X
শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২
২২ আশ্বিন ১৪২৯

অর্থনীতি, আইএমএফ-এর ঋণ আবেদন এবং প্রচারণা

মাসুদা ভাট্টি
০২ আগস্ট ২০২২, ১৭:০৮আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২২, ১৭:০৮
প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা কতটা খারাপ? এই প্রশ্নকে সামনে রেখে যদি এগোতে থাকি তাহলে আমরা লক্ষ করবো যে দেশের গণমাধ্যমের কয়েকটি চিহ্নিত পত্রিকা ও টেলিভিশন সংবাদ যেসব সংবাদ বা বিশ্লেষণ প্রকাশ/প্রচার করছে তাতে জনমনে আতঙ্কই তৈরি হচ্ছে। দেশের ভেতরকার অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের বরাত দিয়ে এসব সংবাদ বা বিশ্লেষণ সম্পর্কে সরকারের পক্ষ থেকে কোনও বক্তব্য আমরা দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে বিখ্যাত অর্থনীতি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ বাংলাদেশের অর্থনীতি বিষয়ে কী বলছে সেটা আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ যে মুহূর্তে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ-এর কাছে ঋণ গ্রহণের জন্য চিঠি পাঠালো তখন আন্তর্জাতিক দৃষ্টি স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের দিকে পড়লো। প্রথমে এই ঋণ-আবেদনকে ‘বেইল আউট’ হিসেবে বলা হলেও অতি দ্রুত এই ‘বেইল আউট’ শব্দটি বদলে ‘আইএমএফ-এর কাছে ঋণ চাইলো বাংলাদেশ’ বলেই সংবাদটি সংশোধন করেছে ব্লুমবার্গ-এর মতো বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান।

এবার প্রশ্ন হলো, আইএমএফ-এর কাছে বাংলাদেশ কেন ঋণ চাইলো? মহামারি-উত্তর পৃথিবীতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। এই বাস্তবতায় একের পর এক রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে খারাপ অবস্থার মুখোমুখি হয়ে পড়ছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোও দেশজ অর্থনীতি নিয়ে বিরাট চাপের সম্মুখীন হয়েছে। মূল্যস্ফীতি এত খারাপ অবস্থায় গিয়ে পৌঁছেছে যে প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেসব দেশে ‘অর্থনৈতিক মন্দা’ দেখা দেওয়ার বিষয়ে জোরদার দাবি জানাচ্ছে। এই বিশ্বায়নের যুগে বড় ও শক্তিশালী অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলে তার প্রভাব বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্র অর্থনীতিতে পড়তে বাধ্য। এরমধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তার ফলে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের না থাকাটা শুধু অস্বাভাবিকই নয়, অবাস্তব চিন্তাও বটে। এই মুহূর্তে যারা আইএমএফ-এর কাছ থেকে অর্থ সহযোগিতা চেয়েছে তাদের মধ্যে আফ্রিকার কয়েকটি দেশ রয়েছে এবং এশিয়ায় সর্বশেষ সংযুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের নাম। এর আগে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের নাম এসেছে। যদিও বাংলাদেশের চাওয়া আর শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের চাওয়ায় পার্থক্য রয়েছে।

শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সরাসরি ‘বেইল আউট’ (আর্থিক ধসের হাত থেকে বাঁচাতে অর্থ সহায়তা) শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে ‘ঋণের জন্য আবেদন’। ‘বেইল আউট’ ও ‘ঋণের জন্য আবেদন’-এর মধ্যে যে বিস্তর ফারাক রয়েছে সে বিষয়ে আলোকপাত করেছেন ভারতের দ্য প্রিন্ট-এর প্রধান সম্পাদক শেখর গুপ্তা।

শেখর গুপ্তা প্রথমে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা কী সে বিষয়ে আলোকপাত করেছেন তার ইউটিউব ভিডিও’তে। তিনি বলতে চাইছেন যে বাংলাদেশের অর্থনীতি কোনোভাবেই ‘ভয়াবহ’ বা খারাপ অবস্থায় নেই, তবে সরকার এ বিষয়ে সচেতন যে এই মুহূর্তেই যদি ভবিষ্যতের পরিকল্পনা ও খারাপ অবস্থা মোকাবিলায় ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয় তাহলে সামনে অর্থনীতির অবস্থা খারাপ হতে পারে। কারণ, বিশ্ব পরিস্থিতি খারাপের দিকেই যাচ্ছে।

শেখর গুপ্তা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হঠাৎ করে কমে গেলেও যা রয়েছে (এই মুহূর্তে যার পরিমাণ ৩৯.৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) তা দিয়ে অন্তত পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। আর পাকিস্তানের যে রিজার্ভ রয়েছে তা দিয়ে পাঁচ থেকে সাত সপ্তাহের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব আর শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে এই সংখ্যা মাত্র সাত দিনের। ফলে বাংলাদেশ যেকোনোভাবেই পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার সঙ্গে তুলনীয় নয় সেকথা জোর দিয়ে বলে শেখর গুপ্তা বলতে চাইছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশ সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে দেশের সার্বিক খরচ কমিয়ে অর্থনীতিতে স্বস্তি দিতে তা ‘সচেতন’ ও ‘সুবিবেচনাপ্রসূত’ এবং একই সঙ্গে আগে থেকেই আইএমএফ-এর সঙ্গে ঋণ-আবেদন নিয়ে আলোচনা শুরু করায় বাংলাদেশ অন্য অনেক দেশের তুলনায় কয়েক ধাপ এগিয়ে রইলো। আইএমএফ-এর কাছে ঋণ-আবেদনেও বাংলাদেশ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে এভাবে, বাংলাদেশ প্রথমত আইএমএফ-এর জলবায়ু তহবিল থেকে ঋণের একটি অংশ চেয়েছে, যা বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবেই দাবিদার এবং সুদমুক্ত এই ঋণ বাংলাদেশের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার দেশগুলোর জন্যই নির্ধারিত।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের অর্থনীতি বিগত বছরগুলোতে যে সক্ষমতা দেখিয়েছে তাতে বিশ্বজুড়ে এই সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে যে বাংলাদেশ আসলে পৃথিবীর অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল একটি অর্থনীতি। ফলে বাজেট-সহায়তাসহ চলতি হিসাবের জন্য অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আইএমএফ এই ঋণ না দেওয়ার কোনও কারণ নেই, যেটা শ্রীলঙ্কা কিংবা পাকিস্তানের ক্ষেত্রে আইএমএফ-এর পক্ষে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ কেবল কঠিনই নয়, অকল্পনীয়ও বটে।

এই যে আগেভাগেই আইএমএফ-এর মতো প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ-আবেদন করা হলো তাতে বাংলাদেশের অর্থনীতির দুর্বলতা প্রকাশ হলো কিনা? এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে শেখর বলছেন, এতে বরং বাংলাদেশ উপকৃতই হলো। যদি ঋণ মঞ্জুর হয় তাহলে সেটি হবে বাংলাদেশের জন্য আগেভাগে অর্থনীতি মেরামতের জন্য সহায়ক। আর যদি আইএমএফ ঋণ মঞ্জুর না করে তাহলে সেটিও আগে থেকে জানা থাকায় বাংলাদেশ বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। কোনও দেশের অর্থনীতিই রাতারাতি খারাপ হয়ে যায় না, ধারাবাহিক ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আগে থেকে সতর্ক না হওয়াই দেশের অর্থনীতি খারাপ হওয়ার মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞগণ বলে থাকেন। সে বিচারে বাংলাদেশ আগে থেকেই আইএমএফসহ অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে দেনদরবার শুরু করায় এটুকু স্পষ্ট যে সরকার বিষয়টিকে লুকোতে চাইছে না কিংবা এড়িয়েও যেতে চাইছে না। বরং জনগণের সামনে বিষয়টি উন্মুক্ত করে দিয়েছে, যাতে জনগণও এ বিষয়ে ব্যক্তি ও সামষ্টিক জীবনে সচেতন হতে পারে এবং কৃচ্ছ্র সাধন করতে পারে। কথায় আছে ‘এভরি লিটল হেল্পস’ (বাংলা প্রবাদ পিঁপড়ার শক্তিই শক্তি), বাংলাদেশের জনগণ এই বিশ্বাসে ঐতিহাসিকভাবেই আস্থা রেখেছে।

আইএমএফ থেকে ঋণগ্রহণ কোনও আতঙ্কের ঘটনা নয়। অনেক ধনী দেশও আইএমএফ থেকে ঋণ গ্রহণ করেছে। মজার ব্যাপার হলো, পৃথিবীতে একটি মাত্র দেশ, যারা আইএমএফ থেকে সবচেয়ে বেশি ঋণ গ্রহণ করেছে সেটি কোন দেশ জানেন? পাকিস্তান। দেশটির ৬৪ বছরের ইতিহাসে ২২ বার আইএমএফ থেকে ঋণ গ্রহণ করেছে, অর্থাৎ প্রায় প্রতি দেড় বছরে একবার করে পাকিস্তান আইএমএফ-এর কাছে হাত পেতেছে। এবং এই ঋণ পাকিস্তানের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণও বলছেন যে দেশটির টিকে থাকাই মুশকিল হতো যদি আইএমএফ দেশটিকে বাঁচিয়ে না রাখতো ঋণ দিয়ে। নিন্দুকেরা অবশ্য বলেন যে দেশটি ঋণ নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের খরচ জুগিয়েছে।

অপরদিকে বাংলাদেশ প্রথমবার আইএমএফ-এর সহযোগিতা নেয় ১৯৭৪ সালে এবং সর্বশেষ ঋণ নেয় ২০১২ সালে। গড়ে প্রতি পাঁচ বছরে একবার বাংলাদেশকে আইএমএফ-এর সহযোগিতা নিতে হয়েছে, যাকে বাংলাদেশের মতো বিশাল জনসংখ্যার দেশের জন্য মোটেও অযাচিত নয় বলে দাবি করা যায়। ওদিকে ভারত মোট ৬ বার আইএমএফ-এর দ্বারস্থ হয়েছে এবং সর্বশেষ নিয়েছে ১৯৯১ সালে। প্রতি ১১ বছরে একবার আইএমএফ-এর সহযোগিতা নিয়ে অর্থনীতিকে দাঁড় করিয়েছে ভারত। ঋণগ্রহণ কোনোভাবেই ভালো কোনও বিষয় নয়, সেটা যে দেশের জন্যই হোক না কেন। বাংলাদেশও যে আইএমএফ-এর দ্বারস্থ হয়েছে সেটা কোনও সুখের কথা নয়। কিন্তু দেশের সামনে যে বিপদ উপস্থিত হয়েছে তাতে বিকল্প কোনও পথ খোলা ছিল কিনা সে বিষয়েও প্রশ্ন তোলা যায়।

বিশ্ব পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন কোনও দেশ বা বাস্তবতা নয়, ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বাস্তবতার নিরিখে বাংলাদেশের পরিস্থিতিকেও বিশ্লেষণ করতে হবে। মহামারি ও যুদ্ধ গোটা বিশ্বকে কীভাবে আক্রান্ত করেছে তা আগে ধর্তব্যে নিতে হবে এবং তার আঘাত বাংলাদেশকে কীভাবে পর্যুদস্ত করছে এবং আগামীতেও করতে পারে সেসব মাথায় রাখতে হবে যেকোনও পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনায়। দুঃখজনক হলো, বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় এই সংবেদনশীলতা লক্ষ করা যাচ্ছে না। একপক্ষ বাংলাদেশে সব ঠিক আছে বলতে চাইছেন, আরেকপক্ষ বাংলাদেশকে ক্ষণে শ্রীলঙ্কা ক্ষণে পাকিস্তান ক্ষণে ব্যর্থ রাষ্ট্র বানিয়ে বাণী প্রচার করে চলেছেন। সরকার চেষ্টা করছে পরিস্থিতি নিয়ে জনগণের সামনে তাদের মতো একটি ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হতে এবং তাতে জনমনে জমা হওয়া প্রশ্নের উত্তর খানিকটা হলেও মিটছে কিন্তু পরক্ষণেই গুজব আর ভয় ছড়ানো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যম তাদের নিজস্ব ভয় উদ্রেককারী বিশ্লেষণ প্রকাশ করে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে। এর সঙ্গে যদি দেশের পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করার রাজনীতিকে আমরা যুক্ত করি তাহলে বলতেই হবে, দেশের পরিস্থিতি খুব কৌশলে ও ইচ্ছাকৃতভাবে ‘খারাপ’ করার চেষ্টা চলছে। এই মুহূর্তে যা দেশ ও দেশের অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে।
 

লেখক: এডিটর ইনচার্জ, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি



[email protected]
 
 
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ফেসবুকে প্রতারণা, বাঁচবেন কীভাবে
ফেসবুকে প্রতারণা, বাঁচবেন কীভাবে
পাকিস্তানের বিপক্ষে জিততে বাংলাদেশের চাই ১৬৮
পাকিস্তানের বিপক্ষে জিততে বাংলাদেশের চাই ১৬৮
গাছে যাত্রীবাহী বাসের ধাক্কা, পুলিশসহ নিহত ৪
গাছে যাত্রীবাহী বাসের ধাক্কা, পুলিশসহ নিহত ৪
নাসুমের পর তাসকিনের উইকেট উদযাপন
নাসুমের পর তাসকিনের উইকেট উদযাপন
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ