যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি সন্নিকটে এবং তা সপ্তাহান্তেই স্বাক্ষরিত হতে পারে। তবে তেহরান বলছে, আলোচনা চললেও এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ব্যস্ত এক সপ্তাহান্তের মধ্যেই সম্ভাব্য এই চুক্তিকে নিজের প্রেসিডেন্সির গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে তুলে ধরছেন ট্রাম্প। ইরানের প্রধান তেল রফতানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকি দেওয়ার পর তিনি জানান, তেহরানের সঙ্গে সমঝোতা কাছাকাছি চলে আসায় ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হামলা স্থগিত করা হয়েছে।
তবে ইরান স্বীকার করেছে যে আলোচনা চলছে, কিন্তু প্রস্তাবিত চুক্তি নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বারবার নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনের অভিযোগও তুলেছে দেশটি।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পর্যায়ে কোনও সমঝোতা হলেও সেটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তি হবে না; বরং যুদ্ধবিরতি বজায় রেখে আরও গভীর আলোচনার পথ তৈরি করবে।
কী বলছেন ট্রাম্প?
বৃহস্পতিবার নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প দাবি করেন, ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের সঙ্গে আলোচনা দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং অনুমোদিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আলোচনার মূল বিষয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান, বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান ও মিসরসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মতি রয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষরের সময় ও স্থান শিগগিরই ঘোষণা করা হবে বলেও জানান ট্রাম্প। তার দাবি, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিও এই সমঝোতায় সম্মতি দিয়েছেন। তবে তেহরানের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
একটি ভার্চুয়াল নির্বাচনি সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, আমরা একটি দুর্দান্ত চুক্তি করেছি। কোনও পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না। সবকিছু প্রায় সম্পন্ন।
আসলেই কি চুক্তি সন্নিকটে?
ইরান এখনও কোনও চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। বরং ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘জল্পনা’ বলে উল্লেখ করেছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সাবেক অস্ট্রীয় সামরিক কর্মকর্তা উলফগ্যাং পুসতাই বলেন, ট্রাম্পের বক্তব্য সরাসরি সত্য হিসেবে নেওয়া উচিত নয়।
তার মতে, ট্রাম্পের এই মন্তব্য তথ্যযুদ্ধের অংশ এবং এর লক্ষ্য রিপাবলিকান সমর্থকগোষ্ঠী, আন্তর্জাতিক তেল ও শেয়ারবাজার এবং ইরান সরকার।
ইরানের অবস্থান
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য কেবল জল্পনা, কিছুই চূড়ান্ত হয়নি।
তিনি বলেন, চাপ ও হুমকির মুখে নীতি থেকে সরে আসার হলে ইরান অনেক আগেই তা করতো।
বাঘাইয়ের দাবি, আলোচনার বেশিরভাগ খসড়া চূড়ান্ত হলেও যুক্তরাষ্ট্র বারবার নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, কাতার ও পাকিস্তানের মতো মধ্যস্থতাকারীরা এখনও সক্রিয় রয়েছে।
সম্ভাব্য চুক্তিতে কী থাকতে পারে?
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি, অধিকার বা ক্রয় করতে পারবে না।
তিনি আরও দাবি করেন, চুক্তি হলে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া হবে এবং বন্ধ থাকা হরমুজ প্রণালি আবারও জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
তবে এসব বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
ইরান কী চায়?
ইরানের মেহর সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তেহরান ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারকের খসড়া প্রস্তাব করেছে।
এর মধ্যে রয়েছে সব ফ্রন্টে, বিশেষ করে লেবাননে, তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি; ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি; হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা; যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার; ইরানি তেল বিক্রির ওপর সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের সম্পদ মুক্ত করা।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, পারমাণবিক ইস্যুসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে ৬০ দিনের আলোচনা চালানো যেতে পারে।
বড় বাধাগুলো কী?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সবচেয়ে বড় মতপার্থক্যের বিষয় রয়ে গেছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। এ ছাড়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি সম্পদের ভবিষ্যৎ এবং লেবাননে যুদ্ধবিরতির প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উভয় পক্ষ একটি সমঝোতা স্মারকের কাছাকাছি পৌঁছালেও স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানো এখনও কঠিন।
লন্ডনভিত্তিক থিংকট্যাংক চ্যাথাম হাউসের গবেষক আনিসেহ তাবরিজি বলেন, চুক্তি বাস্তবে স্বাক্ষর না হওয়া পর্যন্ত সেটি সম্পন্ন হয়েছে বলা কঠিন। উদযাপন করার সময় এখনও আসেনি। তার মতে, ইসরায়েলের মতো পক্ষগুলোও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এই প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারে।
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, তিনি সম্ভাব্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে চূড়ান্ত চুক্তিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামো অপসারণ, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সীমিত করা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকার দাবি জানিয়েছে ইসরায়েল।
কাতারের আমিরও ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলে সম্ভাব্য সমঝোতা প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদারের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন।
সূত্র: আল জাজিরা









