X
বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২
২২ আষাঢ় ১৪২৯

নিজের জিহ্বায় কাটা পড়বেন আরও কতজন?

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬:০০

আমীন আল রশীদ জিহ্বা মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অঙ্গ। এর নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বিপদ শুধু ব্যক্তির নিজের নয়, বরং তার পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রেরও। জিহ্বা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে তার করাতে নিজেকেই রক্তাক্ত হতে হয়।

সবশেষ এই জিহ্বা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে পদ হারিয়েছেন একজন প্রতিমন্ত্রী। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশে ছেড়ে কানাডায় চলে গেলেও সেই দেশ তাকে ঢুকতে দেয়নি। দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করে তীব্র সমালোচনার মুখে ক্ষমা চেয়েছেন বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা। দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

এর আগে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বেফাঁস মন্তব্য করে ফেঁসে গেছেন গাজীপুরের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ও সিটি মেয়র জাহাঙ্গীর আলম। পদ হারিয়েছেন তিনিও। দলেও জায়গা নেই। বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ইস্যুতে একজনের সঙ্গে ফোনে কথা বলে পদ হারিয়েছেন রাজশাহীর কাটাখালী পৌরসভার মেয়র আব্বাস আলী। গ্রেফতারও হয়েছেন।

দেখা যাচ্ছে, পর পর কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজের জিহ্বায় কাটা পড়েছেন। আর তাদের এই বেফাঁস কথাবার্তায় ফেঁসে যাওয়ার পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে ডিজিটাল ডিভাইস ও ইন্টারনেট। অর্থাৎ তারা ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিসরে মন্তব্যগুলো করলেও তা যখনই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে গেছে বা ভাইরাল হয়েছে, তখনই এ ব্যাপারে অ্যাকশন নেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। তাদের এসব মন্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে না পড়লে তাদের কেউই বিপদে পড়ে পদ হারাতেন না। একসময় যাদের চারপাশে নেতাকর্মীদের ভিড় সামাল দেওয়া যেত না, তারা এভাবে ‘একঘরে’ হয়ে যেতেন না। অর্থাৎ শুধু জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা এবং ডিজিটাল মাধ্যমের বিপদ সম্পর্কে সম্যক অবহিত না থাকার ফলে সকাল বেলার ‘আমিরে’রা সন্ধ্যার আগেই ফকির হয়ে গেলেন।

প্রশ্ন হলো, এমন কথা কেন বলতে হলো যার ফলে মুরাদ হাসানের প্রতিমন্ত্রিত্ব গেলো, এমপি পদও যায় যায়? কানাডায় গিয়ে বসবাস করতে চেয়েছিলেন। সেই চেষ্টাও ব্যর্থ। শরীরের অতি ক্ষুদ্র একটি অঙ্গ (জিহ্বা) নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে এখন তার ‘কোথাও কেউ নেই’ দশা।

কেন প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে এমন কথা বলতে হলো যার ফলে মোয়াজ্জেম হোসেন আলালকে ক্ষমা চাইতে হলো? ব্যক্তিগত পরিসরে বললেও গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গীর আলম এবং কাটাখালীর মেয়র আব্বাস আলীর মাথায় কেন এটা থাকলো না যে তারা যাই বলুন না কেন? কোথাও না কোথাও কথার রেকর্ড থেকে যাচ্ছে। কেউ না কেউ এই রেকর্ড ফাঁস করে দিয়ে তাদের ক্যারিয়ারের বারোটা বাজিয়ে দিতে পারেন। নাকি তারা ভেবেছিলেন, ব্যক্তিগত পরিসরের এসব কথা কেউ জানবে না?

কিছু দিন আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি গান বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। তার কথাগুলো এরকম: ‘ও মানুষ, মানুষ… দুটো কান আর দুটো চোখ, দেখবা আর শোনবা, কিন্তু একটা মুখ তো! একটু কথা কম কবা’। তবে শুধু কথা কম-বেশি বলার বিষয় নয়। বরং কোথায় কী বলছেন সেটি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের এক্ষেত্রে সতর্কতা বেশি জরুরি। কারণ, তাদের চারপাশেই শত্রুপক্ষের লোক ঘোরাফেরা করে।

সাধারণ মানুষ তো বটেই, সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এমনকি নীতিনির্ধারকদের অনেকেরও যে ‘ডিজিটাল লিটারেসি’ বা ‘ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম’ ব্যবহারের ন্যূনতম জ্ঞানের যথেষ্ট অভাব রয়েছে, সেটি মুরাদ হাসান, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, জাহাঙ্গীর আলম ও আব্বাস আলীর ঘটনায় স্পষ্ট।

বলাই হয়, কারও পকেটে একটি স্মার্টফোন এবং তাতে ইন্টারনেট সংযুক্ত রয়েছে মানে হলো তিনি একটি অ্যাটম বোমা পকেটে নিয়ে ঘুরছেন। অর্থাৎ ইন্টারনেট সংযুক্ত একটি স্মার্টফোনের এমনই জাদুকরি ক্ষমতা, এটা দিয়ে মুহূর্তেই অন্য একজনের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব। এমনকি নিজের ডিভাইসেই কেউ তার ফেসবুকে ছোট একটি বাক্য লিখেও নিজের ও পরিবারের জন্য সমূহ বিপদ ডেকে আনতে পারেন। ইউটিউবে কোনও একটি আপত্তিকর কনটেন্ট শেয়ার করে সমাজে হেয় হতে পারেন। বড় ধরনের আইনি ঝামেলায় পড়তে পারেন। আবার যেহেতু প্রত্যেকের পকেটেই একটি করে অ্যাটম বোমা রয়েছে, ফলে কে কখন কার ছবি তুলছেন, ভিডিও করছেন, কে কখন কার কোন আপত্তিকর কথাটি রেকর্ড করে ফেলছেন এবং সেই রেকর্ড প্রকাশ করে দিলে যে কোন ধরনের বিপদে পড়ে যাবেন—তা বলা মুশকিল। সব মিলিয়ে ডিজিটাল দুনিয়া যে একটা বড় ধরনের বিপজ্জনক প্ল্যাটফর্ম—সে বিষয়ে নিশ্চয়ই কেউ দ্বিমত করবেন না।

পক্ষান্তরে এই ডিজিটাল দুনিয়াকে অসংখ্য মানুষ ইতিবাচক কাজেও ব্যবহার করছেন। লাখ লাখ মানুষ উদ্যোক্তা হয়ে গেছেন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম কাজে লাগিয়ে। কিন্তু বিষয়টা দাঁড়িয়েছে ওই গানের মতোই যে, ‘দেখবা আর শুনবা কিন্তু কথা কম কবা’। বেফাঁস কথা বললে যে নিজেকেই ফেঁসে যেতে হতে পারে—সে বিষয়ে খুব সতর্ক থাকা দরকার। এমনকি ব্যক্তিগত পরিসরে কথা বলার সময়েও।

২.

তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান একটি ইউটিউব চ্যানেলে বিএনপি নেতা তারেক রহমান এবং তার মেয়ের সম্পর্কে বাজে মন্তব্য করে সমালোচিত হলেও মূলত তার পদ হারানোর বিষয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে চিত্রনায়িকা মাহির সঙ্গে একটি ফোনালাপ—যেখানেও মুরাদ হাসান বাজে কথা বলেছেন। অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করেছেন। যে ফোনালাপটি ফাঁস হয়েছে সেখানে স্পষ্ট যে তিনি ওই সময়ে মাতাল ছিলেন। মূলত এই ঘটনাটি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পথটি সুগম করে।

যদিও ফোনালাপ ফাঁস নতুন কোনও ঘটনা নয়। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটে ২০১৩ সালের অক্টোবরে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার ফোনালাপ ফাঁসের মধ্য দিয়ে। এরপর ২০১৫ সালে বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকা এবং নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার ফোনালাপও ফাঁস হয়। ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের ফোনালাপ ফাঁস হয়।

ফোনে আড়িপাতা এবং ফোনালাপ প্রকাশ নিয়ে দেশের কোনও আইনে সুস্পষ্ট কিছু উল্লেখ নেই। টেলিযোগাযোগ আইনের একটি ধারায় বলা হয়েছে, যদি নিরাপত্তা সংস্থা প্রয়োজন মনে করে, তদন্তের ও মামলার স্বার্থে কারও ফোনালাপ নিতে পারে। তাহলে টেলিফোন সেবাদাতা সংস্থা তাদের সব রকমের তথ্য দিতে বাধ্য থাকবে; কিন্তু তারা যে কারও ফোনে আড়িপাততে পারবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা নেই। বরং বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৩ (খ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘চিঠিপত্রের ও যোগাযোগের অন্যান্য উপায়ের গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার থাকিবে।’ অর্থাৎ নাগরিকরা চিঠিপত্র এবং যোগাযোগের অন্যান্য মাধ্যম যেমন ফোন, ই-মেইল ইত্যাদির মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করলে রাষ্ট্র তার গোপনীয়তা রক্ষা করবে। আইন বলছে, সুনির্দিষ্ট মামলা বা তদন্তের স্বার্থে ফোনকল রেকর্ড করা যাবে।

এটা ঠিক, ফোনালাপ ফাঁস অনেক সময় বড় কোনও ঘটনারও জন্ম দেয় বা বড় ধরনের অপরাধের হাত থেকে দেশকে বাঁচিয়ে দেয়। যশোরের একজন এমপি স্থানীয় এক আইনজীবীকে ফাঁসাতে পুলিশকে যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন, সেই ফোনালাপ ফাঁস না হলে এই অপরাধের খবরটি জানা যেত না। হেফাজত নেতা মামুনুল হককে আটকের পরে তিনি তার স্ত্রীর সঙ্গে কী কথা বলেছেন, সেটিও প্রকাশিত না হলে জানা যেত না যে তার সঙ্গে থাকা নারী আসলে তার স্ত্রী নন। একজন চিত্রনায়িকার সঙ্গে ফোনালাপটি ফাঁস না হলেও নিয়মিত অশ্লীল কথাবার্তা বলা এবং যাকে-তাকে গালাগালে অভ্যস্ত মুরাদ হাসান হয়তো এখনও প্রতিমন্ত্রীই থাকতেন।

ফোনালাপ ফাঁসের আইনি ও নৈতিক বৈধতা নিয়ে নানারকম প্রশ্ন থাকলেও বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ফোনকল রেকর্ড করা হয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতারা নিজের দল ও সরকার পরিচালনার স্বার্থে নেতাকর্মী ও সংশ্লিষ্টদের নানা ধরনের পরামর্শ ও নির্দেশনা দেন। কিন্তু সবার ফোনালাপ ফাঁস করা হয় না। শুধু তাদেরটাই ফাঁস করা হয়, যাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হয়। যেমন, হেফাজত নেতা মামুনুল হকের ফোনালাপও ফাঁস করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাটি জায়েজ করার জন্য এবং তিনি ইসলামের কথা বললেও ব্যক্তি জীবনে যে অসৎ এবং যা করছেন তা যে ইসলামসম্মত নয়, সেটি মানুষকে জানানোর জন্য।

মুরাদ হাসানকে নিয়েও অনেক দিন ধরেই সরকারের ভেতরে অস্বস্তি ছিল। দলের ভেতরেও। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে অশোভন আচরণ করার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে অনেক। শোনা যায়, প্রশাসনের একটি বিরাট অংশও তার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ছিলেন। সেই পরিস্থিতিতে তিনি আবার সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম বাতিল নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটি স্পষ্টতই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বর্তমান অবস্থানের বিপরীত। সব মিলিয়ে মুরাদ হাসান মূলত ধীরে ধীরে নিজের গর্তটা বড় করেছেন এবং সামান্য একটি ফোনালাপ ফাঁসের মাধ্যমে তার কফিনের বুকে শেষ পেরেকটা ঠোকা হয়।

গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গীর আলমও নানা ঘটনায় সমালোচিত ছিলেন। স্থানীয় রাজনীতিতেও তার প্রতিপক্ষ বেশ শক্তিশালী। ফলে ব্যক্তিগত পরিসরে বাংলাদেশের রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তিনি কিছু আপত্তিকর মন্তব্য করলেও সেটি যে কেউ না কেউ মোবাইল ফোনে ধারণ করছেন এবং এটি প্রকাশের মধ্য দিয়ে যে তিনি রাজনীতি থেকে হাওয়া হয়ে যাবেন—সেই চিন্তাটাই হয়তো তার মাথায় ছিল না। তার মানে মেয়র জাহাঙ্গীরকে ধরার জন্য একটি বিরাট শক্তি অনেক দিন ধরেই কাজ করছিল এবং তার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাকে ‘সাইজ’ করা হলো।

প্রশ্ন হলো, এরকম জিহ্বা সংবরণে ব্যর্থ এবং ডিজিটাল লিটারেসি না থাকার কারণে ভবিষ্যতে আরও কতজন রাজনীতিক এভাবে ছিটকে পড়বেন? আরও কতজনের এরকম ভিডিও এবং অডিও আছে—যা ভবিষ্যতে আলোচনায় আসতে পারে? যেহেতু সব রাজনীতিকের ফোনকলই রেকর্ড হয় বলে ধারণা করা হয় এবং তাদের অনেকেই যে নানারকম বেফাঁস কথাবার্তা মোবাইল ফোনে বলেন, ফলে কার ফোনকল কখন ফাঁস করা হবে, সেটি আগেভাগে ধারণা করা মুশকিল। তবে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে হয়তো আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আগে আরও অনেকের ফোনকল বা আপত্তিকর ভিডিও প্রকাশ করা হবে, বিশেষ করে যাদের নির্বাচনের মাঠ থেকে দূরে রাখার প্রয়োজন দেখা দেবে?

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির সুযোগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির সুযোগ
বিনিয়োগের প্রলোভনে কোটি টাকা নেন হেনোলাক্সের মালিক
বিনিয়োগের প্রলোভনে কোটি টাকা নেন হেনোলাক্সের মালিক
ঘাটে যানজট নেই
ঘাটে যানজট নেই
গভীর রাতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষে আহত ৭
গভীর রাতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষে আহত ৭
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ