জামায়াত ছাড়ছে বিএনপি!

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৬:৫৪, জুলাই ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৬, জুলাই ২২, ২০২০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজারাজনীতি নেই। করোনা মহামারি এসে রাজনীতিকে দূরে ঠেলে সামনে নিয়ে এসেছে স্বাস্থ্য আর চিকিৎসা খাতকে। তবুও রাজনীতি আছে। স্বাস্থ্য খাতের রুগ্‌ণতার মাঝে হঠাৎ খবর, বিএনপি নাকি জামায়াত ছাড়ছে। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি। জানা গেলো, বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে দলের বেশিরভাগ কেন্দ্রীয় নেতা জানিয়ে দিয়েছেন, তারা জামায়াতের সঙ্গে দলের সখ্য আর চান না।
রাজনীতি আছে কিনা, সেটি যখন প্রশ্ন তখন বিএনপির এই জামায়াত ছাড়ার প্রকল্প আমাদের রাজনীতিকে কোথায় নিয়ে যাবে সেটা এক প্রশ্ন। তবে, একটা বিষয় পরিষ্কার হয়েছে, তারেক রহমান বা খালেদা জিয়া না বুঝলেও দলের নেতারা বুঝতে শুরু করছেন, জামায়াতকে নিয়ে আর সামনে অগ্রসর হওয়া যাবে না। তাহলে কোন প্রক্রিয়ায় দলটিকে জোট থেকে বিদায় করা হবে, তা নিয়ে নিশ্চয়ই বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা শুরু হবে।
কিন্তু জামায়াত ছাড়বে কি ছাড়বে না সেটা ঠিক করার আগে বিএনপিকে ঠিক করতে হবে তার রাজনীতি কোনটি। জামায়াতের সঙ্গে সখ্য, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তারেক রহমানের কটূক্তি, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা, যুদ্ধাপরাধের বিচারের ব্যাপারে স্পষ্ট অবস্থান নিতে না পারায় বিএনপির রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
বিএনপিতে ভর করা একসময়কার চীনপন্থী বামেরা একটা প্রচারণা সবসময় করতো, বিএনপি হলো একটি ‘উদার-মধ্যপন্থী’ রাজনৈতিক দল। কিন্তু জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত এই দলটি আসলে কখনও তা ছিল না। আওয়ামী লীগের বিরোধিতার নামে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি ও আদর্শকে মদত দেওয়া বিএনপি বরাবরই ছিল ডানপন্থী অবস্থানে। প্রতিক্রিয়াশীল নেতারা দলটিতে প্রভাবশালী থাকায় মুক্তিযোদ্ধা নেতারা আস্তে আস্তে কোণঠাসা হয়ে পড়ায় বিএনপি ‘আওয়ামী লীগ বিরোধী একটি ক্লাব’ ছাড়া কখনও একটি রাজনৈতিক দল হয়ে উঠতে পারেনি।
সেই দল যখন স্বাধীনতাবিরোধী, অসাম্প্রদায়িকতাবিরোধী, প্রগতিশীলতার পরিপন্থী জামায়াতের আলিঙ্গন ছাড়তে চায়, তখন বড় প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিএনপি নেতারা যা বলতেন, রাজনৈতিকভাবে বিএনপির অবস্থান হলো ডানের বামে ও বামের ডানে, সেটা বিএনপি কখনও প্রমাণ করতে পারেনি। একটি রাজনৈতিক দল মানুষের মাঝে জনভিত্তি গড়ে তোলে মানুষের প্রবৃত্তি বা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনের মধ্য দিয়ে। সেটার ভিত্তিতেই একটা দলের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারিত হয়।
বিএনপি লড়াই করে নিজের সঙ্গে। একদিকে তার ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আবেগ, আবার নিজেকে প্রচার করতে চায় মধ্যপন্থী দল হিসেবে। তাই জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়লেও কতগুলো মৌলিক বিষয়ে নিজের অবস্থান অস্পষ্টই রাখবে বলে ধারণা করছি। মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে স্বয়ং খালেদা জিয়া তার সংশয়ের কথা উচ্চারণ করেছিলেন। তাই রাজনীতির স্রোতে বিএনপি নিজেই নিজেকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে যে সেই পুরনো ছক থেকে বের হওয়া কঠিন।জামায়াত ছাড়বে, কিন্তু বিএনপি সেই রাজনীতি থেকে সরতে পারবে কিনা যে রাজনীতি তাকে দিয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী সব রাজনৈতিক জোটের একক নেতৃত্ব।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান যুদ্ধাপরাধীদের জেল থেকে ছেড়ে দিয়ে, গোলাম আযমকে দেশে এনে, স্বাধীনতার স্লোগান বদলে দিয়ে, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করে, স্বাধীনতাবিরোধীদের মন্ত্রিত্ব দিয়ে এমন একটা অবস্থা সৃষ্টি করেছিলেন যেন দ্রুত মানুষকে মোহগ্রস্ত করা যায়। রাজনীতিতে ধর্মকে জোরেশোরে নিয়ে এসেছিলেন তিনি মুক্তিযুদ্ধের দর্শনকে ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য। অনেকে বলবেন, জিয়াউর রহমানের সময়কার প্রেক্ষাপট বদলে গেছে, খালেদা জিয়ার সময়ও গেছে, তাই তার ছেলের বিএনপিকে নতুন পথেই হাঁটতেই হবে।
কিন্তু একুশে আগস্টের মতো সহিংস ঘটনার সঙ্গে তারেক রহমানের নাম জড়িয়ে যাওয়ায় তার প্রেক্ষাপটটাও আলোচনায় আছে। শেষ পর্যন্ত এই ঘটনার বিচারে কী প্রমাণিত হবে আমরা জানি না, তবে একথা মানতেই হবে, একুশে আগস্টের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অবিশ্বাস আর বিভাজনকে চিরস্থায়ী করেছে।
জামায়াতের সঙ্গে নতুন সমীকরণে গেলে প্রশ্ন জাগবে দলের রাজনীতির ভিতটা কি নড়ে গেলো? ধর্মভিত্তিক রাজনীতি আবার মধ্যপন্থা মেনে চলার মিশেল-অস্ত্র কাজ করবে কিনা সময় বলবে। তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের যে জায়গা আছে তাকে বিতর্কিত করে, সাধারণ মানুষ যা চায়, তাদের কথা না বললে শুধু ধর্মভিত্তিক ও ভারতবিরোধী রাজনীতি ব্যাপারটা ভালো করে কাজ করবে না, মাঠ থেকে ছিটকে পড়তে হবে। যুদ্ধাপরাধের বিচারটা শুরু হলে তরুণ প্রজন্মের ভাবনা ছিল বিএনপির উচিত হবে জোট থেকে জামায়াতকে সরিয়ে দেওয়া, যুদ্ধাপরাধীদের দায় গ্রহণ না করা। বিএনপি সময়মতো তা করতে পারেনি।
বাংলাদেশের মানুষ চায় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ফাঁসটা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ঐক্যবদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রতিরোধ দিয়ে জাতির গলা থেকে নামুক। বাস্তবতা হলো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল দল ও শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। এদেশে ধর্ম যেমন আবেগ, মুক্তিযুদ্ধও আবেগ। সেই রাজনীতি কতটা শক্ত হবে, কতটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে, সেটাই হবে আগামীর বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ।
লেখক: সাংবাদিক

 
/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ