X
রবিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩
১৪ মাঘ ১৪২৯

বুদ্ধিজীবীদের কবর সংরক্ষণ জরুরি

মো. আবুসালেহ সেকেন্দার
০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮:১৯আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮:১৯

ডিসেম্বর মাস এলেই মনটা অস্থির হয়ে ওঠে। ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যার নৃশংস ইতিহাসের কথা বারবার মনে পড়ে। ঘাতকের প্রতি ঘৃণায় মনটা বিষিয়ে ওঠে। স্বাধীনতার ৫১ বছর পরও বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল হোতা চৌধুরী মাঈনুদ্দিন ও মো. আশরাফুজ্জামান খানকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার ব্যর্থতা তাড়া করে ফেরে। তারপর আজকের একটি দৈনিকে প্রচারিত একটি সংবাদ পড়ে মনটা আরও খারাপ হলো। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দাবিকারী সরকারের সময়ে এমন একটি সংবাদ কল্পনা করিনি। স্বাধীনতার এত বছর পরও একজন শহীদ বুদ্ধিজীবীর কবর সংরক্ষণে তার পুত্রকে দ্বারা দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে– পত্রিকার পাতায় আমাদের এমন সংবাদ পড়তে হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধের উত্তর প্রজন্মের একজন তরুণ হিসেবে ওই সংবাদে সত্যি লজ্জিত। শহীদ বুদ্ধিজীবীর পুত্রের কাছে জাতির পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করা ছাড়া আমাদের আর কীইবা করার আছে। সরকারের নানা সুযোগ-সুবিধা এখন পাচ্ছে স্বাধীনতা বিরোধীরা। সরকারের নানা দফতরে এখনও ছদ্মবেশে যুদ্ধাপরাধীদের অনেকে ছড়ি ঘোরাচ্ছে। সুতরাং বুদ্ধিজীবীর পুত্রকে তার বাবার কবর সংরক্ষণ করার জন্য বিদেশ থেকে এসে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে এটাই যেন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে!

সরকারের উচিত ছিল সব শহীদ বুদ্ধিজীবীর কবর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সংরক্ষণ করা। যাদের কবর এখনও চিহ্নিত হয়নি তাদের কবর চিহ্নিত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। অবশ্যই উক্ত কাজের কথা বলে অনেকেই সরকারের নানা দফতর থেকে নানা প্রজেক্টের নামে অর্থ বরাদ্দ নিয়েছে কিন্তু নামকাওয়াস্তে কয়েক জায়গায় কয়েকটি স্মৃতি ফলক বসিয়ে দায় সেরেছে। মাঝে মাঝে সভা-সেমিনার আয়োজনের নামে সরকারের মন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে ওই টাকা হালাল করছে। মন্ত্রীদের কেউ কেউ ওই অনুষ্ঠানে হাজির হচ্ছেন। একাডেমিক একটি প্রোগ্রামে যাবেন একাডেমিশিয়ানরা সেখানে মন্ত্রী এমপিদের কাজ কী বিষয়টি আমার অন্তত মগজে ধরে না। কোনও মন্ত্রী বা এমপি যদি একাডেমিশিয়ান হন তাহলে নিশ্চয় তিনি সেখানে অন্য আরও প্রবন্ধ উপস্থাপক ও আলোচকদের মতো ওই কনফারেন্স বা সেমিনারে যেতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রকৃত কাজ না করে ওই অর্থে সভা সেমিনার আয়োজন করে মন্ত্রী এমপিকে ক্রেস্ট দিয়ে অর্থ হালাল করছে কিনা তা অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে মন্ত্রীদের যাচাই করা দরকার। না হলে ওই সব নামফলক ও সংরক্ষণ প্রজেক্টের নয়ছয়ের পরিণতি কী হতে পারে তা বড় প্রমাণ আজ পত্রিকার সংবাদ থেকে পাওয়া যাচ্ছে।

রেডিও পাকিস্তানের (বর্তমানে বাংলাদেশ বেতার) অনুষ্ঠান সংগঠক শহীদ বুদ্ধিজীবী মহিউদ্দিন হায়দারের কবর সংরক্ষণে তার পুত্রকে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে।  (দৈনিক সমকাল, ৩ ডিসেম্বর ২০২২)। সরকারের কাছে দাবি থাকবে অবিলম্বে বুদ্ধিজীবী হত্যার এই মাসে প্রয়োজনে নির্বাহী আদেশে শহীদ বুদ্ধিজীবী মহিউদ্দিন হায়দারের কবর সংরক্ষণ করা হোক। এর মাধ্যমে কিছুটা হলেও তার সন্তানরা শান্তি পাবে। মুক্তিযুদ্ধের উত্তরপ্রজন্মের একজন তরুণ হিসেবে আমাদের মাথা নত না হয়ে গর্বে উঁচু হবে। মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী বর্তমান সরকার যে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি তার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সদাতৎপর তা শহীদ বুদ্ধিজীবী মহিউদ্দিন হায়দারের কবর সংরক্ষণের মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হবে। শহীদ বুদ্ধিজীবী মহিউদ্দিন হায়দারের কবর ডিসেম্বর মাসেই সংরক্ষের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এই প্রজন্মের তরুণদের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ভালোবাসার জন্য বর্তমান সরকারকে আবারও টুপি খোলা সালাম জানাতে চাই।

দুই.

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের কবর অনাদর অবহেলায় পড়ে থাকলেও স্বাধীনতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধী আলবদর আলশামস রাজাকারদের কবর আছে আরামে। যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচারালয় কর্তৃক ফাঁসির দণ্ডে মৃত্যুবরণ করলেও তাদের অনেকের কবরের সামনে ‘শহীদ’ কথা লেখা আছে খোদাই করে। যদিও বাস্তবতা ভিন্ন হবার কথা ছিল। বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লে. মতিউর রহমানের কবরের সঙ্গে পাকিস্তান যে আচরণ করেছিল বাংলাদেশ সরকার যুদ্ধপরাধীদের কবরের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করতে পারত।

বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লে. মতিউর রহমান পাকিস্তানিদের কাছে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশ বিমান বাহিনী গঠনের স্বপ্ন নিয়ে ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট বাংলার এই বীর সন্তান অবাঙালি ছাত্র বৈমানিক রশীদ মিনহাজসহ একটি টি-৩৩ বিমান হাইজ্যাক করে ভারত সীমান্তের দিকে উড়াল দেন। ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ৩ মিনিটের দূরত্ব থাকতে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। পাকিস্তান সরকার রশীদ মিনহাজকে সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘নিশানে হায়দার’ প্রদান করে করাচির মাসরুর বিমান ঘাঁটিতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাধিত করে।

অন্যদিকে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে গাদ্দার হিসেবে অভিহিত করে অনাদর-অবহেলায় তীব্রতম ঘৃণার সাথে ওই বিমান ঘাঁটির চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের কবরস্থানে করব দেয়। বিমানঘাঁটির মূল প্রবেশদ্বারে টাঙিয়ে রাখা হয় রশিদ মিনহাজের ছবি সমরবীর হিসেবে। জানানো হয় অভিবাদন। আর মতিউর রহমানের ছবি টাঙিয়ে গাদ্দার হিসেবে ঘৃণা জানানোর ব্যবস্থা করা হয়।

এছাড়া বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্ত্রী ও সন্তানদের দীর্ঘদিন ওই কবরস্থানে প্রবেশের অনুমতি প্রদান করা হয়নি।

পাকিস্তান যদি পারে বাংলাদেশ কেন পারবে না? আমাদের জাতীয় বীরের কবরকে পাকিস্তানিরা ঘৃণা করতে পারলে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডে মৃত্যুবরণকারীদের ক্ষেত্রে কেন বাংলাদেশ সরকার একই নীতি অনুসরণ করছে না? অনেকে হয়ত এক্ষেত্রে ধর্মের ট্রাম কার্ড খেলতে চাইবে। কবর কবর বলে আওয়াজ তুলবে! ওই সব ধর্মব্যবসায়ীদের প্রশ্ন করতে হবে, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের কবরে যখন পাকিস্তান সরকার ঘৃণা করার ব্যবস্থা করেছিল তখন কোথায় ছিল ফতোয়া, কোথায় ছিল শ্লোগান? অতীতের জবাবদিহিতা ছাড়া শ্লোগান তুললেই কেন তা বাংলাদেশকে মানতে হবে। পাকিস্তানের মতো নিষ্ঠুরতা না দেখাক বাংলাদেশ সরকার এ কাজটুকু তো করতে পারে, যুদ্ধাপরাধীদের কবরকে চিহ্নিত করে তার সামনে যুদ্ধাপরাধী কথাটা লিখে সাইনবোর্ড ঝুলাতে পারে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীরা যত সমাদর পাচ্ছে পৃথিবীর অন্যকোনও দেশে যুদ্ধাপরাধী-দেশদ্রোহীদের এমন সমাদর অকল্পনীয়। বেশিদূরে যাওয়ার দরকার নেই। পলাশী যুদ্ধের খলনায়ক নবাব সিরাজউদ দৌলার সেনাপতি মীরজাফরের কবরের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ভারতের মুর্শিদাবাদে অবস্থিত মীরজাফরের কবরের পাশ দিয়ে যাওয়া আসার সময় জনসাধারণ ঘৃণা প্রকাশ করে। তার কারণ হচ্ছে ওই কবরের সামনে লেখা আছে এটা মীরজাফরের কবর।

প্রকৃত ইতিহাস যখন তরুণ প্রজন্ম জানবে এবং কবরের সামনে লেখা থাকবে তখন তারা মীর জাফরের কবরের মতো যুদ্ধাপরাধীদের কবরেও তাদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করবে।

তাই আমাদের দাবি হচ্ছে, অচিরেই ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সহযোগী যুদ্ধাপরাধী তথা দালাল, রাজাকার, আল বদর, আল শামসদের কবর চিহ্নিত করে প্রতি কবরের সামনে সংক্ষেপে তাদের কীর্তিকালাপ লিখে সাইনবোর্ড দেওয়া হোক। আর এমনটি করা সম্ভব হলে যুদ্ধপরাধীদের প্রতি তরুণ প্রজন্মের ঘৃণা দেখে কোনও যুগে কোনও দেশে আর কেউ যুদ্ধাপরাধ তথা দেশের মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে বিদেশীদের দালালী করে ধর্ষণ-হত্যা ও লুটতরাজের উৎসবে মেতে উঠতে সাহস করবে না।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
সংকট সমাধানে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত দরকার
ওয়েবিনারে বক্তারাসংকট সমাধানে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত দরকার
‘পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় আসতে বিএনপি-জামায়াত ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে’
‘পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় আসতে বিএনপি-জামায়াত ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে’
নির্বাচন কমিশন যথাসময়ে সংসদ নির্বাচনের তারিখ জানাবে: আইনমন্ত্রী
নির্বাচন কমিশন যথাসময়ে সংসদ নির্বাচনের তারিখ জানাবে: আইনমন্ত্রী
ফেনীতে ‘গোপন বৈঠক’ থেকে জামায়াতের ১২ নেতাকর্মী আটক
ফেনীতে ‘গোপন বৈঠক’ থেকে জামায়াতের ১২ নেতাকর্মী আটক
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ