X
বুধবার, ১০ আগস্ট ২০২২
২৫ শ্রাবণ ১৪২৯

শিক্ষক স্বপন কুমার লাঞ্ছনা: ‘চিত্ত যেথা ভয়ে পূর্ণ, নিম্ন যেথা শির!’

শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন
০২ জুলাই ২০২২, ১৬:৫৪আপডেট : ০২ জুলাই ২০২২, ১৮:১৫

বাংলাদেশ এখন দু’টি মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা নিয়ে উত্তাল। একটি নড়াইলের, অন্যটি সাভারের। দু’টি ঘটনায়ই ভিকটিম হচ্ছেন শিক্ষক, এবং কাকতালীয়ভাবে শিক্ষকদের উভয়েই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। প্রথম ঘটনাটি শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসকে নিয়ে। তিনি নড়াইল সদর উপজেলায় মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। ধর্ম নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য সমালোচিত ভারতের বিজেপি নেত্রী নূপুর শর্মার সমর্থনে ফেসবুকে নড়াইলের ওই কলেজের এক হিন্দু ছাত্রের পোস্টকে কেন্দ্র করে গত ১৮ জুন শুরু হয় বিক্ষোভ। বিক্ষোভের এক পর্যায়ে ওই ছাত্র এবং শিক্ষক স্বপন কুমারকে জুতার মালা পরিয়ে কলেজ ভবন থেকে বের করে আনা হয়। এ ঘটনার কিছু ছবি এবং ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে কীভাবে একজন কলেজ অধ্যক্ষকে এভাবে হেনস্থা করা হলো?

ঘটনার নয় দিন পর স্থানীয় পুলিশ বাদী হয়ে নাশকতা এবং শিক্ষককে জুতার মালা পরিয়ে হেনস্থা করার অভিযোগে মামলা করেছে। গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এছাড়া জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের দু’টি তদন্ত কমিটি এই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। নড়াইলের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেছেন, শিক্ষককে যেখানে জুতার মালা পরানো হয়েছে, সেখান থেকে তিনি এবং পুলিশ সুপার কিছুটা দূরত্বে ছিলেন। তিনি বলছেন, ‘স্থানীয় জনগণের অভিযোগ ছিল যে প্রিন্সিপাল মহোদয় সকাল থেকেই ওই ছেলেটাকে বা পারিপার্শ্বিক অবস্থা সামাল দিতে পারেননি। সেখানে দুর্বলতা বা অন্যান্য বিষয়ে অভিযোগে তার (অধ্যক্ষ) প্রতি আক্রোশটা বেশি ছিল।’

বুঝলাম, একজন হিন্দু শিক্ষার্থী তার অপরিপক্কতার জন্য হোক, বা অপরিণামদর্শিতার জন্য হোক, ধর্ম নিয়ে ফেসবুকে অবমাননাকর পোস্ট দিয়েছে। সেজন্যে এলাকার ধর্মপ্রাণ মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। কিন্তু তার প্রকাশ এমন নিষ্ঠুর ও মর্মান্তিক কেন হবে? মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকজন শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানাতে পারতেন, ভুল শুধরানোর জন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষক, পরিবার ও সমাজের বয়োজেষ্ঠ্যরা হিন্দু শিক্ষার্থীকে বোঝাতে পারতেন, কাউন্সেলিং করতে পারতেন। কিন্তু সেটি না করে মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকজন কেন কলেজের একজন সম্মানিত অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরাতে গেলেন? এই শিক্ষক তো কোনও পোস্ট দেননি। তিনি হিন্দু শিক্ষার্থীর অসহায়ত্বের কথা চিন্তা করে হয়তো তার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। পরে তিনিও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আক্রোশের শিকারে পরিণত হন।

একজন শিক্ষার্থী যে ধর্ম, বর্ণ বা গোষ্ঠীরই হোন না কেন, তিনি যদি কোনও অন্যায় করে থাকেন, সেটি প্রতিকারের ব্যবস্থা আছে। সভ্য, সামাজিক ব্যবস্থা যেমন আছে তেমনি পুলিশি এবং আইন আদালতের ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু প্রকাশ্যে তাকে জুতার মালা পরানো কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। আর একজন শিক্ষককে যখন জেলা প্রশাসক ও এসপি কাছে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় জুতার মালা পরানো হয়, সেই লজ্জাকর ঘটনার গ্লানির অভিঘাতের জ্বালা প্রকাশ করার ভাষা আমার জানা নেই।

বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলকে কারাগারে ঢুকিয়ে আমরা কি সমগ্র বাংলাদেশটাকে কারাগারে ঢুকিয়ে দেইনি? শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় যে জুতার মালা পরানো হয়েছে, সেই লাঞ্ছনা কি আমাদের সকলের হৃদয়ে বাজেনি?

আমরা আসলে ধর্মের নামে ধর্মান্ধতায় ডুবে আছি। আমরা আমাদের পরিচয়কে খণ্ডিত করে ফেলছি। মানবিক সত্তা, ধর্মীয়, ও আধ্যাত্মিক সত্তা, সামাজিক ও নৃতাত্ত্বিক সত্তা মিলে আমরা প্রত্যেকেই এক একটা পূর্ণাঙ্গ মানুষ। এর প্রত্যেকটি সত্তাই গুরুত্বপূর্ণ, এবং মানবিক, ধর্মীয়, ও নৃতাত্ত্বিক সত্তা মিলেই প্রত্যেকের পূর্ণাঙ্গ পরিচয়। পরিচয়ের এই সামগ্রীক বিন্যাস ও বুননকে অস্বীকার করে আমরা ধর্মীয় পরিচয়কে বড় করে তুলছি বা একমাত্র পরিচয় করে তুলছি। আর তাতেই দেশে দেশে গোল বাঁধছে। ধর্মীয় পরিচয় নয়, ধর্মান্ধ ও উগ্র ধার্মিকতার পরিচয় কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, ও আফগানিস্তানে অসংখ্য অমানবিক, ও নিষ্ঠুর ঘটনার অবতারণা করেছে, করছে; এবং ধর্মীয় গোঁড়ামি থামানো না গেলে ধর্মভিত্তিক ঘৃণার বিস্তার ও নির্বোধ ধর্মান্ধদের নিষ্ঠুরতাকে থামানো কঠিন হবে।    

এই কয়েকদিন আগে, গত ২৫ জুন শনিবার দুপুরে শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে ক্রিকেটের স্ট্যাম্প দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করল দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। কী মর্মান্তিক! আশুলিয়ায় হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের স্কুল শাখার ছাত্রীদের আন্তঃশ্রেণি ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় খেলা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন বিদ্যালয়ের পৌরনীতি ও সুশাসন বিষয়ের শিক্ষক উৎপল কুমার সরকার। স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র জিতু ছাত্রীদের উত্যক্ত করায় শিক্ষক উৎপল কুমার তাকে বাঁধা দেন, ও নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে জিতু একটি স্টাম্প দিয়ে উৎপল কুমার সরকারের ওপর হামলা করে এবং স্টাম্প দিয়ে উপর্যুপরি উৎপল কুমারের পেট ও মাথায় আঘাত করে। পরে রক্তাক্ত উৎপল কুমার সরকার হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাংলাদেশ তর তর করে এগিয়ে যাচ্ছে। ব্যবসা, বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক উন্নয়নের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান প্রশংসিত হচ্ছে। কিন্তু ধ্স নেমেছে মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গায়। তরুণ শিক্ষার্থীসহ ধর্মান্ধতা মনের গভীরে বাসা বেঁধেছে সংখ্যাগুরু জনগণের। অধিকাংশ মানুষ কাণ্ডজ্ঞান, যুক্তি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ভুলে হয়ে উঠছে আত্মকেন্দ্রিক, অসহিষ্ণু, উগ্র ধার্মিক, সুবিধাবাদী, ও ভোগবাদী। শিক্ষার মানে ধস নেমেছে, মানবিক মূল্যবোধ তিরোহিত হচ্ছে, শিক্ষার উদ্দেশ্য মুখ থুবড়ে পড়ছে, মুক্তচিন্তা আজ ভয়াবহ সংকটের মধ্যে। ‍

আমাদের অগ্রবর্তী চেতনা ও সংবেদনশীল মননের কেন্দ্রে  যাদের অবস্থান, তারা হচ্ছেন– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন, স্বামী বিবেকানন্দ, জীবনানন্দ দাশ, ও বেগম রোকেয়ার মতো মানুষেরা।  এদের সকলেই ছিলেন মুক্তচিন্তার মানুষ। জাত, পাত ও ধর্মের ভেদ না মানায় নজরুল ও লালন তো হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের গালি খেয়েছেন। আর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে কোনও গোঁড়ামি বা চরমপন্থাকে, সেটি ধর্মীয় হোক, জাতীয়তাবাদের হোক বা বর্ণের হোক, খুবই অপছন্দ করতেন। নারী শিক্ষার পথিকৃৎ বেগম রোকেয়াও ধর্মান্ধ ও গোঁড়াপন্থীদের আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন।

ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে ধর্মান্ধতা ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষেরা এবং তাদের পরাজিত করে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অসাম্প্রদায়িক, ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ। আজ একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে আবার আমরা ‘ধর্মীয় গোঁড়ামি’ নামের দানবের মুখোমুখি। বাংলাদেশে ধর্মান্ধতা, ধর্মভিত্তিক ঘৃণা, মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞান-বৈরী ধর্মীয় গোঁড়ামি যেভাবে বাড়ছে, তাতে মনে হচ্ছে এক সাগর আঁধার পাড়ি দিয়ে আবার আমরা ছুটে চলেছি হিমালয় সমান অন্ধকারের দিকে! কবিগুরু লিখেছিলেন, “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,/ জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর/ আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী/ বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি,/ যেথা বাক্য হৃদয়ের উৎসমুখ হতে/ উচ্ছ্বসিয়া উঠে, যেথা নির্বারিত স্রোতে/ দেশে দেশে দিশে দিশে কর্মধারা ধায়/ অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়,/ যেথা তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি/ বিচারের স্রোতঃপথ ফেলে নাই গ্রাসি ...”

বাঙালির মুক্ত, ও মৌলিক চিন্তার দৈন্য, ঔপনিবেশিক সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা অসঙ্গতি, এবং বাঙালির কূপমন্ডুকতা ও সংকীর্ণতায় বিরক্ত হয়ে কবিগুরু ১৯১০ সালে এ চরণগুলো লিখেছিলেন বলে আমার ধারণা। আজ এক শ’ ২১ বছর পরেও কবিগুরুর কথাগুলো সমান প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশে আজ ভয়শূন্য চিত্ত, ও উচ্চ শিরওলা মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে, মুক্ত জ্ঞান গৃহের প্রাচীর, ও ধর্মান্ধতার আড়ালে ঢাকা পড়েছে। তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি কীভাবে আমাদের কাণ্ডজ্ঞান, বিবেচনা বোধ ও যুক্তিকে গ্রাস করে ফেলছে, তারই প্রমাণ নিয়ত পাচ্ছি শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাস, ও হৃদয় মন্ডলের অমানবিক লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে;  এবং নীলা, নুসরত, তনু, ও উৎপল কুমারসহ অসংখ্য মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ জন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মুক্ত, মৌলিক ও নতুন চিন্তার খরা চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বরাবরই ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিল। এখন এমন অনেক শিক্ষার্থী এখানে পড়াশুনা করছে যারা বিশ্ববিদ্যালয়, এবং মুক্তচিন্তার সারবস্তু সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। তাহলে কি বৃহত্তর সমাজের মধ্যে গত কয়েক দশকে যে ধর্মান্ধতাজাত অন্ধকার জমা হয়েছে, সেটিই একটু একটু করে ঢুকে যাচ্ছে শতাব্দী প্রাচীন এই বাতিঘরের মধ্যে? আমি ভীষণভাবে শংকিত, ও উৎকণ্ঠিত। আমি নিজেই দু’টি ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর চরম আক্রোশের শিকার হয়েছি। তবুও আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, ধর্ম, দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার প্রকৃত শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং রবীন্দ্রনাথ, ও কাজী নজরুল ইসলামের মুক্তচিন্তাই আলোকবর্তিকা হয়ে আমাদের পথ দেখাবে।  

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।        

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
হারারেতে ৪০০তম ওয়ানডে খেলার অপেক্ষায় বাংলাদেশ
হারারেতে ৪০০তম ওয়ানডে খেলার অপেক্ষায় বাংলাদেশ
ভারতে শেষ দিনে ছেলেরা হারলেও জিতেছে নারী দল
ভারতে শেষ দিনে ছেলেরা হারলেও জিতেছে নারী দল
তুরাগে ভাঙারি দোকানে বিস্ফোরণ, মৃত্যু বেড়ে ৭
তুরাগে ভাঙারি দোকানে বিস্ফোরণ, মৃত্যু বেড়ে ৭
তুরস্কে ফাইনালে গিয়েও ইমরান হলেন ষষ্ঠ
তুরস্কে ফাইনালে গিয়েও ইমরান হলেন ষষ্ঠ
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ