X
সোমবার, ২৭ মে ২০২৪
১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
সিনেমা সমালোচনা

১৯৭১ সেই সব দিন: ৫৩ বছর আগের বাস্তবতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা

আহসান কবির
আহসান কবির
২৫ আগস্ট ২০২৩, ১৪:১০আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৩, ১২:৪৮

অনুদানপ্রাপ্ত ও হৃদি হক পরিচালিত প্রথম ছবি ‘১৯৭১ সেই সব দিন’। শ্রদ্ধেয় নাট্যজন প্রয়াত ড. ইনামুল হকের গল্প ভাবনায় মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটনা প্রবাহ নিয়ে আরেকটি নতুন ছবি ‘১৯৭১ সেই সব দিন’। নাটক, যুদ্ধ, প্রেম, পার্টি, গানসহ অনেক অনুষঙ্গ ভরা এক ছবি ‘১৯৭১ সেই সব দিন’। গল্পের বয়ানে খানিক ধারাবাহিকতা হারানো এবং অগণিত চরিত্রের সমাহারে ন্যুব্জ এক ছবি ‘১৯৭১ সেই সব দিন’। ডকুমেন্টারির ছোঁয়া, ধারা বর্ণনা আর কিছু প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া এক ছবি ‘১৯৭১ সেই সব দিন’। সবশেষে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অবিচল আস্থারও এক ছবি ‘১৯৭১ সেই সব দিন’।

সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত এক পরিবারের গল্প বলার চেষ্টা করা হয়েছে ছবিতে। দাদি, বাবা-মা, তিন ছেলে, দুই ছেলের বউ, ছোট ছেলের প্রেম ও প্রেমিকা, তাদের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এবং পরিণতির বয়ান আছে এই ছবিতে। একই পরিবারের বড় ভাই সাইদ বিয়ে ও ব্যবসার কারণে পাকিস্তানের প্রতি দুর্বল হয়ে ওঠে। সে বিয়ে করে এক শিল্পপতির মেয়েকে যে কিনা পাকিস্তানি ব্যবসায়ী ও সেনা কর্মকর্তাদের পার্টিতে যায়, ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’ গান গায়।  ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মেজ ছেলে সঞ্জু এবং নাটক ও রাজনীতি সচেতন ছোট ছেলে রঞ্জু জড়িয়ে যায় আন্দোলনে এবং শেষমেশ তারা যুদ্ধে চলে যায়। যুদ্ধকালীন বড় ছেলের নিজ ও শ্বশুরের পরিবার জড়িয়ে পড়ে দ্বন্দ্বে। পরিবারভুক্ত এক সদস্য নেমে পড়ে রাজাকারগিরিতে। রাজাকারের কোনও শাস্তি না হলেও পরিবারের ছোট ছেলের আত্মাহুতির ভেতর দিয়ে ক্রমশ শেষ হয় ছবি।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বাস্তবতা তুলে ধরতে গিয়ে অনেক সময় গল্পের ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। কোনও কোনও চরিত্রের পরিণতি নেই আবার কোনও চরিত্রকে কেন আনা হয়েছে ছবি দেখে সেই প্রশ্ন উঠতেই পারে। যেমন, পরিবারের মেজ ছেলে শিক্ষক সঞ্জুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন ফেরদৌস। যুদ্ধকালীন এক বাড়িতে এসে সে রাতের খাবার খায়। বাড়িওয়ালার কাছ থেকে সে জানতে পারে সেটা রাজাকার অধ্যুষিত গ্রাম। খাওয়ার মাঝখানে রাজাকাররা বাড়ি ঘিরে ফেললে সঞ্জুকে বাড়ির পেছন দিয়ে পালিয়ে যেতে বলা হয়। পালানোর সময়ে বলা হয় মেয়েটাও সঙ্গে যাবে! মেয়েটা সাঁতার জানে না, কিন্তু চিঠি লিখে ছেলেদের পোশাক পরে নদীতে ঝাঁপ দেয়। বৃষ্টির ভেতরে অন্ধকারে চশমা বের করে ফেরদৌস সেই চিঠি পড়ে!

ছবিতে নাজিয়া হক অর্ষা নাটকের নন্দিনী। সে চিঠি লিখে দেয় সজীবকে। সজীব ধরা পড়ে পাকিস্তানিদের হাতে। অত্যাচারের কারণে তাকে কিছু দিন স্ক্র্যাচ নিয়ে হাঁটতে হয়। অর্ষাকে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা। চিঠি কিংবা অর্ষা চরিত্রের কোনও পরিণতি নেই ছবিতে, পরিণতি নেই আনিসুর রহমান মিলনের চরিত্রেরও। যে দৃশ্যে রঞ্জু অর্থাৎ আব্দুন নূর সজল মারা যায় সেই দৃশ্যে রঞ্জু রাজাকার রূপী রায়হানকে তার ব্যাগ দিয়ে পালিয়ে যেতে বলে। আবার নিজ স্ত্রী ও শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে রাগ করে সাইদ যখন শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে আসে, তারপর ছবিতে তাকে আর দেখা যায় না।  

প্রীতি ও সজল তারপরও তেপ্পান্ন বছর আগের বাস্তবতাকে ফিরিয়ে আনার প্রাণান্তকর এক চেষ্টার ছবি ‘১৯৭১ সেই সব দিন’। একাত্তরের যুদ্ধে ব্যবহৃত সামরিক অস্ত্র বা বাহন, সেই সময়ের দেয়াল লিখন ও রিকশার পেছনের ছবি, সেই সময়ের রাস্তাঘাট, ট্রেন বা গাড়ি কিংবা টেলিফোন, যুদ্ধের যেসব স্থির ছবি আমরা দেখি সেই আদলে দৃশ্য সাজানো বা মুক্তিযোদ্ধাদের ফিরে আসা একাত্তরের স্মৃতিকেই সামনে নিয়ে আসে। ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ণ হলেও পঁচিশ মার্চ রাতের নির্মম হত্যাযজ্ঞ, সাধারণ মানুষের পলায়ন, হিন্দুদের ওপর অত্যাচার, বুদ্ধিজীবী হত্যা, পাকিস্তানিদের পদলেহন, অনেক কিছুই টুকরো টুকরো মালার মতো গাঁথার চেষ্টা করা হয়েছে ছবিতে।

ছবিতে দেশাত্মবোধকসহ গান ব্যবহৃত হয়েছে কয়েকটি। পাকিস্তানিদের পার্টিতে ‘ইয়ে শ্যামে ঝালকায়ে’- উর্দু ভাষায় এই গানটি লিখেছেন চয়নিকা দত্ত এবং কণ্ঠ দিয়েছেন সঞ্চারি সেনগুপ্ত। এই পার্টিতে ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’ গানটিও ব্যবহৃত হয়েছে। এছাড়া ‘যাচ্ছ কোথায় কিছু না বলে’ গানটি লিখেছেন হৃদি হক এবং সুর করেছেন দেবজ্যোতি মিশ্র। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন ইশরাত এনি ও কামরুজ্জামান রনি। অন্য গানগুলো পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবহার করা হয়েছে।

‘১৯৭১ সেই সব দিন’ ছবিতে অভিনয় করেছেন মামুনুর রশীদ, আবুল হায়াত, গীতশ্রী চৌধুরী, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, মুনমুন আহমেদ, শিল্পী সরকার অপু, ফেরদৌস, লিটু আনাম, তারিন জাহান, হৃদি হক, আনিসুর রহমান মিলন, নাজিয়া হক অর্ষা, সানজিদা প্রীতি, আবদুন নূর সজল, সাজু খাদেম, মৌসুমী হামিদ, জুয়েল জহুর, রাশেদা রাখী প্রমুখ। এরমধ্যে মুনমুন আহমেদ, তারিন, হৃদি হক, লিটু আনাম, আবদুন নূর সজল, সানজিদা প্রীতি ও সাজু খাদেম ভালো অভিনয় করেছেন।

ছবির শুটিং শুরু হয়েছিল ঠাকুরগাঁ ও মানিকগঞ্জে, তিন বছর আগে। ড. ইনামুল হক তখন বেঁচে ছিলেন। ইনামুল হকের জন্মদিনকে ঘিরে ‘১৯৭১ সেই সব দিন’ ছবিটি মুক্তি দেওয়া হয় ২০২৩ সালের ১৮ আগস্ট। ছবির দৃশ্য ধারণে ছিলেন মেহেদী রনি এবং সম্পাদনার কাজ করেছেন কামরুজ্জামান রনি। দীর্ঘদিন পরে অভিনয়ে ফেরা লিটু আনাম এতে অভিনয় ছাড়াও শিল্প নির্দেশনা ও কোরিওগ্রাফি করেছেন। ছবিতে মনে রাখার মতো কয়েকটা সংলাপ আছে। অন্ধকারে জ্বলতে থাকা ল্যাম্প নিভে যাবার সময়কার সংলাপ- ২৫ মার্চ বাংলাদেশটাকেই অন্ধকার করে গেছে। পাকিস্তানিদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা পরিবারের বড় ছেলের এক সংলাপের জবাবে বাবার উত্তর- সম্রাট হলেও পরাধীনতায় কোনও সুখ নেই!

আহসান কবির ১৯৭১ সেই সব দিন: রেটিং ৬/১০
জনরা: মুক্তিযুদ্ধ
পরিচালক: হৃদি হক
প্রযোজক: লাকি ইনাম
প্রযোজনা: টিকিট
পরিবেশক: জাজ মাল্টিমিডিয়া
সংগীত পরিচালনা: দেবজ্যোতি মিশ্র
মুক্তি: ১৮ আগস্ট ২০২৩

সমালোচক: রম্যলেখক, সাংবাদিক ও কবি

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

আরও সমালোচনা:

আম কাঁঠালের ছুটি: দুরন্ত শৈশব মনে করিয়ে দেয়া এক ছবি

প্রিয়তমা: পরিচিত গল্প আর ‘তাড়াহুড়ো’য় নির্মিত ছবি!

প্রহেলিকা: ছবিটি দেখলে কিছু প্রশ্ন উঠবেই

‘পরাণ’-এর আরেক ভার্সন ‘সুড়ঙ্গ’!

সুলতানপুর: ফর্মুলায় আক্রান্ত ধারাবাহিকতাহীন ছবি

আদিম: ‘বস্তি ঘনিষ্ঠ’ এক অপরূপ ছবি!

পাপ: শেষ না হওয়া এক থ্রিলার গল্পের ছবি

কিল হিম: বড়শি দিয়ে মাছ ধরেন অনন্ত, কিন্তু সেটা নড়ে না!

লিডার: স্বস্তি আর অস্বস্তির পাঁচ-ছয়

লোকাল: রাজনীতির ব্যানারে প্রেম ও প্রতিশোধের ছবি!

জ্বীন: ‘জিন ছাড়ানো’র কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছবি!

/এমএম/এমওএফ/
সম্পর্কিত
ফাতিমা: সাধারণ এক নারীর ‘অসাধারণ’ সংগ্রামের ছবি
সিনেমা সমালোচনাফাতিমা: সাধারণ এক নারীর ‘অসাধারণ’ সংগ্রামের ছবি
সজলের শুভেচ্ছা ও প্রত্যাশা...
বাংলা ট্রিবিউনের দশম বর্ষপূর্তিসজলের শুভেচ্ছা ও প্রত্যাশা...
সজলের মুগ্ধতা অপির চোখে, জন্মদিনে
সজলের মুগ্ধতা অপির চোখে, জন্মদিনে
দেয়ালের দেশ: মন খারাপ করা সিনেমা
সিনেমা সমালোচনাদেয়ালের দেশ: মন খারাপ করা সিনেমা
বিনোদন বিভাগের সর্বশেষ
মায়ের মৃত্যুর পর ধর্মে আস্থা বেড়ে গেছে: জাহ্নবী
মায়ের মৃত্যুর পর ধর্মে আস্থা বেড়ে গেছে: জাহ্নবী
ওটিটিতে আসছে ‘রাজকুমার’
ওটিটিতে আসছে ‘রাজকুমার’
ফাতিমা: সাধারণ এক নারীর ‘অসাধারণ’ সংগ্রামের ছবি
সিনেমা সমালোচনাফাতিমা: সাধারণ এক নারীর ‘অসাধারণ’ সংগ্রামের ছবি
কান নিয়ে হুমার ‘খোঁচা’ ও প্রত্যাশা
কান নিয়ে হুমার ‘খোঁচা’ ও প্রত্যাশা
ফারিয়াকে চমকে দিলো আফ্রিকান ভক্ত
ফারিয়াকে চমকে দিলো আফ্রিকান ভক্ত