X
মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯

সেফহোমে থাকা বঙ্গনারীর আকুতি

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২১, ১৮:২৪

সালেক উদ্দিন দৃশ্যমান পদ্মা সেতু নিয়ে পুরো দেশবাসী যখন আনন্দ উল্লাসে উদ্বেলিত, যখন বিজয় দিবস উদযাপন নিয়ে আমরা ব্যস্ত, করোনাকালীন সময়ে এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলা ভার্চুয়ালি না হয়ে আগের মতোই আয়োজন সঠিক হলো কিনা ইত্যাদি বিষয়ের মধ্যে কোনটাকে অগ্রাধিকার দিয়ে লিখতে বসবো তা নিয়ে যখন ভাবতে হচ্ছে ঠিক তখনই একটি দৈনিকের প্রথম পাতায় প্রকাশিত 'সৌদিতে শত শত নারী কর্মী' শিরোনামের খবরটি আবার আহত করলো। লেখার বিষয়বস্তুকে ঘুরিয়ে দিলো। কী আছে এই খবরে! কেনই বা 'আবার আহত করলো' শব্দটি ব্যবহার করলাম?

না, মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী নির্যাতন নতুন কিছু নয়। সেখানে বাংলাদেশের নারী গৃহকর্মীর ওপর নিয়োগকর্তার অমানুষিক নির্যাতনের কথা অনেক পুরনো। পুরনো খবরই করোনাকালীন সময়ে নতুন মাত্রা পেয়েছে মাত্র। বিষয়টি হলো, সৌদি আরবে প্রতারিত হওয়া এই শত শত গৃহপরিচারিকা নিয়োগকর্তার ভয়াল থাবা থেকে পালিয়ে সেফহোমে উঠলেও করোনাকালীন সময়ের জন্যে দেশে ফিরতে পারছেন না।

'আবার আহত করলো' বিষয়টি উল্লেখ করেছি এ কারণে যে, গেলো বছরের শেষদিকে  সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাঙালি গৃহপরিচারিকাদের দৈহিক ও যৌন নির্যাতনের খবর প্রতিনিয়ত এখনকার চেয়ে অনেক বেশি পাচ্ছিলাম এবং আহত হচ্ছিলাম। নির্যাতিত নারীদের  আত্মহত্যা, কফিন বেশে দেশে ফেরা, ধর্ষিতা গৃহপরিচারিকার লাশ মাসাধিককাল সে দেশের মর্গে পড়ে থাকা, পালিয়ে সেফহোমে আশ্রয় গ্রহণ ইত্যাদি হরেক রকমের অমানবিক খবর আসছিল দৈনিক পত্রিকায়।

বিষয়টি‌ নিয়ে নভেম্বর ০২, ২০১৯ তারিখে বাংলা ট্রিবিউনে 'মধ্যপ্রাচ্যে ধর্ষণের শিকার গৃহকর্মীর ক্রন্দন' শিরোনামে আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে তাতে লিখেছিলাম, মধ্যপ্রাচ্যে বাঙালি গৃহপরিচারিকাদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়োগকর্তারা যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। কেউ কেউ দেশে ফিরছেন হাজার রকমের নির্যাতনের অভিজ্ঞতা নিয়ে। কেউ ফিরছেন কফিনবন্দি হয়ে। যারা নিজেদের সম্ভ্রমটুকু বাঁচানোর জন্য প্রতিবাদী হচ্ছেন তাদের ওপর চলছে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন। বিপদগ্রস্ত বহু নারী এখনও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সেফহোমে বসবাস করছেন।

সেই লেখায় প্রত্যাশা করেছিলাম, এ দেশের কন্যা-জায়া-জননী যেন গৃহকর্মীর চাকরি নিয়ে প্রবাসে গিয়ে আর নির্যাতনের শিকার না হন, যৌন হয়রানির শিকার না হন। ধর্ষণের শিকার গৃহকর্মীর চিৎকারে মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি যেন আর কেঁদে না ওঠে, কফিন বন্দি হয়ে দেশে ফিরতে না হয়- আমাদের দেশের সরকার সে বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।'

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আমাদের প্রত্যাশা এখনও প্রত্যাশায় রয়ে গেছে। তাদের ওপর সরকারের খেয়াল কতটা রয়েছে তার প্রমাণ মেলে এখনকার দৈনিকের খবরে। পড়তে হয় সব হারানো নির্যাতিতা অসহায় বাঙালি গৃহপরিচারিকারা দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের ফিমেল ডিপোর্টেশন সেন্টার এবং বাংলাদেশ দূতাবাস পরিচালিত সেফহোমে অবস্থান করার খবর। এসব বঙ্গনারী দেশে ফেরার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন কিন্তু পারছেন না। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সরকার বিদেশফেরত সবার জন্য করোনা নেগেটিভ সনদ বাধ্যতামূলক করায় ধর্ষক নির্যাতক গৃহকর্তাদের হাত থেকে পালিয়ে সেফহোমে এসেও বিপত্তি কাটেনি তাদের।        

এরা অধিকাংশই ইতোমধ্যে অবৈধ হয়ে পড়েছেন। ফলে তাদের পক্ষে সৌদি আইন অনুযায়ী সরকারিভাবে করোনা পরীক্ষা করানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে বেসরকারিভাবে করোনা পরীক্ষা (পিসিআর টেস্ট) করাতে যে অর্থের প্রয়োজন হয় তাও তাদের নেই।

এমতাবস্থায় করোনাকালীন সময়ে এসব অসহায় বঙ্গনারীকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস যে উদ্যোগ নেয়নি তা নয়। দূতাবাস এসব নারী কর্মীকে দ্রুত দেশে ফেরানোর স্বার্থে পিসিআর টেস্ট বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি চেয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে। এই লেখার সময়কাল পর্যন্ত প্রস্তাবটির উল্লেখযোগ্য কোনও অগ্রগতি এখনও হয়নি।

এ দেশের নারীরা কর্মের সন্ধানে বিদেশে গিয়ে নিয়োগকর্তা কর্তৃক নির্যাতিত হবে, সম্ভ্রম হারাবে। আবার সব হারাবার পরেও দেশে ফেরার জন্য বিদেশ বিভুঁইয়ে সেফহোমে দিনের পর দিন বছরের পর বছর প্রহর গুনবে, এটা ঠিক নয়। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রস্তাবের ওপর সঠিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের সর্বোচ্চ মহলের দৃষ্টি দেয়া উচিত বলে মনে করছি। করোনাকালীন সময়ের জন্যে যদি পিসিআর টেস্ট অপরিহার্যই হয়ে থাকে তবে তার ব্যয়ভার বহন করা আমাদের দেশের সরকারের জন্য কোনই কঠিন কাজ নয়। প্রয়োজন শুধু সরকারি কাজের লালফিতার কালচার থেকে বেরিয়ে এসে উদ্যোগ নেওয়ার। বিষয়টি এমনই স্পর্শকাতর' এবং এতই অমানবিক যে এই নিয়ে বিলম্বের আর সুযোগ নেই। লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে যদি সেফহোমে আটকাপড়া বঙ্গনারীদের দেশে ফিরতে বিলম্ব হয় তা হবে দুঃখজনক।

শুধু তা-ই নয়, ভবিষ্যতে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে নারীকর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারকে অবশ্যই যুগোপযোগী ব্যবস্থা নিতে হবে। জনসম্পদ আমদানিকারক দেশসমূহের সরকারের সঙ্গে শ্রমিক নির্যাতনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান রেখে আমাদের দেশের সরকারকে জনসম্পদ রফতানির চুক্তি করতে হবে। এমন একটি ব্যবস্থা করতে হবে যে, প্রবাসী নারী শ্রমিকরা কে কোথায় আছেন তার পূর্ণাঙ্গ ডাটা সে দেশে আমাদের দূতাবাসের কাছে থাকতে হবে এবং তারা কেমন আছেন তা নিয়মিত তদারকি করতে হবে। তাদের বিপদে ঢাল হয়ে পাশে দাঁড়াতে হবে। এটা শুধু নারী শ্রমিক বলে নয়, এ হলো এ দেশের  মানুষ হিসেবে তাদের মৌলিক নাগরিক অধিকার।

খুশি হতাম যদি এমন হতো যে এই লেখাটি প্রকাশের আর প্রয়োজন নেই। প্রকাশের আগেই  সেফহোমের বিপদগ্রস্ত বঙ্গনারীরা দেশে ফিরে এসেছেন। আর যদি তা না হয় তবে অন্তত এটুকু  আশা করবো যে, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপে হলেও অতি দ্রুত তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বাইডেনের সহায়তা চাইলেন রাশিয়ায় আটক মার্কিন বাস্কেটবল তারকা
বাইডেনের সহায়তা চাইলেন রাশিয়ায় আটক মার্কিন বাস্কেটবল তারকা
‘খাদ্যশস্যের মূল্য স্থিতিশীল রয়েছে’
‘খাদ্যশস্যের মূল্য স্থিতিশীল রয়েছে’
নূতন সিংহ-বিনোদ বিহারীর নামে বৃত্তি ইডিইউ’তে
নূতন সিংহ-বিনোদ বিহারীর নামে বৃত্তি ইডিইউ’তে
পুরস্কারপ্রাপ্তি আনন্দের
জেমকন সাহিত্য পুরস্কার ২০২১পুরস্কারপ্রাপ্তি আনন্দের
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ