X
সোমবার, ০৪ জুলাই ২০২২
২০ আষাঢ় ১৪২৯

একটি বিজ্ঞাপন ও পুরুষতন্ত্রের কাঁচি রাজনীতির পাঠোন্মোচন

আপডেট : ১১ মার্চ ২০১৭, ১৩:৩৩

সাদিয়া নাসরিন নারী দিবসকে সামনে রেখে জুঁই এর একটি টিভিসি চোখে পড়ল। একটি মেয়ে চুল ছোট করতে চায়। সার্ভিস প্রোভাইডার বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে, যেন চুলের কাট একটু বড় রাখা হয়। কিন্তু মেয়েটি বলে, এত ছোট করতে যেন আর ‘এভাবে’ চুল ধরা না যায়, যেভাবে পুরুষতন্ত্র টেনে ধরে রেখেছে নারীর চুল যুগ যুগ ধরে। টিভিসির শেষে যে বার্তা আসে, তা হলো ‘যে চুল নারীকে সুন্দর করে, সে চুল যেন তার দুর্বলতার কারণ না হয়।’ গণমাধ্যমে লিঙ্গ বৈষম্য আর জেন্ডার অ-সংবেদনশীল বিজ্ঞাপন দেখতে দেখতে আমরা যখন হাঁফিয়ে উঠছিলাম, তখন জুঁই এর এই বিজ্ঞাপন নিঃসন্দেহে পুরুষতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করার মতো ইতিবাচক বার্তা ও সাহস দুই-ই দিয়েছে। পুরুষতন্ত্রের রাজনীতি যেভাবে যুগ যুগ কাঁচিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে নিজের স্বার্থে, ছোট চুলের নারীকে কলঙ্কিত করেছে, নিগৃহীত করেছে বড় চুলের পুরুষকেও, সেই রাজনীতি নিয়ে কথা বলার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য জুঁই আর স্কয়ারকে ধন্যবাদ।
পুরুষতন্ত্র নারীকে বেঁধেছে চুলের মসৃণ শেকলে, যে শেকল সাজাতে জীবন যায় নারীর। তাই নারীর ‘দীঘল কালো রেশমি’ চুল নিয়ে পুরুষের যৌনতা আর রোমাঞ্চের বর্ণনায় ভরপুর সাহিত্য, গান, নাটক আর প্রবাদ দিয়ে নারীর মনস্তত্ত্ব এভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যে, চুলের যত্ন করে, বিনুনি গেঁথে, বাহারি খোঁপা বেঁধে নারী দূরে থাকে উৎপাদনশীলতা থেকে। আর পুরুষ এই ফাঁকে নিজের রোজগার আরও বাড়াতে থাকে, নিজেকে আরও প্রতিষ্ঠিত করতে থাকে এবং আরও যোগ্য করতে থাকে। আমি বলছি না নারীর বড় চুল রাখা অন্যায়। তবে এই প্রশ্নটা আমি করতে চাই, বড় চুল যদি এত মহিমান্বিতই হবে, তবে পুরুষ কেন বড় চুল রাখলে ঘৃণিত হয়? বা ছোট চুলের নারী যদি অস্বীকৃত হয়, তবে পুরুষ কেন অস্বীকৃত হয় না?
কিভাবে এবং কেন বড় চুলের মেয়েদের 'ভালো' আর বড় চুলের ছেলেদের 'খারাপ' বলে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে সেই রাজনীতিটা বোঝা খুব জরুরি, বোঝা জরুরি পুরুষতন্ত্র আর পুঁজিবাদের রসায়নটাও। সৌন্দর্য আর কমনীয়তার নামে সেক্সি হেয়ার স্টাইল, স্ট্রেইটনিং বা কার্লিং, ব্লো ড্রাই, হেয়ার কালার আর ট্রিটমেন্ট এর পেছনে কেন হাজার হাজার টাকা মেয়েদের পকেট থেকে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে, বিউটি সেলুনে কিভাবে নারীর লাখ লাখ কর্মঘণ্টা অপচয় হচ্ছে, সেই হিসেবটা করার সময় এসেছে। আমেরিকার বিখ্যাত হেয়ার স্পেশালিস্ট Lucinda Ellery’র হিসেবে ‘একজন নারী তার জীবনকালে প্রতি বিঘত চুলের যত্নে পঞ্চাশ হাজার ইউএস ডলার খরচ করে। এবং শুধুমাত্র দেখতে ভালো লাগার জন্য নয়, বরং চুল আমাদের বিশ্বাস, চিন্তা এবং নারীত্বকে প্রতিনিধিত্ব করে বলেই নারীরা চুলের যত্নে এত মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে।’

পুরুষতন্ত্রে এটা অবধারিত যে, নারীর শরীরের কোথাও না কোথাও পুরুষের জন্য যৌনতার আকর্ষণ থাকতে হবে। বড় চুল পুরুষের কাছে সেই শাশ্বত নারীত্বের বার্তা দেয়, যা নারীর প্রতি পুরুষের যৌন আকর্ষণ তৈরি করে; যে আকর্ষণে পুরুষ নারীর চুল নিয়ে খেলে, রোমাঞ্চ করে, পুরুষের বোতামে আটকে থাকে নারীর চুল (জীবনও নয় কি!)। সাউথ ব্রিটানি ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের জার্নাল থেকে জানা যায়, পুরুষেরা নারীর বড় চুল পছন্দ করেন। কারণ চুল মেয়েদের স্বাস্থ্য, যৌবন ও জিনের প্রমাণ দেয়। বড় চুলের মেয়েদের বেশি স্বাস্থ্যবতী, রূপসী এবং আবেদনময়ী হিসেবে ধারণা করা হয় এবং এই ব্যাপারটি পুরুষদের নির্ভয়ে মেয়েটির কাছাকাছি যেতে অনুপ্রাণিত করে। তাই পুরুষতন্ত্র তার প্রয়োজনে চুলের কারুকার্য আর বর্ণিল খোঁপায় নারীর জন্য সৌন্দর্যের যে সংজ্ঞা তৈরি করে দিয়েছে, পৌরুষকে যেভাবে মহিমান্বিত করেছে ছোট চুলে, পুরো জীবন ধরেই সেই সংজ্ঞা মতোই চুলের গুরুত্ব রক্ষা করে যেতে হয় নারী-পুরুষ উভয়কেই।

নারীর হেয়ারস্টাইল তাই পুরুষের জন্য এমন একটি আকস্মিক ‘বিবৃতি’ তৈরি করে যা নারীর পছন্দের ওপর পুরুষের প্রতিক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে। ‘......লম্বা শরীর, সুন্দর দীঘল চুল এবং পুরু ঠোঁট এই তিনটি জিনিস পুরুষের যৌন আকর্ষণ তৈরি করে। কোনও মেয়ে যখন তার চুল কেটে ফেলে, তখন খুব সম্ভবত সে এই বার্তাই দিতে চায় যে,  সে শরীর থেকে প্রচলিত নারীত্বের ধারণাকে ঘষে তুলে ফেলার ক্ষমতা রাখে...সে সাহসী, তার লক্ষ্য পরিষ্কার, প্রতিজ্ঞা দৃঢ় এবং সে নিজেকে কারও যৌন উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সমর্পণ করতে রাজি নয়’ সেক্স থেরাপিস্ট D: Aline Zoldbrod এমনটাই মন্তব্য করেছেন, যিনি নারীর ছোট চুলকে বুদ্ধিমত্তা, দৃঢ়চিত্ত, আর আত্মবিশ্বাসের প্রতীক বলে চিহ্নিত করেছেন এবং বলেছেন, ‘ছোট চুল নারীর শরীর থেকে নারীত্ব সরিয়ে স্টাইলকে রিপ্লেস করে।’

পুরুষতন্ত্রে নারীর ছোট চুল তাই অস্বীকৃত, কলঙ্কিত এবং ভয়ঙ্কর। এতোটাই অস্বীকৃত, এত বেশি ভয়ঙ্কর যে, নিপীড়ন করার জন্য বা শাস্তি হিসেবে নারীর চুল কেটে দেওয়া হয় যুগে যুগে। কিন্তু কোনও পুরুষকে শাস্তি দেওয়ার জন্য তার চুল কেটে দেওয়া হয়নি কখনও। পৌরুষত্ব দেখানোর জন্য নারীর চুলের মুঠি ধরে টেনে হিঁচড়ে আঘাত করে পুরুষ। নারীর যৌনতা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিধবা নারীদের শরীর থেকে রঙিন কাপড় খুলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কাঁচি চালানো হয় চুলে, মাটিতে লুটোয় গোছা গোছা চুল, ঠিক তার জীবনের মতোই।

মূলত পুরুষতন্ত্র নারীর চুলে কাঁচি চালানো ভয় পায়। ‘...আমি যখন খুব সচেতনভাবে এমন আচরণ করতে শুরু করেছি, যা আমাকে পুরুষের যৌন আকর্ষণের বস্তু হওয়া থেকে দূরে রেখেছে, আমি দেখলাম আমার জীবন অকল্পনীয়ভাবে বদলে গেল...আমি যখন চুল কেটে ফেললাম চারপাশে শুনতে পেলাম অসংখ্য কণ্ঠস্বর। যারা বলছে, ‘যে সব মেয়ে চুল কেটে ফেলে তাদের কাছ থেকে দূরে থাকো। তারা পাগল, অভিশপ্ত এবং তারা তাদের নারীত্বকে ধ্বংস করেছে।’ ( Laurie Penny, New Statement, January 2014)।

পেনির মতোই কিছু অভিজ্ঞতা আমার জীবনে সত্যি হয়ে আসলো, যেদিন সন্ধ্যায় গিয়ে আমি ও আমার মেয়ে দুজনেই চুল কেটে ফেললাম। যখনই ওর চুলে কাঁচি চলতে শুরু করলো এবং গোছা গোছা নিচে পড়তে থাকলো আমি দেখলাম, চোখের সামনে আমার মেয়েটা বদলে যাচ্ছে। ওর ওই ছোট্ট কোমল মুখটাতে ধার আসছে, ওর কমনীয়তা, সৌন্দর্য নিচে পড়ে যাচ্ছে গোছা গোছা চুলের সঙ্গে। আমি বুঝলাম, আমার ছোট্ট মেয়েটা কষ্টে ভেঙে যাচ্ছে ভেতরে ভেতরে, ঠিক যেমনটা ভাঙছিল জুঁই এর বিজ্ঞাপনের সেই মেয়েটি। আমার নিজের ভেতরেও এক অদ্ভুত কষ্টের ক্ষরণ হচ্ছিল। হঠাৎ কি হলো, আমি একটা স্লিপ কেটে পাশের চেয়ারে বসে পড়লাম। ওর মতো আমারও গোছা গোছা চুল মাটিতে পড়তে লাগলো। তখনই আমি বুঝলাম ‘দীঘল কালো চুলের’ সংস্কার থেকে মুক্ত হওয়া কত বেদনার। এও নাড়ী ছেড়ার মতোই কষ্টের।

অদ্ভুত বিষয় হলো, চুল কাটার পর আমাদের চারপাশের নারীরা প্রতিবাদ করলো সবচেয়ে বেশি। এমনকি নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করা কেউ কেউ বলল যে, আমি আমার ও মেয়ের জীবনটা অহেতুক কঠিন করে তুলছি। আমার বারো বছরের মেয়েটা স্কুলে তার বন্ধুদের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হলো, ক্লাস টিচার শোনালেন সেই অমোঘ বাণী, ‘Girls’ should like a girl’; এক শিক্ষক ধর্মের ভয় দেখালেন, অন্য শিক্ষক বললেন, ‘You have lost your softness!!’ সত্যি বলতে কি, আমার ভেতরের পুরুষতান্ত্রিক সংস্কারও বিভিন্ন রকম প্রতিক্রিয়া করছিল। চুল তো সব সময়ই কাটি। কিন্তু এবার তো শুধু চুল কাটিনি, সচেতনভাবে একটা প্রথার শেকলও কেটেছি। এই শেকল কাটতে গিয়ে আমি বুঝেছি, লম্বা চুলের ফাঁদ কেটে বেরোতে পারলেই মেয়েরা অর্ধেক মুক্ত হয়ে যায় শাড়ি গয়না আর রঙ মাখার মায়াজাল থেকে।

প্রথা ভাঙার লড়াই মনে হয় এভাবেই করতে হয়। নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হয়, জুঁই এর বিজ্ঞাপনের মেয়েটির মতো। হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে হলে আগে নিজের ভেতরের শৃঙ্খলকে অতিক্রম করতে হয়। সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছি আমি নিজের মুক্তির জন্য, আমার সন্তানের জন্য। এটা একদম একান্ত ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক লড়াই। আমি না পারলেও ওরা ঠিকই একদিন ঘুরে দাঁড়িয়ে বলতে পারবে, ‘আমরা যেমন আছি তেমনই থাকবো। আমরা আমাদের সর্বস্ব নিয়ে, সম্পূর্ণ হয়েই বাঁচবো।’ ওরা নিশ্চয়ই সৌন্দর্যের নামে কোনও দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেবে না কোনও দিন, কোনোভাবেই না।  

লেখক: কলামিস্ট, অ্যাক্টিভিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়া নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করলো জার্মানি
ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়া নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করলো জার্মানি
চট্টগ্রামে করোনায় আরও একজনের মৃত্যু
চট্টগ্রামে করোনায় আরও একজনের মৃত্যু
‘শিক্ষকদের জীবন বাঁচানোই এখন দায়’
‘শিক্ষকদের জীবন বাঁচানোই এখন দায়’
‘সিম আছে, তবে চালু হবে না’
‘সিম আছে, তবে চালু হবে না’
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ