বদলে যাওয়ার খিদে, জাগবে কবে?

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৪:৫৭, আগস্ট ০৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫৯, আগস্ট ০৮, ২০২০

তুষার আবদুল্লাহআমাকে প্রথম কথাটি বলেছিলেন মহল্লার একজন নরসুন্দর। অভিজাত এলাকার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সেলুনে প্রবেশের অভিজ্ঞতা না থাকলেও, সেখানকার একজন নরসুন্দরের সঙ্গে  আলাপ হয়েছিল দীর্ঘ এক রেলযাত্রায়। বলে রাখা ভালো, আমি প্রকৃত অর্থেই তাদের সুশীল জ্ঞান করি।  রাষ্ট্র, সমাজের  সুউচ্চ থেকে শুরু করে ধরণীতলের মানুষ তাদের কাছে এসে কত সহজে কান পেতে দেন। সেই কানের লতি ধরে নরসুন্দর নিজের জীবন ও রাষ্ট্র দর্শন ঢেলে দিতে থাকেন। যদিও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সেলুনের যে হিম আবেশ, সেখানকার যে আভিজাত্য, সেখানে মহল্লার সেলুনের মতো বাকবাকুম হবার স্বতঃস্ফূর্ত পরিবেশ তৈরি হয় না। তারপরও কিছুটা ফিসফাস তো চলেই। যাই হোক, দুই নরসুন্দরই বলেছিলেন—চুল, দাড়ি কামাতে বা রঙ মাখতে এসে সামনের আয়নায় তাকালেও, নিজের চোখে কেউ চোখ রাখতে চায় না। নিজের চোখে চোখ পড়বার আগেই গর্দান নুইয়ে ফেলেন। জানতে চেয়েছিলাম, কারণটা কী? দু’জনার উত্তর একই রকম—নিজের চোখে চোখ রাখার মুরোদ নাই মানুষের। এতটাই নষ্ট হয়ে গেছে যে, নিজেকে মানুষ ভাবতে মানুষ নিজেই লজ্জিত।

মহল্লার নরসুন্দর বলছিলেন, ‘দেখেন মামা, এই মহল্লায় কম মানুষ তো দেখি নাই। কাউকে কাউকে মায়ের পেট থিকা পড়তে দেখছি।  চোখের পলকেই কেমন বদলায় যায়। কে কেমনে পয়সা রোজগার করে সব আমার জানা। ছাপড়া ঘরের মানুষটা দালানের মালিক হইয়া গেলো ঘুম না ভাঙতেই। মহল্লায় যারা মুরুব্বি আছিল হেরা এখন নতুন দালানের মানুষের ভয়ে ঘর থেইকা বাইর হয় না বললেই চলে। মামা, এই যে ভয়ে ঘরে ঘামটি মাইরা বইসা থাকা এইটাও অপরাধ তাই না?’

শীতঘরে বসে মানুষের উত্তাপের উঠানামা দেখে অভিজাত এলাকার নরসুন্দর ভাই। তিনি বলেন, আজকের রাজা, কালকে ফকির। এই উদাহরণ আমার চেয়ে বেশি কেউ দেখেছে বলে মনে হয় না। কাজের ফাঁকে উঁকি মেরে দেখি কে কারে কী মেসেজ লেখে। ফিসফিস করে কারে কী অকাজ করার নির্দেশ দেয়। দুই একটা এমন ঘটনা আছে, যা ঘটার আগে আমি জানতাম। ঘটে যাওয়ার পর খালি অঙ্ক মিলিয়েছি। যিনি ঘটালেন, তিনি আবার কাজের জন্য আসলে ওই ঘটনার গল্প তুললেই–বরফের মতো ঠান্ডা কোনও কথা নেই।  এমন গল্প তুলতে গিয়ে দুই একজন মোটা বকশিশের খদ্দের হারিয়েছি।

বললাম—নিজের চোখে চোখ রাখতে পারেন এমন মানুষ আসেন না?

নরসুন্দর ভাই বললেন—দুর্নীতি বা অপরাধের সঙ্গে জড়িত এমন মানুষেরাই যে এখানে আসেন শুধু তা নয়। আর্থিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নন, এমন গোবেচারা মানুষেরাও আসেন। কিন্তু তাদেরও আছে গভীর অপরাধ বোধ। তারা যে প্রতিবাদ করতে পারেন না, ভয় পাচ্ছেন, নীরবে সয়ে যাচ্ছেন, এই অপরাধবোধ তাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। তাই তারা নিজ চোখে চোখ রাখার সাহস পান না।

দুই নরসুন্দর ভাইয়ের কথা মনে পড়লো সকালেই। সত্যিই দিবারাত্রি যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। বা যে স্বপ্ন আমাদের দেখতে শেখানো হয়েছিল তা কি শুধু ঘুম পাড়ানো গল্প? আমরা কি স্বপ্নের সেই সাম্য ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চাইনি। আমাদের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ অহংকার যে মুক্তিযুদ্ধ, তার দর্শন, মুক্তিযোদ্ধাদের শপথ থেকে আর কত দূরে সরে যাবো আমরা? ব্যক্তিকেন্দ্রিক হতে হতে আমরা যে আসলে সামষ্টিক দেউলিয়ার মুখে পড়েছি, এই সত্য কী করে অস্বীকার করে বসে আছি। কতক্ষণ অসত্যকে আড়াল করে রাখতে পারবো? 

১৯৭১-এর পর থেকে রাজনৈতিক কত উত্থান পতন ও মেরুকরণ পাড়ি দিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। কতটা বদলে যেতে পেরেছে বৈষম্যের সমাজ ব্যবস্থা থেকে। হাঁটা কি শুরু করতে পেরেছি মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সড়কে? কখনও হাঁটতে শুরু করিনি এমনটা বলবো না। কিন্তু নানা সময়, ভিন্ন ভিন্ন অজুহাত বা ভয়ে সেই চলা থমকে দাঁড়িয়েছে। আসতে হয়েছে পিছু হটে। স্বপ্নের পথে দুর্নিবার হেঁটে চলার মূল হাতিয়ার হচ্ছে সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যা এই মুহূর্তে অনুপস্থিত। সাংস্কৃতিক আন্দোলন সমাজ বদলে দেবে এমন বলা যাবে না। তবে সমাজ বদলের খিদা উসকে দেবে সাংস্কৃতিক আন্দোলন। সেই খিদে রাজনীতির উদোরকেও ক্ষুধার্ত করে তুলতে বাধ্য। পৃথিবীর ইতিহাস তাই বলছে। তবে সমস্যা হচ্ছে আমরা বরাবরই ইতিহাসের অমনোযোগী শিক্ষার্থী। সমাজকে বাঁচাতে ইতিহাসের ক্লাসে মনোযোগী হতেই হবে আমাদের। তুলে নিতে হবে সমাজ বদলের হাতিয়ার ‘সাংস্কৃতিক আন্দোলন’কে।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ