X
মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২২, ১১ মাঘ ১৪২৮
সেকশনস

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: প্রান্তজনের সখা

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭:৩৯

নবনীতা চৌধুরী সত্তর সালের সেই প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের পরদিন অর্থাৎ ১৯৭০ সালের ১৩ নভেম্বর ঝড়জল মাথায় নিয়েই আমার মাকে নিয়ে তাঁর বাবা (আমাদের নানা) রওনা দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির উদ্দেশ্যে। অনেকেই তখন অবাক হয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, মানুষের জীবন বাঁচে না, আর মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করতে সেসময় এমন তাগিদের কী অর্থ থাকতে পারে! কিন্তু, আমাদের দাদু তখন অপ্রতিরোধ্য। মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিলেই একটা দায়িত্ব শেষ হয় তাঁর। ঢাকা এসে মেয়েকে এপ্লাইড ফিজিক্সে স্নাতকোত্তরে পড়তে ভর্তি করে দিয়ে বলে গেলেন, এবার তোমার জীবন গড়ে নেওয়ার, নিজেকে দেখে শুনে রাখার সব দায়িত্ব তোমার। তখন হবিগঞ্জ শহর থেকে ঢাকা আসতে দুই দফা রেলগাড়ি বদল করতে হয়। আর সেতো আর এযুগের মোবাইল ইমেইলের যুগ নয়। সত্যিকার অর্থেই মেয়েটির তখন এই বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আর কোনও ঘর, পরিচয় বা আশ্রয় থাকে না। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ই তাকে গড়ে তোলে, বাড়িয়ে ধরে আর আগলে রাখে। আমি দেখি তাতেই নির্ধারিত হয় মায়ের ভবিষ্যৎ এমনকি আমাদের অর্থাৎ মায়ের উত্তর প্রজন্মের ভবিতব্যও।

আমার মা বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন অবশ্য আরো আগে। ১৯৬৯ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী হিসেবে রাজপথে নেমে আসেন সারাদেশের আপামর ছাত্রীদের সঙ্গেই। ওই তো বাংলাদেশের মেয়েদের, মায়েদের, বোনেদের মুক্তিসংগ্রামে একাত্ম হয়ে নেমে আসার মাহেন্দ্রক্ষণ। সেই আমার মা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলেন ঘূর্ণিঝড় পেরিয়ে, তারপর সময় উত্তাল। ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিসংগ্রাম, ভারতের শরণার্থী জীবন, মুক্তি সংগ্রামীদের মাঝে খবর সরবরাহের কাজ, তাঁরই মাঝে সেলাই ফোড়াই, টিউশনি করে টিঁকে থাকার সংগ্রাম শেষে মা আবার সবাইকে ফেলে ফিরে এলেন তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের আশ্রয়েই। এরপর সবাই ছুটিতে বাড়ি গেছে অথচ একাত্তরের পর বেদখলের জেরে মূল উতপাটিত আমার মায়ের তখন আর কোনও বাড়ি রইলো না। মা ছুটিতে বা স্বাধীনতা পরবর্তী অস্থিরতাতে হল খালি করে দেওয়ার ঘোষণা এলেও হলেই থাকেন। একমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশ্রয়ের অধিকারই অটুট থাকে। আশৈশব তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প আমার কাছে আমার ঘর বাড়ি আঙ্গিনার গল্পের মতো। যেখানে ভয়াল ঝড় পেরিয়ে একদিন আমার মাকে আমার দাদু নিয়ে না এলে আজ আমি যেখানে, সেখানে আর থাকি না। এই যে জন্মের পর থেকে বাংলাদেশের এক মেয়ে আমি জেনে বড় হলাম দেশের সর্বোচ্চ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে পড়ায় আমার সর্বাত্মক অধিকার আর নিজের জীবন নিজে গড়ে নেওয়ার আর নিজেকে দেখে শুনে রাখার সব দায়িত্বও তখন থেকে আমার হবে - এর সবটুকু শুরু তো আসলে ওই ঝড়জল পেরিয়ে আমার মায়ের ওই উঠোনে পা রাখা থেকেই।   

আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মই তো এই অসীম সম্ভাবনার চক্রে এই বঙ্গের একেকটি পরিবারকে ফেলবে বলে। জ্ঞান আর বিদ্যা এমন এক চাবিকাঠি; সে যার হাতে একবার পড়বে তার আর পিছু ফিরবার প্রয়োজন পড়বে না। আমার কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সার্থকতা এই যে, মামা চাচা অর্থ বিত্ত ক্ষমতা শক্তি সব কিছুর ওপরে যে এখনো বিদ্যার জোর ডিগ্রির জোর কপাল ফেরাতে আর ‘লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চরে সে’ প্রমাণে এবং একটি পরিবারকে প্রজন্মান্তরে বর্ধনশীল করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে তা প্রমাণ করে যাচ্ছে এই এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

আমার মায়ের তিরিশ বছরখানেক পর আমি এসে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম তখনো সেই যাদুর কাঠির ছোয়া অব্যাহত এই প্রাঙ্গণে। সারাদেশের সেরা ছেলেমেয়েরা এসে জীবন বদলের স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হলেন আমার আইন অনুষদে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আমার বাবা ছোটবেলা থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে বাংলা একাডেমির  বইমেলা প্রাঙ্গণে আনার পথে আমাদের তিন ভাইবোনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা ভবন আর অনুষদ চেনাতেন। বড়বোন জানতো সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়বে;  আমি জানতাম শহীদ মিনারের পাশের এনেক্স ভবনে আমি পড়তে চাই আইন আর আমার ভাই ঠিক কবে কখন ঠিক করল ও দেশের সেরা করপোরেট প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে চায় আর তাই ওকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ’তেই পড়তে হবে সেটা ঠিক মনে পড়ে না আমার। আমার বড়বোনকে আবার আমাদের  বাবা এক্কেবারে স্কুল পড়া সময়েই দৈনিক সংবাদের পাতায় সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম বা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের লেখা দেখিয়ে বলে রেখেছিলেন এই বিদগ্ধজনেরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক আর ওকেও নাকি তাই হতে হবে।

এই তো কিছুদিন আগে নিউইয়র্কের রাস্তায় যখন আমি আর আমার বন্ধুটি হাঁটছিলাম, যে এখন বাংলাদেশের উচ্চপদস্থ কূটনীতিক, জাতিসংঘের স্থায়ী মিশনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে, আমি ফিরে যাচ্ছিলাম, পরীক্ষার আগের রাতে আমাদের শামসুন্নাহার হলের করিডোর বা মাঠের অস্থির পায়চারীর সময়ে। মনে পড়ছিল, আমার বন্ধুটি তখন হাঁটতো আর বলতো, আন্তর্জাতিক আইন নিয়েই কাজ করতে চায় ও, হতে চায় কূটনীতিক। আমি বলতাম এত হাতে গোনা মানুষ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কোরে যোগ দেওয়ার সুযোগ পায়, শুধু ওই এক কাজেই বোধহয় লক্ষ্য স্থির না করে ওর মতো তুখোড় ছাত্রের উচিত বিদেশে উচ্চশিক্ষায় গিয়ে গবেষক বা শিক্ষক হওয়ার পথও বাতলে রাখা। তখন ফুল টাইম সাংবাদিকতা করে আইন পড়া আমাকে ওই পরীক্ষা পাসের জন্য পরীক্ষার আগের রাতগুলোয় পড়ায় মনিকা। কাজেই পড়ালেও ও কত ভাল করবে আমি জানতাম। কিন্তু, মণিকা বলতো, ও কূটনীতিকই হবে, আর তাই হয়ে উঠতেও পারল ও। কারণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বপ্ন দেখায়, প্রস্তুত করে আর আমাদের নিয়ে যায় স্বপ্ন পূরণের দোরগোড়ায়, সেই আমাদের যাদের বিদ্যা, ডিগ্রি, স্বপ্ন আর কঠোর পরিশ্রম ছাড়া আর কোনও জোর নেই।

আমাদের প্রিয় অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক আইনের গুরু মিজানুর রহমান স্যার আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের তখনকার ভাঙ্গা ক্লাসরুমে, অচল ফ্যানের তলায় দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখাতেন আর ভবিতব্য নির্ধারণের মত বলতেন, ‘তোমরা সারা পৃথিবীতে কাজ করবে। কাজেই পুরো দুনিয়া নিয়ে তোমরা ভাববে এবং সেভাবে প্রস্তুত হবে।’   গরম কফির ইনসুলেটেড মগ হাতে ক্লাসে ঢুকে তখন কি শুধু পাঠ্যবই পড়াতেন মিজান স্যার? তখন স্যার পড়ছেন উইলিয়াম ডালরিম্পলের হোয়াইট মুঘলস। আমাদের সে বইয়ের সাদা সাহেবের সাথে এক ভারতীয় মুসলিম রমণীর গভীর প্রেম বিয়ে আর বিশ্বাসঘাতকতার গল্প বলার সাথে সাথে স্যার আমাদের বলেন বিশ্বে তখন ডিকলোনাইজেশনের যে ডিসকোর্স চলছে তা নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ক্লাসে শুধু অপ্রতিরোধ্য মেধার জোরে উঠে আসা  সুদূর কোন গ্রামের ছাত্রটি তখন গা ঝাড়া দিয়ে বসে জেনে নেয়, নতুন শতকের পৃথিবী আমাদেরই। ধনী বিশ্বের অক্সফোর্ড হার্ভার্ড পড়া সাদা সাহেবদের বুদ্ধি আর তত্ত্বে দুনিয়া আর চলবে না। এখন আমি যখন ঘুরে তাকাই, দেখি আমরা সত্যি সারা পৃথিবীতে কাজ করেছি, করছি। কাজ আর বিদ্যার জোরই আমাদের দেশের পরিধির বাইরে নিয়ে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি আমাদের বিশ্ব সভার জন্যে প্রস্তুত করে দিয়েছে।  আমার ক্লাসের ছেলেমেয়েরা দেশের সেরা আইনজীবী, বিচারক, সরকারী কর্মকর্তা তো হয়েছেনই, তারা হয়েছেন পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সেরা গবেষক এবং আইন বিশেষজ্ঞ। আমাদেরই কেউ মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত নির্ধারনী মামলার যুক্তি তর্ক খসড়া করেছে তো কেউ জাতিসংঘের ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউয়ের খসড়া করছে।      

অনেকেই খুব হা হুতাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষক তৈরি করতে পারলো না,  মনীষী তৈরি করতে পারলো না কেন? কেন এই বিশ্ববিদ্যালয় নেই একশটি বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায়?- এমন হরেক অভিযোগ এর বিরুদ্ধে।

১৯২১ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি কিন্তু তৈরি হয়েছিল একেবারেই এই অঞ্চলের মানুষের যে উচ্চশিক্ষায় অধিকার ছিল না তা প্রতিষ্ঠায় – মানে গ্রাজুয়েট তৈরি করতে। আমার বাবা মায়ের আগের  প্রজন্মে আমার মাতামহসহ পরিবারের যত সদস্য গ্রাজুয়েট ছিলেন তারা সকলেই ঘুরে এসেছিলেন কলকাতা। গ্রাজুয়েট হওয়ার সঙ্গে তখন মেধার প্রতিযোগিতার চেয়েও অর্থ বিত্ত, কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগের সরাসরি সম্পর্ক ছিল। এই জায়গায় সাম্য তৈরি করাই কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য আর প্রয়োজন ছিল। ওদিকে দেখুন, কলকাতায় বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে গেছে আরো প্রায় সাড়ে চার দশক আগে সেই ১৮৫৭ সালে। পুরো ভারতেরই প্রথম আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় নাকি ওটি। পূর্ববঙ্গের বাঙালিকে সেই বৈষম্য থেকে মুক্ত করাই ছিল আমাদের অঞ্চলের রাজধানীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি আর তা প্রতিষ্ঠার মূল কারণ। ঢাকায় যখন বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হচ্ছে, তার আগেই কলকাতায় বংশের ধন সম্পদ জমি জিরাত উড়িয়ে কয়েকশ বছরের যে পুরনো  বাবু কালচার তাকে টপকে নগরে নাক গলিয়ে ঢুকে পড়তে শুরু করেছে  ইংরেজের দপ্তরে কলম পিষে মধ্যবিত্ত নামে এক নতুন শ্রেণিতে নাম লেখানো কলেজ ইউনিভার্সিটি পাস করা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি হিন্দু চাকুরেরা। এই চাকরি ছাড়া মূলত গায়ে খাটা কৃষক আর শ্রমজীবী মানুষের পূর্ববঙ্গে নগরে ঢোকা, নগরে টেঁকা আর ঘাম শুকিয়ে গা এলিয়ে বসে ভাবনার বিকাশের সময় সুযোগ হওয়ারই আর কোনও পথ ছিল না। কাজেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি আমার চোখে যত না মনীষী তৈরির জন্যে তার চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক, নাগরিক মানুষ তৈরির জন্যে যারা ডিগ্রি বেচে, কলম পিষে নিজের এবং পরিবারের আর্থ সামাজিক অবস্থা বদল করবেন এবং কায়িক শ্রম থেকে উত্তরণের মাধ্যমে নিজেকে মহত্তর ভাবনায় যুক্ত করার পথ খুঁজে পাবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সে কাজ করেছেনও। এ বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টির তিন দশকেরও কম সময়ের মধ্যে একে ঘিরেই দানা বেঁধে উঠতে থাকে বাঙালির শ্রেষ্ঠতম জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। ৫২ সালে ভাষার জন্যে আন্দোলনটিও বাঁধভাঙ্গা হয়ে ওঠে যখন পূর্ববঙ্গের বাঙালি জানতে পারেন সরকারী চাকরির পরীক্ষায় আবার তাদের অজানা ভাষা উর্দু জানা জরুরি করার ঘোষণা এসেছে। আসলে ক্রমাগত প্রান্তিক করে রাখা, প্রান্তিক হয়ে থাকা পূর্ববঙ্গের কৃষিজীবী বাঙালির, মূলত বাঙালি মুসলমানের বৈষম্যমুক্তির সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হয়ে গত শতবছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের মতো প্রান্তজনের সখা এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের পরিবারের স্বপ্নলোকের চাবি এই বিশ্ববিদ্যালয়। আমার মা, মামী, পিসি পরিবারের সব নারীরা আগের প্রজন্মে বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে গেছেন এর হাত ধরেই। কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হয়েছেন, দেশ গঠনে ভূমিকা রেখেছেন। এই প্রজন্মে আমার বোন শৈশবের পরিকল্পনামত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন, তারপর এখন ভাষা আর ভাষাতত্ত্ব পড়াচ্ছেন ইংরেজি ভাষাভাষীদের এক দেশে। আমার ভাই এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি দিয়েই দেশের সেরা করপোরেটে চাকরি করতে করতে দুইদফা বিদেশে পোস্টিংয়ের পর এখন আন্তর্জাতিক পরিসরে চাকরি নিয়ে গিয়ে থিতু হয়েছে।   

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পরীক্ষা দিতে না দিতেই লন্ডনে বিবিসি রেডিওতে চাকরি করতে দেশ ছেড়েছিলাম। শিক্ষক আর বাবা-মায়ের প্রত্যাশা ছিল মাস্টার্সটা করে নেব সময় সুযোগমত। সাত বছর পর যখন দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম তখন মানবাধিকার আইনে মাস্টার্স করতে ভর্তি হলাম বিশ্বখ্যাত ল’ স্কুল, লন্ডন ইউনিভার্সিটির সোয়াস’এ। আমার মনে আছে, পৃথিবীর নানা দেশে আইন পড়ে আসা ছাত্ররা যখন মানবাধিকার আইনেরও মূল ভিত্তি যে আইন– আন্তর্জাতিক আইন – সে বিষয়টির প্রেক্ষিত আর ধারণা বুঝতে পোস্ট গ্রাজুয়েশন পর্যায়ে এসে হিমশিম, তখন সোয়াসের বিশ্বখ্যাত অধ্যাপকেরা মুগ্ধ যে কতটা গভীরতায় আজকের দুনিয়ায় সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাস, প্রয়োগ সম্পর্কে পড়ে বা জেনে এসেছি এলএলবি অনার্স পর্যায়েই। আমার ক্লাসের আরেক সহপাঠী মাহফুজা লিজা, পুলিশের বড় কর্তা। সুদীর্ঘ সময় কাজ করেছে, উগ্র সন্ত্রাসবাদীদের বিষয়ে সকল গোয়েন্দা তথ্য আর তাদের মনোজগত বিশ্লেষণ করে সন্ত্রাসবাদ প্রতিহত করতে কৌশল নির্ধারণে। বছরের পর বছর নিজের বিশ্লেষনের সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অপরাধবিজ্ঞানী, গোয়েন্দা আর তদন্তকারীর বিশ্লেষণ মিলিয়ে আন্তর্জাতিক কৌশল নির্ধারণই ছিল ওর শ্বাসরুদ্ধকর এসাইনমেন্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী প্রস্তুত ছিল এতেও। কারণ, পৃথিবীর অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই অপরাধী দমনে ফৌজদারি আইন পড়ানো হয় বটে কিন্তু ক্রিমিনোলজি অর্থাৎ অপরাধ বিজ্ঞান পড়িয়ে এর প্রেক্ষিত, বাস্তবতা বা মনোজগত বোঝার তাত্ত্বিক শিক্ষা এলএলবি অনার্সে জুড়ে দিয়ে আইনের গ্রাজুয়েটদের উপলব্ধি গভীর করার উদ্যোগটুকু থাকে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিকশিত হচ্ছে, অগ্রসর হচ্ছে। ক্রিমিনোলজি বা অপরাধ বিজ্ঞানে এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স, মাস্টার্স সম্ভব। আমি এখন বিশ্বের সর্ববৃহৎ বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের জেন্ডার কর্মসূচি দেখভাল করি। আমার টিমে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেন্ডার অ্যান্ড উইমেন স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের ছাত্রছাত্রীরা দলে বেশ ভারী। সমতার বিষয়টিকে মূলধারায় আনার জরুরি কাজটি তাই ক্রমেই জাতীয় প্রেক্ষিত বুঝে আন্তর্জাতিক বাস্তবতা জেনে সকল তাত্ত্বিক জ্ঞানে দক্ষ জনশক্তির হাতে চলে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্থকতা এখানেই। যখন যেমন প্রয়োজন, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে তেমন দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। সবাই হয়তো যে বিষয়ে পড়ছেন সে বিষয়েই কর্মক্ষেত্রে জায়গা করে নিতে পারছেন না তবে মাথা উঁচু করে ঠিক দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন আর চারপাশ বদলে দিচ্ছেন। নারী পুরুষ, ধনী গরিব,  গুলশান কি গুলিস্তান,  চট্টগ্রাম থেকে চাটমোহর, সুনামগঞ্জ কি ঢাল চর যে যেখান থেকে যে পরিচয় নিয়েই একবার উঠে এসেছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে, কাউকে ফেরায়নি সে, কেউ আর ফিরে তাকায়নি। আমার মনে হয় এদেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি এখনো তার বেতনে, খরচে, ভর্তি পরীক্ষায়, আশ্রয়ে এই সাম্যটুকু ধরে রাখতে পেরেছে বলেই এতরকম গোষ্ঠীবাদী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরেও সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা আর আশরাফ আতরাফে বৈষম্যহীনতার দাবিটুকুই বাংলাদেশের উচ্চকিত মধ্যবিত্ত মানসের মূল দাবি হয়ে থেকে যেতে পেরেছে। 

লেখক: পরিচালক, জেন্ডার কর্মসূচি, ব্র্যাক
(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের স্নাতক)

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

শাবি ভিসির পদত্যাগ চেয়ে শিক্ষকদের অনলাইন ক্যাম্পেইন
শাবি ভিসির পদত্যাগ চেয়ে শিক্ষকদের অনলাইন ক্যাম্পেইন
এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট বিতরণের নির্দেশ
এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট বিতরণের নির্দেশ
পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্র নেই: রাজ্যপাল ধনখড়
পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্র নেই: রাজ্যপাল ধনখড়
নিজের করা মামলায় বাবুল আক্তারের জামিন নামঞ্জুর
নিজের করা মামলায় বাবুল আক্তারের জামিন নামঞ্জুর
শপথ নেওয়ার পরপরই ৪ ইউপি চেয়ারম্যান গ্রেফতার
শপথ নেওয়ার পরপরই ৪ ইউপি চেয়ারম্যান গ্রেফতার
একদিনে ১৬ হাজার রোগী, মৃত্যু ১৮ জনের
একদিনে ১৬ হাজার রোগী, মৃত্যু ১৮ জনের
স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ: যুবকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ: যুবকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
পেপারলেস হচ্ছে কলকাতা পৌরসভা
পেপারলেস হচ্ছে কলকাতা পৌরসভা
প্রতারণার মামলায় কারাগারে সিসিক কাউন্সিলর শানু
প্রতারণার মামলায় কারাগারে সিসিক কাউন্সিলর শানু
বাংলাদেশকে আরও ২১ লাখ ডোজ টিকা দিয়েছে ফ্রান্স
বাংলাদেশকে আরও ২১ লাখ ডোজ টিকা দিয়েছে ফ্রান্স
দারুণভাবে ফিরলেন মাশরাফি
দারুণভাবে ফিরলেন মাশরাফি
অতি আত্মবিশ্বাসে সংক্রমণ বাড়ছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
অতি আত্মবিশ্বাসে সংক্রমণ বাড়ছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2022 Bangla Tribune