X
মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯

‘আয়কর নীতি’ এসডিজি অর্জনে কতটা সহায়ক

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২২, ২০:০৮
মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বাকি আছে মাত্র কয়েক বছর। এটা সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে অর্জন করার অঙ্গীকার বাংলাদেশেরও। প্রত্যেক রাষ্ট্রই নিজ নিজ পলিসি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, নিয়েছে নানা কৌশল। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশও বসে নেই। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগগুলো নানামুখী ভূমিকায় অবতীর্ণ। সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে ব্যাপকভাবে প্রস্তুতি দৃশ্যমান। এছাড়া এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করছে নানা উপায়ে, নানা ফর্মে।

দেশের রাজস্ব নীতি, নাগরিকের কর পরিশোধের সক্ষমতা ও কর ন্যায্যতা রক্ষায় সরকার কতটা সতর্ক তা দেখা দরকার।  এসজিডির ১৭টি অভীষ্ট অর্জনে দেশের রাজস্ব নীতি বা আয়কর আইন কতটা সহায়ক হওয়া দরকার বা  বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের করণীয় সম্পর্কে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট মূল্যায়নের এখন গুরুত্বপূর্ণ সময়।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টসমূহ অর্জনে আয়করের সরাসরি যেমন ভূমিকা আছে, তেমনি যথাযথভাবে আয়কর আদায়ের খাত চিহ্নিত করতে না পারলে এর নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অর্থ নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ ইতোমধ্যে বিভিন্ন উপায়ে তাদের মতামত ব্যক্ত করেছে। যেকোনও দেশের সরকারের রাজস্ব নীতি এসডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওএসডি) ও বিশ্বব্যাংকসহ প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বিভিন্ন গবেষণা ও দলিলে প্রমাণ দিয়েছে। গবেষণাগুলোতে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্র সমূহ এসডিজির অভীষ্ট অর্জনের ক্ষেত্রে রাজস্ব সংগ্রহের যেমন গুরুত্ব দেবে তেমনই অধিকতর সতর্কতার সঙ্গে জনকল্যাণে রাজস্ব বিতরণও করবে। সংস্থাগুলো এক জরিপে বলেছে, রাজস্ব আহরণ সংশ্লিষ্ট দেশের এসডিজি অর্জনে কীভাবে অবদান রাখবে তা পরিষ্কার হওয়া কঠিন। কারণ একই সাথে নাগরিকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় হবে, আবার নাগরিকদের কল্যাণে তা কীভাবে ব্যয় হচ্ছে তা অনেকটাই অস্পষ্ট।

এই অস্পষ্টতার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে গবেষক দল তাদের গবেষণায় তিনটি মিথস্ক্রিয়া লক্ষ করেছেন। প্রথমত, ট্যাক্সেশন/আয়কর তহবিল এসডিজি লক্ষ্যমাত্রাসমূহ অর্জনের সহায়ক হতে পারে। দ্বিতীয়ত, এসডিজির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু খাতে করের ব্যবস্থা সরাসরি এবং ইতিবাচকভাবে অবদান রাখবে। তৃতীয়ত, ট্যাক্স ব্যবস্থা এসডিজির ওপর সরাসরি এবং নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যখন রাষ্ট্র অসচেতনভাবে করের উৎস নির্বাচন করবে।

এসডিজির ১৭টি অভীষ্টের মধ্যে ৬টি অভীষ্ট অর্জনের সাথে রয়েছে উল্লেখিত তিনটি মিথস্ক্রিয়ার প্রভাব: এসডিজির ৬টি অভীষ্ট লক্ষ্য যেগুলো সরাসরি ট্যাক্সের সঙ্গে জড়িত, তাদের উল্লেখিত ক্রমিক নম্বর হলো- ১, ২, ৮, ১০, ১৬, ১৭।

১. দারিদ্র্যশূন্য করা (দারিদ্র্য থাকবে না/সকল জায়গায় দারিদ্র্যের অবসান: এসডিজির প্রধান লক্ষ্যমাত্রায় প্রত্যাশা করেছে যে ২০৩০ সালে সকল জায়গা দারিদ্র্যকে শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসবে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আয়কর নীতি কীভাবে ভূমিকা রাখছে? আমাদের  দেশের প্রেক্ষাপটে এই জায়গা আমরা অপ্রিয়ভাবে ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। করনীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের গবেষণার ঘাটতি অনেক। যার ফলে রাজস্ব সংগ্রহে একদিকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয় না, অন্যদিকে দরিদ্র নাগরিকের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ দিন দিন বাড়ছে। তাই ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স-আইসিসি বলেছে, করনীতি এমন হতে হবে যেখানে কর পরিশোধের যোগ্য নাগরিকদের কাছ থেকে কর আদায় হবে এবং তা দরিদ্রদের মাঝে পুনঃবিনিয়োগে কাজে লাগাবে। যাতে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারিত হয়, ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি হয়। আমাদের কর ব্যবস্থায় এই পরিকল্পনা কল্পনাও করা যায় না। এটা অস্বাভাবিক একটা চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতি বিরাজমান থাকলে ২০৩০ তো দূরের কথা, আরও ৫০ বছরে দরিদ্রতাকে শূন্যের কোঠায় আনা সম্ভব হবে না। তাই আমাদের করনীতি ক্ষেত্রে ব্যাপক গবেষণা দরকার। আগে ঠিক করতে হবে মূলত কর পরিশোধ করার যোগ্য করদাতা কারা? উক্ত করদাতা থেকে নিশ্চিতভাবে কর আদায়ের ব্যবস্থা করা। একইভাবে আদায়কৃত কর দেশের নাগরিকদের মাঝে সমতার ভিত্তিতে বণ্টন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কেবল তখনই সম্ভব হবে দারিদ্র্য নিয়ন্ত্রণ করা।

২. ক্ষুধামুক্ত, খাদ্যের নিরাপত্তা, পুষ্টির উন্নতি ও টেকসই কৃষি সম্প্রচার: এই লক্ষ্যমাত্রার সাথে রাজস্ব নীতির গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান।  দেশের নাগরিকদের ক্ষুধামুক্ত রাখার জন্য আগে দরকার খাদ্যের নিশ্চয়তা। করের টাকায় দরিদ্র এলাকাগুলোকে চিহ্নিত করে ছোট ছোট উন্নয়ন কাজ পরিচালনা করা। যেখানে ওই এলাকার দরিদ্র জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। যাকে আমরা বলি কাজের বিনিময়ে খাদ্য। এমন যেন না হয়, ভিক্ষুকের নামে বরাদ্দকৃত অর্থ পাবেন এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তির স্ত্রীর নামে। খাদ্যের নিশ্চয়তা বহুভাবে করার সুযোগ আছে। যেমন, দেশে উৎপাদন বাড়ানো। উৎপাদন বাড়াতে গেলে প্রথম দরকার কৃষি জমি রক্ষা করা। যেভাবে ইটভাটা ও অপরিকল্পিত শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে, তাতে দিন দিন কৃষি জমি তলানিতে ঠেকছে। কৃষক ও  কৃষিভূমি রক্ষার জন্য দরকার ত্বরিত সিদ্ধান্ত।  সকল প্রকার কৃষি পণ্যের আমদানি রফতানির ওপর কর প্রত্যাহার করা। কৃষিকে আধুনিকায়ন করার জন্য সকল কৃষি যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক শূন্য করা। কিন্তু আমাদের চলমান রাজস্ব নীতি নাগরিকদের ক্ষুধামুক্ত রাখা, খাদ্যের নিরাপত্তা বিধান, পুষ্টির নিরাপত্তা বিধান, টেকসই কৃষির জন্য উপযুক্ত নয়। ফলে জাতীয়ভাবে এসডিজির ২ নম্বর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাধাগ্রস্ত হবে। কারণ, আমাদের করনীতি দেশ ক্ষুধামুক্ত রাখার পরিকল্পনা উপযুক্ত নয়, এতে নেই খাদ্যের নিরাপত্তার কোনও নির্দেশনা, পুষ্টিকর সব পণ্যের ওপর কোনও কোনোভাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর আরোপ করায় পুষ্টিকর খাদ্য ক্রয়ে নাগরিকদের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, কৃষিকে টেকসই করার জন্য রাজস্ব নীতি সহায়ক নয়। ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচের পরিমাণ বেশি, অন্যদিকে বাজার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে নাগরিকদের চাহিদা, উৎপাদন, জোগান, সরবরাহ ইত্যাদির সাথে করনীতির সম্পর্ক  যৌক্তিক সম্পর্ক নেই। যার কারণে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ঊর্ধ্বগতি থাকায় এসডিজির অভীষ্ট-২ অর্জনও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

৩. সবার জন্য টেকসই অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, টেকসই শিল্পায়ন এবং উদ্ভাবনকে প্রেরণা দেওয়া: এসডিজি ৮ অর্জনের অন্যতম নিয়ামক হলো বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের সুপারিশ হলো – ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক কার্যকলাপ, বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবন হলো উৎপাদনশীলতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রধান চালক। আন্তর্জাতিক আয়কর চুক্তিগুলো যেমন ব্যবসার নিশ্চয়তা প্রদান করে, ঝুঁকি হ্রাস করে বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে, তেমনি দেশের নাগরিকদের কর আরোপ এবং কর পরিহারের ইতিবাচক দিকগুলো সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির নিশ্চয়তা প্রদান করে। বিশ্বব্যাংক ২০১৮ সালে কর পরিশোধ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, উন্নয়নশীল দেশে করের বোঝা নাগরিকদের ওপর এতে বেশি যে নতুন করে বিনিয়োগকারী খুঁজে পাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ সাব-সাহারান আফ্রিকাতে, কার্যকর করের হার মাঝারি আকারের হলেও কোম্পানিগুলির বিশ্বের গড়ে প্রায় ৭ শতাংশ করের মুখোমুখি। কিন্তু ট্যাক্স নীতি এমন হবে যা বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে এবং উদ্ভাবনের ভূমিকা রাখবে।  বিশেষ করে উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে, বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হবে। এছাড়া সরকার প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের প্রতি জোর দেবে, যার ফলে টেকসই শিল্পায়ন তৈরি করবে, উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি হবে, ফলে কার্যকরভাবে দেশগুলোর মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়তে ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।

যেসব দেশ অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি তৈরি করার জন্য পরিকল্পিত করনীতি গ্রহণ করবে তারা ২০৩০ সালের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা ৮ অর্জনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারবে। দেশের প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগবান্ধব করনীতি গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। এখানেও একটি নিরপেক্ষ এবং কার্যকর গবেষণার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যেখানে সরকারকে নাগরিকদের জন্য তথা সবার জন্য টেকসই অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, টেকসই শিল্পায়ন এবং উদ্ভাবনকে প্রেরণা দেওয়ার মতো একটি সহায়ক কর নীতি গ্রহণ করতে পারে।

৪. বৈষম্য হ্রাসকরণ:  দেশের ভেতরে ও বিভিন্ন দেশের মধ্যকার বৈষম্য দূর করা: এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা ১০ অর্জনের জন্য প্রত্যেক দেশের জন্য টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে সামনে রেখে ট্যাক্স নীতিগুলো ডিজাইন করা উচিত। একইভাবে সংশ্লিষ্ট দেশের ট্যাক্স নীতিগুলো এতটাই নমনীয় এবং আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে যাতে করে তা  দেশ ও দেশের বাইরের আর্থিক পরিবেশে অবাধে প্রবেশ করতে পারে বা কার্যকর প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়। তা না হলে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা কঠিন হবে বরং নাগরিকদের মাঝে অন্যায্য কর ব্যবস্থা বিরাজ করবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে তা বাস্তবায়নে বাধার মুখে পড়বে।

৫. শান্তি ও ন্যায় বিচার: টেকসই উন্নয়নের জন্য শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা, সবার জন্য ন্যায় বিচারের সুযোগ সৃষ্টি, সবস্তরে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা: এই এজেন্ডা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ট্যাক্সনীতিতে যে মিশ্র ব্যবস্থাপনা রয়েছে তা পরিহার করা প্রয়োজন। এখানে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার বৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আয়কর/রাজস্ব নীতিতে স্থান দিয়ে অবৈধ ব্যবসা বাণিজ্য বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আলাদা অপরাধ হিসেবে গণ্য করার জরুরি। কারণ, অর্থনৈতিক অপরাধের উৎপত্তির কারণ অনুসন্ধান করে কর ব্যবস্থাপনা থেকে আলাদা রাখলে কর পরিকল্পনা গ্রহণ করা ও তা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে না। অপরাধের ধরন বিবেচনায় অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে আলাদা আইনে বিচারের ব্যবস্থায় শাস্তির বিধান রাখার উচিত।

একই মতামত প্রদান করেছে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি)। কার আইসিসি বলেছে– কর পরিকল্পনা এবং কর ব্যবস্থাপনার বৈধ ও বৈধ পদ্ধতির ব্যবহার থেকে বের হতে হবে। এই অবৈধ কার্যকলাপগুলোকে স্পষ্টভাবে আলাদা করা উচিত। একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং সফল কর ব্যবস্থা অর্জনের জন্য সরকার এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে বৃহত্তর সহযোগিতা প্রয়োজন, যা কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। একইভাবে উচ্চস্তরের ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য প্রত্যেক দেশের কর প্রতিবেদনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। যাতে একটি মূল্যায়ন টুলস থাকবে যেখানে বৈশ্বিক কার্যকলাপ এবং প্রদত্ত করের একটি কার্যকর মূল্যায়ন থাকবে। আইসিসি আরও বলেছে কত টাকা ট্যাক্স আদায় হয় এবং তা কীভাবে ব্যয় হয় সে সম্পর্কে সরকারের কাছ থেকে কার্যকরভাবে স্বচ্ছতা প্রকাশ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের জন্য এই নীতিটি গ্রহণ করা এখন একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। কারণ, কর প্রশাসনের সেবার মান এবং করদাতাদের করের টাকার ব্যবহার নিয়ে নাগরিকদের মাঝে ব্যাপক সন্দেহ বিদ্যমান।

এই পরিস্থিতি বিরাজমান থাকলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের অর্জন প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে কর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও করের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা বা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সঙ্গে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়ন কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হবে।

৬. লক্ষ্য অর্জনের জন্য অংশীদারিত্ব-বাস্তবায়নের উপায়গুলো শক্তিশালী করা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব পুনর্জীবিত করা:

জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য এই লক্ষ্যমাত্রাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কারণ, পারস্পরিক অংশীদারিত্ব না থাকলে উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায় না। এই অংশীদারিত্ব সরকারের সাথে নাগরিকের, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের, রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্বকে বোঝানো হয়েছে। এই অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে না পারলে অনেক ক্ষেত্রে এসডিজির কোনও লক্ষ্যমাত্রাই অর্জন করা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে। তাই আইসিসি থেকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির জন্য সরকার ও ব্যবসায়ীদের নিম্ন বর্ণিত বিবেচনামূলক সুপারিশগুলো উল্লেখ করেছে:

ক)  OECD/এ২০ বেস ইরোশন অ্যান্ড প্রফিট শিফটিং (BEPS) প্রকল্প অভূতপূর্ব আন্তর্জাতিক কর সহযোগিতার যুগে একটি মাইলফলক চিহ্নিত করে। বিইপিএস প্রকল্প একটি ব্যাপক, সুসঙ্গত এবং সমন্বিত সংস্কার প্রচেষ্টার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কর নীতির দুর্বলতাগুলো হ্রাস করতে সরকারগুলোকে সহায়তা করে।

খ) আন্তসীমান্ত বাণিজ্য, ব্যবসায়, বিনিয়োগ, চাকরি এবং প্রবৃদ্ধির জন্য করের সুস্পষ্ট, সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং স্বচ্ছ আন্তর্জাতিক মান অপরিহার্য। তদ্ব্যতীত, বাণিজ্য সহজতর করে এমন প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগুলোকে সহজ করা জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ।

গ) সরকারকে কর প্রতিযোগিতার গ্রহণযোগ্য ফর্মগুলোতে সম্মত হওয়া উচিত এবং আইন প্রণয়ন প্রণোদনা ব্যবহার করার সময় ব্যবসাকে আক্রমণাত্মক কর পরিকল্পনা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। একইভাবে বিনিয়োগকারীকে, ব্যবসায়ীদের অবশ্যই দেশগুলোর মধ্যে সম্মত নিয়ম এবং নীতিগুলো মেনে চলতে হবে।

ঘ) ট্যাক্স বিধিতে দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব (উৎস ও বাসস্থানভিত্তিক করের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশ এবং উদীয়মান বাজারের মধ্যে পার্থক্য, অর্থনৈতিক উপকরণ এবং আইনি সত্তার বিভিন্ন সংজ্ঞা, সেইসাথে প্রশাসনিক পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্যসহ) দ্বিগুণ-করের কারণ হতে পারে অথবা অনিচ্ছাকৃত ডবল অ-ট্যাক্সেশন আরোপ হতে পারে তা বিবেচনায় রাখা;

ঙ) আন্তর্জাতিকভাবে পরিচালিত ব্যবসার দ্বৈত-কর এড়ানোর সময় স্থানীয় কর আইনের ভারসাম্য রক্ষার চাবিকাঠি হলো একটি বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রাখা;

চ) কর এমনভাবে বাড়াতে হবে যা ন্যায্য, বৈষম্য হ্রাস করে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখে- কর নীতিগুলো অবশ্যই এতে বাধা সৃষ্টি করবে না।

ছ) একটি ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে উন্নয়ন তহবিল সম্পূর্ণ বা প্রাথমিকভাবে অর্থায়ন করা যেতে পারে ‘বহুজাতিক উদ্যোগের সন্দেহজনক ট্যাক্স অনুশীলনের ওপর ক্র্যাকডাউন করে।’ ১৭ নিরপেক্ষ অনুমান ইঙ্গিত প্রমাণ দেয় যে BEPS বিশ্বব্যাপী $১০০ বিলিয়ন ট্যাক্স সংগ্রহ হ্রাস করে।অধিকন্তু, এই রাজস্ব হ্রাসকরণ সংবাদ সম্ভবত সেসব দেশের জন্য কার্যকর হবে না যাদের উন্নয়নের তহবিল বেশি প্রয়োজন।

এই লক্ষ্যগুলো পূরণের জন্য প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে এমন কর নীতির প্রয়োজন।

জ) আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিনিয়োগের পরিবেশের উন্নতি এবং আরও কর সংগ্রহের পরিবর্তে আরও ভালো এবং আরও কার্যকর কর ব্যবস্থার জন্য সমর্থনকে অগ্রাধিকার না দিলে আরও বেশি করের জন্য চাপের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের বিরূপ পরিণতি হতে পারে।

ঝ) কিছু কিছু ক্ষেত্রে টার্গেটেড ট্যাক্স নির্দিষ্ট লক্ষ্যে সাহায্য করবে- যেমন জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত; তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কীভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে SDGs-এ বিনিয়োগের জন্য সামগ্রিক ট্যাক্স নেওয়া যায়।

ঞ) উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায় অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, সামাজিক সুরক্ষা এবং পরিষেবা থাকে। অনেকেই ট্যাক্স থেকে সম্পদের অভাবকে এসডিজি অর্জনে বাধা হিসেবে দেখেন।

ট) পারস্পরিক সম্মতি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে যা ব্যবসা এবং কর প্রশাসন উভয়ের জন্য সুবিধার জন্য একটি সাশ্রয়ী এবং দক্ষ সমাধান হতে পারে। এটি ব্যবসার জন্য নিশ্চয়তা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে, যা বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে কাজ করতে পারে।

আলোচ্য তথ্যাদি ও সুপারিশসমূহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে বাংলাদেশসহ স্বল্প উন্নত দেশসমূহের জন্য নাগরিকদের ট্যাক্স নির্ধারণ, ট্যাক্স আদায়, ট্যাক্স তহবিলের ব্যবহার একই সাথে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ। তাই নীতিনির্ধারকদের সতর্কতার সঙ্গে রাজস্ব নীতি নিয়ে অগ্রসর হতে হবে এবং ট্যাক্স নীতিরও সংস্কার করতে হবে। যাতে উপরোক্ত মিথস্ত্রিয়াগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে। টেকসই উন্নয়নের জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদের সংহতি এবং কার্যকর ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসডিজি-এর অভীষ্ট অর্জনে তা একটি শক্তিশালী হাতিয়ার এবং এটি অন্যান্য উপায়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে অবদান রাখবে পারে। একটি সঠিক ও কার্যকর রাজস্বনীতি একযোগে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে তহবিল একত্রিত করতে পারে, বৈষম্য কমাতে পারে এবং টেকসই ব্যবহার ও উৎপাদনের ধরনকে উন্নীত করতে পারে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য ২০১৮ সালে ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফোরামের জরিপের ফলাফলগুলোতে যেমন হাইলাইট করা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রাসঙ্গিক দিকনির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে সংস্থানগুলোকে একত্রিত করা এবং সমাজের উন্নতির লক্ষ্যগুলোকে নীতিগত এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্ব সহকারে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। দেশে দেশে তথা বিশ্বব্যাপী সহযোগিতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক, নেটওয়ার্কযুক্ত এবং কার্যকর বহুপাক্ষিকতা জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একটি নিরাপদ, উন্নত এবং আরও টেকসই ভবিষ্যৎ অর্জনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন এবং উন্নত ডিজিটাল সহযোগিতার পাশাপাশি নারী ও যুবকদের বৃহত্তর অন্তর্ভুক্তির জন্য একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিকভাবে একটি ন্যায্যতার করনীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যা বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খুবই গুরুত্ব বহন করে।

 লেখক: আয়কর আইনজীবী

[email protected]
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
আরও আড়াই লাখ টন চাল আমদানির অনুমতি  
আরও আড়াই লাখ টন চাল আমদানির অনুমতি  
বন্যা মোকাবিলা: প্রকৃতির ভ্রুকুটি ও আমাদের বিস্কুট দৌড়
বন্যা মোকাবিলা: প্রকৃতির ভ্রুকুটি ও আমাদের বিস্কুট দৌড়
বঙ্গবন্ধু কূটনৈতিক উৎকর্ষ পদক পাচ্ছেন দুই রাষ্ট্রদূত
বঙ্গবন্ধু কূটনৈতিক উৎকর্ষ পদক পাচ্ছেন দুই রাষ্ট্রদূত
বিজিএমইএ’র নতুন লোগো
বিজিএমইএ’র নতুন লোগো
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ