X
শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ১০ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

অদ্ভুত বিদেশ সফর

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:৫১

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা এক হাজার সরকারি কর্মকর্তাকে খিচুড়ি রান্না শিখতে বিদেশে পাঠাতে চায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর (ডিপিই)। স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় প্রশিক্ষণের জন্য তাদের বিদেশ পাঠানোর উদ্যোগ নিয়ে প্রাথমিকভাবে এই অভিনব বিদেশ সফরের জন্য পাঁচ কোটি টাকাও চেয়েছে ডিপিই। পরিকল্পনা কমিশন থেকে এর অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা করছে অধিদফতর। তবে সামাজিক মাধ্যমে এই অদ্ভুত বিদেশ সফরের প্রস্তাবনা নিয়ে হাস্যরস সৃষ্টি হওয়ার পর পরিকল্পনা কমিশন পুরো বিষয়টির ব্যাখ্যা চেয়েছে।
খিচুড়ি নিয়ে গল্প, আলোচনা আর হাস্যরসের মাঝেই জানা গেলো বিল্ডিং দেখতে বিদেশ যাবেন ৩০ কর্মকর্তা। এজন্য প্রত্যেক কর্মকর্তার পেছনে ব্যয় হবে ৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। বিল্ডিং নির্মাণ প্রকল্পে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ কোটি টাকা। পরিকল্পনা কমিশনের সম্মতিতেই এই বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। সেই সঙ্গে পরামর্শক খাতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ৯৭৩ জন পরামর্শকের জন্য ১৯ কোটি ৮২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। ‘গণগ্রন্থাগার অধিদফতরের বহুতল ভবন নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পে এসব ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। 

পানির দেশের মানুষ আমরা, অথচ পানি দেখতে উগান্ডা যাওয়া, পুকুর খনন শিখতে বিদেশ যাওয়া, লিফট কিনতে বিদেশ যাওয়ার মতো অসংখ্য ‘আজাইরা’ সফরের দৃষ্টান্ত দেওয়া যাবে। গত বছর জুলাই মাসের ঘটনা মনে আছে নিশ্চয়ই। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি দল যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও মহাকাশ বিষয়ক সংস্থা নাসা’র আয়োজিত এক প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়। তাদের পুরস্কৃত করতে নাসার পক্ষ থেকে ফ্লোরিডায় আমন্ত্রণ জানানো হয় দলটিকে। বিজয়ী দলের সদস্যরা না যেতে পারলেও সরকারি খরচে তথ্য মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট আরেকটি প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তা ঠিকই ঘুরে এসেছেন। একই বছর আমরা জেনেছিলাম বোয়িংয়ের একটি বিমান ডেলিভারি নিতে বাংলাদেশের ৪৫ জনের সরকারি প্রতিনিধিদল যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন। সফরে যাওয়া উচ্চপদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তার সেলফিবাজিতে ফেসবুক সয়লাব ছিল। 

জনগণের কষ্টার্জিত টাকার এমন শ্রাদ্ধ আমাদের সরকারি অফিসের কর্ম সংস্কৃতি বা অ-কর্ম সংস্কৃতির অংশ। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশে প্রশিক্ষণ নিতে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকৃত। মূলত পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য এ সুযোগ রাখা হয়েছে। কিন্তু এ সুযোগটির অপব্যবহার হচ্ছে সব স্তরে। প্রশিক্ষণের নামে যারা বিদেশে যাচ্ছেন, তাদের একটা বড় অংশই যাচ্ছেন মূলত দেশ ভ্রমণ অথবা বিনোদনের উদ্দেশ্যে এবং সরকারি ভ্রমণ ভাতা পকেটে ঢুকাতে। 

এসব ভ্রমণের অধিকাংশই তাদের পেশাগত জীবনে বা দেশের কাজে লাগে না। ২০১৮ সালের একটি খবরের কথা মনে আছে। একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা বেলারুশ গিয়েছিলেন ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট দেখতে। আর সিস্টেম অ্যানালিস্ট চীন সফর করেছেন এলইডি প্রস্তুতকারক ফ্যাক্টরি পরিদর্শনে। প্রশিক্ষণ শেষে সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা মানা হচ্ছে না। এবং দিলে সেখানে তারা কী লেখেন, সেটা এক বড় অনুসন্ধানের বিষয় হতে পারে। 

২০১৯ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেছিলেন সামান্য কারণে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশ ভ্রমণের বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী। মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, প্রকল্পের অজুহাতে সরকারি কর্মকর্তারা যেন ‘অহেতুক’ বিদেশ সফর না করেন, সে বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

কিন্তু কমছে না এই প্রবণতা। করোনায় বিপর্যস্ত সারা বিশ্ব। উন্নত দেশগুলোতেও চলছে কৃচ্ছ্রতা সাধন। সেখানে আমাদের সরকারি দফতরগুলোতে এরকম ভাবনা সামান্যও আছে কিনা সন্দেহজনক। আমাদের সরকারি অফিসের কর্মসংস্কৃতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা প্রয়োজন, প্রয়োজন বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। একদিকে হলো কাজ না করার সংস্কৃতি, অন্যদিকে হলো সম্পাদিত কাজের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন। আর আছে এমন যথেচ্ছ অপরিকল্পিত হৃদয়হীন ব্যয়। সরকারি দফতর ও কাজের জায়গায় দুর্নীতি যে অনেকটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে, এরকম সফর সে কথাই মানুষকে বুঝিয়ে দেয়। 

প্রকল্পের ক্ষেত্রে বা অন্যান্য অনেক কাজেই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশ সফর স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের সরকারি দফতরের কর্মকর্তাদের সফরের ধরন বেশ অভিনব। আইনি কাঠামো ও নীতিমালা এমনভাবে করা যে, একে অবৈধ বলা বেশ কঠিন, কিন্তু এসব সফরের অনেকগুলোই একেবারেই প্রয়োজনহীন। 

বিদেশ সফরের নামে ‘প্লেজার ট্রিপ’ বড় ক্ষতি করছে পুরো সিস্টেমের। মাসের পর মাস গুরুত্বপূর্ণ ফাইল পড়ে থাকছে অনেক সরকারি কর্মকর্তার টেবিলে, কারণ তারা দেশে নেই। কখনও সরকারি অর্থে, কখনো বা দাতা সংস্থার অর্থে বিদেশ সফরে ব্যস্ত থাকছেন তারা। মাসে একাধিকবার বিদেশে যাচ্ছেন বহু কর্মকর্তা। ফ্লাই হ্যাপি একজনের নামই নাকি হয়ে গেছিল ‘উড়ন্ত’ সচিব। 

জনগণ নামের অসহায়দের ট্যাক্সের টাকা অপচয় করতে যে তাদের বাধে না তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ পুকুর কাটার জন্য, খিচুড়ি রান্না দেখার জন্য কর্তাব্যক্তিরা বিদেশ সফরে যেতে পারেন। কেনাকাটায় দুর্নীতি, প্রকল্পের টাকা নয়ছয়, যেনতেনভাবে ছুতানাতায় গণকর্মচারীদের বিদেশ সফর কোনও বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। রাষ্ট্রের সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির যে সংকট চলছে তারই প্রতিফলন। পর্দা ও বালিশকাণ্ড, পুকুর ও খিচুড়িকাণ্ডসহ অভিযোগের যে ব্যাপকতা আছে, সে তুলনায় জবাবদিহির ঘাটতি অনেক অনেক বেশি। বরং উল্টো আমরা দেখলাম, সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আইন ও বিচার বিভাগের সচিবের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে বলছে, সরকারি দায়িত্ব পালন সংক্রান্ত কাজের জন্য কোনও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনও মামলা গ্রহণ করা যাবে না। এই নির্দেশ বাস্তবায়িত হলে অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে সামান্য সমালোচনাও হয়তো করা যাবে না। 

লেখক: সাংবাদিক 

 

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

কে বড়, কে ছোট

কে বড়, কে ছোট

নিজের হাতেই নেই নির্ভরতার চাবি

নিজের হাতেই নেই নির্ভরতার চাবি

লকডাউনের বাংলাদেশ ‘ভার্সন’

লকডাউনের বাংলাদেশ ‘ভার্সন’

ছবিটা পরিষ্কার হলো কি?

ছবিটা পরিষ্কার হলো কি?

জনতা চায় মারমুখী সংবাদ প্রতিনিধি?

জনতা চায় মারমুখী সংবাদ প্রতিনিধি?

বাঙালির আত্মা

বাঙালির আত্মা

‘কী একটা অবস্থা!’

‘কী একটা অবস্থা!’

কিছু কিছু ঘটনা পুলিশের নীতি-নৈতিকতার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে

কিছু কিছু ঘটনা পুলিশের নীতি-নৈতিকতার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে

পাপুল কাণ্ড

পাপুল কাণ্ড

আবিরন হত্যার বিচারে উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই

আবিরন হত্যার বিচারে উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই

বহুমাত্রিক দুর্নীতির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা

বহুমাত্রিক দুর্নীতির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা

সু চি’র বিদায় ও রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ

সু চি’র বিদায় ও রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ

সর্বশেষ

টাইমস হায়ার এডুকেশন র‍্যাংকিংয়ে সপ্তম স্থানে ডিআইইউ

টাইমস হায়ার এডুকেশন র‍্যাংকিংয়ে সপ্তম স্থানে ডিআইইউ

মুসা ম্যানশন সিলগালা, সকল রাসায়নিক দ্রব্য অপসারণ

মুসা ম্যানশন সিলগালা, সকল রাসায়নিক দ্রব্য অপসারণ

বাঁশখালীতে শ্রমিক হত্যার বিচার দাবিতে শাহবাগে সমাবেশ

বাঁশখালীতে শ্রমিক হত্যার বিচার দাবিতে শাহবাগে সমাবেশ

শিথিল হচ্ছে লকডাউন চলবে গণপরিবহন

শিথিল হচ্ছে লকডাউন চলবে গণপরিবহন

আগে ম্যাচ বাঁচানো, পরে জয়ের চিন্তা মুমিনুলদের

আগে ম্যাচ বাঁচানো, পরে জয়ের চিন্তা মুমিনুলদের

এ বছর চালের উৎপাদন বাড়াতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছি: কৃষিমন্ত্রী

এ বছর চালের উৎপাদন বাড়াতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছি: কৃষিমন্ত্রী

করোনায় মারা গেলেন ডুয়েটের ডেপুটি রেজিস্ট্রার

করোনায় মারা গেলেন ডুয়েটের ডেপুটি রেজিস্ট্রার

ফাইজারের সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম ভ্যাকসিন চুক্তি করবে ইইউ

ফাইজারের সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম ভ্যাকসিন চুক্তি করবে ইইউ

শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ টেস্টের মাঝেই করোনায় আক্রান্ত একজন

শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ টেস্টের মাঝেই করোনায় আক্রান্ত একজন

স্ত্রী-শ্যালিকাকে হত্যার পর নিজেই করলেন আত্মহত্যা!

স্ত্রী-শ্যালিকাকে হত্যার পর নিজেই করলেন আত্মহত্যা!

তাণ্ডবের ঘটনায় বিচার চেয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজত নেতার পদত্যাগ

তাণ্ডবের ঘটনায় বিচার চেয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজত নেতার পদত্যাগ

উজবেকিস্তানে নিজেদের অবস্থান দেখলো বাংলাদেশ

উজবেকিস্তানে নিজেদের অবস্থান দেখলো বাংলাদেশ

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune