদ এবং অধিদফতরের পক্ষে মহাপরিচালক স্বাক্ষর করেছিলেন। সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরদাতার একজন এখন জাতীয় ভিলেন হয়ে কারাগারে, আরেকজন পদত্যাগ করে বাঁচতে চাইছেন। রিজেন্ট-জেকেজি-জেএমআই কেলেঙ্কারির দায়ে প্রতিষ্ঠান প্রধান আবুল কালাম আজাদকে কেন গ্রেফতার করা হবে না? পদত্যাগেই কি মাফ হয়ে যাবে সব অপরাধ? শুধু আবুল কালাম আজাদ নন, যারা যারা রিজেন্টে চিকিৎসার উপযুক্ত পরিবেশ পেলো, জেকেজি-রিজেন্টকে দুর্নীতি করার সুযোগ করে দিলো; তাদের সবাইকে খুঁজে বের করে জেকেজি-রিজেন্টের মামলায় গ্রেফতার করতে হবে। গত সপ্তাহেই লিখেছিলাম, টেবিলের বাইরে থাকা সাবরিনা-সাহেদদের নিয়ে আমরা যতটা ব্যস্ত; ভেতরে থাকা মানুষদের নিয়ে ততটা নয়। চাইলেই একপক্ষ অপরাধ করতে পারে না, অপরপক্ষের সহায়তা লাগে। আইনের আওতায় আনতে হবে প্রত্যেককে। আবুল কালাম আজাদ ‘মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষে’র ওপর দায় চাপিয়ে পার পেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে, পার পাননি।
সব নেতিবাচক ঘটনারই কিছু ইতিবাচক দিক আছে। যেমন করোনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কতটা নাজুক, কতটা অথর্ব, কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত। এখন সবার নজর স্বাস্থ্য খাতের দিকে, এখনই সুযোগ এই খাতকে বাঁচানোর। আবুল কালাম আজাদের পদত্যাগও আমাদের সামনে আরেকটা বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তার পদত্যাগই যেন শেষ না হয়। একজন ব্যক্তির পদত্যাগ খুব বেশি বদল আনবে না। অথচ স্বাস্থ্য খাতকে একেবারে ঢেলে সাজাতে হবে, দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। আমি কখনও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়ানোর দাবি করি না, এমনকি করোনার সময়ও করিনি। স্বাস্থ্য খাতে যা বরাদ্দ থাকে তার পুরোটা ঠিকমতো দক্ষতার সঙ্গে খরচ করতে পারলেই অনেক কিছু বদলে যাবে। সেই বদলটা যেন এখনই শুরু হয়। এই সুযোগে ভেঙে দিতে হবে স্বাস্থ্য অধিদফতরকে ঘিরে গড়ে ওঠা সকল সিন্ডিকেট। সত্যি সত্যি যেন স্বাস্থ্য অধিদফতর দুর্নীতিমুক্ত হয়, তার যাত্রাটা শুরু করতে হবে এখন থেকেই।
আগেই বলেছি একজন ব্যক্তি আবুল কালাম আজাদের পদত্যাগে খুব বেশি বদল হবে তেমনটা আমি বিশ্বাস করি না। পরিবর্তনের সূচনাটা করতে হবে শীর্ষ থেকে। জাহিদ মালেক কাগজে কলমে এখনও স্বাস্থ্যমন্ত্রী বটে, তবে তিনি 'নিধিরাম সর্দার' হয়ে গেছেন অনেক আগেই। ‘আমি কিছু জানি না’ বারবার এই কথা বলে বলে তিনি প্রমাণ করেছেন, তিনি আসলে 'উজিরে খামোকা'। এই সুযোগে তিনিও যদি বিদায় নেন, তাহলে স্বাস্থ্য খাতের খোলনলচে পাল্টে ফেলার কাজটা ভালোভাবে শুরু হতে পারে।
লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 

 
 
/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ