X
বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৬ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

টিকটক ভিডিও: সর্বনাশা নেশা

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২০, ১৫:০১

রেজানুর রহমান একটা ছেলে টিকটক ভিডিও বানায়। তার ফ্যান ফলোয়ারের সংখ্যা নাকি কয়েক লাখ। তার নাম অপু। উত্তরায় ব্যস্ত রাস্তা দখল করে শুটিং করছিল। ফলে পথচারীদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে দারুণ জটিলতা দেখা দেয়। কিন্তু সেদিক অপু আর তার সহযোগীদের কোনোই ভ্রুক্ষেপ ছিল না। বরং তারা পথচারীদের ওপরই চোটপাট দেখাচ্ছিল। প্রতিবাদ করতে গিয়ে একজন নিরীহ ভদ্রলোক অপু ও তার সহযোগীদের হাতে লাঞ্ছিত হন। ঘটনাস্থলে ছুটে আসে পুলিশ। অপুকে গ্রেফতার করে। সংবাদপত্রসহ দেশের সব গণমাধ্যমে ফলাও করে খবরটি প্রচার করা হয়। দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রকাশিত এতদসংক্রান্ত খবরের শিরোনাম দেখে যারপরনাই অবাক হয়েছি। টিকটক ভিডিও নির্মাতা অপুর পরিচয় দিতে গিয়ে অপুর সাথে ‘ভাই’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে। ‘অপু ভাই’ গ্রেফতার। শিরোনাম দেখে মনে হতে পারে অপু নামের ওই কিশোর অন্ধকার জগতের কোনও ‘ডন’ হয়ে উঠেছে। সে কারণে তার নামের সঙ্গে ‘ভাই’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে।
অন্যায় ও অপরাধ কর্মকাণ্ডের জন্য প্রতিদিনই তো কত মানুষ গ্রেফতার হয়। আবার ছাড়াও পেয়ে যায়। সে কারণে অপুকে গ্রেফতারের ঘটনা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি আমার কাছে। তবে অপুর চেহারা বিশেষ করে মাথার চুলের রঙ দেখে কৌতূহল দমন করতে পারিনি। কালো মাথার চুলে বাহারি রঙ দেখে ছেলেটিকে আস্ত একটা ‘বেয়াদব’ মনে হয়েছে। ফেসবুকে এই ‘বেয়াদবের’ নাকি কয়েক লাখ ফলোয়ার আছে। ওহ! মাইগড! কী করে এটা সম্ভব? আমি যাকে ‘বেয়াদব’ ভাবছি তার ফলোয়ার আছে লাখ লাখ! জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে আমি তো তার কাছে কিছুই না। তাহলে আমি তাকে বেয়াদব ভাবছি কোন যুক্তিতে?
ছেলেটি টিকটক ভিডিও’র নামে কী বানায় তা দেখার জন্য কৌতূহলী হয়ে উঠলাম। দেখলাম তার কয়েকটি টিকটক ভিডিও! স্বীকার করছি এই ছেলের মেধা আছে। কিন্তু সে তার মেধাকে ভুল পথে কাজে লাগাচ্ছে। এই যে ভুল পথের কথা বললাম তা নিয়েও তর্ক হতে পারে। একজনের কাছে যেটা ‘ভুল পথ’ অন্যের কাছে সেটা সঠিক পথ মনে হতে পারে। চোর চুরি করার পরও যুক্তি দাঁড় করায় কেন সে চুরি করেছে। পেটের ক্ষুধা নিবারণের জন্য সে চুরি করতে বাধ্য হয়েছে। এটা হলো মুদ্রার একপিঠ। মুদ্রার অন্য পিঠে রয়েছে স্বভাবগত ভাবনা। চুরি করা তার পেশা ও নেশা। সে জন্যই বোধকরি একটা কথা প্রচলিত আছে– চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনি। একই কথা বোধকরি টিকটক ভিডিও নির্মাতা অপুর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এই যে আমি তার ব্যাপারে এত নেতিবাচক কথা বলছি, সে যদি প্রশ্ন করে– কোন যুক্তিতে আপনি এত কথা বলছেন? আপনি কি জানেন ফেসবুকে আমার লাখ লাখ ফলোয়ার আছে। তখন এর উত্তর কী হবে?
শুধু অপু নয়, তার মতো এমন ধারার আরও অনেক কিশোর ও তরুণ টিকটক নির্মাতার লাখ লাখ ফলোয়ার আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের টিকটকের বিষয়বস্তু নর-নারীর প্রেম, সস্তা সংলাপ ও যৌনতা। পাশাপাশি অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি আর অশালীন শব্দের প্রয়োগও টিকটক ভিডিওর অন্যতম আকর্ষণ। আর তাই টিকটক ভিডিও নিয়ে গভীর আগ্রহ কিশোর ও তরুণ বয়সীদের। গোপন আড্ডায় অথবা প্রকাশ্যে রাস্তার মোড়ে অথবা পড়ার টেবিলে একা অথবা দলবেঁধে কিশোর তরুণেরা টিকটক ভিডিও দেখার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। গ্রাম, শহর সর্বত্রই একই অবস্থা। অনেকে নাওয়া খাওয়া ভুলে টিকটক ভিডিও দেখে সময় কাটায়। অনেকটা নেশার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে বিষয়টি। করোনাকালের এই দুঃসময়ে স্কুল কলেজ বন্ধ থাকায় টিকটক ভিডিওর প্রতি কিশোর ও তরুণদের আগ্রহ দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে পরিবেশ হয়ে উঠেছে তুষের আগুনের মতো। তুষের আগুন দেখা যায় না। কিন্তু শেষমেশ এই আগুন যখন ভয়াবহ রূপ নেয় তখনই বোঝা যায় কতটা ক্ষতি হয়েছে।
টিকটক ভিডিও অনেকটা তেমনই ভূমিকা পালন করছে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে। এখনই হয়তো বোঝা যাচ্ছে না এই ধরনের ভিডিও কিশোর ও তরুণদের মাঝে কতটা বিরূপ প্রভাব ফেলছে। কিন্তু অচিরেই এর প্রভাব ভয়াবহ আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
টিকটক ভিডিওর মূল উদ্দেশ্যই থাকে যেকোনও মূল্যে দর্শককে আটকে রাখা। এখানে দেশাত্মবোধের কোনও তাড়না নেই। অপুর একাধিক ভিডিও দেখলাম। গানের ব্যবহার থাকলেও দেশীয় শিল্পীর গান উপেক্ষিত। চটুল হিন্দি গানের প্রতিই অধিক মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। মাঝে মাঝে নীতিবাক্যও জুড়ে দেওয়া আছে। রঙিন উদ্ভট স্টাইলের চুলের কারণে বয়োজ্যেষ্ঠদের অনেকে তাকে বেয়াদব ভাবলেও তার সমবয়সীরা বেজায় খুশি। অনেক ‘অপু ভাই’ বলতে অজ্ঞান। মূলত এটাই ভবিষ্যৎ শঙ্কার বিষয়। ধরা যাক, অপুর আদর্শে তারই মতো কিশোর তরুণেরা চুলের স্টাইল ধারণ করে প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে শুরু করলো, তখন পরিস্থিতি কেমন দাঁড়াবে? প্রসঙ্গত উল্লেখ্যে, অপুকে গ্রেফতারের পর তাকে যখন আদালতে হাজির করা হয় তখন মাননীয় বিচারক তার মাথায় চুলের স্টাইল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। অপু কোনও জবাব দেয়নি। কিন্তু তার পক্ষের আইনজীবী যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন, ও তো অভিনয় করে। তাই মাথার চুল এমনটা করতে হয়েছে।
আইন পেশার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা আমার। কিন্তু যখন দেখি জলজ্যান্ত অপরাধ ও অপরাধীর পক্ষে শ্রদ্ধাভাজন আইনজীবীদের অনেকেই দাঁড়িয়ে যান তখন মনের ভেতর নানান প্রশ্ন খেলা করে। অপুর মাথায় উদ্ভট স্টাইলের চুলের পক্ষে শ্রদ্ধাভাজন আইনজীবী যত যুক্তিই দেখান না কেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস তিনি নিজের ছেলের মাথায় এমন উদ্ভট স্টাইলের চুল দেখতে চাইবেন না। তার মানে বিষয়টি অশোভন। অথচ আমরা অনেকেই স্বার্থের প্রয়োজনে অশোভন কর্মকাণ্ডের পক্ষে জেনে-বুঝেই অবস্থান নিচ্ছি। ফলে আমাদের সমাজে শোভন-অশোভনের মধ্যে এক ধরনের ঠান্ডা লড়াই চলছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অশোভন কর্মকাণ্ডই লড়াইয়ে টিকে যাচ্ছে।
প্রসঙ্গত একটা বিষয়ে জোর দিতে চাই। দেশজুড়ে কিশোর, তরুণেরা এই যে আপত্তিকর টিকটক ভিডিওর প্রতি এত আগ্রহী হয়ে উঠেছে, এজন্য কি তারাই দায়ী? অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিনোদনেরও প্রয়োজন আছে। দেশের কিশোর ও তরুণদের জন্য সেই অর্থে আছে কী কোনও বিনোদন সুবিধা? দেশে বর্তমানে বিটিভিসহ ৩০টিরও বেশি টিভি চ্যানেল ক্রিয়াশীল রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ টেলিভিশন চ্যানেলে কিশোর ও তরুণদের উপযোগী কোনও অনুষ্ঠান নেই। একটা সময় দেশের প্রায় প্রতিটি দৈনিক পত্রিকায় কিশোর ও তরুণদের জন্য পৃথক বিভাগ চালু ছিল। বর্তমানে দুই একটি দৈনিক ছাড়া অন্য দৈনিকে কিশোর, তরুণদের জন্য কোনও বিভাগও চালু নেই। অথচ দেশের জনসংখ্যার একটা বিরাট অংশই কিশোর ও তরুণ। তাদের মেধার বিকাশ ও বিনোদন ভাবনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত কোনও পদক্ষেপ না থাকায় একটা শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। বুঝে না বুঝে এই শূন্যতা পূরণের সুযোগ নিচ্ছে তথাকথিত টিকটক ভিডিও নির্মাতারা। যাদের কাছে দেশ ও দেশের সংস্কৃতি মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং আনন্দ দেওয়ার নামে অনেকে অশ্লীলতাকে পুঁজি করে বিজাতীয় সংস্কৃতিকেই উসকে দিচ্ছে। এদের মধ্যে অধিকাংশরাই টিনএজার। দেশের ভালো-মন্দ নিয়ে এদের অনেকেরই কোনও দায়বদ্ধতা নেই। একজনের দেখাদেখি অন্যজন টিকটক ভিডিও নির্মাণে আগ্রহী হচ্ছে। অনেকে ফ্যান ফলোয়ারদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রক্রিয়ায় গড়ে তুলছে কিশোর গ্যাং। রাজধানীসহ দেশের নানা স্থানে এই কিশোর গ্যাংরা নানান ধরনের অসামাজিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে। সুবিধাবাদী অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গও তাদের নানাভাবে ব্যবহার করছেন।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, টিকটক নির্মাতা এই কিশোর তরুণদের অভিভাবকদের মধ্যে অনেকেই বিষয়টি জানেন। কিন্তু বিষয়টির ক্ষতিকর দিক নিয়ে অধিকাংশ অভিভাবকের কোনও উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা নেই। অপুর বাবা স্বীকার করেছেন তিনি ছেলের ‘টিকটক’ প্রতিভা সম্পর্কে কিছুটা জানেন। কিন্তু এতে যে ছেলের কোনও সুন্দর ভবিষ্যৎ তৈরি হবে না তা তিনি জানেন না। শুধু অপুর বাবাই নন, আরও অনেক বাবা-মা সন্তানের টিকটক চর্চা, বিশেষ করে ফেসবুক চর্চার ব্যাপারে অনেকটাই উদাসীন। অনেকের চতুর সন্তান পড়াশোনার নাম করে রাত জেগে ফেসবুক চর্চায় মেতে থাকে। বাবা-মা ভাবেন তার প্রিয় সন্তান রাত জেগে ক্লাসের পড়াশোনা তৈরি করছে। কিন্তু বাস্তবে ঘটছে তার উল্টোটা। একটি ছোট্ট ঘটনা উল্লেখ করি।
রাজধানীতে এক আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। ড্রয়িং রুমে বসে আছি। পরিবারটির কর্তার সঙ্গে আলাপ করছি। তাদের স্কুল পড়ুয়া দুই ছেলেমেয়ের একজনকেও ধারে কাছে দেখলাম না। একসময় পরিবারটির কর্ত্রী ড্রয়িংরুমে এলেন। প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি অনেকটা অহংকারের সঙ্গেই ছেলেমেয়েদের সম্পর্কে বললেন, ‘রাত জেগে পড়াশোনা করেছে তো। এখন ঘুমাচ্ছে।’ বলা বাহুল্য, সেদিন ছিল ছুটির দিন। সময় ছিল সকাল ১১টা। আমার কেন যেন সন্দেহ হচ্ছিল। শেষমেশ আমার সন্দেহই বাস্তবে প্রমাণিত হয়। ছেলেমেয়ে দুটি স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় সেবার ফেল করেছিল।
প্রিয় পাঠক, একথা নিশ্চয়ই মানবেন অতিরিক্ত আদর সন্তানকে বিপথে পরিচালিত করে। কাজেই সন্তানদের ব্যাপারে সবার উচিত আরও সচেতন ও সজাগ থাকা। সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মিশে, তার বন্ধু কারা, এ ব্যাপারেও সব অভিভাবকের নজরদারি থাকা জরুরি। আপনি সত্যি সত্যি জানেন তো আপনার প্রিয় সন্তান প্রতিদিন কোথায় যায়? কার সাথে মিশে? তার বন্ধু কারা? সত্যি কী জানেন?
আবার টিকটক ভিডিওর কথায় আসি। এই লেখাটির প্রয়োজনে অপুসহ আরও অনেক কিশোর নির্মাতার একাধিক ভিডিও দেখলাম। সত্যি বলতে কী, ছেলেগুলো বেশ মেধাবী। তবে তাদের গন্তব্য সঠিক নয়। নিজেরাও হয়তো জানে না কি করছে? কেন করছে? সস্তা বাহবা পাওয়া ও নিজেকে হিরো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রায় সবাই তৎপর। অপুদের এসব টিকটক ভিডিওতে অশ্লীল অশোভন সংলাপ, অঙ্গভঙ্গি থাকায় কিশোর তরুণদের মাঝে এক ধরনের নেশায় পরিণত হয়েছে। গ্রাম, শহর সর্বত্রই কিশোর, তরুণদের একটি বড় অংশ এই বদ নেশায় আক্রান্ত। অথচ অভিভাবকদের অনেকেই দেখেও না দেখার ভান করছেন। ভাবটা এমন, ‘ছেলে মানুষ, উঠতি বয়স। এটা ওটা করে সময় কাটাবে। বয়স হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।’
অভিভাবকদের উদ্দেশে বলছি, এসব ‘এটা ওটা’ যারা করছে তারা বয়স হলে ঠিক পথে এসে যাবে তা ভাবার কোনও যুক্তি নেই। কারণ, আপনি যাকে ‘এটা ওটা’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন আসলে তা এক ধরনের মরণঘাতী মাদক নেশায় পরিণত হয়েছে। কোমলমতি ছেলেমেয়েরা একবার এই মাদকের খোঁজ পেলে আর ছাড়ে না। দিন রাত ২৪ ঘণ্টা ওই নেশায় বুদ হয়ে থাকে। কাজেই এখনই সময় তাদের ফিরিয়ে আনার।
কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব? আমরা অনেকেই অভিযোগ করতে পছন্দ করি। কিন্তু দায়িত্বের কথা উঠলেই নানা ছুঁতোয় নিজেকে সরিয়ে নেই। আড্ডা, আলোচনায় হরহামেশাই দেশের কিশোর-তরুণদের নিয়ে কথা ওঠে। তারা উচ্ছন্নে যাচ্ছে, গুরুজনদের মানে না। দেশের সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করে না– এ ধরনের অনেক অভিযোগ কিশোর তরুণদের প্রতি। কিন্তু কেন তাদের মাঝে এই ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা দেখা দিচ্ছে তা তলিয়ে দেখি না। আবারও সেই প্রশ্নটাই করি। একবার ভাবুন তো দেশে কিশোর তরুণদের জন্য আছে কি বিনোদনের কোনও সুযোগ-সুবিধা! স্কুল, কলেজের শিক্ষাজীবনও কি তাদের জন্য আনন্দময়? উত্তর হবে– না। তাহলে তারা যাবে কোথায়? করবেটা কি? কথায় আছে অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। টিকটক ভিডিও অনেকটা ‘শয়তানের কারখানা’র মতোই। শয়তান যেমন ভালো মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করে, টিকটক ভিডিও তেমনি। ভুল পথকেই সঠিক পথ বলে চিনিয়ে দিচ্ছে। এখনই সময় ভুল পথ থেকে দেশের সম্ভাবনাময় কিশোর ও তরুণ সমাজকে ফিরিয়ে আনার। তা না হলে দেশের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। ‘কথা কি পরিষ্কার? নাকি কোনও সন্দেহ আছে?’

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক: আনন্দ আলো।

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

বিষয়টি ‘কথার কথা’ নয়

বিষয়টি ‘কথার কথা’ নয়

স্কুল যেন এবার আনন্দের হয়

স্কুল যেন এবার আনন্দের হয়

এক হাত পরীর, অন্য হাত কার?

এক হাত পরীর, অন্য হাত কার?

দেশের বড় সেতুগুলোর নিরাপত্তা কি আছে?

দেশের বড় সেতুগুলোর নিরাপত্তা কি আছে?

খুলেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রয়েছে শঙ্কাও

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২০:১২

ড. প্রণব কুমার পান্ডে ১৭ মার্চ ২০২০ সাল থেকে বাংলাদেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করোনা অতিমারির বিপর্যয়ের কারণে বন্ধ থাকায় শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। শিক্ষার্থীরা তাদের প্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে না যেতে পেরে অলস সময় অতিবাহিত করেছে প্রায় দেড় বছর। এ সময় অনেকের মধ্যে উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে তাদের শিক্ষা জীবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাকালীন  শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অনলাইন ক্লাস এবং অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রম চলমান থাকলেও অনেকেই এই কার্যক্রমের আওতায় বাইরে ছিল বলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জানা যায়। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাংলাদেশে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি হলেও এখন পর্যন্ত দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেটের গতি ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে গ্রামীণ অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ডিভাইসের অপ্রতুলতা।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে সরকারি বিভিন্ন ধরনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম সফল করার জন্য শিক্ষকমণ্ডলীরও দায় রয়েছে। কারণ, শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক শিক্ষক রয়েছেন যারা এখনও নিজেদের অনলাইন কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচিত করে উঠতে পারেননি। বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকলেও সরকার বারবার চেষ্টা করেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়ার জন্য। কিন্তু কিছু সময় বিরতির পর কোভিড-১৯ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করায় বারবার সরকারি সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হয়েছে। যাহোক, করোনার তৃতীয় ঢেউ যখন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে ঠিক সেই সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  সিদ্ধান্তটি সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কিছু গাইডলাইন বা নির্দেশনা প্রস্তুত করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিতরণ করেছে। পঞ্চম শ্রেণি এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ছাত্রছাত্রীদের প্রত্যেক দিন ক্লাসের ব্যবস্থা রেখে অন্যান্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য একদিন স্কুলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক বলে মনে হয়। কারণ, শিক্ষার্থীরা একদিন স্কুলে গেলেও তাদের মানসিক বিপর্যস্ততা কাটিয়ে ওঠে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।
 
শিক্ষার্থীরা হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাণ। শিক্ষার্থীশূন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মরুভূমির মতো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্তে নিশ্চিতভাবেই প্রাণের সঞ্চার হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। তবে আমাদের মধ্যেও এক ধরনের শঙ্কাও সব সময় কাজ করছে। আমরা নিকট অতীতে আমেরিকার অভিজ্ঞতার দিকে যদি দৃষ্টি দেই তাহলে দেখবো, সেখানে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর শিক্ষার্থীদের করোনা আক্রান্তের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। এমনকি আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশকে আইসিইউতেও ভর্তি করতে হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা সত্যিই আমাদের শঙ্কার মধ্যে ফেলেছে। আর এ কারণেই মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী  যে বার্তাটি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তা হলো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলায় কিংবা করোনা পরিস্থিতি আবার যদি খারাপ হয় তাহলে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শঙ্কা থাকলেও গত কয়েক দিন ধরে যেভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম চলছে তাতে সত্যিই আনন্দিত আমরা।

তবে শিক্ষার্থীদের পাঠদান এবং পরীক্ষা চলমান রাখার ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের বিষয় আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুযোগ-সুবিধা উন্নত দেশের মতো নয়। তবে অত্যন্ত আশার খবর হচ্ছে, খোলার পর থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সরকারের গাইডলাইন মেনে চলার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঢুকতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা গেলেও ক্লাসরুমগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মানার মতো সক্ষমতা বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের নেই। কারণ, ছোট ছোট শ্রেণিকক্ষে অনেক বেশি শিক্ষার্থীর ক্লাস নেওয়া হয় বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে।

স্বীকার করতে হবে, এসব বিষয় মাথায় রেখেই একই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কয়েকটি ভাগ করে পাঠদান করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে, যা সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, দেড় বছর বাসায় অবস্থান করায় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এখন তারা কতটা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারবে সেটাই বিচার্য। অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ করেছি, শিক্ষার্থীরা পরস্পরকে আলিঙ্গন করছে, মাস্ক খুলে গল্প করছে এবং এমনকি নিজেদের টিফিন ভাগাভাগি করছে।  এসব অবশ্য তারা আবেগে করছে। এখন স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন করে শিক্ষার্থীরা যদি দূরত্ব বজায় না রাখে, তবে  নিজেরা আক্রান্ত হতে পারে, তেমনি পরিবার এবং দেশে আক্রান্তের হার বৃদ্ধি পেতে পারে। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষাবিধি মানার বিষয়টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে আরও সতর্ক থাকতে হবে।

সুরক্ষাবিধি মেনে চলার জন্য শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।  অভিভাবকরা সন্তানদের যদি বোঝাতে সক্ষম হন স্কুলে সহপাঠী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকার কাছ থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে ক্লাস করতে হবে, মাস্ক পরতে হবে এবং বারবার হাত ধুয়ে পরিষ্কার রাখতে হবে, তবেই আক্রান্তের হার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এসব না মানলে করোনা পরিস্থিতি ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি নিশ্চিত করা যেমন একটি চ্যালেঞ্জ, তেমনি অভিভাবকদের সুরক্ষাবিধি মেনে স্কুলের বাইরে অবস্থান করার বিষয়টি নিশ্চিত করা আরেকটি চ্যালেঞ্জ। মিডিয়ায় এসেছে, স্কুল গেটের বাইরে গাদাগাদি করে অবস্থান করছেন অভিভাবকরা, যা অত্যন্ত ভয়ের একটি বিষয়।  অস্বীকার করার উপায় নেই অভিভাবকরা অনেক দূর থেকে সন্তানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে আসেন এবং বসে থেকে স্কুল শেষে বাসায় নিয়ে যান। একবার স্কুলে আসার পরে বাসায় ফিরে পুনরায় স্কুলে আসা তাদের জন্য কঠিন। এ জন্যই তারা স্কুলের বাইরেই অপেক্ষা করেন।

মনে রাখতে হবে, অভিভাবকরা যদি নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে না পারি, তাহলে সন্তানদের সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে না। অনেক অভিভাবক মিডিয়ায় বলেছেন, স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের বসার কোনও ব্যবস্থা করেনি। তবে, এখানে স্কুল কর্তৃপক্ষকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। বাংলাদেশে অনেক স্কুল রয়েছে, বিশেষ করে যেগুলো শহরে অবস্থিত, সেই স্কুলগুলো অল্প জায়গার ওপরে নির্মিত। তাদের পর্যাপ্ত জায়গা নেই, যেখানে বসার ব্যবস্থা করতে পারে। ঢাকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সেখানে বিভিন্ন ভবনে স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে অভিভাবকরা স্কুলের বাইরে গাদাগাদি করে অবস্থান করেন। অভিভাবকরা যদি এরইমধ্যে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তবে খুব দ্রুত অন্যরা আক্রান্ত হবেন এবং পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করবে।

তবে এসব চ্যালেঞ্জ নিয়েই এগোতে হবে। কেউই এখন সঠিকভাবে বলতে পারবো না কবে আমরা করোনামুক্ত পৃথিবীতে বাস করতে পারবো। ফলে, করোনা পরবর্তী নিউ নরমাল জীবন পদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যদি খাপ খাইয়ে চলতে না পারি তাহলে আমরা পিছিয়ে পড়বো। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে ঠিকই এগিয়ে চলেছে। আমাদেরও উচিত তা করা। এটা করতে পারলেই করোনা সৃষ্ট বিপর্যয় থেকে শিক্ষা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবো।

শিক্ষা ব্যবস্থায় উন্নত দেশের সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাশা করা কখনোই সমীচীন হবে না। দীর্ঘদিন  শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ধ্বংস করাও ঠিক হবে না। এখন পরিস্থিতি যেহেতু কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তাই আমরা যদি নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করি, তাহলে একদিকে শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে, তেমনি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন রক্ষা করা যাবে।


লেখক: অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজন অনলাইন-অফলাইন সমন্বয়

শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজন অনলাইন-অফলাইন সমন্বয়

‘বিপদে আমি না যেন করি ভয়’

‘বিপদে আমি না যেন করি ভয়’

গ্রামাঞ্চলে টিকা কার্যক্রম: কিছু সুপারিশ

গ্রামাঞ্চলে টিকা কার্যক্রম: কিছু সুপারিশ

মহামারির বিপর্যয় মোকাবিলায় স্থানীয় সরকারের সম্পৃক্ততা জরুরি

মহামারির বিপর্যয় মোকাবিলায় স্থানীয় সরকারের সম্পৃক্ততা জরুরি

ডু নট টাচ মাই ক্লথস: আমাদের জন্য কেন জরুরি?

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৭:২৫

জোবাইদা নাসরীন আফগানিস্তানের নারীদের প্রতিবাদ এবং বিক্ষোভ দেখছে বিশ্ব। সংখ্যায় হয়তো বেশি নয়, কিন্তু তালেবানদের ভয়ভীতি উপেক্ষা করে তারা সামাজিকমাধ্যম এবং রাজপথে  সরব রয়েছেন। আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি যে আফগানিস্তানে তালেবানরা যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার করেছে সেই সরকারের মন্ত্রিসভায় নেই কোনও নারী। শুধু এটি করেই ক্ষান্ত হয়নি তালেবানরা, দেশটির নারী বিষয়ক মন্ত্রণালয় বাদ দেওয়া হয়েছে। এই মন্ত্রণালয়ের সাইনবোর্ড বদলে ফেলে সেখানে পাপ ও পুণ্য মন্ত্রণালয়ের নামে নতুন সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। সেখানে দারি ও আরবি ভাষায় লেখা হয়েছে, প্রার্থনা, নির্দেশনা এবং পুণ্যের প্রচার ও পাপ ঠেকানো মন্ত্রণালয় (বাংলা ট্রিবিউন , ১৭ সেপ্টেম্বর)।  

এমনকি মন্ত্রণালয়ের ভবনেও কোনও নারীকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন আফগান নারীরা। এর আগে নারীদের ফুটবল খেলা, নারীদের উচ্চশিক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল তারা। তালেবানেরা প্রথম যে বিষয়টির ওপর চাপ তৈরি করেছে তা হলো নারীর পোশাকের স্বাধীনতার ওপর। দেখা গেছে, রাতারাতি  দেশটির নারীরা কালো কিংবা নীল বোরকা পরে চলাচল করছে এবং তালেবানদের পক্ষে মিছিল এবং র‍্যালিতে অংশ নিচ্ছে।
 
তালেবান সরকারের এই নারীবিদ্বেষী অবস্থান এবং সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আফগানিস্তানে বুল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রদেশ বাদাখশানে কয়েক ডজন নারী রাস্তায় নেমে তালেবানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন। দেশটির রাজধানী কাবুল ও বাদাখশান, পারওয়ান ও নিমরুজ  প্রদেশে এই বিক্ষোভ হয়েছে। এই বিক্ষোভ অন্যান্য বিক্ষোভের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ  এ কারণেই যে আফগানিস্তানে নতুন সরকারের ঘোষণা দেওয়া নারীদের ঘরে থাকা এবং অন্যান্য বিষয়ে নিষেধাজ্ঞার মুখেও নিজেদের অধিকার আদায়ে বিক্ষোভ জারি রেখেছেন দেশটির নারীরা। শুধু বিক্ষোভই নয়, তারা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছেন, যে সরকারে কোনও নারী নেতৃত্ব নেই এমন সরকার তারা কোনোভাবেই গ্রহণ করবেন না। নারীকে বাদ দিয়ে তালেবানদের সরকার গঠন এবং একের পর এক নারীবিরোধী সিদ্ধান্তে  ক্ষোভ প্রকাশ করছে বিশ্বনেতৃবৃন্দও।

বিক্ষোভ যে শুধু রাজপথেই চলমান রয়েছে তা নয়, এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। নারীর পোশাক পরিবর্তনের জন্য তালেবানদের চাপের বিষয়ে ফেসবুকে একটি আন্দোলন চলেছে, আর সেই আন্দোলনের স্লোগান হলো’ #Do NotTouch My Clothes এবং #Afghanistan Culture. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই আন্দোলনকে সামনে নিয়ে আসেন আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব আফগানিস্তানের ইতিহাসের সাবেক অধ্যাপক ড. বাহার জালালি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই আন্দোলনের গুরুত্ব নিয়ে তিনি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, আফগানিস্তানের পরিচয় এবং সার্বভৌমত্ব এখন হুমকির মুখে বলে তার মনে হয়েছে, এটা নিয়ে তিনি সবচেয়ে উদ্বিগ্ন। সে কারণেই তিনি এই আন্দোলন শুরু করেছেন। এই প্রতিবাদী হ্যাশট্যাগ ফেসবুকে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং হ্যাশট্যাগের প্রতিবাদে অনেকে অনলাইনে তাদের বর্ণিল ঐতিহ্যবাহী পোশাক শেয়ার করছেন। তাতে যোগ দেন আরও অনেকে। তিনি নিজে একটি সবুজ আফগান পোশাক পরে একটি ছবি টুইটারে পোস্ট করেন এবং এর পাশাপাশি তিনি অন্য আফগান নারীদেরকেও ‘আফগানিস্তানের আসল চেহারা’ তুলে ধরার আহ্বান জানান।

শুধু আফগানিস্তানে নয়, Do Not Touch My Clothes এই আন্দোলন বাংলাদেশের জন্যও খুবই প্রাসঙ্গিক। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে যখন আফগানিস্তানে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা জারি হচ্ছিল নারীর বিরুদ্ধে, তখন কিন্তু এ দেশের অনেক নারীই মানসিকভাবে ভীত হয়ে পড়েন। কারণ, বাংলাদেশে বেশিরভাগ সময়ই বিশেষ করে নারী নিপীড়ন ব্যাখ্যা এবং বিশ্লেষণে নারীর পোশাককে অপ্রাসঙ্গিকভাবে হাজির করা হয়। তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে বিষয়গুলো নিয়ে তর্কবিতর্ক এবং নারীর প্রতি অশ্লীল বাক্য, গালিগালাজ করা হয়, তখন মনে হয় বাংলাদেশে অনেক তালেবান রয়েছে, যারা নারীকে তালেবানদের মতোই দেখতে চায় এবং নারীকে দেখার এই তালেবানি পুরুষতান্ত্রিক চোখ ভীত করে বাংলাদেশের নারীদের। এখানে এ বিষয়টিও বলে রাখা একবারেই প্রাসঙ্গিক, শুধু নিপীড়নের ক্ষেত্রেই নয়, আমরা প্রতিনিয়তই পাবলিক পরিসরে নারীর পোশাক নিয়ে, টিপ নিয়ে নানা ধরনের কটূক্তি শুনি। এই কটূক্তির পেছনে যে কারণ বা মতাদর্শ কাজ করে সেটি একভাবে যেমন নারীবিদ্বেষী এবং অন্যভাবে নারীকে বিভিন্ন পাবলিক পরিসর, চাকরিসহ নানা ধরনের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক জায়গা থেকে বাদ দেওয়ার রাজনীতি।

তাই Do Not Touch My Clothes স্লোগানকে সামনে নিয়ে যখন আফগান নারীরা তাদের বর্ণিল পোশাকগুলো তুলে একে একে বলতে থাকে ‘এটাই আমরা সংস্কৃতি, বোরকা আমার সংস্কৃতি নয় এবং ওই কালো এবং নীল বোরকা অন্য জায়গার সংস্কৃতি’ সেটি একভাবে বাংলাদেশের নারীদেরও উজ্জীবিত করে। এর পাশাপাশি আমরা আরও সাহসী কয়েকজন আফগান নারীর বিভিন্ন ধরনের প্রতিবাদ দেখেছি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আফগানিস্তানে গ্রাফিতি শিল্পী সামসিয়ার একটি ছবি। যেখানে দেখা যাচ্ছে অনেক কালো বোরকা পরা নারীর মধ্যে বইয়ের আলো হাতে দাঁড়িয়ে থাকা একজন নারী আলো ছড়াচ্ছেন।

রাস্তায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তালেবানদের নারীবিদ্বেষী আচরণ এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জারি রেখে এবং বিভিন্নভাবে এটিকে ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে আফগান নারীরা একভাবে বিশ্বের সব নারীকে শক্তি জোগাচ্ছে এবং জানাচ্ছে কীভাবে অনেক বেশি চাপের মধ্য দিয়েও আন্দোলন এবং প্রতিবাদ চালিয়ে রাখা যায়।

তাই আমাদের মনে রাখতে হবে, আফগানিস্তানে নারীর বিরুদ্ধে যা ঘটছে এবং পাশাপাশি নারীরা যেভাবে লড়ছে এই দুটোকেই বিশ্লেষণ করতে হবে সমানভাবেই। তাই এ মুহূর্তে আফগান নারীদের পাশে বাংলাদেশের নারীদের থাকতে হবে।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: [email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

আমাদের মনোযোগ বাড়াতে হবে যেখানে

আমাদের মনোযোগ বাড়াতে হবে যেখানে

বডি শেমিং ও আমাদের ‘বাজারি মন’

বডি শেমিং ও আমাদের ‘বাজারি মন’

কয়লা হয়ে বস্তায় ঢোকা জীবন

কয়লা হয়ে বস্তায় ঢোকা জীবন

তদন্ত কমিটির রিপোর্টগুলো কোথায় যায়?

তদন্ত কমিটির রিপোর্টগুলো কোথায় যায়?

রাজনৈতিক দলের বিদেশি ‘দোকান’ বন্ধ হোক

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:০৪

আনিস আলমগীর বাংলাদেশের প্রথম সারির রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রায় সবার বিদেশে রাজনৈতিক শাখা আছে। এসব শাখা রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র অনুসারে বেআইনি তবে কেন্দ্রীয় নেতাদের সম্মতিতেই চলছে। তারা বিদেশ শাখার অনুষ্ঠানে অংশ নেন, তাদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। যে কথাটা অনেকে হয়তো জানেন না, সরকারি সফর না হলে নেতাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও করেন ওইসব শাখার নেতাকর্মীরা। সরকারি-বেসরকারি যেকোনও সফরে তাদের ব্যাগভর্তি উপহার সামগ্রী এবং টাকা-পয়সা দেয় প্রবাসী রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা।

মূল দলের নেতারা ছাড়াও দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতারাও একই আদর-যত্ন পেয়ে থাকেন। অঙ্গদলের নেতারা বরং কেন্দ্রীয় নেতাদের থেকে বেশি বিদেশ ভ্রমণ করেন। যেখানে যান সংগঠনের শাখা খুলে আসেন, অনুমোদন দিয়ে আসেন। সেসব কমিটিতে স্থান পেতে স্থানীয়ভাবে চলে তীব্র প্রতিযোগিতা। বলার অপেক্ষা রাখে না, যাদের টাকা-পয়সা খরচ করার সামর্থ্য বেশি তারা উঁচু পদে আসীন হন, শিক্ষাগত যোগ্যতা, রাজনৈতিক গুণাবলি এখানে কোনও বিষয় না।

রাজনৈতিক দলের বিদেশ শাখা খোলার এই কালচার কখন থেকে চালু হয়েছে আমি জানি না। তবে এ ধরনের শাখার সঙ্গে আমি প্রথম পরিচিত হই ১৯৯৯ সালে নিউ ইয়র্কে।

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন কাভার করার জন্য গিয়েছিলাম। যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল সেবার জাতিসংঘ কর্তৃক বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের ২৫ বছরপূর্তির অনুষ্ঠান ছিল জাতিসংঘ সদর দফতরে। ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘে প্রথমবারের মতো ভাষণ দিয়েছিলেন। এসব স্মরণ করেই ছিল অনুষ্ঠানমালা।

আমি সরকারি সফরসঙ্গী ছিলাম না। আমার পত্রিকা আজকের কাগজের পক্ষ থেকে সেটা কাভার করতে যাই। একটি বাড়তি সুবিধা পেয়েছিলাম যে বেসরকারিভাবে গেলেও প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী একই বিমানে যেতে পেরেছি। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীর বাইরে আমার মতো আরও কিছু যাত্রীও সেখানে ছিলেন, যাদের সঙ্গে মাঝপথে প্রধানমন্ত্রী ঘুরে-ঘুরে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। জানি না নিরাপত্তার কথা ভেবে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানে এখন বেসরকারি যাত্রী কতটা স্থান পায় এবং তিনি আগের মতো বেসরকারি যাত্রীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন কিনা।

যাক, ব্রাসেলসে বিরতি দিয়ে আমরা যখন নিউ ইয়র্ক পৌঁছি, প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানানোর জন্য ব্যানার নিয়ে আওয়ামী লীগ যুক্তরাষ্ট্র শাখার নেতারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। পরের কয়েক দিনে তাদের সরব উপস্থিতি দেখতে পাই বিভিন্ন ভেন্যুতে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানস্থল হোটেলের লবিতে-বাইরে আওয়ামী লীগ কর্মীরা ভিড় করে থাকতো। দলীয় প্রধানকে তারা একটি হোটেলে সংবর্ধনা দিয়েছিল, যেখানে মূল অংশজুড়ে ছিল গৎবাধা ‘তেল প্রদান’। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুবলীগের কিছু নেতাও গিয়েছিলেন, তাদের নিয়েও ভিড় এবং উপহার দেওয়ার ধুম লেগে ছিল।

সেই সময় প্রায় সব দলের স্থানীয় শাখার কথা জানতে পারি। জাসদ (রব) তখন ক্ষমতার অংশীদার ছিল। আশ্চর্য হই তাদেরও মোটামুটি জনবলের কমিটি সেখানে আছে। স্থানীয় বাংলা সাপ্তাহিকগুলোতে নানা দলের নেতাদের কার্যক্রম ছাপা হতো। শুধু রাজনৈতিক দল নয়, বিভিন্ন জেলা, উপজেলার শাখা, এমনকি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের শাখাও দেখতে পাই। বিএনপির সমাবেশ দেখতে পাই জাতিসংঘের অদূরে ‘খোয়াড়ে’র মতো পুলিশি বেষ্টনীতে ঘেরা একটি জায়গায়, যেখানে তারা সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছিল।

প্রথমবার আমি প্রায় দুই মাস ছিলাম। তখনকার বাংলাদেশি জনসমাজ এবং অন্যান্য দেশের জনসমাজের চিত্র দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। আমি স্থানীয় সাপ্তাহিক ‘বাংলা পত্রিকা’র সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে রাজনৈতিক দলের এসব ‘দোকান’ বন্ধ করার অনুরোধ করেছিলাম, যাতে বাংলাদেশিরা মূলধারার রাজনীতিতে আগ্রহী হয়। আর সেটা হলে বাংলাদেশের মান বিদেশে বাড়তো, যখন ইন্ডিয়ান-আমেরিকানদের উদাহরণ আমাদের চোখের সামনেই ছিল। অবশ্য নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর অনেক স্থানে ভারতীয়রাও তাকে কালো পতাকা দেখাচ্ছে। গত ১৫ আগস্ট ভারতের জাতীয় দিবসে ‘রিজাইন মোদি’ ব্যানার টানিয়েছে লন্ডনসহ অনেক শহরে।

দুর্ভাগ্য, এর পরের বার ২০০৪ সালে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের আমন্ত্রণে আমেরিকা সফরে গিয়েও দেখেছি বাংলাদেশিদের এই কালচার অব্যাহত আছে। এখন নাকি তার পরিধি আরও বেড়েছে। জাতিসংঘের ৭৬তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে গেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পত্রিকায় দেখলাম এরমধ্যেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশি অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটস এলাকা। ১৮ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সফরের পক্ষে ও বিপক্ষে দিনভর কর্মসূচি চলার সময় এ ঘটনা ঘটে।

এ সময় দফায় দফায় হামলা, পাল্টা হামলা, ধাক্কাধাক্কি আর কিল-ঘুসির ঘটনা ঘটেছে। একপর্যায়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। তবে উভয় পক্ষই পুলিশ বেষ্টনীর মধ্যে আক্রমণাত্মক স্লোগান দিতে থাকে। এর ফলে সন্ধ্যা সাড়ে ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত পুরো এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তি দেখে জ্যাকসন হাইটস এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই অপ্রীতিকর ঘটনায় এলাকার বাসিন্দারা ভয়ে পুলিশকে ফোন করেন।

আমার সাংবাদিক বন্ধু প্রথম আলোর নিউ ইয়র্ক সংস্করণের সম্পাদক ইব্রাহিম চৌধুরীর মতে,  ‘জ্যাকসন হাইটসের সাদা বাসিন্দারা ওই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। তারা বাংলাদেশিদের হৈ-হল্লা, মারামারি কালচারে অভ্যস্ত না। ৭৩ স্ট্রিটের হালচাল দেখে এমনকি এই প্রজন্মের বাংলাদেশিরাও ওই এলাকায় যেতে চায় না। ২০ মাইলেরও বেশি দূরে নিঝুম রাতে ম্যানহাটনের হোটেলে যখন প্রধানমন্ত্রী ঘুমাচ্ছেন তখন এখানে ট্যাক্সি না চালিয়ে, রেস্টুরেন্টের কাজে না গিয়ে সরকারি দলের সমর্থকরা কী সুখে কয়দিন ধরে জমায়েত করছে তারা জানে! অনেক নারী সমর্থকরাও আছে এই ভিড়ে। তবে বিএনপি রাতজাগা কর্মসূচিতে নেই, তারা ক্ষমতার ভাগ পাওয়ার কোনও আশা দেখে না।’

শনিবার যখন বাংলাদেশিরা ওই এলাকায় মারামারি করছে সেদিনই খন্দকার আবদুল্লাহ নামের এই প্রজন্মের একজন পুলিশ কর্মকর্তা কমান্ডিং অফিসার হয়েছেন নিউ ইয়র্কে, ভবিষ্যতে তার পুলিশ কমিশনার হওয়ার সম্ভাবনা আছে ওই শহরে। শাহানা হানিফ নামে আরেকজন তরুণী মূলধারার রাজনীতিতে অংশ নিয়ে সিটি কাউন্সিল হতে যাচ্ছেন, সোমা সাইদ নামের আরেকজন হতে যাচ্ছেন সিভিল বিচারক।

আমেরিকার মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশিদের অবদান ক্ষীণ হলেও দ্বিতীয় প্রজন্মের অনেক স্কলার সুনাম কামাচ্ছেন অন্য সেক্টরে। তৃতীয় প্রজন্মও এগিয়ে আসছেন। কিছু দিন আগে বিখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিনে ৩০ বছরের কম বয়সী ৩০ উদ্যোক্তার তালিকায় স্থান পেয়েছেন (Forbes 30 Under 30 list) বাংলাদেশি নাবিল আলমগীর। তাকে নিয়ে আমেরিকান পত্রিকায় সংবাদ বেরিয়েছে। বাংলাদেশে ঢাকা ট্রিবিউন তার একটি সংবাদ প্রকাশ করেছে। নাবিলের ‘লাঞ্চবক্স’ নামের একটি অ্যাপ রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীদের লাভের মার্জিন বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে একশ’ ডলারের অর্ডার থার্ডপার্টিকে দিয়ে কাস্টমারের বাসায় পৌঁছিয়ে যখন তাদের লাভ হতো ৫ ডলার, সেটা এখন হচ্ছে ২৫ ডলার। আর করোনাকালে নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, তার কোম্পানির ২০২০ সালের রাজস্ব আয় সাতগুণ বেড়েছে।

বাংলাদেশি-আমেরিকানদের এ ধরনের সাফল্যের খবর কিংবা যেকোনও দেশ থেকে প্রবাসীদের সাফল্যের খবর বাংলাদেশে এলে আমরা অভিভূত হয়ে পড়ি। আমাদের গর্ব হয়। অথচ আমাদের পড়তে হয় তাদের নেতিবাচক খবর, বিদেশে গিয়েও দেশি রাজনীতি নিয়ে মারামারির খবর। আমি বিশ্বাস করি, দল-মত নির্বিশেষে প্রবাসীদের এসব কর্মকাণ্ড দেশের মানুষ ভালো চোখে দেখে না। এই সংক্রান্ত খবরগুলোর নিচে মানুষের মতামত দেখলেই প্রবাসীরা বুঝতে পারবেন সেটা।

আমাদের দেশটি ছোট। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুসারে এই দশকের শেষে, মানে ২০৩০ সালে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের অষ্টম জনবহুল রাষ্ট্র এবং আমাদের প্রতিবেশী ভারত হবে বিশ্বের প্রধান জনবহুল রাষ্ট্র। এত সংখ্যক মানুষের জায়গা দেশের মাটিতে হবে না। এই জনগণকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করে বিদেশে পাঠাতে হবে। আর এই দায়িত্ব পালনে সরকার এবং সরকারি দলের ভূমিকাই বেশি। সরকারের কাছ থেকে দেশে ব্যাংক-বিমা খোলার লাইসেন্স, পাওয়ার প্ল্যান্ট বা কোনও বিদেশি টেন্ডারের কমিশন পায় বলেই এরা বিদেশে বসেও দেশের রাজনীতির দোকান খুলে বসে আছে। আগের সরকার আমলেও তা-ই হয়েছে। এসব প্রবাসী নেতা দেশি দুর্নীতিবাজ নেতাদের তাদের ব্যবসায়িক পার্টনার দেখিয়ে দেশের টাকা বিদেশে পাচার করতে সহায়তা করে আসছে। তাই সব দলের উচিত প্রবাসীদের দেশি রাজনীতিতে যুক্ত না করা এবং শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে রাজনৈতিক দলগুলোর ‘বিদেশি দোকান’ বন্ধ করা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

দায় এড়াতে পারবে না নতুন তালেবান

দায় এড়াতে পারবে না নতুন তালেবান

ই-কমার্স প্রতারণা থামানোর উপায়

ই-কমার্স প্রতারণা থামানোর উপায়

জিয়ার কবর নিয়ে রাজনীতি

জিয়ার কবর নিয়ে রাজনীতি

তালেবানের আফগান দখলে পাকিস্তানের লাভ-ক্ষতি

তালেবানের আফগান দখলে পাকিস্তানের লাভ-ক্ষতি

শিক্ষকতা কেন ‘ঘটনাক্রমে’ পেশা?

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:৪৪

উমর ফারুক কেএফসি’র প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল হারল্যান্ড ডেভিড স্ট্যান্ডার্সের শীর্ষে ওঠার গল্পটা আমরা জানি। একজন চা বিক্রেতার বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার গল্পটা আমরা জানি। একজন তামাক ও দাস ব্যবসায়ীর বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের জাতির জনক হয়ে ওঠার গল্পটা আমরা জানি। হকার থেকে ধনী হয়ে ওঠা ওয়ারেন বাফেটের জীবনগল্পটা আমরা জানি। টুঙ্গিপাড়ার একজন খোকা বাবুর বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার গল্পটাও আমরা সবাই জানি। এগুলো নিশ্চিতভাবে সংগ্রামের গল্প, ঘটনাক্রমে ঘটে যাওয়া কোনও গল্প নয়।

একই সঙ্গে রাতারাতি ধনী হয়ে ওঠা অসংখ্য মানুষের গল্প আমাদের জানা। একজন ব্যবসায়ীর কোনও রকম রাজনৈতিক চর্চা ছাড়াই রাতারাতি জনপ্রতিনিধি হয়ে ওঠার গল্পটাও আমাদের জানা। সুযোগ বুঝে অনেকের মন্ত্রী হয়ে ওঠার গল্পটাও আমাদের অজানা নয়।

ঘটনাক্রমে ঘটে যাওয়া কদাচিৎ ঘটনা ছাড়া প্রায় সবটাই অপ্রত্যাশিত, অনভিপ্রেত ও নিন্দনীয়। এসব ঘটনা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কোনও সুফল বয়ে আনে না। একজন ব্যবসায়ী যদি রাতারাতি, ঘটনাক্রমে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠেন তাহলে তা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। একজন ডাক্তার যদি ঘটনাক্রমে ডাক্তারি পেশা বেছে নেন তাহলে তা স্বাস্থ্যসেবার জন্য ক্ষতিকর। একজন ইঞ্জিনিয়ার যদি ঘটনাক্রমে তার পেশা বেছে নিয়ে থাকেন তাহলেও তা ক্ষতিকর। একজন বিসিএস ক্যাডার যদি ঘটনাক্রমে পছন্দের তলানি থেকে তার শিক্ষকতা পেশা পেয়ে থাকেন তাহলেও তা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর যখন একজন শিক্ষক ঘটনাক্রমে ‘শিক্ষক’ হয়ে উঠছেন। শিক্ষকতা কোনও পেশা নয়, ব্রত। আর দশটি সাধারণ ব্রতর মতো নয়, একটি অনন্য ব্রত। রাষ্ট্র তাকে যথাযথ সম্মান দেবে না, সমাজ তাকে যথাযথ সম্মান দেবে না, তাকে বিনা বেতনে চাকরি করতে হবে, তাকে এমপিওভুক্তির জন্য লড়তে হবে, তাকে অভাবের সঙ্গে লড়তে হবে, এটা জেনেও তিনি শিক্ষকতাকে ব্রত হিসেবে বেছে নেবেন, এবং সেই ব্রত যথাযথভাবে পালন করে যাবেন, এজন্যই এর নাম শিক্ষকতা! কথাটায় যুক্তি যত কম, হাস্যকরও তত বেশি।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে একটা বড় অংশ ঘটনাচক্রে শিক্ষক। যারা হয়তো অন্য কোনও পেশায় না গিয়ে এই পেশায় এসেছেন। তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রয়োজন। একই অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রভাবশালীদের তদবিরে শিক্ষক নিয়োগ হয়। যোগ্যতা এখানে মূল ব্যাপার নয়। তিনি আরও বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে যারা, তারা ছাত্রনেতাদের কথায় ওঠেন-বসেন।

এই দুটো উদ্ধৃতি থেকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মোটাদাগে কয়েকটা সমস্যা চিহ্নিত হয়। এক. ঘটনাক্রমে শিক্ষক। দুই. শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। তিন. প্রভাবশালীদের তদবিরে শিক্ষক নিয়োগ হয়। চার. শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা মূল বিষয় নয়। পাঁচ. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রনেতারা ছড়ি ঘোরান। ছয়. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানরা ছাত্রনেতাদের কথায় ওঠেন ও বসেন।

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে দুই মন্ত্রী সাম্প্রতিক এমন মন্তব্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভাবতে অবাক লাগছে, এই দীর্ঘ পথচলায় আজও আমরা শিক্ষাকে ‘ঘটনাক্রমে শিক্ষক’ লজ্জামুক্ত করতে পারলাম না। আজও  আমরা প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ব্যবস্থা করতে পারলাম না। শিক্ষক নিয়োগকে তদবিরমুক্ত করতে পারলাম না! এমন ছাত্রনেতা নির্বাচন করতে পারলাম না, যারা প্রতিষ্ঠান প্রধানকে ওঠাবেন না, বসাবেন না। এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানও নিয়োগ দিতে পারলাম না, যারা ছাত্রনেতাদের কথায় উঠবেন না, বসবেন না।

এখন প্রশ্ন জাগছে, এই ব্যর্থতা কার? রাষ্ট্রের, নাকি শিক্ষকদের? ব্যর্থতার দায় নিয়ে যদি বিতর্কে না জড়াই তাহলে দুই মন্ত্রীর এমন মন্তব্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য নতুন আলোর সূচনা করতে পারে। কারণ, এই প্রথম আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল সংকটকে চিহ্নিত করতে পেরেছি। সমস্যা চিহ্নিত করতে পেরেছি। সমস্যা স্বীকার করে নিয়েছি। ফলে আন্তরিকতা থাকলে এখন শিক্ষা ব্যবস্থাকে সংকটমুক্ত করা সম্ভব। মূলত এই মন্তব্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের মুক্তির এক দুরন্ত সম্ভাবনা।

শিক্ষার মান বিশ্লেষণ বলছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের শিক্ষার মান ২ দশমিক ৮ শতাংশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কায় শিক্ষার মান ২০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং পাকিস্তানের শিক্ষার মান ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু কেন আমাদের শিক্ষার মানের এই বেহাল দশা? তাহলে কি ঘটনাক্রমে শিক্ষকদের জন্যই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এই ভয়াবহতা নেমে এসেছে? কিন্তু কেন শিক্ষকতা আমাদের দেশে পছন্দ না হয়ে ঘটনাক্রমে ঘটে যাওয়া পেশা হলো?

উন্নত দেশের শিক্ষকদের সঙ্গে আমাদের শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য কতটা?

ক’বছর আগেও আমাদের দেশে শিক্ষকতা পেশার জন্য প্রকাশ্য ঘুষ প্রচলন ছিল। সবাই জানতো কিন্তু কেউ কিছু বলতো না। এর নাম ছিল অনুদান। ক’টাকা প্রতিষ্ঠানের খাতে জমা হতো, বাকিটা হতো ভাগবাটোয়ারা। তখন কয়েক লক্ষ টাকা ও একটি ফোনে জুটে যেত শিক্ষকতা পেশা। যাদের কোনও চাকরি হয়নি, বয়স শেষ অথবা প্রায় শেষ– তিনি নেতাদের ধরে কিছু টাকা অনুদান দিয়ে এলাকার স্কুল অথবা কলেজে শিক্ষকতায় যোগদান করতেন।

কী নির্মম একটা গল্প! অপেক্ষাকৃত কম মেধার ও কখনও কখনও বখাটে, সন্ত্রাসীদের হাতে আমরা তুলে দিতাম আমাদের প্রজন্ম বিনির্মাণের দায়িত্ব। একবার ভাবুন তো, একটি শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের জন্য কি আর কোনও পদক্ষেপ দরকার আছে? এখন এই সুযোগ কমেছে। সময়টা এখন খানিকটা বদলে গেছে। এখন নিয়োগ হয় এনটিআরসি’র মাধ্যমে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য কিছু ক্ষেত্র এখনও অযোগ্য শিক্ষকদের নিয়োগের দ্বার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে শিক্ষকতা পছন্দের পেশা নয়, বরং ঘটনাক্রমে পেশা। সাধারণত কেউ এই পেশায় আসতে চান না। সে জন্য একসময় আমরা সবচেয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন অনেক মানুষকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিয়োগ দিয়েছি। অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টো। কিন্তু কেন কেউ শিক্ষকতা পেশায় আসতে চান না? খুব সোজাসাপ্টা কথা হলো, এই পেশায় আর্থিক সুযোগ-সুবিধা অত্যন্ত কম। কম মানে শুধু কম নয়, অতি নগণ্য। আমরা এক দুর্ভাগা জাতি, এজন্যই হয়তো শিক্ষকতা পেশার জন্য বরাদ্দ রেখেছি সর্বনিম্ন।

পেশাগত ক্ষেত্রে আমাদের সর্বোচ্চ বরাদ্দ ক্যাডার পেশায়। তাও আবার সব ক্যাডারে নয়, কয়েকটি পেশায়। যেখানেও শিক্ষকতা পেশা অবহেলিত। ফলে প্রতিদিন মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, যা আমাদের পুরো রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থাকে এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

গবেষণা বলছে, আমাদের ৬৬ শতাংশ স্নাতক পাস মানুষ কর্মহীন। এটা দুঃখজনক। যদি আমরা মেধাবী প্রজন্ম তৈরি করতে চাই, যদি আমরা শুধু মেধাবী বিসিএস ক্যাডারও তৈরি করতে চাই, যদি শিক্ষকতাকে পছন্দের তালিকায় আনতে চাই, তবে সবার আগে এই পেশার সামাজিক ও আর্থিক মর্যাদা বাড়াতে হবে। নানান সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে এই পেশাকে গুরুত্বপূর্ণ, লোভনীয় ও গ্রহণযোগ্য করার দায়িত্ব রাষ্ট্ররই। একই সঙ্গে শিক্ষকতা পেশা নির্বাচনকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। তাহলেই প্রথম পছন্দ হিসেবে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় সম্পৃক্ত হবে। তখন আর কেউ ঘটনাক্রমে শিক্ষক হবে না। শেষ পছন্দ হিসেবে শিক্ষকতাকে বেছে নেনে না। বেছে নেবেন প্রথম পছন্দ হিসেবে। তাহলেই বাড়বে শিক্ষকের মান, বাড়বে শিক্ষার মান। মুক্তি পাবে আমাদের শিক্ষা।

লেখক: শিক্ষক, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।  

ই-মেইল: [email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

কেন বাংলাদেশ উগ্রবাদের ভূখণ্ড হবে না?

কেন বাংলাদেশ উগ্রবাদের ভূখণ্ড হবে না?

বাবা’রা এমন কেন হয়!

বাবা’রা এমন কেন হয়!

অভিভাবকের আয় আনুপাতিক শিক্ষাব্যয় নির্ধারণ কি সম্ভব?

অভিভাবকের আয় আনুপাতিক শিক্ষাব্যয় নির্ধারণ কি সম্ভব?

বিসিএস, বিসিএস এবং বিসিএস

বিসিএস, বিসিএস এবং বিসিএস

কোভিড-১৯ ও বাংলাদেশের ‘রহস্যময়’ প্রত্যাবর্তন

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:২৫

ডা. মালিহা মান্নান আহমেদ কোভিড-১৯ সামাল দেওয়া নিয়ে আমরা যতটা না ভয় পেয়েছিলাম, বাংলাদেশ তারচেয়ে বেশ ভালোভাবেই এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। মোটামুটি একটা বড় জনগোষ্ঠী টিকার আওতায় না আসা পর্যন্ত নতুন ভ্যারিয়েন্ট ও ব্রেকথ্রু কেইস (টিকা দেওয়ার পরও আক্রান্ত হওয়া)-এর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইটা চলবে। তবে এখন পর্যন্ত গত ১৯ মাসে আমরা যেহেতু তৃতীয় ঢেউ ও তৃতীয় লকডাউনের ধাক্কা সামলে উঠতে পেরেছি সেটার সাপেক্ষে এখন একটি পর্যালোচনামূলক গবেষণা করা জরুরি। কী কী পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে আমরা একটি মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে পেরেছি, সেটা বুঝতে পারলে আমরা আমাদের সক্ষমতা সম্পর্কে বুঝতে পারবো। ‘কোভিড ১৯ ইন সাউথ এশিয়া’ শীর্ষক ব্রাউন ইউনিভার্সিটির একটি প্যানেল আলোচনায় পর্যবেক্ষণটি উপস্থাপন করেছিলেন ভারতীয় প্রতিনিধি বরখা দত্ত ও শ্রীলঙ্কা থেকে আসা ড. পি. সারাভানামুত্তু।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ১৫ লাখ ৪০ হাজার কোভিড আক্রান্তের ৯৭ দশমিক ২ শতাংশই সেরে উঠেছে। আমাদের মৃত্যুর হারও এখন ১ দশমিক ৭৬ ভাগে রয়েছে। নিঃসন্দেহে আক্রান্তের আসল সংখ্যাটা আরও বেশি হবে— সেটা হতে পারে পরীক্ষার সংখ্যা কম ছিল কিংবা অনেকেই উপসর্গহীন ছিলেন। তার মানে, আমাদের সত্যিকার মৃত্যুর হারও আরও কম?

এমনটা হতে পারে, আবার না-ও পারে। কেননা, কোভিডের মতো উপসর্গ নিয়েও অনেকের মৃত্যু হয়েছে। যেমন, সাতক্ষীরার কথা বলা যায়। সেখানে একপর্যায়ে কোভিডের মতো উপসর্গ নিয়ে ৪৪৬ জনের মৃত্যুর খবর বলা হয়েছিল। কিন্তু পরে দেখা গেলো তাদের মধ্যে কোভিড-১৯ ছিল ৮০ জনের।

ভবিষ্যতের রেফারেন্সের খাতিরে এমন শ্রেণি করে হিসাব রাখলেই ভালো হতো- কোভিড সন্দেহে মৃত্যু, নিশ্চিত কোভিড, লং-কোভিড ও কোভিড-পরবর্তী জটিলতায় মৃত্যু। যাবতীয় বিতর্কের পরও ২০২০ সালে বাংলাদেশের মোট মৃত্যুর হার ছিল ৫.৫৪১। যার মানে হলো প্রতি হাজারে সাড়ে পাঁচ জন মারা গিয়েছিল। ২০১৯ সালেও সংখ্যাটা ছিল ৫.৫৪৫ জন। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে এ সংখ্যাটা ছিল সন্তোষজনক।

ঠিক কোন জিনিসটা এখানে কাজে এসেছে? ২০২০ সালে সবার জন্য এটুআই-তে কাজ করার সুবাদে আমি একটা বিষয় জানি যে আমাদের কোভিড সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো অন্য দেশের মহামারি নিয়ন্ত্রণের সফল কৌশল, লোকজনের চলাফেরা, সম্পদের স্মার্ট ব্যবহার ও বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে নেওয়া বিজ্ঞানসম্মত মতামতের ওপর ভিত্তি করেই নেওয়া। এটা সরকার, বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর এমন এক সমন্বিত প্রচেষ্টা, যা প্রতিটি সময়ই পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে সহায়তা করেছে। তেমনই কিছু সিদ্ধান্তের কথা এখানে বলবো। আর এসব তথ্য থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়ভারটা আপাতত পাঠকের হাতেই ছেড়ে দিচ্ছি।

তিনটি ঢেউ ও তিনটি লকডাউন

এ নিয়ে কোনও বিতর্কের অবকাশ নেই যে লকডাউনই সংক্রমণের চেইনটা ভাঙতে পেরেছিল। যেসব নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো অন্য সব দেশের সঙ্গে ছিল সঙ্গতিপূর্ণ—জনসমাগমে নিষেধাজ্ঞা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস, কারখানা বন্ধ রাখা, জেলার ভেতর ও আন্তজেলার পরিবহন বন্ধ রাখা, ফ্লাইট বাতিল করা ইত্যাদি।

বিদেশ ফেরত আক্রান্তদের কারণে সৃষ্ট প্রথম ঢেউয়ের সময় পজিটিভ টেস্টের হার ছিল গড়পড়তায় ২৩ শতাংশ। আর সাধারণ লকডাউন তখনই তুলে দেওয়া হয়েছিল, যখন ছোটখাটো অনেক নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করতে কোভিডের হটস্পটগুলোর ম্যাপিং করা সম্ভব হয়েছিল। ওই সময়কার তুলনামূলক ভালো তিনটি মাসের বলয়টা ভেঙে গিয়েছিল ২০২১ সালের মার্চে—বেটা ভ্যারিয়েন্টের আগমনে। ওই সময় যখন আবার শনাক্তের হার ১৮ শতাংশর কাছাকাছি চলে এলো তখনই আরোপ করা হলো দ্বিতীয় লকডাউন। এরপর খুব তাড়াতাড়িই সীমান্ত এলাকাগুলোতে ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়লে তৃতীয়বারের মতো লকডাউন দেওয়া হয়। তখন রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর বিভাগের ১৫টি ‘রেড জোন’ জেলা থেকে ঢাকাকে রক্ষা করাই ছিল বড় লক্ষ্য।

তৃতীয় লকডাউনের ৪২ দিনেই ৪ লাখ ৬৫ হাজার ১৮৩ নতুন শনাক্ত হয়, যখন কিনা ২০২০ সালের প্রথম ছয় মাসে শনাক্ত ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার। এ সংখ্যা ও ২৮-৩১ শতাংশ শনাক্তের হার—দুটোই ইয়েল ইউনিভার্সিটির প্রতিবেদনের সঙ্গে মিলে যায়, যাতে বলা হয়েছিল অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ডেলটায় আক্রান্ত এক ব্যক্তি গড়ে সাড়ে তিন থেকে চার জনকে আক্রান্ত করছে। আগের সার্স কভ-২ ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা ছিল ২ দশমিক ৫ জন।

স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বেড়েছে

২০২০ সালের এপ্রিলে যেখানে গোটা দেশের জন্য ঢাকায় মাত্র ৫টি টেস্ট সেন্টার ছিল, সেখানে এখন দেশজুড়ে আছে ৮০০টি। মোট পরীক্ষা কেন্দ্রের মধ্যে ৯০ শতাংশই এখন আরটি-পিসিআর। আর ১৪০টি আরটি-পিসিআরের মধ্যে ৮৬টি পরীক্ষা কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারিভাবে। ৫৪৫টি র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন ও ৫১টি জিন এক্সপার্ট টেস্ট সেন্টারে বিনামূল্যে পরীক্ষার সুযোগ দিয়েছে সরকার। সরকারি কেন্দ্রগুলোতে আরটি-পিসিআর পরীক্ষায় লাগছে জনপ্রতি ১০০ টাকা, দরিদ্রদের জন্য তা আবার বিনামূল্যে। বেসরকারি কেন্দ্রগুলোতে খরচ হচ্ছে ৩০০০-৪৫০০ টাকা পর্যন্ত। গত বছরেই আমদানি করা আরটি-পিসিআর টেস্ট কিটের দাম ৩০০০ থেকে কমে ৮০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত মোট ৯৪ লাখ পরীক্ষা করা হয়েছে, যার ৭৪ শতাংশই হয়েছে সরকারি কেন্দ্রগুলোতে। এখন দিনে পরীক্ষা করার সক্ষমতা ৫৫ হাজারের কাছাকাছি। অথচ, মহামারির একদম শুরুর দিকে আইইডিসিআর দিনে মাত্র ৩৩ জনের কোভিড পরীক্ষা করতে পারতো।

২০২০ সালের এপ্রিলে আমাদের কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল ছিল মাত্র ৯টি। এখন ১০০টি সরকারি ও ৩৯টি বেসরকারি হাসপাতাল কোভিড ১৯ রোগীদের সেবা দিচ্ছে। ২০২০ সালের জুনে ২১৮টি সরকারি আইসিইউ বেডের মধ্যে মাত্র ৬৯টি ঠিকঠাক কাজ করতো। দেশজুড়ে তখন এর মোট সংখ্যা ছিল ৩৮১। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে কোভিড ডেডিকেটেড জেনারেল বেড বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজারে, আইসিইউ হয়েছে ১৩২১টি ও এইচডিইউ বেড হয়েছে ৮৫৬টি।

আর ঢাকা যেহেতু দারুণভাবে ঘনবসতিপূর্ণ এবং মোট শনাক্তের ৫৪ শতাংশ ও মোট মৃত্যুর ৪৩ শতাংশই এখানে। আর তাই মোট হাসপাতালের ৪৪ শতাংশই আছে ঢাকায়। কোভিড আক্রান্তদের জন্য হাইফ্লো অক্সিজেন সরবরাহের বিষয়টি শুরু থেকেই জানতে পারি আমরা, আর তাই সেই অনুযায়ী একটি কৌশল গ্রহণ করা হয় ২০২০ সালের জুনে। যে কৌশলের আওতায় কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোর সেন্ট্রাল পাইপলাইনে নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে তরল অক্সিজেনের ট্যাংক স্থাপন করা হয়। সেন্ট্রাল অক্সিজেন ট্যাংক, অক্সিজেন সিলিন্ডার ও অক্সিজেন কনসেনট্রেটর থেকে অক্সিজেন সরবরাহে হাসপাতালগুলোও তাদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়িয়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সরবরাহ করা হয়েছে পিপিই।

আমাদের স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ের বেশিরভাগটা পকেট থেকেই যায়। আর প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে কোভিড রোগীর চিকিৎসায় দিনে ৩৭ হাজার থেকে শুরু করে ৬৮,৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। এ পরিমাণ খরচ ও সরকারি হাসপাতালের বেডগুলোর সংখ্যা—এ দুটো বিষয়ই সরকারি হাসপাতালে মৃত্যুর হার (মোট মৃত্যুর ৮৪ শতাংশ) বেশি হওয়ার কারণটা ব্যাখ্যা করতে পারে।

আমাদের ওষুধ শিল্পও এ কৃতিত্বের দাবিদার। দরকারি ওষুধপত্রের ৯৮ শতাংশই এসেছে এ শিল্প থেকে। শুধু টোসিলিজুমাব (অ্যাকটেমরা) ছাড়া। যে ইমিউনোমডিউলেটরটি ব্যবহৃত হয়েছিল সাইটোকাইন স্টর্ম কমানোর জন্য। এর বাইরে কোভিড ১৯ সংক্রমণের যাবতীয় ওষুধই তৈরি করা হয়েছিল দেশে। এমনকি সরকার যাতে ভ্যাকসিন সংরক্ষণ করতে পারে সেজন্য প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সংরক্ষণ ফ্যাসিলিটিও বাড়িয়েছিল।

সরকারের যত প্রণোদনা প্যাকেজ

গত ১৯ মাসে আমাদের প্রধানমন্ত্রী মোট ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। ৭২ হাজার ৭৫০ টাকার প্রথম প্রণোদনা প্যাকেজটি ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২০ সালের এপ্রিলে এবং ১ লাখ ২১ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা হয়েছিল ২০২০ সালের নভেম্বরে। এটি আমাদের জিডিপির ৪.৩ শতাংশ এবং এর ৭০ ভাগই বিতরণ হয়েছে ২০২১ সালের এপ্রিলের মধ্যে।

সর্বশেষ ৩২০০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করা হয় ২০২১ সালের জুলাইয়ে। এর লক্ষ্য ছিল সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে লোকজনের কাজের সংস্থান, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, স্বল্পসুদে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে শিল্পকারখানাকে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন নানা খাতে কর্মরত দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে নিয়ে আসতে খাদ্য সহায়তা, নগদ অর্থ ও আবাসনের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হয়েছে।

একনজরে বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এর প্রণোদনা প্যাকেজ

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও এনজিও খাত

মহামারি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউএসএইড যৌথভাবে ৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার দিয়েছে বাংলাদেশকে। যুক্তরাজ্য, বিশ্বব্যাংক ও আরও কিছু দেশও বেশ ভালো অঙ্কের সহায়তা দিয়েছিল। স্থানীয় এনজিওগুলোকে এ ক্ষেত্রে নেতৃত্বে দিয়েছিল ব্র্যাক। এক লাখ মানুষকে নগদ ভর্তুকি দিয়ে সহায়তা করেছে সংস্থাটি। স্বাস্থ্যসেবা খাতে তাদের ৫০ হাজার নারীকর্মী কোভিড দূরীকরণ তথ্য শিক্ষা দিয়েছিলেন প্রায় ৪৭ লাখ মানুষকে। বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন গবেষণাতেও তারা ভূমিকা রেখেছেন।

করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও মানবিক সাহায্য সংস্থা; প্রত্যেকেই কমিউনিটির প্রতি যার যার দায়িত্ব পালনে এগিয়ে এসেছিলেন। সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হাতে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া ও খাবারের রেশন নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসন।

এই সময়ে আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১০৬ কর্মকর্তাকে হারিয়েছি। হারিয়েছি কোভিড-১৯ ফ্রন্টলাইনে ডিউটিরত ১৮৬ ডাক্তারকে। সংসদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সদস্য অর্থাৎ প্রায় ১০০ সংসদ সদস্য আক্রান্ত হয়েছিলেন কোভিডে এবং দুঃখজনক যে তাদের চার জনকেও আমরা হারিয়েছি।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার

আমাদের ১১ কোটি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী আছে। এদের মধ্যে ১০ কোটি ৭০ লাখের ইন্টারনেট সংযোগ আছে এবং মোবাইল ব্যবহারকারীদের ৪০ শতাংশেরই আছে স্মার্টফোন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার করে সরকারি ও বেসরকারি খাত লকডাউনে টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে কার্যকরভাবে চালু করেছে ই-কমার্স, ই-হেলথ, ই-ব্যাংকিং, ই-গভর্ন্যান্স ও ই-এডুকেশন। আরও অনেক কিছুর মধ্যে মহামারির সময়টাতে আইসিটির সবচেয়ে বড় সেবাটা ছিল ‘সুরক্ষা’ পোর্টালের মাধ্যমে ভ্যাকসিন রেজিস্ট্রেশন, করোনা হেলপলাইন ৩৩৩, ভার্চুয়াল কোর্ট সিস্টেম (মাইকোর্ট), টেলিহেলথ সেবা ও ডিজিটাল ক্লাসরুম। নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক সুবিধাসম্পন্ন অনলাইন অফিস পরিচালনা, মুদিপণ্য কেনা, খাবারের অর্ডার ও ডেলিভারি অ্যাপ, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন ফার্মেসি, বিল পরিশোধ, টেলিমেডিসিন ও বিনোদন পরিচালনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেয়েছিল আইসিটির বিজনেস কনটিনিউইটি প্ল্যান।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার

ভ্যাকসিন সংগ্রহ ও ভ্যাকসিন প্রকল্প

এফডিএ, ইইউ এবং ডব্লিউএইচও কর্তৃক জরুরি অনুমোদনপ্রাপ্ত ভ্যাকসিনগুলোর অনুমোদন দিয়ে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ এবং প্রায় ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৫৬ হাজার মানুষ (জনসংখ্যার ৮০%) বিনামূল্যে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

এই অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশই সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে ২০২০ সালের নভেম্বরের প্রথম দিকে ভ্যাকসিন চুক্তি করে প্রশংসিত হয়েছিল। তবে ফেব্রুয়ারিতে এ যাত্রার সফল সূচনা হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভারত ভ্যাকসিন রফতানি বন্ধ ঘোষণা করলে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত একটি বিপর্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।

এদিকে ধাপে ধাপে ৬ কোটি ভ্যাকসিনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কোভ্যাক্স। আর এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র প্রদান করেছে ৬৫ লাখ ফাইজার ও ৫৫ লাখ মডার্নার টিকা। জাপান দিয়েছে ৩০ লাখেরও বেশি অ্যাস্ট্রাজেনেকা, চীন দিয়েছে ৩৪ লাখ সিনোফার্ম ভ্যাকসিন।

বাংলাদেশ এখন বেশিরভাগ টিকা সিনোফার্ম থেকে কিনে স্থানীয়ভাবে প্যাকেটজাত করার প্রস্তাব দিয়েছে।

টিকাদান কার্যক্রমটাকে সহজ করেছে সুরক্ষা অ্যাপ, যা নিবন্ধনের পাশাপাশি টিকার সনদও দিচ্ছে।

সৌদি আরব ও কুয়েতগামী প্রবাসীদের জন্য ফাইজার ও মডার্নার টিকা দিয়ে অযাচিত কোয়ারেন্টিনের খরচ কমাতে সরকার যে কৌশল নিয়েছে সেটাও কিন্তু প্রশংসার দাবি রাখে। স্কুল খোলার এই সময়টাতে ১২-১৮ বছর বয়সীদের ফাইজার ও মডার্নার টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এখন পর্যন্ত মোট জনগোষ্ঠীর ১২ শতাংশ টিকার আওতায় এসেছে। ১৮ শতাংশ পেয়েছে এক ডোজ করে টিকা।

পরিস্থিতির উন্নয়নে আরও যা ভূমিকা রেখেছে

  • সরকারের ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ নীতি ও প্রতিটি ফোন কলে মাস্কের ব্যবহার নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন প্রচার।
  • গত চার দশকে গড়ে ওঠা ইপিআই প্রোগ্রাম, যা কিনা কোভিড-১৯ টিকা কার্যক্রমের ভিত গড়ে দিয়েছিল। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের ছয় দিনের গণটিকা কার্যক্রমে মোট ৫০ লাখ মানুষ পরিপূর্ণভাবে ভ্যাকসিনের আওতায় এসেছিল।
  • জনসংখ্যা সমঘনত্ব ও সমজাতীয়তার কারণে যোগাযোগটা হয়েছিল সহজ। আবার বিভিন্ন সম্প্রদায় ও ধর্মীয় নেতারাও সচেতনতা ছড়াতে অংশ নিয়েছিলেন।
  • ২০২০ সালে রেকর্ড পরিমাণ ১৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল। একই বছর জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
  • একটি গবেষণায় স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের দাবির পক্ষে জোরালো প্রমাণ মিলেছে যে, ৬০-৭০ শতাংশ মানুষের শরীরে হয়তো ইতোমধ্যে কোভিড-১৯ অ্যান্ডিবডি তৈরি হয়েছে।
  • যুব সমাজের একটি বড় অংশও এখানে বড় ভূমিকা রেখেছে বলা যায়। জাতির গঠনে এই যুব সমাজের উৎপাদনমুখী ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিতে পারে।
  • ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে নিরাপত্তা বেষ্টনীতে রাখতে পারা।

আর্থসামাজিক প্রভাব

অনেক সূচকের মধ্যে কোনোটিতে কাঙ্ক্ষিত অর্জন আসতে দশকেরও বেশি সময় লাগলেও মহামারিতে এগুলো বেশ বড় ধাক্কা খেয়েছিল-

  • ২০২১ সালে বাংলাদেশে ‘নতুন দরিদ্র’ হয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ।
  • নারীদের মধ্যে বেকারত্বের উচ্চহার চলমান আছে। গত বছরেই চাকরি হারিয়েছিল প্রায় ১০ লাখ গার্মেন্ট কর্মী।
  • ৫৩টি জেলার ৬৫ হাজার নারী ও শিশুর ওপর গবেষণা করে দেখা গেছে, এদের ৩০ শতাংশই মহামারিকালে প্রথমবারের মতো পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
  • স্কুল বন্ধ হওয়া, বেকারত্ব ও দরিদ্রদের ঋণের বোঝা বেড়ে যাওয়ার কারণে বাল্যবিয়ে বেড়েছে কয়েকগুণ।
  • তালিকাভুক্ত প্রায় আট হাজার যৌনকর্মী হয়েছে আশ্রয়হীন।
  • ১৮ মাস স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষায় ক্ষতি হয়েছে অনেক। এ সময়ে বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ১৫ হাজার বেসরকারি কিন্ডার গার্টেন স্কুল।
  • অভিভাবকের আয় কমে যাওয়ার কারণে ৪০ শতাংশ শিশু অপুষ্টির শিকার হয়েছে।
  • আগের চেয়ে কম হলেও এখনও কোভিড সম্পর্কিত মানসিক অবসাদ কেটে যায়নি।

আমাদের বিজয়, এরপর কী?

এ যুদ্ধে আমাদের বড় জয়টা হলো কোভিডে আমরা যাদেরই হারিয়েছি, আমাদের স্বেচ্ছাসেবী মানবিক সংস্থাগুলোর সুবাদে প্রত্যেকেই সম্মানজনক একটি শেষকৃত্য পেয়েছেন। আমাদের কোনও গণকবর খুঁড়তে হয়নি। এছাড়া, সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো একজোট হয়ে খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক কার্যক্রম চলমান রেখে বেকারত্ব দূর করা, শিল্পগুলোকে বাঁচিয়ে রেখে জিডিপি ধরে রাখা এবং সংক্রমণের চেইন ভেঙে ভারতের মতো ভয়ানক পরিস্থিতির হাত থেকে বাঁচিয়েছে দেশকে। যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এসব উপাত্ত দেখানোর সুযোগ আমি পেয়েছিলাম তখন বিশেষজ্ঞ মডারেটররা কিন্তু বাংলাদেশের এসব সংখ্যাতত্ত্বের প্রতি মনোযোগী ছিলেন। তারা এও বুঝতে পেরেছিলেন যে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো মহামারিতে লাগাম দেওয়ার নেপথ্যে টিকার ভূমিকা ছিল না। এটা সম্ভব হয়েছিল আমাদের সুযোগ্য নেতৃত্বের কারণে, কৌশলের কারণে। এ পরিস্থিতি থেকে নিজেদের আরও শক্তিশালীরূপে বেরিয়ে আসতে আমরা ছিলাম দৃঢ় প্রত্যয়ী। তাই আশা করি, এসব তথ্য-উপাত্ত নিজেদের সক্ষমতার ওপর আমাদের আত্মবিশ্বাস আরও জোরালো করবে। আর হ্যাঁ, এখনও মাস্ক পরতে ভুল করবেন না।

লেখক: অর্গানিকেয়ার-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক। এমবিবিএস, এমবিএ ও হেলথ কেয়ার লিডারশিপ-এ স্নাতকোত্তর।

 

/এফএ/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

অজ্ঞতায় সুখ নেই

অজ্ঞতায় সুখ নেই

টিকা মানেই রক্ষাকবচ নয়

টিকা মানেই রক্ষাকবচ নয়

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন: এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন: এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু, নেপথ্যে ‘নজরদারির অভাব’

গবেষণাপানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু, নেপথ্যে ‘নজরদারির অভাব’

মেসির জন্য আরও দুঃসংবাদ

মেসির জন্য আরও দুঃসংবাদ

ত্যাগীর ম্যাজিকে রাজস্থানের শ্বাসরুদ্ধকর জয়

ত্যাগীর ম্যাজিকে রাজস্থানের শ্বাসরুদ্ধকর জয়

মুক্তির জন্য প্রস্তুত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যানিমেশন সিনেমা

মুক্তির জন্য প্রস্তুত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যানিমেশন সিনেমা

চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তানের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক আফগান প্রধানমন্ত্রীর

চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তানের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক আফগান প্রধানমন্ত্রীর

ইরানের বিপক্ষে বাংলাদেশের ‘অভিজ্ঞতা অর্জনের ম্যাচ’

ইরানের বিপক্ষে বাংলাদেশের ‘অভিজ্ঞতা অর্জনের ম্যাচ’

বিসিবি নির্বাচন ৬ অক্টোবর

বিসিবি নির্বাচন ৬ অক্টোবর

ববি ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর মানববন্ধন

ববি ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর মানববন্ধন

রিমান্ডে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন এহসানের রাগীবসহ ৪ ভাই

রিমান্ডে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন এহসানের রাগীবসহ ৪ ভাই

তালেবানের সঙ্গে বৈঠক রাশিয়ার

তালেবানের সঙ্গে বৈঠক রাশিয়ার

খালি হচ্ছে বরিশালের করোনা ওয়ার্ড

খালি হচ্ছে বরিশালের করোনা ওয়ার্ড

প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য ১১ দফা নির্দেশনা

প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য ১১ দফা নির্দেশনা

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune