X
শনিবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২২
২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

‘শনিবার বিকেল’ দেখতে চাই

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
১৭ আগস্ট ২০২২, ১৩:২০আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২২, ১৫:৫২

আমাদের চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের আসলে কাজটা কী? কিংবা যারা এই বোর্ডে আছেন তাদের চলচ্চিত্র সম্পর্কে জ্ঞান কতটুকু? এসব প্রশ্ন ওঠে যখন কোনও একটা ভালো ছবি আটকে যায়। সেন্সর বোর্ড মারদাঙ্গা ছবি, নকল ছবি, বস্তাপচা কাহিনি ও নিম্নমানের নির্মিত ছবি আটকায় না, আটকে দেয় সামাজিক সচেতনতামূলক ছবি, ইতিহাস-নির্ভর ছবি, রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে নির্মিত ছবি অথবা এমন ছবি যেটি কিনা বিশ্বদরবারে প্রশংসা কুড়িয়ে আনে।

তাহলে কী বলা যায়, আমাদের সেন্সর বোর্ডের কাজ হলো ভালো ছবি দমন করা? ঠিক এতটা রূঢ় হতে চাই না। তবে বলা চলে ছবি আটকে দেওয়ার একটা সংস্কৃতি বোর্ডের আছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে সনদ পাওয়ার পরও ছবি আটকে যায়, হলে ওঠে না। যেমনটা ঘটেছে দেশের নন্দিত চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সিনেমা ‘শনিবার বিকেল’ নিয়ে। আটকে আছে সেই ২০১৯ সাল থেকে। সেন্সর বোর্ডের সনদ পাওয়ার সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখলো না ছবিটি। যারা বোর্ডের সদস্য ছিলেন তারা এখনও বলছেন, সিনেমা হিসেবে ছবিটি নিয়ে তাদের কোনও আপত্তি ছিল না। কিন্তু ‘অজানা’ কারণে সেটি আটকে আছে অন্ধকারে।

এই অজানা আর জানা হয় না। একজন নাগরিক হিসেবে ফারুকীর মৌলিক অধিকার হলো ঠিক কোন কারণে ‘শনিবার বিকেল’ বাংলাদেশে মুক্তি দেওয়া যাচ্ছে না- সেই প্রশ্নের উত্তরটা জানা। বিশ্বদরবারে প্রশংসা পাওয়া ছবিটির ছাড়পত্র পাওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। কেন বোর্ডের হিমঘরে আটকে আছে, সেটা দায়িত্বশীল কেউ মুখ খুলে বলছেন না।

আমাদের এখানে যারা ছবি বানান, তাদের একটা প্যাটার্ন আছে, ফর্মুলা আছে। এর বাইরে গেলেই সমস্যা। ফারুকীরা সেই প্রথার বাইরের মানুষ। তারা সেই ফর্মুলার ছবি নির্মাণ করেন না। এসব ছবির ক্ষেত্রে প্রথম যে আপত্তি তোলা হয় সেটা হলো তথাকথিত সামাজিক মূল্যবোধ ও ভাবমূর্তি। কী সেই মূল্যবোধ সেটা পরিষ্কার নয়, কার ভাবমূর্তি এবং সেটা কীভাবে নষ্ট হয়, সেটাও বরাবর থেকে যায় অস্বচ্ছ।

সিনেমা গল্প বলে যে গল্প সমাজে বিরাজমান। একটা বিষয় মাথায় আসে না, যা বলা যায়, লেখা যায়, লিখছেও মানুষ, সেটা নিয়ে সিনেমা কেন করা যাবে না? কিছু ব্যক্তির নিজস্ব ভাবনা, তাদের সর্বাধিপত্যকামী ও অগণতান্ত্রিক মনোভাব এভাবেই খর্ব করে একজন পরিচালকের শ্রম আর মেধাকে। শিল্পের ভাষা যদি গ্রহণ করার মানসিকতা না থাকে, শিল্পীর ওপর যদি নেমে আসে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, তাহলে সমাজ আগে বাড়বে কী করে?

একজন নিবেদিতপ্রাণ চলচ্চিত্রকার সিনেমা বানানো ছাড়া আর কোনও কিছুই করতে পারেন না। তার কাছে এটি সাধনা। অনেকে আছে অন্য অনেক ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি সৌখিন নির্মাতা। ফারুকী আমাদের দেশের একজন পেশাদার পরিচালক। তিনি হতাশা প্রকাশ করছেন, রাষ্ট্রের কাছে জানতে চেয়েছেন, তার কণ্ঠ আর কত চেপে ধরার চেষ্টা করা হবে। আমরাও আসলে জানতে চাই– রাষ্ট্র বলুক কোথায় এই ছবির সমস্যা– যে ছবি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুনাম অর্জন করলেও বাংলাদেশের ক্ষতি হয়ে যায়।

যতটুকু জেনেছি, বিধি মোতাবেক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল বোর্ডে যান ছবির প্রযোজক। আপিলের শুনানিতে আপিল কমিটি সন্তুষ্টিও প্রকাশ করে। তবু দিন যায়, বছর যায়। নির্মাতা ও প্রযোজকদের আজও জানানো হচ্ছে না–এই ছবিকে ছাড়পত্র দিতে সমস্যা কোথায়।

সিনেমা তো মুক্তির স্বপ্ন দেখায়, মানুষকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়, সমাজ বাস্তবতা তুলে ধরে মানুষকে মানবিক চিন্তা করতে শেখায়, ইতিহাসমুখী করে। ১৯৭০ সালে জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিটির কথাই ধরা যাক। একটি ছবি কেমন করে হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রেরণা। বলা হয়, এটি পাকিস্তান আমলের প্রথম রাজনৈতিক ছবি, যার শুরু ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের প্রভাতফেরির দৃশ্য-দিয়ে। এ ছবিতে ব্যবহৃত পাঁচটি গানের মধ্যে ‘আমার  সোনার বাংলা’ গানটিও ছিল। পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা সেন্সর বোর্ডে ছবিটি আটকানোরও ষড়যন্ত্র করে। গণরোষে প্রথমে মুক্তি দিলেও সেদিনই ছবি নিষিদ্ধ করে সরকার। আমরা নিশ্চয়ই সে যুগে বাস করছি না। আমাদের জানতে দেওয়া হোক ‘শনিবার বিকেল’ ছবির সমস্যা কোথায়?

সেন্সর বোর্ড বা তার ওপরে যারা এই ছবি নিয়ে খেলছেন, তারা হয়তো ভাবছেন ছবিটি মুক্তি পেলে সমাজের মস্তিষ্ক নষ্ট হবে, সমাজ উচ্ছন্নে চলে যাবে। তাই তাকে আটকাতেই হবে। যুক্তিগুলো মানা যায় না। গণতান্ত্রিক দেশ তার সংবিধানমতে বাকস্বাধীনতার কথা বলে, বলে মুক্ত-মতের কথাও। চলচ্চিত্রে কোনও ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বক্তব্য দেখে যদি রক্ষণশীল বর্গ সেই চলচ্চিত্র আটকে রাখে তাহলে আমাদের শিল্প-সাহিত্য কোন পথে চলবে? আমরা মনে করি– সু-সংস্কৃতি, কু-সংস্কৃতি নির্বিশেষে সেই মুক্তির পরিসরকে বিরাজ করতে দেওয়া জরুরি। চলচ্চিত্রকে আটকাবার জন্য মানুষের মনন আর সৃজনশীলতাকে আটকানো চলে না।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
লঞ্চ চললেও যাত্রী নেই সদরঘাটে
লঞ্চ চললেও যাত্রী নেই সদরঘাটে
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে গণপরিবহন নেই
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে গণপরিবহন নেই
বিএনপির সমাবেশ এলাকায় র‌্যাবের মহড়া
বিএনপির সমাবেশ এলাকায় র‌্যাবের মহড়া
দুপুরে খিচুড়ির আয়োজন করেছে যুবলীগ
দুপুরে খিচুড়ির আয়োজন করেছে যুবলীগ
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ